২০২৬ সালের ১২ জানুয়ারি বাংলাদেশের অনলাইন সংবাদমাধ্যম জাগো নিউজের লাইফস্টাইল ডেস্ক স্ট্রিট-স্টাইলে মিষ্টি আলুর ফ্রেঞ্চ ফ্রাই তৈরির একটি রেসিপি প্রকাশ করে। রেস্তোরাঁর জনপ্রিয় এই খাবারের নতুন রূপটি ঘরের রান্নাঘরেই পাঁচটি উপকরণে বানানো যায়: মাঝারি আকারের মিষ্টি আলু, লবণ, ভিনেগার, পানি ও রান্নার তেল। পদ্ধতিও ছোট। মিষ্টি আলুর খোসা ছাড়িয়ে লম্বা করে কেটে লবণ ও ভিনেগার দেওয়া ফুটন্ত পানিতে প্রায় তিন মিনিট আধা সেদ্ধ করা হয়, তারপর পরিষ্কার কাপড়ে শুকিয়ে মাঝারি আঁচে এমনভাবে ভাজা হয় যাতে বাইরে সোনালি ও মচমচে আর ভেতরে নরম থাকে।
রেসিপির শুরুতে জাগো নিউজ লিখেছিল, ফ্রেঞ্চ ফ্রাই খেতে ভালোবাসেন না এমন মানুষ কমই আছেন; রেস্তোরাঁয় গেলে ফ্রেঞ্চ ফ্রাই না খেলে যেন খাবারই অসম্পূর্ণ থেকে যায়, আর ফ্রায়েড চিকেন, বার্গার কিংবা ফিশ ফ্রাইয়ের সঙ্গে দেওয়া গরম ফ্রেঞ্চ ফ্রাই মুহূর্তেই থালা থেকে উধাও হয়ে যায়। স্বাদে একটু ভিন্নতা চাইলে মিষ্টি আলুর ফ্রেঞ্চ ফ্রাইকে দারুণ বিকল্প হিসেবে তুলে ধরে ডেস্কটি: বাইরে সোনালি ও মচমচে, ভেতরে নরম, স্বাদে একেবারে আলাদা। অতিথি আপ্যায়ন কিংবা বিকেলের নাস্তায় এটি বিশেষ আকর্ষণ হতে পারে, ঘরোয়া উপকরণেই সহজে বানানো যায়, আর নতুন এই রূপে মিষ্টি আলু খাওয়ার আগ্রহও বাড়বে বলে লেখা হয়েছিল।
নিচে জাগো নিউজের দেওয়া রেসিপিটি হুবহু ধাপে ধাপে তুলে ধরা হলো। সঙ্গে কৃষি, পরিসংখ্যান ও খাদ্য নিরাপত্তা বিষয়ক কর্তৃপক্ষের তথ্য থেকে জানানো হলো মিষ্টি আলু কী, বাংলাদেশে কতটা মিষ্টি আলু হয়, এতে কী কী পুষ্টি উপাদান আছে, এবং ঘরে শর্করাপ্রধান খাবার ভাজা ও গরম তেল সামলানো নিয়ে খাদ্য নিরাপত্তা সংস্থাগুলো কী পরামর্শ দেয়।
জাগো নিউজের রেসিপি
উপকরণ (জাগো নিউজের তালিকা অনুযায়ী):
- মিষ্টি আলু: ৫ থেকে ৬টি, মাঝারি আকারের
- লবণ: স্বাদমতো
- ভিনেগার: ১ চা চামচ
- পানি: প্রয়োজনমতো
- রান্নার তেল: প্রয়োজনমতো
প্রস্তুত প্রণালি:
- প্রথমে মিষ্টি আলুর খোসা ছাড়িয়ে দুই পাশ সামান্য ছেঁটে নিন। এরপর লম্বা করে ফ্রেঞ্চ ফ্রাইয়ের মতো কেটে নিন। কাটার সময় যে বাড়তি অংশগুলো থাকবে, সেগুলো ফেলে না দিয়ে চাটনি তৈরির জন্য আলাদা করে রেখে দিন।
- একটি প্যানে পানি ফুটিয়ে তাতে কাটা মিষ্টি আলু, লবণ ও ভিনেগার দিয়ে প্রায় ৩ মিনিট আধা সেদ্ধ করে তুলে নিন। খুব বেশি সেদ্ধ করবেন না, তাহলে ভাজার সময় ভেঙে যেতে পারে।
- সেদ্ধ করা আলু একটি ট্রের ওপর পরিষ্কার কাপড়ে ছড়িয়ে দিন। আলতোভাবে মুছে আলুর গা থেকে অতিরিক্ত পানি শুকিয়ে নিন। এতে ভাজার সময় আলু ভালোভাবে মচমচে হবে।
