নওগাঁর ধামইরহাট উপজেলার বরেন্দ্র অঞ্চলে মাল্টা চাষ করে সফলতা পেয়েছিলেন নারী উদ্যোক্তা রিনা আক্তার। সংবাদ সংস্থা ইউএনবির যে প্রতিবেদন ঢাকা ট্রিবিউন বাংলা ২০১৯ সালের ১৯ জুলাই প্রকাশ করে, তাতে বলা হয়, তিন একর জমিতে রোপণ করা তার মাল্টা বাগান তখন ফলে ভরে উঠেছিল। স্নাতক পাসের পর চাকরি না পেয়েও তিনি হতাশ হননি, নেমে পড়েন ফলের বাগান গড়তে।
চাকরির বদলে ফলের বাগান
ধামইরহাট ইউনিয়নের আঙ্গরত তেলিপাড়া গ্রামে রিনা আক্তার মায়া কানন (বায়ো এগ্রি ফার্ম) নামে একটি নার্সারি গড়ে তোলেন। কৃষিবিদ পরিবারে বেড়ে ওঠা রিনার ছোটবেলা থেকেই কৃষির প্রতি বিশেষ আগ্রহ ছিল, আর ফলের বাগান গড়া ছিল তার স্বপ্ন।
রিনা জানান, ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে তিনি ৫০ শতাংশ জমিতে এক বছর বয়সী উন্নত মানের মাল্টার চারা দিয়ে চাষ শুরু করেন। কৃষি বিভাগের পরামর্শে ১০ ফুট পর পর মোট ১৩৬টি চারা লাগানো হয়। তার ভাষ্য অনুযায়ী, উপজেলার সাবেক কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ ড. জামাল উদ্দিন এবং তখনকার উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মো. সেলিম রেজা তাকে সার্বিক সহযোগিতা করেন।
পরের বছর গাছে ফুল এলেও তা ভেঙে দেওয়া হয়। ২০১৯ সালে গাছে পর্যাপ্ত ফুল আসে এবং অসংখ্য ফল ধরে। রিনা তখন আশা করছিলেন, প্রতিটি গাছ থেকে ১০ থেকে ১৫ কেজি পর্যন্ত ফল পাওয়া যাবে এবং আগস্টের শেষ সপ্তাহ থেকে ফল নামানো শুরু হবে।
খরচ ও আয়ের হিসাব
রিনা জানান, মাল্টা বাগান গড়ে তুলতে তার প্রায় ৭০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। প্রতিটি চারা ১৫০ টাকা দরে কিনতে লাগে ২০ হাজার ৪০০ টাকা; শ্রমিকের মজুরি ও অন্যান্য খাতে খরচ হয় আরও ৫০ হাজার টাকা।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, সে সময় বাজারে পাইকারি মাল্টা কেজিপ্রতি ১০০ থেকে ১২০ টাকায় বেচাকেনা হচ্ছিল। কেজি ১০০ টাকা ধরে প্রতি গাছে প্রায় ১০ কেজি ফল হলে একেকটি গাছের ফলের দাম হয় ১ হাজার টাকা; সে হিসাবে ১৩৬টি গাছ থেকে ১ লাখ ৩৬ হাজার টাকার মাল্টা বিক্রির সম্ভাবনা ছিল। প্রাকৃতিক দুর্যোগ না হলে সে বছর মাল্টা বিক্রি করে লাভের আশা করছিলেন রিনা।
বারি মাল্টা-১ ও কৃষি বিভাগের সহায়তা
ধামইরহাট উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. সেলিম রেজা জানান, রিনা আক্তারকে মাল্টা ও ড্রাগন ফল চাষের পদ্ধতি নিয়ে সরকারিভাবে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। তার বাগানে মাল্টার প্রদর্শনী দেওয়া হয়েছে এবং উন্নত জাতের বারি মাল্টা-১ চারা সরবরাহ করা হয়েছে। তাকে নিয়মিত পরামর্শও দেওয়া হয়।
বারি মাল্টা-১ বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বারি) উদ্ভাবিত মাল্টার জাত। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) মেহেরপুর হর্টিকালচার সেন্টারের তথ্য অনুযায়ী, এটি নিয়মিত ফল দেওয়া উচ্চফলনশীল জাত; গাছ খাটো, ছড়ানো ও ঝোপালো। ফল গোলাকার ও মাঝারি আকারের, ওজন প্রায় ১৫০ গ্রাম, পাকা ফলের রংও সবুজ। মধ্য ফাল্গুন থেকে মধ্য চৈত্র পর্যন্ত গাছে ফুল আসে এবং কার্তিক মাসে ফল সংগ্রহের উপযোগী হয়। গাছপ্রতি ৩০০ থেকে ৪০০টি ফল ধরে, হেক্টরপ্রতি ফলন ২০ টন। গাছের ভালো বৃদ্ধির জন্য প্রথম দুই বছর গাছে ফল না রাখার পরামর্শ দেয় ডিএই।

ধানের এলাকায় ফল চাষের সম্ভাবনা
সেলিম রেজা বলেন, ধামইরহাটের মাটি যেকোনো ফল চাষের জন্য বেশ উপযোগী। এ অঞ্চলের মানুষ শুধু ধান চাষে ব্যস্ত থাকেন, অথচ ধান চাষে অনেক সমস্যা দেখা দিয়েছে; এ কারণে এলাকার চাষিদের লাভজনক ফল চাষে উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে। তার মতে, এ অঞ্চলের মাল্টা ও ড্রাগন ফলের মিষ্টতা ও গুণাগুণ অন্য অঞ্চলের চেয়ে ভালো, বাজারে দামও ভালো মিলছে। রিনার বাগান দেখে এলাকার অনেক বেকার যুবক ফলের বাগান করতে উদ্বুদ্ধ হচ্ছেন বলে জানান তিনি; আগামীতে এ অঞ্চল ফলের এলাকা হিসেবে পরিচিতি পাবে বলেও আশা করেন এই কৃষিবিদ।

বাংলাপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ধামইরহাট নওগাঁ জেলার একটি উপজেলা। এর আয়তন ৩০০ দশমিক ৮০ বর্গকিলোমিটার, ইউনিয়ন ৮টি; উত্তরে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য, পূর্বে জয়পুরহাট সদর উপজেলা। প্রধান নদী আত্রাই ও ছোট যমুনা। উপজেলার মানুষের আয়ের প্রধান উৎস কৃষি (৮৩ দশমিক ১০ শতাংশ); প্রধান ফসল ধান, গম, পাট, সরিষা, ডাল ও সবজি। জগদ্দল মহাবিহারের প্রত্নস্থলও এই উপজেলায়। আর বরেন্দ্র অঞ্চল বা বরেন্দ্রভূমি বঙ্গ অববাহিকায় প্লাইস্টোসিন যুগের সবচেয়ে বড় ভূপ্রাকৃতিক একক; পুরোনো পলিমাটিতে গড়া এ অঞ্চলের আয়তন প্রায় ১০ হাজার বর্গকিলোমিটার।

ছবি: Abu Sayeed / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: ঢাকা ট্রিবিউন (ইউএনবি), কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই), বাংলাপিডিয়া, উইকিপিডিয়া





মন্তব্য
(০)