সৌদি আরব দেশটির লাখ লাখ উটের জন্য পাসপোর্ট দেওয়া শুরু করেছে। সৌদি গেজেটের খবর অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহে রিয়াদে পরিবেশ, পানি ও কৃষি মন্ত্রণালয়ের উপমন্ত্রী মানসুর আল-মুশাইতি 'ক্যামেল পাসপোর্ট' উদ্যোগের উদ্বোধন করেন। মন্ত্রণালয় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশিত একটি ভিডিওতে নথিটি দেখিয়েছে: সবুজ রঙের একটি পাসপোর্ট, যার ওপর দেশের প্রতীক ও সোনালি রঙের একটি উটের ছবি। কর্মকর্তাদের ভাষ্য, এতে উট পালন খাত আরও কার্যকর হবে এবং উটের পরিচয় ও মালিকানার একটি নির্ভরযোগ্য তথ্যভাণ্ডার তৈরি হবে।
পাসপোর্টে কী তথ্য থাকছে
মন্ত্রণালয়ের বরাতে সৌদি গেজেট জানায়, উটের পাসপোর্ট একটি পূর্ণাঙ্গ পরিচয়পত্র। এতে থাকবে উটের শরীরে বসানো মাইক্রোচিপের নম্বর, পাসপোর্ট নম্বর, উটের নাম, জন্মতারিখ, জাত, লিঙ্গ, রং, জন্মস্থান, পাসপোর্ট ইস্যুর তারিখ ও স্থান, আর পরিচয় নিশ্চিত করতে দুই পাশ থেকে তোলা উটের ছবি। টিকার জন্য আলাদা একটি অংশ থাকবে, যেখানে প্রতিটি টিকার তথ্য দায়িত্বপ্রাপ্ত পশুচিকিৎসকের নাম, স্বাক্ষর ও সিল দিয়ে প্রত্যয়িত হবে।
উদ্যোগটি প্রাণিসম্পদ ও মৎস্য খাত উন্নয়নের জাতীয় কর্মসূচির অংশ। মন্ত্রণালয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, পাসপোর্টের মাধ্যমে উট কেনাবেচা, পরিবহন ও মালিকানা হস্তান্তর নিয়মের মধ্যে আসবে, মালিকের অধিকার সুরক্ষিত হবে এবং স্বাস্থ্য, জাত ও বংশধারার সঠিক তথ্যের ভিত্তিতে দাম নির্ধারণ করা যাবে। দেশি ও আন্তর্জাতিক নিলামে স্বচ্ছতা বাড়বে বলেও আশা করা হচ্ছে। বয়স, লিঙ্গ, জাত ও রং অনুযায়ী উটের সংখ্যার সঠিক হিসাব পরিকল্পনা, প্রজনন ও দেশি জাত উন্নয়নের কাজেও লাগবে।

২২ লাখ উট ও দুই বিলিয়ন রিয়ালের খাত
বিবিসি বাংলা জানায়, ২০২৪ সালের সরকারি হিসাবে সৌদি আরবে প্রায় ২২ লাখ উট রয়েছে, যা প্রতি বছর দেশটির অর্থনীতিতে দুই বিলিয়ন রিয়ালের বেশি অবদান রাখে। আরব নিউজের তথ্য উদ্ধৃত করে বিবিসি লিখেছে, বিশ্বে উটের সংখ্যা প্রায় সাড়ে তিন কোটি, যার এক কোটি সত্তর লাখ আরব বিশ্বে। আরব দেশগুলোর মধ্যে উটের সংখ্যায় শীর্ষে সোমালিয়া, এরপর সুদান, মৌরিতানিয়া, সৌদি আরব ও ইয়েমেন।
উট সৌদি আরবের জাতীয় প্রতীকের অংশ; দেশটিতে উটের সৌন্দর্য প্রতিযোগিতা ও প্রদর্শনী হয়, যেখানে সেরা উট পুরস্কার পায়। উটের পণ্যের বাণিজ্যও বাড়ছে। 'স্বানি' নামের একটি প্রতিষ্ঠান উটের দুধ ও গুঁড়া দুধ শিল্পে বিনিয়োগ করে ২৫টি দেশে পণ্য রপ্তানি করেছে এবং উটের দুধের আইসক্রিমও বানাচ্ছে। 'আবেল' ব্র্যান্ড উটের লোম ও চামড়া দিয়ে পোশাক, হাতে তৈরি ব্যাগ ও জুতা তৈরি করে; কুমিরের চামড়ার পর উটের চামড়াকেই সবচেয়ে শক্ত ও টেকসই ধরা হয়। উট বিশেষজ্ঞদের মতে, ওমান ও সুদানের উট দৌড়ের জন্য পরিচিত, আর সৌদি আরবের উপকূলীয় অঞ্চলের উট বেশি দুধ দেয়। রঙের ভিত্তিতেও উটকে বিভিন্ন শ্রেণিতে ভাগ করা হয়, বাদামি থেকে লালচে পর্যন্ত।
সৌদি আরবের ভিশন ২০৩০-এর আওতায় উট শিল্পকে দেশটির তেলবহির্ভূত প্রধান আয়ের উৎসগুলোর একটি হিসেবে দেখা হচ্ছে।

