শহরে কিংবা গ্রামে বাড়ির ছাদ, বারান্দা বা উঠানে শখ করে অনেকেই টবে ফুল চাষ করেন, আর তাঁদের বেশির ভাগের পছন্দ গোলাপ। জাগো নিউজ ২০১৭ সালের আগস্টে টবে গোলাপ চাষের কয়েকটি মূল নিয়ম তুলে ধরেছিল। সরকারি জাতীয় ই-তথ্যকোষের গোলাপ চাষ নির্দেশিকা, বাংলাপিডিয়া এবং যুক্তরাজ্যের রয়্যাল হর্টিকালচারাল সোসাইটি (আরএইচএস) ও যুক্তরাষ্ট্রের ক্লেমসন বিশ্ববিদ্যালয়ের পরামর্শ মিলিয়ে সেই নিয়মগুলো এখানে যাচাই করে দেওয়া হলো।
বাংলাপিডিয়ার তথ্যে গোলাপ রোজেসি পরিবারের Rosa গণের কাঁটাযুক্ত গুল্ম; এই গণে ১৫০টির বেশি প্রজাতি আছে। বীজ, কাটিং, দাবা কলম ও চোখ কলম (বাডিং) দিয়ে গোলাপের বংশবিস্তার করা যায়, তবে বাণিজ্যিক চারা তৈরিতে চোখ কলমই সবচেয়ে উপযোগী। এ পদ্ধতিতে পছন্দের জাতটি আরেকটি গাছের (শিকড় গাছ বা রুটস্টক) কাণ্ডে জোড়া দেওয়া হয়, শিকড় আসে সেই গাছ থেকে। ই-তথ্যকোষ জানায়, দেশে সাভার, যশোর ও কুষ্টিয়ায় বাণিজ্যিকভাবে গোলাপ চাষ ও বাজারজাত হয়।
চারা বাছাই ও রোপণ
গোলাপ ভালো জন্মায় দীর্ঘ সময় রোদ পাওয়া খোলামেলা জায়গায় এবং মোটামুটি ঠান্ডা আবহাওয়ায়। ই-তথ্যকোষের পরামর্শে পানি নিষ্কাশনের সুবিধাসহ দোআঁশ, বেলে দোআঁশ বা এঁটেল দোআঁশ মাটি সবচেয়ে ভালো, মাটির পিএইচ থাকা উচিত ৬ থেকে ৭-এর মধ্যে। চারা লাগানোর উপযুক্ত সময় অক্টোবর-নভেম্বর। গোলাপ জলাবদ্ধতা সহ্য করে না, তাই টবের তলায় পানি বের হওয়ার ছিদ্র থাকা জরুরি।
- নতুন চারার বদলে এক বছর বয়সী চারা লাগানো ভালো।
- চারাটি গর্তে সোজা করে বসাতে হবে।
- চারার শিকড় মাটি দিয়ে পুরোপুরি ঢেকে গোড়ার মাটি শক্ত করে চেপে দিতে হবে।
- জোড় কলমের চারায় জোড়ের জায়গাটি মাটি থেকে অন্তত ৩ থেকে ৪ সেন্টিমিটার ওপরে রাখতে হবে। ক্লেমসন বিশ্ববিদ্যালয়ও জোড়ের স্থান মাটির ঠিক ওপরে রাখার পরামর্শ দেয়।

