সেনেগাল সরকার বিশ্বব্যাংক গ্রুপের সঙ্গে মিলে ২০২৬ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি রাজধানী ডাকারে ‘অ্যাগ্রিকানেক্ট সেনেগাল কম্প্যাক্ট’ চালুর ঘোষণা দেয়। বিশ্বব্যাংকের সংবাদ বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, এই কৌশলগত উদ্যোগের লক্ষ্য দেশটির কৃষি-খাদ্যব্যবস্থার রূপান্তর এবং লাখো সেনেগালবাসীর খাদ্য নিরাপত্তা উন্নত করা। ২০২৯ সালের মধ্যে কৃষি খাতে ৮ লাখ আনুষ্ঠানিক কর্মসংস্থান সৃষ্টি এর প্রধান লক্ষ্যগুলোর একটি।
তিন মূল্যশৃঙ্খল, তিন অক্ষ
কম্প্যাক্টটি ‘সেনেগাল জাতীয় রূপান্তর এজেন্ডা ২০৫০’ এবং ২০২৫ থেকে ২০৩৪ সালের খাদ্য সার্বভৌমত্ব কৌশলের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ। এটি একটি সমন্বিত বাস্তবায়ন ব্যবস্থা, যেখানে সেনেগাল সরকার এবং বিশ্বব্যাংক গ্রুপ তাদের তিন প্রতিষ্ঠান, আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা (আইডিএ), আন্তর্জাতিক অর্থ সংস্থা (আইএফসি) ও বহুপক্ষীয় বিনিয়োগ গ্যারান্টি সংস্থার (মিগা) মাধ্যমে, কারিগরি ও আর্থিক অংশীদার, বেসরকারি খাত এবং উৎপাদক সংগঠনগুলোর সঙ্গে একসঙ্গে কাজ করবে।
উদ্যোগের মনোযোগ তিনটি অগ্রাধিকার মূল্যশৃঙ্খলে: দানাশস্য, উদ্যানফসল ও প্রাণিসম্পদ। কাজ চলবে তিনটি অক্ষে:
- কৃষি অবকাঠামো ও সেবায় কাঠামোগত বিনিয়োগ;
- ব্যবসার পরিবেশ উন্নত করতে খাতভিত্তিক নীতির সংশোধন;
- উদ্ভাবন ও প্রতিযোগিতা বাড়াতে আরও বেশি বেসরকারি বিনিয়োগে উৎসাহ।

২০২৯ সালের লক্ষ্য: খাদ্য নিরাপত্তা, চাল ও সমবায়
বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, ২০২৯ সালের মধ্যে কম্প্যাক্ট জাতীয় পর্যায়ে ৯০ শতাংশের বেশি খাদ্য নিরাপত্তা অর্জন এবং কৃষি খাতে ৮ লাখ আনুষ্ঠানিক কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে চায়। নির্দিষ্ট লক্ষ্যের মধ্যে আছে দানাশস্যের চাহিদা পূরণের হার ৪৮ শতাংশ থেকে ৭৮ শতাংশে তোলা, চালে স্বয়ংসম্পূর্ণতা ৬৪ শতাংশে নেওয়া এবং সারা দেশে ১০০টি কমিউনিটিভিত্তিক কৃষি সমবায় গড়ে তোলা। বিজ্ঞপ্তিতে একে জাতীয় কৃষি ও খাদ্যনীতির নকশা, সমন্বয় ও বাস্তবায়নে এক উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন বলা হয়।
চালের লক্ষ্যটি সেনেগালের জন্য বিশেষ গুরুত্বের। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) বৈশ্বিক তথ্য ও আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা (জিআইইডব্লিউএস) ২০২৪ সালের ডিসেম্বরের প্রতিবেদনে জানায়, চাল দেশটিতে সবচেয়ে বেশি খাওয়া দানাশস্য। ২০২৩ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৪ সালের মে পর্যন্ত দেশি চালের গড় খুচরা দাম ১৫ শতাংশ এবং আমদানি করা চালের দাম ২৫ শতাংশ বেড়েছিল। একই প্রতিবেদনে ২০২৪ সালে মোট দানাশস্য উৎপাদনের পূর্বাভাস ছিল ৩৮ লাখ টন, যা আগের পাঁচ বছরের গড়ের চেয়ে প্রায় ৮ শতাংশ বেশি। ২০২৪ সালের জুন থেকে আগস্টের অভাবের মৌসুমে প্রায় ৫ লাখ ১৯ হাজার মানুষ, অর্থাৎ জনসংখ্যার প্রায় ৩ শতাংশ, তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় ছিল বলে প্রাক্কলন করা হয়েছিল।

