২০২৬ সালের ঈদুল আজহার আগে সারা দেশে কোরবানির পশুর হাট আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হলেও প্রথম দিকেই বাজারে এক ধরনের মন্দাভাব দেখা দেয়। জাগো নিউজ ২৪ সে বছরের ২৫ মে জানায়, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, অর্থনৈতিক মন্দা আর পশুখাদ্যের বাড়তি দামের কারণে হাটে পশুর সরবরাহ ছিল কম, অথচ বিক্রেতারা দাম হাঁকছিলেন কিছুটা বেশি। জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটি আগেই জানিয়েছিল, বাংলাদেশে ঈদুল আজহা হবে ২৮ মে। সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা করছিলেন, আগের কয়েক বছরের ধারাবাহিকতায় সেবারও দেশে পশু কোরবানির সংখ্যা কমবে।
কয়েক বছর ধরে কমছে কোরবানি
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের (ডিএলএস) হিসাবে ২০২৫ সালের ঈদুল আজহায় দেশে ৯১ লাখ ৩৬ হাজার ৭৩৪টি পশু কোরবানি হয়, যা ২০২৪ সালের ১ কোটি ৪ লাখ ৮ হাজার ৯১৮টির চেয়ে প্রায় ১৩ লাখ কম। ২০২৫ সালে ৩৩ লাখ ১০ হাজারের বেশি কোরবানিযোগ্য পশু অবিক্রীত থেকে যায়।
২০২৬ সালের ৩ মে সচিবালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিনুর রশিদ ডিএলএসের তথ্য তুলে ধরে জানান, সেবারের ঈদে কোরবানিযোগ্য পশু ছিল ১ কোটি ২৩ লাখ ৩৩ হাজার ৮৪০টি। এর মধ্যে গরু-মহিষ ৫৬ লাখ ৯৫ হাজার ৮৭৮টি, ছাগল-ভেড়া ৬৬ লাখ ৩২ হাজার ৩০৭টি এবং উট, দুম্বাসহ অন্যান্য পশু ৫ হাজার ৬৫৫টি। সম্ভাব্য চাহিদা ধরা হয় ১ কোটি ১ লাখ ৬ হাজার ৩৩৪টি, ফলে উদ্বৃত্ত থাকার কথা প্রায় ২২ লাখ ২৭ হাজার পশু।
তবে সংশ্লিষ্টরা জাগো নিউজকে বলেন, ২০২৬ সালে কোরবানি ২০২৫ সালের ৯১ লাখের চেয়েও কম হতে পারে, আর অবিক্রীত পশুর সংখ্যা অধিদপ্তরের ধারণার চেয়ে বেশি হতে পারে।

দাম বেড়েছে, কমেছে ক্রয়ক্ষমতা
বিশ্লেষকদের মতে, অর্থনৈতিক দুর্বলতা, ব্যবসা-বাণিজ্যে মন্দা, দারিদ্র্যের হার বৃদ্ধি, উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ার সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে কোরবানির বাজারে। উৎপাদন খরচ বাড়ায় কয়েক বছরে পশুর দাম দ্রুত বেড়েছে, যা নিম্ন ও নিম্নমধ্যবিত্তের নাগালের বাইরে চলে গেছে। তাই আগে যারা একাই একটি পশু কোরবানি দিতেন, তাদের অনেকে কয়েকজন মিলে ভাগে কোরবানি দিচ্ছেন। সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতিরও কিছুটা বিরূপ প্রভাব পড়েছে বলে তারা মনে করেন।
কৃষি অর্থনীতিবিদ ও বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক মহাপরিচালক জাহাঙ্গীর আলম খান বলেন, খামারিদের নানা খরচ বেড়ে যাওয়ায় পশুর দাম বেড়েছে, আর উচ্চ মূল্যস্ফীতিতে সাধারণ মানুষ প্রতিদিনের খরচ মেটাতেই হিমশিম খাচ্ছেন। তার ভাষায়, যারা ছোট গরু দিতেন তারা ছাগল দিচ্ছেন, আর যারা অনেক কষ্টে দিতেন তারা এবার আর দিতে পারছেন না।
শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অর্থনীতির অধ্যাপক রিপন কুমার মণ্ডল বলেন, করোনা-পরবর্তী অর্থনৈতিক দুর্বলতা এখনো কাটেনি। মধ্যবিত্ত শ্রেণির অনেকের পক্ষে গরু কিনতে এক লাখ বা তার বেশি টাকা খরচ করা সম্ভব নয়; তাই তারা ছাগল কিনছেন, কেউ কেউ কোরবানিই দিচ্ছেন না।

