ফসলে কীটনাশক ও সার ছিটানোর কাজে স্প্রে ড্রোন বা চালকবিহীন উড়োযান ব্যবহারের সম্ভাবনা নিয়ে ২০২৫ সালের ৮ ডিসেম্বর জাগো নিউজে একটি লেখা প্রকাশিত হয়। লেখক কৃষি ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ সমীরণ বিশ্বাস। তাঁর মতে, হাতে বা যন্ত্রে স্প্রে করতে সময়, শ্রম ও খরচ বেশি লাগে এবং পুরো জমিতে সমানভাবে ওষুধ দেওয়া কঠিন হয়। ড্রোন নির্দিষ্ট উচ্চতা ও গতিতে উড়ে স্প্রে করে বলে প্রয়োগ সমান হয়, কীটনাশকের অপচয় কমে এবং কৃষকের শ্রম বাঁচে। দুর্গম বা জলাবদ্ধ জমিতে এটি বিশেষ কাজে আসে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
স্প্রে ড্রোন কী কাজ করে
স্প্রে ড্রোন হলো একাধিক পাখাওয়ালা ছোট উড়োযান, যার সঙ্গে তরলের ট্যাংক ও নজল লাগানো থাকে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) এবং আন্তর্জাতিক টেলিযোগাযোগ ইউনিয়ন (আইটিইউ) ২০১৮ সালে প্রকাশিত এক বইয়ে জানায়, কৃষিতে ড্রোন ব্যবহার হচ্ছে ফসল চাষ, আগাম সতর্কবার্তা, গাছপালা পর্যবেক্ষণ, বালাই দমন, প্রাণী শনাক্ত এবং বন ও পরিবেশ পর্যবেক্ষণে। একই প্রকাশনায় সতর্ক করা হয়, বেশির ভাগ উন্নয়নশীল দেশে ড্রোন ব্যবহারের প্রয়োজনীয় আইন ও নীতিকাঠামো নেই।
২০২২ সালে ফ্রন্টিয়ার্স ইন প্লান্ট সায়েন্স সাময়িকীতে প্রকাশিত একটি পর্যালোচনায় গবেষকেরা লেখেন, স্প্রে ড্রোনে প্রয়োগকারীর শরীরে কীটনাশক কম লাগে, কাজের দক্ষতা বেশি এবং জমির ঢাল বা নরম মাটি এর কাজে বাধা হয় না। তবে এর বহনক্ষমতা সীমিত, আর তুলনামূলক উঁচু থেকে দ্রুত উড়ে স্প্রে করে বলে কিছুটা কীটনাশক বাতাসে ভেসে যাওয়া প্রায় অনিবার্য।

বিশ্ববাজার ও বাংলাদেশের উদ্যোগ
লেখক এক বাজার গবেষণার হিসাব উদ্ধৃত করে জানান, ফসলে স্প্রে করার ড্রোনের বিশ্ববাজার ২০২৪ সালে ছিল ২.৪৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং ২০২৯ সালের মধ্যে তা ১০.৮৬ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে। আরেক গবেষণা প্রতিষ্ঠান আইএমএআরসি গ্রুপের হিসাবে ২০২৪ সালে কৃষি ড্রোনের বাজার ছিল ২.৭০৬ বিলিয়ন ডলার। প্রতিষ্ঠানভেদে হিসাব আলাদা হওয়ায় প্রত্যাশা পরিমিত রাখা উচিত বলে লেখক নিজেই মন্তব্য করেন। তাঁর মতে, এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে চাহিদা বেশি এবং ছোট ও মাঝারি খামারে ড্রোন স্প্রে জনপ্রিয় হচ্ছে।
বাংলাদেশে কৃষি ড্রোনের চেষ্টা নতুন নয়। বাংলা ট্রিবিউনের ২০১৬ সালের সেপ্টেম্বরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী শিক্ষকের তত্ত্বাবধানে কীটনাশক ছিটানোর একটি স্বয়ংক্রিয় ড্রোন তৈরি করেছিলেন, যা ৩ লিটার কীটনাশক বহন করতে পারত। লেখক জানান, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি) ও কয়েকটি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান এ বিষয়ে গবেষণা ও প্রশিক্ষণ শুরু করেছে। বেসরকারি খাতের যেসব উদ্যোগের কথা তিনি উল্লেখ করেন, তার মধ্যে আছে এসিআই মটরস, সিনজেনটা ফাউন্ডেশন, আইকনিক ইঞ্জিনিয়ারিং এবং মাঠপর্যায়ে স্প্রে ড্রোন চালানো ও ড্রোন উৎপাদনে জিনিয়াস ফার্মস লিমিটেড ও ফ্লাইমেকের যৌথ কাজ। তাঁর মতে, ধান, গম, ভুট্টা ও সবজিতে ড্রোন কাজে আসছে এবং সরকার ও বেসরকারি খাত একসঙ্গে কাজ করলে উৎপাদন বাড়বে ও খরচ কমবে।

নিয়ম ও সতর্কতা
বাংলাদেশে ড্রোন ওড়ানো নিয়মের অধীন। ২০২০ সালের সেপ্টেম্বরে মন্ত্রিসভা ড্রোন নিবন্ধন ও উড্ডয়ন নীতিমালা অনুমোদন করে। দ্য ডেইলি স্টার বাংলার প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাণিজ্যিক ও অবাণিজ্যিক উভয় কাজে ড্রোন ব্যবহারে সরকারের অনুমতি লাগবে, ৫ কেজির বেশি ওজনের ড্রোন আমদানির আগে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অনাপত্তিপত্র নিতে হবে এবং এমন ড্রোনের নিবন্ধন বাধ্যতামূলক।
কীটনাশক ভেসে যাওয়ার ঝুঁকিও মাথায় রাখা দরকার। দক্ষিণ কোরিয়ার ধানখেত নিয়ে ২০২৩ সালে সায়েন্টিফিক রিপোর্টস সাময়িকীতে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা যায়, স্প্রে করা জমি থেকে দূরত্ব বাড়লে বা মাঝখানে ভুট্টার মতো বাতাস আটকানো ফসল থাকলে পাশের ফসলে ভেসে যাওয়া কীটনাশক কমে। পাতাওয়ালা সবজিতে এই অবশিষ্টাংশ সবচেয়ে বেশি পাওয়া যায়। এফএও ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ২০২৪ সালের নভেম্বরে আকাশপথে কীটনাশক প্রয়োগের হালনাগাদ নির্দেশিকা প্রকাশ করে, যার লক্ষ্য প্রয়োগ পদ্ধতি নিরাপদ ও দক্ষ করা। কোন ফসলে কোন কীটনাশক কতটা দিতে হবে, তা জানতে কৃষকদের উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার পরামর্শ নেওয়া উচিত।

ছবি: Shreesha Sharma / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: জাগো নিউজ, এফএও ও আইটিইউ, ফ্রন্টিয়ার্স ইন প্লান্ট সায়েন্স, সায়েন্টিফিক রিপোর্টস, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, বাংলা ট্রিবিউন, দ্য ডেইলি স্টার বাংলা




মন্তব্য
(০)