মন্ত্রী ও বিশ্বব্যাংকের বক্তব্য
কৃষি, খাদ্য সার্বভৌমত্ব ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী মাবুবা দিয়ান বলেন, ‘অ্যাগ্রিকানেক্ট চুক্তির লক্ষ্য আমাদের জনগণের জীবন বাস্তবে বদলে দেওয়া। এরা সেই পরিবার, যারা সন্তানদের আরও ভালো খাওয়াতে পারবে; সেই কৃষক, যাঁদের আয় বাড়বে ও স্থিতিশীল হবে; সেই তরুণ, যাঁরা আধুনিক ও লাভজনক কৃষিতে কাজ ও ভবিষ্যৎ খুঁজে পাবেন।’
পশ্চিম ও মধ্য আফ্রিকায় বিশ্বব্যাংকের ভাইস প্রেসিডেন্ট উসমান দিয়াগানা বলেন, ‘অ্যাগ্রিকানেক্টে আমাদের চালিত করছে এই বিশ্বাস যে সেনেগালের কৃষি সেনেগালকে খাওয়াতে পারে, তরুণদের সুযোগ দিতে পারে এবং ভাগ করা সমৃদ্ধির ইঞ্জিন হতে পারে।’ তিনি জানান, আইডিএ, আইএফসি ও মিগার সমন্বিত কাজের মাধ্যমে সরকারি ও বেসরকারি বিনিয়োগকে একটি লক্ষ্যে আনতে চান তাঁরা: প্রতিটি সেনেগালবাসীর জন্য খাদ্য সার্বভৌমত্ব ও কর্মসংস্থানকে বাস্তব ও টেকসই করা। সেনেগাল ২০৫০ এজেন্ডার তদারকির দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিমন্ত্রী আহমাদু আল আমিনু লো কম্প্যাক্টকে জাতীয় রূপান্তর এজেন্ডার প্রকল্পধারা সাজানোর এক আদর্শ প্ল্যাটফর্ম বলেন এবং জানান, সব অংশীজনের কাছে ফলভিত্তিক ব্যবস্থাপনা প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
পরিচালনা, অংশীদার ও বিশ্বব্যাংকের কৃষি উদ্যোগ
কম্প্যাক্টের পরিচালনার দায়িত্বে থাকবেন ২০৫০ এজেন্ডার তদারকির দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিমন্ত্রী; বাস্তবায়ন করবে কৃষি, খাদ্য সার্বভৌমত্ব ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় তার ‘ডেলিভারি ইউনিট’-এর মাধ্যমে। পরিকল্পনা, সমন্বয় ও পর্যবেক্ষণের জন্য অংশীদারদের কারিগরি গ্রুপের সহায়তায় একটি যৌথ স্টিয়ারিং কমিটি গঠন করা হবে। কম্প্যাক্টটি তৈরি হয় আইএফএডি, এফএও, বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি, ফরাসি উন্নয়ন সংস্থা, আফ্রিকান উন্নয়ন ব্যাংক, ইসলামি উন্নয়ন ব্যাংক, জাইকা, জিআইজেড, নেদারল্যান্ডস, মাস্টারকার্ড ফাউন্ডেশন এবং বিল অ্যান্ড মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশনের সঙ্গে পরামর্শ করে।
উদ্যোগটি বিশ্বব্যাংক গ্রুপের বৃহত্তর কৃষি পরিকল্পনার অংশ। ২০২৪ সালের অক্টোবরে গ্রুপটি কৃষি-ব্যবসা ও কৃষি অর্থায়নে বার্ষিক অঙ্গীকার দ্বিগুণ করে ২০৩০ সালের মধ্যে ৯০০ কোটি ডলারে নেওয়ার ঘোষণা দেয়, সঙ্গে আরও ৫০০ কোটি ডলার সংগ্রহের লক্ষ্য। ২০২৫ সালের ১৪ অক্টোবর বিশ্বব্যাংক-আইএমএফ বার্ষিক সভায় অ্যাগ্রিকানেক্ট অনুষ্ঠানে বিশ্বব্যাংক গ্রুপের প্রেসিডেন্ট অজয় বাঙ্গা বলেন, বিশ্বে ৫০ কোটি ক্ষুদ্র কৃষক পৃথিবীর ৮০ শতাংশ খাদ্য উৎপাদন করেন, অথচ তাঁদের প্রতি ১০ জনে একজনেরও কম বাণিজ্যিক অর্থায়ন পান।
ছবি: Africa Rice Center / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)
সূত্র: বিশ্বব্যাংক, জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও জিআইইডব্লিউএস)





মন্তব্য
(০)