ঈদুল আজহার আগে ২০২৬ সালের ২৬ মে মঙ্গলবার দুপুর ১২টার দিকে হঠাৎ ঝুম বৃষ্টি শুরু হলে ঢাকার শাহজাহানপুর ও কমলাপুর কোরবানির পশুর হাটের বেশিরভাগ অংশ কাদা-পানিতে একাকার হয়ে যায়। সকাল থেকে জমে ওঠা হাট ছেড়ে ক্রেতাদের একটি বড় অংশ দ্রুত চলে যান, আর দেশের নানা জেলা থেকে গরু নিয়ে আসা ব্যাপারীরা বিপাকে পড়েন। জাগো নিউজ ২৪ সেদিন সরেজমিনে হাট দুটি ঘুরে এই চিত্র তুলে ধরে।
জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটি ১৮ মে জানিয়েছিল, দেশে ঈদুল আজহা উদযাপিত হবে ২৮ মে। আবহাওয়া অফিসের বরাতে দৈনিক ইনকিলাব ২৬ মে দুপুরে জানায়, আগের ২৪ ঘণ্টায় রাজধানীতে মোট ৮০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। আবহাওয়া অধিদপ্তরের বিশেষ পূর্বাভাসে সেদিনও ঢাকা ও আশপাশে অস্থায়ীভাবে বৃষ্টি অথবা বজ্রসহ ভারী বৃষ্টি এবং ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ৪০ কিলোমিটার বেগে দমকা হাওয়ার সম্ভাবনার কথা বলা হয়।
সকালের ভিড়, দুপুরে ফাঁকা হাট
সকাল থেকে দুই হাটেই ক্রেতাদের ভিড় ছিল চোখে পড়ার মতো; অনেকে পরিবার নিয়ে গরু দেখতে আসেন। দুপুরের প্রবল বৃষ্টির পর হাটের ভেতরে হাঁটাচলা কঠিন হয়ে পড়ে, কোথাও কোথাও পানি জমে যায়।
শাহজাহানপুর হাটে কুষ্টিয়া থেকে আসা ব্যাপারী আবদুল মালেক জাগো নিউজকে বলেন, সকাল থেকে ভালো বেচাকেনার আশা ছিল, কয়েকজন ক্রেতা দরদামও করছিলেন, কিন্তু বৃষ্টি শুরু হওয়ার পর সবাই চলে যান। তিনি জানান, তিনটি ট্রাকে করে ২২টি গরু নিয়ে ঢাকায় এসেছেন; পরিবহন, খাবার ও শ্রমিক মিলিয়ে এবার খরচ অনেক বেড়েছে, তার ওপর গরু ভিজে যাওয়ায় অসুস্থ হওয়ার শঙ্কাও তৈরি হয়েছে।
পাবনা থেকে আসা ব্যাপারী সাইদুল ইসলাম বলেন, পানি জমে যাওয়ায় গরু নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা কঠিন হয়ে গেছে, খড় ভিজে গেছে, গরুকে ঠিকমতো বসানোও যাচ্ছে না। তাঁর অভিযোগ, হাটে পানি নিষ্কাশনের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই, তাই সামান্য বৃষ্টিতেই কাদা-পানিতে পরিবেশ নষ্ট হয় এবং ক্রেতারা বেশিক্ষণ থাকতে চান না।
শাহজাহানপুরের আরেক ব্যাপারী মো. আসাদুল ইসলাম জানান, সকালে বিক্রি ভালোই হয়েছিল, কিন্তু আগের দিনের পর সেদিন সকাল থেকেও দুই দফা বৃষ্টি হয়েছে। তাঁর কথায়, বৃষ্টিতে অনেক গরুর গায়ে ময়লা লেগে সৌন্দর্য কমে গেছে, আর বেশি ভিজলে গরু অসুস্থও হতে পারে।