- এবার কড়াইয়ে তেল দিয়ে গরম করুন। তেল ভালোভাবে গরম হয়ে এলে আলুগুলো ধীরে ধীরে ছেড়ে দিন। আঁচ মাঝারি রেখে ভাজতে থাকুন, যেন আলু ভেতরে নরম আর বাইরে সোনালি ও মচমচে হয়ে ওঠে।
- আলুগুলোতে সোনালি রং ধরলে তুলে নিয়ে তেল ভালোভাবে ঝরিয়ে নিন। এরপর গরম গরম ফ্রেঞ্চ ফ্রাই ঝাল-টক-মিষ্টি চাটনি ও পছন্দের সসের সঙ্গে পরিবেশন করুন।
রেসিপিতে লবণ, পানি ও তেলের পরিমাণ নির্দিষ্ট করা হয়নি, সেটি রাঁধুনির ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে; চাটনি তৈরির আলাদা পদ্ধতিও দেওয়া হয়নি, ছেঁটে রাখা অংশগুলো ঘরে যে চাটনি সাধারণত বানানো হয় তাতেই কাজে লাগানোর কথা বলা হয়েছে। রেসিপির দুটি ধাপ, অর্থাৎ অল্প সময় আধা সেদ্ধ করা এবং তেলে ছাড়ার আগে আলু শুকিয়ে নেওয়া, ভাজা আলুর খাবার নিয়ে খাদ্য নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর পরামর্শের সঙ্গে প্রায় হুবহু মিলে যায়। পরের অংশগুলোতে তা ব্যাখ্যা করা হলো।
মিষ্টি আলু আসলে কী
মিষ্টি আলুর বৈজ্ঞানিক নাম Ipomoea batatas; এটি কলমিলতা বা মর্নিং-গ্লোরি গোত্রের (Convolvulaceae) উদ্ভিদ। পেরুর রাজধানী লিমায় অবস্থিত সিজিআইএআরের গবেষণা কেন্দ্র আন্তর্জাতিক আলু কেন্দ্র (সিআইপি) জানায়, নামে মিল থাকলেও আলুর সঙ্গে মিষ্টি আলুর কোনো আত্মীয়তা নেই। আমরা যে আলু খাই তা কন্দ, অর্থাৎ মোটা হয়ে যাওয়া কাণ্ড; আর মিষ্টি আলুর যে অংশ খাওয়া হয় তা সঞ্চয়ী মূল, গাছের পাশের দিকের একটি মূল ফুলে বড় হয়ে যা তৈরি হয়। দেখতে কিছুটা মিল থাকলেও ইয়াম বা গাছআলুর সঙ্গেও এর সম্পর্ক নেই বলে কেন্দ্রটি উল্লেখ করেছে। পাঁচ হাজার বছরেরও বেশি আগে লাতিন আমেরিকায় মিষ্টি আলুকে প্রথম চাষের আওতায় আনা হয়, এবং সিআইপির ভাষায়, উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে অন্য যেকোনো মূলজাতীয় ফসলের চেয়ে বেশি দেশে এর চাষ হয়।
বাংলাদেশের জাতীয় জ্ঞানকোষ বাংলাপিডিয়ার বর্ণনায় মিষ্টি আলু দ্বিবীজপত্রী, বীরুৎ জাতীয় বহুবর্ষজীবী লতা, যা সাধারণত একবর্ষী ফসল হিসেবে চাষ করা হয়। দেশে এটি মিঠা আলু, মিষ্টি আলু বা শকরকন্দ আলু নামে পরিচিত। সাধারণত লতার কাটিং থেকে চারা করে চাষ হয়, আর খাওয়া হয় ফুলে ওঠা সঞ্চয়ী মূল। দিন ও রাত দুটোই উষ্ণ থাকে এমন এলাকায় মিষ্টি আলু সবচেয়ে ভালো হয়। জ্ঞানকোষটি জানায়, বাংলাদেশে মিষ্টি আলু একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পূরক খাদ্য এবং সারা দেশে সবজি হিসেবেও খাওয়া হয়; এর কচি কাণ্ড ও পাতা সবজি হিসেবে খাওয়া হয়, পশুখাদ্য হিসেবেও ব্যবহৃত হয়।