অবিক্রীত পশু নিয়ে খামারিদের শঙ্কা
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের উপপরিচালক (খামার) মো. শরীফুল হক বলেন, প্রতিবছরই কিছু পশু উদ্বৃত্ত থাকে। তবে মাংসের চাহিদা সারা বছর থাকায় খামারিদের বড় ক্ষতির আশঙ্কা নেই; অবিক্রীত পশু পরের বছরের কোরবানিতে বা বছরের যেকোনো সময় বিক্রি করা যায়। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা তথ্য অনুযায়ী, দেশে বছরে যত গরু জবাই হয় তার অর্ধেক হয় কোরবানির ঈদে।
কিন্তু অধিকাংশ প্রান্তিক খামারি বলেন, কোরবানির জন্য প্রস্তুত পশু সাধারণ সময়ে কসাইয়ের কাছে বিক্রি করলে উৎপাদন খরচও ওঠে না। জয়পুরহাটের আক্কেলপুরের খামারি রুবেল হোসেন বলেন, হাট থেকে ফিরে আসা পশু ধকলে প্রায়ই অসুস্থ হয়ে পড়ে, আর বিক্রির আগ পর্যন্ত খাবার ও ওষুধের পুরো খরচই বাড়তি। ঈদের পরে অবিক্রীত পশুর চাপে হাটে দামও পড়ে যায়।
বাংলাদেশ ডেইরি অ্যান্ড ফ্যাটেনিং ফার্মারস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোহাম্মদ ইকবাল হোসেন বলেন, পাঁচ-ছয় মণ ওজনের একটি গরু কোরবানিতে বিক্রি না হলে পরে ৫০ থেকে ১০০ কেজি পর্যন্ত ওজন হারায়। পশুখাদ্য, ওষুধ ও খামার চালানোর ব্যয় কয়েক বছরে অস্বাভাবিক বেড়েছে, বিষয়টিতে সরকারের গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। তবে তার মতে, কম বিক্রির আশঙ্কা তখনো চূড়ান্ত নয়, কারণ ঈদের মূল কেনাবেচা শুরু হয় দুদিন আগে।

ঢাকার হাটে চড়া দাম
ঢাকার হাটগুলোতে বেচাকেনা শুরু হলেও তা আশানুরূপ ছিল না; গরুর দাম বেশি থাকায় অধিকাংশ ক্রেতা বাজার দেখে ফিরে যাচ্ছিলেন। বিক্রেতারা জানান, আগের কয়েক বছরের মতো ছোট ও মাঝারি গরুর চাহিদাই বেশি। চার থেকে সাড়ে চার মণ মাংস হবে এমন গরুর দাম দেড় লাখ টাকার ওপরে হাঁকা হচ্ছিল। তাদের দাবি, প্রত্যন্ত এলাকার খামারিদের কাছ থেকে ছোট ও মাঝারি গরু আগের বছরের চেয়ে ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা বেশি দামে এবং বড় গরু লাখ টাকা পর্যন্ত বেশি দিয়ে কিনতে হয়েছে।
রাজধানীর শাহজাহানপুর হাটের ক্রেতা আব্দুল বারি বলেন, শুরু থেকেই বাজার অনেক চড়া মনে হচ্ছে; যে গরুর দাম এক লাখ ৭০ হাজার টাকা চাওয়া হচ্ছে, তার কাছে সেটির ঠিক দাম এক লাখ ৪০ হাজার টাকা।
ছবি: Wasiul Bahar / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, ঢাকা ট্রিবিউন, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, দ্য ডেইলি স্টার




মন্তব্য
(০)