মরুভূমির জাহাজের দীর্ঘ ইতিহাস
একটি উট ৪০০ কিলোগ্রাম পর্যন্ত বোঝা বহন করতে পারে, তাই একে বলা হয় 'মরুভূমির জাহাজ'। বিশ শতকের শুরুর দিকে মক্কা ও মদিনায় যাতায়াতের একমাত্র বাহন ছিল উট; আফগানিস্তান, মধ্য এশিয়া ও দক্ষিণ এশিয়া থেকে হাজিদের কাফেলা উটের পিঠেই সৌদি আরবে পৌঁছাত। চারশ বছর আগে 'ইকলাত' নামে পরিচিত ব্যবসায়ীরা ভারত, তুরস্ক, মরক্কো ও নাইজেরিয়া পর্যন্ত উটের বাণিজ্য করতেন।
সৌদি আরবের আল-জওফ অঞ্চলের সাকাকার কাছে 'ক্যামেল সাইট' নামে পরিচিত স্থানে পাথরে খোদাই করা উটের বড় আকারের ভাস্কর্য রয়েছে। ২০১৮ সালে খননের সময় এগুলো প্রায় দুই হাজার বছরের পুরোনো ভাবা হয়েছিল। কিন্তু ২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে জার্নাল অব আর্কিওলজিক্যাল সায়েন্স: রিপোর্টস সাময়িকীতে মারিয়া গুয়াগনিন ও তাঁর সহকর্মীদের প্রকাশিত গবেষণায় খোদাইয়ের ক্ষয়ের ধরন, বিভিন্ন চিহ্ন ও আশপাশে পাওয়া প্রাণীর হাড় বিশ্লেষণ করে এর বয়স সাত থেকে আট হাজার বছর নির্ধারণ করা হয়। অর্থাৎ ভাস্কর্যগুলো উট গৃহপালিত হওয়ার আগের এবং মিসরের গিজার পিরামিডের চেয়েও পুরোনো।
রিয়াদ পত্রিকার কলাম লেখক ও সৌদি ইতিহাসবিদ বদর বিন সৌদ বিবিসিকে বলেন, "উট ছাড়া এই শুষ্ক ও প্রচণ্ড গরম মরুভূমিতে টিকে থাকা অসম্ভব হতো।" আধুনিক সৌদি আরবের প্রতিষ্ঠাতা বাদশাহ আবদুল আজিজের 'আল-রামাআত' নামে একটি উটের পাল ছিল, বাদশাহ সালমানও উটের বড় ভক্ত, আর যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের রয়েছে 'আল-শরফ' নামের একটি উন্নত জাতের উট।

ছবি: Peter Dowley / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY 2.0)
সূত্র: বিবিসি বাংলা, সৌদি গেজেট, জার্নাল অব আর্কিওলজিক্যাল সায়েন্স: রিপোর্টস (গুয়াগনিন ও অন্যান্য), উইকিপিডিয়া




মন্তব্য
(০)