সিআইপি ব্যাখ্যা করে, মিষ্টি আলুর গাছ তিনভাবে বংশবিস্তার করতে পারে: বীজ থেকে, সঞ্চয়ী মূল থেকে, অথবা লতা থেকে। কৃষকেরা অঙ্গজ উপায়ে চাষ করেন, লতা থেকে কাণ্ডের কাটিং নিয়ে লাগান, সেগুলোতে শিকড় গজিয়ে নতুন সঞ্চয়ী মূল তৈরি হয়। কিছু শীতপ্রধান অঞ্চলে লতা ভালোভাবে বাড়ে না বলে সেখানে মূল লাগানো হয়, আর উদ্ভিদতাত্ত্বিক বীজ ব্যবহার হয় জাত উদ্ভাবনের প্রজনন কর্মসূচিতে। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ২,৫০০ মিটার উচ্চতা পর্যন্ত এ ফসল জন্মায়, ভুট্টার মতো ফসলের চেয়ে কম উপকরণ ও কম শ্রম লাগে, আর খরার সময় বা অনুর্বর মাটির মতো প্রতিকূল অবস্থাও সহ্য করতে পারে। কেন্দ্রটির হিসাবে, প্রতি হেক্টরে প্রতিদিনের হিসাবে মিষ্টি আলু গম, ধান বা কাসাভার চেয়ে বেশি খাদ্যশক্তি উৎপাদন করে।
সিআইপির হিসাবে বিশ্বে খাদ্যফসল হিসেবে মিষ্টি আলুর স্থান ষষ্ঠ, ধান, গম, আলু, ভুট্টা ও কাসাভার পরে; উন্নয়নশীল দেশগুলোতে এর স্থান পঞ্চম। বিশ্বে প্রতিবছর ১০৫ মিলিয়ন মেট্রিক টনের বেশি মিষ্টি আলু উৎপাদিত হয়, যার ৯৫ শতাংশই উন্নয়নশীল দেশে। উৎপত্তি লাতিন আমেরিকায় হলেও এখন এশিয়াই সবচেয়ে বড় উৎপাদনকারী অঞ্চল, বছরে ৯০ মিলিয়ন টনের বেশি উৎপাদন হয়; চীন বিশ্বের সবচেয়ে বড় উৎপাদক ও ভোক্তা, যেখানে খাদ্য, পশুখাদ্য এবং স্টার্চসহ নানা পণ্য তৈরিতে মিষ্টি আলু ব্যবহৃত হয়। দুর্ভিক্ষে প্রাণ বাঁচানোর ইতিহাসও কেন্দ্রটি তুলে ধরেছে: টাইফুনে ধানখেত নষ্ট হলে জাপানিরা মিষ্টি আলুর ওপর নির্ভর করেছিল, ষাটের দশকের শুরুতে দুর্ভিক্ষপীড়িত চীনে এটি লাখ লাখ মানুষকে অনাহার থেকে বাঁচিয়েছিল, আর নব্বইয়ের দশকে উগান্ডায় এক ভাইরাস কাসাভা ফসল ধ্বংস করলে মিষ্টি আলুই ভরসা হয়েছিল।

বাংলাদেশে মিষ্টি আলু: জাত ও উৎপাদনের হিসাব
বাংলাপিডিয়া বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ কন্দাল ফসলের তালিকায় আলু, কচু, গাছআলু, কাসাভা ও শাকআলুর পাশাপাশি মিষ্টি আলুর নাম রেখেছে। জ্ঞানকোষটির হিসাবে মিষ্টি আলুর গড় ফলন হেক্টরপ্রতি প্রায় ১০ টন। দেশে অবমুক্ত জাত হিসেবে এতে ফলনসহ যেগুলোর নাম আছে: কমলা সুন্দরী (হেক্টরপ্রতি ৪০ থেকে ৪৫ টন), তৃপ্তি (৪০ থেকে ৫০ টন), দৌলতপুরী (৩০ থেকে ৩৫ টন), বারি মিষ্টি আলু-৪ (৩০ থেকে ৩৫ টন) এবং বারি মিষ্টি আলু-৫ (৩৫ থেকে ৪০ টন)।
