চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলায় আমন ধানের জমিতে আখ চাষ করে লাভ পাচ্ছিলেন কৃষকেরা, তাই বছর বছর বাড়ছিল আখের আবাদ। ২০১৯ সালের ৪ সেপ্টেম্বর প্রথম আলোর এক প্রতিবেদনে জানানো হয়, উপজেলা কৃষি কার্যালয়ের হিসাবে তখন উপজেলায় আখচাষি ছিলেন ১০০ জনের বেশি, অথচ পাঁচ বছর আগেও এ সংখ্যা ছিল ২০ থেকে ৩০ জন। আগের দিন, ৩ সেপ্টেম্বর মঙ্গলবার দুপুরে কুম্ভারপাড়া বিলে গিয়ে দেখা যায়, বিস্তীর্ণ মাঠজুড়ে আখের খেত।
আমনের জমিতে আখ
কুম্ভারপাড়ার চাষি রবিউল আলম এই মৌসুমে আগে আমন ধান চাষ করতেন। তাতে খরচ উঠলেও লাভের মুখ দেখছিলেন না। তিন বছর ধরে তিনি নিজের ৮০ শতক জমিতে আমনের বদলে আখ চাষ করছিলেন, আর প্রতিবেদন অনুযায়ী খরচ বাদ দিয়ে এক মৌসুমেই তাঁর লাভ হচ্ছিল ৩০ হাজার টাকার বেশি।
রবিউল প্রথম আলোকে বলেন, আমনে তাঁর খরচ হতো ৫০ হাজার টাকা, আখেও খরচ একই। তখন পর্যন্ত তিনি ৪০ হাজার টাকার আখ বিক্রি করেছিলেন এবং খেতের বাকি আখ বিক্রি করে আরও অন্তত ৪০ হাজার টাকা পাওয়ার আশা করছিলেন। আগের বছরও এমন লাভ হয়েছিল বলে জানান তিনি।
চাষিরা জানান, কুম্ভারপাড়া বিলে প্রতিবছর আমন ধানের চাষ হতো। কয়েক বছর ধরে ধানের দাম না পাওয়ায় তাঁরা বিকল্প ফসলের কথা ভাবেন এবং কয়েক মৌসুম আগে আখের চারা লাগিয়ে চাষ শুরু করেন। সাফল্য আসায় রোসাংগিরি, সমিতিরহাট, সুয়াবিল, আবদুল্লাহপুর, লেলাং ও দৌলতপুরসহ বিভিন্ন গ্রামে আখের খেত বাড়তে থাকে। কুম্ভারপাড়া গ্রামের আরেক চাষি মুহাম্মদ আবদুল হালিম ১৬ শতক জমিতে আখ চাষ করেছিলেন। তিনি জানান, আশপাশের সব জায়গায় আখের চাষ হয়েছে, অনেকে খেত থেকেই বিক্রি করছেন, আর ফলন ভালো হওয়ায় চড়া দাম পাওয়া যাচ্ছে।
উপজেলায় আবাদের হিসাব
উপজেলা কৃষি কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সালের ওই মৌসুমে উপজেলায় ৩২ হেক্টর জমিতে আখের চাষ হয়। এই হিসাবের বাইরে আরও ২০ হেক্টর জমিতে আখ চাষ হয়েছিল। দুই বছর আগেও উপজেলায় আখের খেত ছিল ১৮ হেক্টর।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা লিটন দেবনাথ প্রথম আলোকে বলেন, গত কয়েক বছরে উপজেলার কৃষকেরা আখ চাষ করে লাভবান হচ্ছেন এবং আখের চাষ ক্রমে বাড়ছে। তাঁর মতে, দক্ষতা, পরিচর্যা এবং সঠিকভাবে সার ও কীটনাশক প্রয়োগ করলে আখের ফলন ভালো হয়। কোন সার বা বালাইনাশক কতটা দিতে হবে, তা জানতে চাষিদের উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার পরামর্শ নেওয়া উচিত।
ফটিকছড়িতে আখের এই ফিরে আসা চোখে পড়ার মতো। বাংলাপিডিয়ার ফটিকছড়ি উপজেলা ভুক্তিতে আখকে তামাক ও তরমুজের সঙ্গে উপজেলার বিলুপ্ত বা বিলুপ্তপ্রায় ফসলের তালিকায় রাখা হয়েছে। ৭৭৩.৫৫ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই উপজেলার উত্তরে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্য, প্রধান নদী ধুরং। সেখানকার প্রধান ফসল ধান, চা, রাবার, আলু, পেঁয়াজ, রসুন, ডাল ও শাকসবজি।