ভেজা গরু নিয়ে দুশ্চিন্তা, বাড়তি খরচের চাপ
কমলাপুর পশুর হাটেও একই চিত্র দেখা যায়। বৃষ্টির সময় অনেক ব্যাপারী ত্রিপল টাঙিয়ে গরু বাঁচানোর চেষ্টা করেন; কেউ কেউ নিজে ভিজে গরুকে শুকনো রাখার চেষ্টা করছিলেন। ক্রেতারা ছাউনির নিচে আশ্রয় নিলেও বেশিরভাগ ব্যাপারীকে খোলা জায়গায় থাকতে হয়।
সিরাজগঞ্জ থেকে আসা ব্যাপারী মো. মিন্টু মিয়া বলেন, গত বছরের তুলনায় এবার পরিবহন খরচ কয়েক হাজার টাকা বেশি পড়েছে; সেই খরচ পোষাতে ভালো দামে বিক্রি জরুরি, কিন্তু দুপুরের পর হাটে ক্রেতা নেই। কমলাপুরের আরেক ব্যাপারী জাকির হোসেন জানান, গরুর শরীর ভিজলে অনেক সময় ঠান্ডা লাগে, তখন গরু খাবার কম খায়। চুয়াডাঙ্গা থেকে আসা নুর ইসলাম বলেন, কাদার কারণে ক্রেতারা গরুর কাছে আসতে চাইছেন না, অথচ তাঁর হিসাবে ঈদের আর মাত্র এক দিন বাকি।
হাট সংশ্লিষ্টরা জানান, ঈদের আগে রাজধানীর পশুর হাটে সাধারণত বিকেল ও সন্ধ্যায় ভিড় বাড়ে, কিন্তু বৃষ্টির কারণে সেদিন সেই চিত্র বদলে যেতে পারে। বৃষ্টির মধ্যেও কিছু ক্রেতা হাটে ঘুরছিলেন, তবে কাদা-পানিতে পরিবার নিয়ে চলাফেরা কষ্টকর হয়ে পড়ে। রাজধানীর কচুক্ষেত পশুর হাটেও ঝুম বৃষ্টিতে ক্রেতা ও ব্যাপারীরা দুর্ভোগে পড়েন, রাস্তায় পানি জমে যায়; বৃষ্টি থামার পর ব্যাপারী ও খামারিরা গরুর শরীর থেকে পানি মুছে দেন।

চাহিদার চেয়ে বেশি পশু, প্রতিটি হাটে চিকিৎসক দল
২০২৬ সালের ৩ মে সচিবালয়ে সংবাদ সম্মেলনে মন্ত্রী আমিন উর রশিদ প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য তুলে ধরে জানান, সেবার দেশে কোরবানিযোগ্য পশু প্রস্তুত ছিল ১ কোটি ২৩ লাখ ৩৩ হাজার ৮৪০টি, বিপরীতে সম্ভাব্য চাহিদা ধরা হয় ১ কোটি ১ লাখ ৬ হাজার ৩৩৪টি। এর মধ্যে গরু ও মহিষ প্রায় ৫৬ লাখ ৯৫ হাজার ৮৭৮টি, ছাগল ও ভেড়া ৬৬ লাখ ৩২ হাজার ৩০৭টি এবং উট-দুম্বাসহ অন্যান্য পশু ৫ হাজার ৬৫৫টি। তাঁর হিসাবে প্রায় ২২ লাখ ২৭ হাজার ৫০৬টি পশু উদ্বৃত্ত থাকার কথা।
একই সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, ঢাকায় ২৭টিসহ সারা দেশে ৩ হাজার ৬০০টির বেশি পশুর হাট বসবে; ঢাকার ২৭টির মধ্যে উত্তর সিটি করপোরেশনে ১৬টি এবং দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে ১১টি। মন্ত্রী জানান, প্রতিটি হাটে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধানে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক দল থাকবে, যাতে কোনো পশু অসুস্থ হলে দ্রুত চিকিৎসা দেওয়া যায়।

ছবি: S.M.M.Musabbir Uddin / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, বাংলা ট্রিবিউন, দৈনিক আমার দেশ, দৈনিক ইনকিলাব, ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশন




মন্তব্য
(০)