বারি জাতগুলোর নাম এসেছে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি) থেকে। বাংলাপিডিয়া জানায়, ধান, পাট, আখ ও চা ছাড়া, যেগুলোর জন্য আলাদা ইনস্টিটিউট আছে, সব ফসলের গবেষণার দায়িত্ব বারির। ১৯০৮ সালে ঢাকায় অ্যাগ্রিকালচারাল রিসার্চ ল্যাবরেটরি, বেঙ্গল নামে এর যাত্রা শুরু, ১৯৭৬ সালে এটি বারিতে রূপ নেয়, আর এর কেন্দ্রীয় স্টেশন গাজীপুরের জয়দেবপুরে। এর ফসলভিত্তিক গবেষণা কেন্দ্রগুলোর একটি কন্দাল ফসল গবেষণা কেন্দ্র, এবং জ্ঞানকোষটির মতে গম, আলু, সরিষা ও সবজির উন্নয়নে প্রতিষ্ঠানটি ভালো অবদান রেখেছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) প্রতিবছর কৃষি পরিসংখ্যান বর্ষগ্রন্থে মিষ্টি আলুর হিসাব প্রকাশ করে। এর ৩৬তম সংস্করণ, অর্থাৎ বর্ষগ্রন্থ ২০২৪, প্রকাশিত হয় ২০২৫ সালের জুনে; রেসিপিটি প্রকাশের সময় এটিই ছিল সর্বশেষ সংস্করণ। এর মুখবন্ধে বলা হয়েছে, বর্ষগ্রন্থে ১৪৬টি ফসলের বার্ষিক জমি ও উৎপাদনের প্রাক্কলন থাকে, যার ছয়টিকে প্রধান ফসল ধরা হয়: আউশ, আমন ও বোরো ধান, গম, আলু এবং পাট। মিষ্টি আলু অপ্রধান ফসলের একটি, এর হিসাব দেওয়া হয় অন্যান্য খাদ্যফসলের সারণিতে।
বর্ষগ্রন্থের জেলাভিত্তিক সারণি অনুযায়ী, ২০২১-২২ সালে দেশে ৬৫,৫২৪.২১ একর জমিতে মিষ্টি আলুর চাষ হয়, উৎপাদন হয় ২,৭৯,৮০০.৯৬ মেট্রিক টন। ২০২২-২৩ সালে জমি ছিল ৭১,৫১০.৮১ একর, উৎপাদন ৩,০৩,৭১০.০৫ টন; আর ২০২৩-২৪ সালে জমি ছিল ৬৯,০৭১.০৩ একর, উৎপাদন ৩,০২,০৭৩.৪৬ টন।
সারা দেশেই মিষ্টি আলু হয়, তবে বিবিএসের হিসাবে উপকূলীয় দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল আলাদা করে চোখে পড়ে। ২০২৩-২৪ সালে নোয়াখালী জেলায় ১৪,০৮৭.০৯ একর জমিতে উৎপাদন হয় ৫৬,৩৬৬.৪৩ টন, আগের বছর ২০২২-২৩ সালে ছিল ১৪,০৩৯.২৪ একরে ৫৫,৩৫৭.৫৯ টন; সারণিতে এটিই কোনো জেলার সর্বোচ্চ হিসাব। পুরো চট্টগ্রাম বিভাগে ২০২৩-২৪ সালে জমি ছিল ২৯,২৫৭.৮৮ একর, উৎপাদন ১,২১,৩১০.৫৫ টন। বরিশাল বিভাগের দ্বীপজেলা ভোলায় একই বছরে ৪,৭১০.৮৮ একরে উৎপাদন হয় ১৭,৪৭১.০৩ টন। অন্যদিকে রাজধানীর কাছে ঢাকা জেলায় হিসাব ছিল ১৭৮.৭২ একর ও ১,৪৬২.১১ টন।

মিষ্টি আলুতে কী আছে
যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগের (ইউএসডিএ) ফুডডেটা সেন্ট্রাল তথ্যভান্ডারের এসআর লিগেসি রেফারেন্স তথ্য (প্রকাশ ২০১৯ সালের এপ্রিলে) অনুযায়ী, ১০০ গ্রাম কাঁচা, রান্না না করা মিষ্টি আলুতে থাকে ৭৭.২৮ গ্রাম পানি, ৮৬ কিলোক্যালরি শক্তি, ২০.১২ গ্রাম শর্করা, ৩.০ গ্রাম খাদ্য আঁশ, ১.৫৭ গ্রাম প্রোটিন ও ০.০৫ গ্রাম চর্বি। একই তালিকায় আছে ৩৩৭ মিলিগ্রাম পটাশিয়াম, ২.৪ মিলিগ্রাম ভিটামিন সি, ৭০৯ মাইক্রোগ্রাম ভিটামিন এ (রেটিনল কার্যকারিতা সমতুল্য হিসাবে) এবং ৮,৫০৯ মাইক্রোগ্রাম বিটা-ক্যারোটিন। এই হিসাব কাঁচা মূলের, ভাজা ফ্রেঞ্চ ফ্রাইয়ের নয়।