খেত থেকেই বিক্রি
চাষিরা জানান, প্রতি কানিতে (৪০ শতক) আখ চাষে গড়ে ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা খরচ হয়, আর প্রতি কানিতে গড়ে এক হাজারটি আখ হয়। তখন প্রতিটি আখের দাম ছিল ৪০ থেকে ৮০ টাকা। চাষিরা পরিপক্ব আখ কেটে আঁটি বেঁধে খেতের পাশে জড়ো করছিলেন, আর চুরি ঠেকাতে খেতের এক পাশে পাহারা দিচ্ছিলেন। পাইকারেরা খেতে এসেই আকার অনুযায়ী আখ কিনে নিচ্ছিলেন।
আখ কিনতে আসা বিবিরহাটের ব্যবসায়ী মুহাম্মদ শাহজাহান জানান, খেত থেকে তোলা প্রতিটি আখ দেখে অনুমান করে দরদাম করা হয়। পরে একই আকারের আখ আলাদা করে গাড়িতে বাজারে নেওয়া হয়। তাঁর কথায়, বড় আকারের প্রতিটি আখ ৬০ থেকে ১০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছিল।

আখ ও চিবিয়ে খাওয়ার জাত
বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী, আখ ঘাস পরিবারের (গ্রামিনি) স্যাকারাম গণের একটি বহুবর্ষজীবী উদ্ভিদ; চাষের প্রধান প্রজাতি Saccharum officinarum। দেশে চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, সিলেট, ঢাকা, ফরিদপুর, যশোর, কুষ্টিয়া, রাজশাহী, রংপুরসহ বিভিন্ন অঞ্চলে আখ চাষ হয়। স্থানীয় জাতের মধ্যে মিশ্রিমালা ও গেন্ডারি প্রধানত চিবিয়ে খাওয়ার জন্য চাষ করা হয়। আখের কাটা অংশ, যা 'সেট' নামে পরিচিত, বীজ হিসেবে লাগানো হয়; আবার আখ কাটার পর মাঠে থেকে যাওয়া গোড়া থেকেও মুড়ি ফসল হয়। বাংলাপিডিয়ার হিসাবে, ২০০৫-০৬ সালে দেশে প্রায় ৩,৭৭,০০০ একর জমিতে আখ চাষ হয় এবং বার্ষিক উৎপাদন ছিল প্রায় ৫৫,১১,০০০ মেট্রিক টন।
আখ নিয়ে গবেষণা করে পাবনার ঈশ্বরদীতে অবস্থিত বাংলাদেশ সুগারক্রপ গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএসআরআই)। কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীন এই প্রতিষ্ঠানের যাত্রা শুরু ১৯৩১ সালে, ঢাকায় আখের চারা পরীক্ষাকেন্দ্র হিসেবে। বাংলাপিডিয়া জানায়, প্রতিষ্ঠানটি প্রায় ৩০টি উন্নত ও উচ্চফলনশীল আখের জাত উদ্ভাবন করেছে।

ছবি: Plague / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: প্রথম আলো, বাংলাপিডিয়া (আখ; ফটিকছড়ি উপজেলা), উইকিপিডিয়া (বাংলাদেশ সুগারক্রপ গবেষণা ইনস্টিটিউট)




মন্তব্য
(০)