ডাল ছাঁটাই ও কুঁড়ি ভাঙা
গোলাপের নতুন ডালে বেশি ফুল আসে, পুরোনো ডালে ফুল ভালো হয় না। তাই নতুন শাখা ছড়াতে দিতে পুরোনো, ক্ষতযুক্ত ও রোগাক্রান্ত ডাল কেটে ফেলতে হয়। মূল প্রতিবেদনে আশ্বিন মাসকে ছাঁটাইয়ের সময় বলা হয়েছিল; সরকারি ই-তথ্যকোষ সাধারণত অক্টোবর-নভেম্বর মাসে ছাঁটাইয়ের কথা বলে, আর প্রথম বছরে গাছ ছাঁটাইয়ের দরকার হয় না। গাছের বৃদ্ধি দেখে হালকা, মাঝারি বা ভারী ছাঁটাই করা হয়।
- মরা ও রোগাক্রান্ত ডাল ধারালো ছুরি বা কাঁচি দিয়ে কাটতে হবে; আরএইচএস বলছে, রোগে মরে আসা ডাল ভেতরের সাদা সুস্থ অংশ পর্যন্ত কেটে ফেলতে হয়।
- কাটা ডাল যাতে শুকিয়ে না যায়, সে জন্য কাটা মাথায় ঘন করে গোলানো ছত্রাকনাশক তুলি দিয়ে লাগাতে হবে।
- ছাঁটাইয়ের পর প্রথম দিকে বের হওয়া ফুলের কুঁড়ি ভেঙে দিলে পরে বড় ফুল ফোটে।
- জোড়ের নিচ থেকে, অর্থাৎ শিকড় গাছ থেকে কোনো ডাল বের হলে তা ধারালো ছুরি দিয়ে কেটে বাদ দিতে হবে, কারণ সেটি পছন্দের জাতের ডাল নয়।

সার ও পানি দেওয়া
ই-তথ্যকোষের পরামর্শ, মানসম্মত ফুল পেতে গোলাপে যতটা সম্ভব জৈব সার দিতে হবে এবং মাটি পরীক্ষা করে মাটির ধরন অনুযায়ী সার প্রয়োগ করতে হবে। পচা গোবর ও আবর্জনা পচা সার এ কাজে ব্যবহার করা যায়। মার্চ-এপ্রিল মাসে গাছের গোড়ায় পচা গোবর ও কম্পোস্টের মালচ দিতে হয়। টবের ওপরের মাটি আলগা করে সার মেশানোর সময় খেয়াল রাখতে হবে যেন শিকড়ের ক্ষতি না হয়।
- চারা লাগানোর পর প্রথম দিকে গোড়ায় ঘন ঘন পানি দিতে হবে।
- মাটিতে চারা ভালোভাবে বসে নতুন ডালপালা ছাড়ার পর খরা মৌসুমে মাটির বেডে প্রতি ১০ দিনে একবার সেচ দিলেই চলে বলে ই-তথ্যকোষ জানায়।
- টবের গাছের ক্ষেত্রে আরএইচএসের পরামর্শ, টবের গোলাপে মাটিতে লাগানো গাছের চেয়ে অনেক বেশি পানি লাগে, গরমে দরকার হলে প্রতিদিন।
- প্রতিবার সেচের পর গোড়ার মাটি ঝুরঝুরে করে দিতে হবে, তবে টবে বা গোড়ায় কখনো পানি জমতে দেওয়া যাবে না।

পোকামাকড় দমন
টবে চাষের সময় পোকা আক্রমণ করলে স্থানীয়ভাবে তৈরি জৈব কীটনাশক ব্যবহার করা যায়। তাতে পোকা দমন না হলে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ইউনিয়ন পর্যায়ের কৃষি কর্মকর্তা বা উপজেলা কৃষি অফিসে পরামর্শ নিতে বলে ই-তথ্যকোষ। মাটির বেডে লাগানো গাছের ক্ষেত্রে নির্দেশিকাটি ছাঁটাইয়ের পর গোড়া থেকে ২০ সেন্টিমিটার দূরে গোল করে মাটি খুঁড়ে ৮ থেকে ১০ দিন শিকড়ে রোদ-বাতাস লাগানোর কথাও বলে, এতে গোড়ার ক্ষতিকর পোকা মরে।
ছবি: Jefrienannienelson / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, জাতীয় ই-তথ্যকোষ (গোলাপ চাষ), বাংলাপিডিয়া, রয়্যাল হর্টিকালচারাল সোসাইটি (আরএইচএস), ক্লেমসন বিশ্ববিদ্যালয় হোম অ্যান্ড গার্ডেন ইনফরমেশন সেন্টার





মন্তব্য
(০)