সিআইপি জানায়, মিষ্টি আলুর জাতভেদে খোসা ও শাঁসের রং সাদা থেকে হলুদ, কমলা ও গাঢ় বেগুনি পর্যন্ত হয়। কমলা শাঁসের মিষ্টি আলু বিটা-ক্যারোটিনের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস, যা থেকে শরীরে ভিটামিন এ তৈরি হয়; কেন্দ্রটির হিসাবে, কমলা শাঁসের বেশির ভাগ জাতের মাত্র ১২৫ গ্রাম তাজা মূলে একটি প্রাক-স্কুল বয়সী শিশুর দৈনিক প্রো-ভিটামিন এ চাহিদা মেটানোর মতো বিটা-ক্যারোটিন থাকে। কেন্দ্রটি আরও জানায়, মিষ্টি আলু ভিটামিন বি, সি ও ই-এর ভালো উৎস, এতে মাঝারি মাত্রায় আয়রন ও জিংক থাকে, আর এর পাতা ও ডগাও খাওয়া যায় এবং সেগুলো ভিটামিন এ, সি ও বি (রাইবোফ্লাভিন)-এর ভালো উৎস।
ফ্রেঞ্চ ফ্রাই সেদ্ধ বা ভাপে রান্না করা সবজির পদ নয়, তেলে ভাজা নাশতা। ডায়াবেটিস, হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ বা নির্দিষ্ট খাদ্যতালিকা মেনে চলতে হয় এমন কোনো রোগ থাকলে এ ধরনের ভাজা নাশতা খাদ্যতালিকায় কতটা রাখা যায়, তা চিকিৎসক বা নিবন্ধিত পুষ্টিবিদের কাছ থেকে জেনে নিন।
ভাজলে রং সোনালি হয় কেন, অ্যাক্রিলামাইড কী
রেসিপিতে যে সোনালি রঙের কথা বলা হয়েছে, তা আসে একটি রাসায়নিক পরিবর্তন থেকে। যুক্তরাজ্যের ফুড স্ট্যান্ডার্ডস এজেন্সি (এফএসএ) ব্যাখ্যা করে, উচ্চ তাপে রান্নার সময় পানি, চিনি ও অ্যামিনো অ্যাসিড মিলে খাবারের নিজস্ব স্বাদ, গঠন, রং ও গন্ধ তৈরি করে; এ প্রক্রিয়ার নাম মেইলার্ড বিক্রিয়া। একই প্রক্রিয়ায় তৈরি হয় অ্যাক্রিলামাইড নামের একটি রাসায়নিক পদার্থ, যা আলু ও রুটির মতো শর্করাপ্রধান খাবার ১২০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি তাপে বেক করা, ভাজা, গ্রিল করা, টোস্ট করা বা রোস্ট করার সময় তৈরি হয়। খাবারে অ্যাক্রিলামাইড ইচ্ছা করে মেশানো হয় না; এটি রান্নারই স্বাভাবিক উপজাত। এফএসএর তালিকায় রোস্ট করা আলু ও অন্যান্য মূলজাতীয় সবজি, চিপস, ক্রিসপস, টোস্ট, কেক, বিস্কুট, সিরিয়াল ও কফিতে এটি পাওয়া যাওয়ার কথা আছে, আর সংস্থাটি বলে, কম সময় ও কম তাপের চেয়ে দীর্ঘ সময় ও বেশি তাপে রান্না করলে বেশি অ্যাক্রিলামাইড তৈরি হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসন (এফডিএ) জানায়, খাবারে প্রাকৃতিকভাবে থাকা চিনি ও অ্যাসপারাজিন নামের একটি অ্যামিনো অ্যাসিড থেকে অ্যাক্রিলামাইড তৈরি হয়। ২০০২ সালের এপ্রিলে কিছু খাবারে প্রথম এটি শনাক্ত হয়, যদিও রান্না করা খাবারে সম্ভবত বরাবরই এটি ছিল। সেদ্ধ করা বা ভাপে রান্নায় সাধারণত অ্যাক্রিলামাইড তৈরি হয় না, আর এটি মূলত পাওয়া যায় উদ্ভিজ্জ খাবারে, যেমন আলুর তৈরি খাবার, শস্যজাত খাবার ও কফিতে; দুধজাত খাবার, মাংস ও মাছে এটি তৈরি হয় না বা কম তৈরি হয়। এফডিএর প্রকাশিত জরিপ তথ্যে আলুর চিপসের পাশাপাশি মিষ্টি আলুর চিপসও পরীক্ষিত নাশতার তালিকায় আছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের ২০১৭ সালের অ্যাক্রিলামাইড বিধিতেও শিশুদের জন্য বয়ামজাত খাবার প্রস্তুতকারকদের এমন জাতের মিষ্টি আলু বেছে নিতে বলা হয়েছে, যাতে রিডিউসিং সুগার ও অ্যাসপারাজিনের মতো অ্যাক্রিলামাইডের পূর্বসূরি উপাদান যথাসম্ভব কম থাকে।
স্বাস্থ্যঝুঁকির প্রশ্নে এফডিএ বলে, যেসব গবেষণায় প্রাণীদের খুব উচ্চ মাত্রায় অ্যাক্রিলামাইড দেওয়া হয়েছিল, সেখানে প্রাণীদের ক্যানসার হয়েছে, এবং ২০১০ সালে খাদ্য সংযোজন বিষয়ক এফএও/ডব্লিউএইচওর যৌথ বিশেষজ্ঞ কমিটি (জেইসিএফএ) সিদ্ধান্তে আসে যে অ্যাক্রিলামাইড মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য উদ্বেগের বিষয়। ইউরোপীয় খাদ্য নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষ (ইএফএসএ) ২০১৫ সালে তাদের পূর্ণাঙ্গ ঝুঁকি মূল্যায়ন প্রকাশ করে জানায়, খাবারের অ্যাক্রিলামাইড সব বয়সী ভোক্তার ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। এফএসএ বলে, ঝুঁকি ঠিক কতটা বাড়ে তা নির্ণয় করা সম্ভব নয়, তবে সতর্কতা হিসেবে সবারই অ্যাক্রিলামাইড গ্রহণ কমানো উচিত। এফডিএর পরামর্শ হলো ভাজা, রোস্ট বা বেক করা খাবার একেবারে বাদ না দিয়ে এমন স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস মেনে চলা, যাতে ফল, সবজি ও গোটা শস্যের ওপর জোর থাকে এবং সম্পৃক্ত চর্বি, ট্রান্স ফ্যাট, লবণ ও বাড়তি চিনি সীমিত থাকে।
রেসিপির ধাপের সঙ্গে মেলে যে খাদ্য নিরাপত্তা পরামর্শ
সংস্থাগুলোর কয়েকটি ব্যবহারিক পরামর্শ জাগো নিউজের পদ্ধতির সঙ্গে সরাসরি মিলে যায়। এফডিএ জানায়, ভাজা, রোস্ট ও বেক করার মধ্যে তুলনা করলে আলু ভাজার সময়ই সবচেয়ে বেশি অ্যাক্রিলামাইড তৈরি হয়। সংস্থাটির পরামর্শ, ভাজা বা রোস্ট করার আগে কাঁচা আলুর টুকরো ১৫ থেকে ৩০ মিনিট পানিতে ভিজিয়ে রাখলে রান্নার সময় অ্যাক্রিলামাইড কম তৈরি হয়; ভেজানো আলু রান্নার আগে পানি ঝরিয়ে মুছে শুকিয়ে নিতে হবে, যাতে তেল ছিটকে না যায় বা আগুন না লাগে। ফ্রেঞ্চ ফ্রাইয়ের মতো কাটা আলুর খাবার বাদামি না করে সোনালি-হলুদ রং পর্যন্ত রান্নার পরামর্শও দেয় এফডিএ, কারণ বাদামি অংশে সাধারণত বেশি অ্যাক্রিলামাইড থাকে।
ঘরের রাঁধুনিদের জন্য এফএসএও একই রঙের নিয়ম দেয়: শর্করাপ্রধান খাবার ভাজা, বেক, টোস্ট বা রোস্ট করার সময় সোনালি-হলুদ বা তার চেয়ে হালকা রং লক্ষ্য রাখুন। সোনালি রং ধরলেই ফ্রেঞ্চ ফ্রাই তুলে নেওয়ার যে নির্দেশ জাগো নিউজ দিয়েছে, তা এই নীতির সঙ্গেই মেলে।
রেস্তোরাঁ, ক্যাফে ও অন্যান্য খাদ্য ব্যবসার জন্য ইউরোপীয় ইউনিয়ন ২০১৭ সালের ২০ নভেম্বরের কমিশন রেগুলেশন (ইইউ) ২০১৭/২১৫৮-এ কিছু ব্যবস্থা নির্ধারণ করেছে, যা ২০১৮ সালের ১১ এপ্রিল থেকে কার্যকর। ফ্রেঞ্চ ফ্রাই ও অন্যান্য কাটা, ডুবো তেলে ভাজা আলুর খাবারের নিয়মে বলা হয়েছে, কাঁচা টুকরো ধুয়ে ঠান্ডা পানিতে ভিজিয়ে রাখতে হবে, ভালো হয় ৩০ মিনিট থেকে ২ ঘণ্টা, অথবা কয়েক মিনিট গরম পানিতে ভিজিয়ে রাখতে হবে, তারপর ভাজার আগে পরিষ্কার পানিতে ধুয়ে নিতে হবে। বিধিতে বলা হয়েছে, আলু ব্লাঞ্চ করলে, অর্থাৎ অল্প সময় ফুটন্ত পানিতে ডুবিয়ে নিলে, অ্যাক্রিলামাইডের মাত্রা কমে, তাই সম্ভব হলে ব্লাঞ্চ করাই উপযুক্ত। ভাজার তাপমাত্রা ১৭৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে এবং খাদ্য নিরাপত্তার শর্ত মেনে যতটা সম্ভব কম রাখতে হবে, আর ঘন ঘন তেলের ওপর থেকে ভাসমান টুকরো ছেঁকে তুলে তেলের মান ঠিক রাখতে হবে। খাওয়ার উপযোগী ফ্রেঞ্চ ফ্রাইয়ের জন্য বিধিতে অ্যাক্রিলামাইডের মানদণ্ড মাত্রা ধরা হয়েছে প্রতি কেজিতে ৫০০ মাইক্রোগ্রাম।
রেসিপিতে লবণ ও ভিনেগার মেশানো ফুটন্ত পানিতে তিন মিনিট আধা সেদ্ধ করার ধাপটি আসলে অল্প সময়ের ব্লাঞ্চিং, আর মাঝারি আঁচ ও সোনালি রঙে থামার নির্দেশও এসব নিয়মের দিকেই ইঙ্গিত করে। তবে সংস্থাগুলো এসব পরামর্শ দিয়েছে আলুর জন্য, আলাদা করে মিষ্টি আলুর জন্য নয়, এবং মিষ্টি আলুর ফ্রেঞ্চ ফ্রাইয়ের জন্য ঘরোয়া কোনো পৃথক নিয়ম তারা দেয়নি; কম সময়, কম তাপ এবং বাদামি নয় বরং সোনালি রং, এই সাধারণ নীতিগুলো শর্করাপ্রধান সব খাবারের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য।

গরম তেল ও লবণ: ঘরের রাঁধুনির জন্য সতর্কতা
কড়াইয়ে ডুবো তেলে ভাজা মানে খোলা আগুনের ওপর অনেকটা খুব গরম তেল। যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল জরুরি ব্যবস্থাপনা সংস্থার অংশ ইউএস ফায়ার অ্যাডমিনিস্ট্রেশন জানায়, দেশটিতে বাসাবাড়িতে আগুন লাগা ও আগুনে আহত হওয়ার প্রধান কারণ, অন্য সব কারণের চেয়ে অনেক এগিয়ে, রান্না। সংস্থাটির হিসাবে ২০২১ সালে সেখানে দমকল বাহিনী আনুমানিক ১ লাখ ৭০ হাজার রান্নাঘরের আগুনে সাড়া দেয়, যাতে আনুমানিক ১৩৫ জনের মৃত্যু হয়, ৩ হাজার জন আহত হন এবং ৪৯৪ মিলিয়ন ডলারের বেশি সম্পদের ক্ষতি হয়। রান্নার পাত্রের বাইরে ছড়িয়ে পড়া রান্নাঘরের আগুনের প্রধান কারণ ছিল চুলা জ্বালিয়ে রেখে সরে যাওয়া (৩৭ শতাংশ)।
রাঁধুনিদের জন্য সংস্থাটির সতর্কবার্তাগুলো সংক্ষিপ্ত:
- রান্নার সময় পাত্রের কাছে থাকুন। রান্নাঘর ছেড়ে গেলে চুলা বন্ধ করুন।
- কী রান্না হচ্ছে খেয়াল রাখুন। তাপ খুব বেশি হলেই আগুন লাগে; ধোঁয়া দেখলে বা তেল ফুটতে শুরু করলে চুলা বন্ধ করুন।
- পাত্রের হাতল চুলার পেছনের দিকে ঘুরিয়ে রাখুন, যাতে কারও ধাক্কা লেগে বা টানে পাত্র উল্টে না যায়।
- কাছে একটি ঢাকনা বা বেকিং শিট রাখুন; পাত্রে আগুন ধরে গেলে তা দিয়ে ঢেকে দিন, এতে আগুন নিভে যাবে।
রেসিপির আলু শুকিয়ে নেওয়ার ধাপটিও এখানে গুরুত্বপূর্ণ: এফডিএ যেমন বলেছে, পানিতে ভেজানো আলু গরম তেলে ছাড়ার আগে পানি ঝরিয়ে মুছে শুকিয়ে নিতে হয়, যাতে তেল ছিটকে না যায় বা আগুন না লাগে।
রেসিপিতে মসলা বলতে শুধু লবণ, যা আধা সেদ্ধ করার পানিতে স্বাদমতো দেওয়া হয়, আর ফ্রেঞ্চ ফ্রাই পরিবেশন করা হয় চাটনি ও সসের সঙ্গে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) প্রাপ্তবয়স্কদের দিনে ২,০০০ মিলিগ্রামের কম সোডিয়াম খাওয়ার সুপারিশ করে, যা ৫ গ্রামের কম লবণের সমান, অর্থাৎ এক চা চামচের সামান্য কম; ২ থেকে ১৫ বছর বয়সী শিশুদের ক্ষেত্রে তাদের শক্তির চাহিদা অনুযায়ী এই মাত্রা আরও কমিয়ে ধরতে বলা হয়েছে। সংস্থাটি আরও জানায়, সয়া সস ও ফিশ সসের মতো অনুষঙ্গে সোডিয়াম বেশি থাকতে পারে, এবং বাজারের তৈরি সস, ড্রেসিং ও ইনস্ট্যান্ট খাবার সীমিত রাখার পরামর্শ দেয়; ফ্রেঞ্চ ফ্রাইয়ের সঙ্গে সস বাছাইয়ের সময় তা মনে রাখা ভালো।
ছবি: Sanjay Acharya / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)
সূত্র: জাগো নিউজ, আন্তর্জাতিক আলু কেন্দ্র (সিআইপি), বাংলাপিডিয়া, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (কৃষি পরিসংখ্যান বর্ষগ্রন্থ ২০২৪), ইউএসডিএ ফুডডেটা সেন্ট্রাল, যুক্তরাজ্যের ফুড স্ট্যান্ডার্ডস এজেন্সি, যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসন, ইউরোপীয় খাদ্য নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষ, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (জেইসিএফএ; লবণ কমানো), ইউরোপীয় ইউনিয়ন (রেগুলেশন (ইইউ) ২০১৭/২১৫৮), ইউএস ফায়ার অ্যাডমিনিস্ট্রেশন





মন্তব্য
(০)