ফসলের রোগ ও ক্ষতিকর পোকা সময়মতো চিনতে না পারায় বাংলাদেশের কৃষকেরা প্রতি মৌসুমে ফলন ও টাকা দুই-ই হারান। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে জাগো নিউজ ২৪-এ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে কৃষিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহারের একটি দেশীয় উদাহরণ তুলে ধরা হয়: ডা. চাষি অ্যাপ, যাকে দেশের কৃষিতে মাঠ পর্যায়ে ব্যবহৃত প্রথম এআই মোবাইল অ্যাপ বলে বর্ণনা করা হয়। প্রতিবেদন অনুযায়ী, অ্যাপটির তখন প্রায় ৮৭ হাজার ব্যবহারকারী ছিল।
রোগ শনাক্তে কেন এআই
প্রচলিত পদ্ধতিতে ফসলের রোগ চিনতে কৃষককে সাধারণত কৃষি বিশেষজ্ঞ বা উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তার ওপর নির্ভর করতে হয়, যা সময়সাপেক্ষ এবং সব এলাকায় সহজে পাওয়া যায় না। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) জানিয়েছে, প্রতি বছর বিশ্বের মোট ফসল উৎপাদনের ৪০ শতাংশ পর্যন্ত ক্ষতিকর বালাইয়ের কারণে নষ্ট হয়। গাছের রোগে বিশ্ব অর্থনীতির বছরে ২২ হাজার কোটি ডলারের বেশি এবং আগ্রাসী পোকায় অন্তত ৭ হাজার কোটি ডলারের ক্ষতি হয়।
এআই ভিত্তিক ব্যবস্থায় মেশিন লার্নিং, ডিপ লার্নিং ও কম্পিউটার ভিশন ব্যবহার করে স্মার্টফোন বা ড্রোনে তোলা পাতার ছবি বিশ্লেষণ করা হয়। ছবির লক্ষণ মিলিয়ে সফটওয়্যার রোগ বা পোকার ধরন জানায় এবং প্রতিকারের পরামর্শ দেয়। এতে কৃষক দ্রুত ও কম খরচে ব্যবস্থা নিতে পারেন এবং অপ্রয়োজনীয় কীটনাশক ছিটানো কমে।

ডা. চাষি অ্যাপে কী আছে
জাগো নিউজের প্রতিবেদনে অ্যাপটির প্রধান সেবাগুলো ছিল:
- ছবি দেখে তাৎক্ষণিক রোগ ও পোকামাকড় শনাক্ত করা এবং সমাধান জানানো
- জৈব ও রাসায়নিক দুই ধরনের প্রতিকারের সুপারিশ
- আবহাওয়ার পূর্বাভাস
- ফসল ও এলাকাভিত্তিক সার ব্যবস্থাপনা
- ই-কমার্স, প্রশিক্ষণ ও পরামর্শ সেবা
মাঠের ফসলের পাশাপাশি ছাদবাগানের গাছের সমস্যাতেও অ্যাপটি ব্যবহার করা যায়। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড ২০২৩ সালের মে মাসে জানায়, ডা. চাষির প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী মদিনা আলী। তখন অ্যাপটি ১৭টি ফসলের ৬৮টির বেশি রোগ ও পোকা চিনতে পারত, রোগ শনাক্তের অ্যালগরিদমের নির্ভুলতা ছিল ৯২ শতাংশ, আর মডেল তৈরিতে ৬৭ হাজার ৮০০টির বেশি ছবি সংগ্রহ করা হয়েছিল। অ্যাপটি ২০২২ সালে বেসিস ন্যাশনাল আইসিটি অ্যাওয়ার্ডে চ্যাম্পিয়ন পুরস্কার পায়। দ্য ডেইলি স্টার ২০২৫ সালে লেখে, প্ল্যাটফর্মটি ইউএসএআইডি ও বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিনা) সঙ্গে কাজ করেছে।

ব্যবহারকারী ও মাঠের ফল
জাগো নিউজের হিসাবে প্রায় ৮৭ হাজার ব্যবহারকারীর ৩০ শতাংশ, অর্থাৎ প্রায় ২৫ হাজার ৮০০ জন, সরাসরি কৃষক। ৩৭ শতাংশ ছাত্র ও তরুণ-তরুণী, ৭ শতাংশ বিজ্ঞানী ও কৃষি পেশাজীবী এবং বাকি ২৬ শতাংশ অন্যান্য শ্রেণির মানুষ।
প্রতিবেদনে বিভিন্ন তথ্য বিশ্লেষণের বরাতে বলা হয়, অ্যাপ ব্যবহারকারী কৃষকদের ফলন ১২ থেকে ১৬ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে, কীটনাশকের ব্যবহার ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ কমেছে, সারের ব্যবহার কমেছে প্রায় ১১ শতাংশ এবং সময় ও অর্থ সাশ্রয় হয়েছে প্রায় ৩৩ শতাংশ। এই হিসাব কোনো স্বাধীন সংস্থা যাচাই করেছে কি না, প্রতিবেদনে তা উল্লেখ ছিল না।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, এমন অ্যাপের হাত ধরে শিক্ষিত তরুণেরা কৃষিতে যুক্ত হচ্ছেন। তাঁরা এআইয়ের পাশাপাশি ইন্টারনেট অব থিংস ভিত্তিক মাটির সেন্সর ও স্প্রে ড্রোনের মতো স্মার্ট প্রযুক্তি ব্যবহার করছেন এবং কৃষিকে আধুনিক ও লাভজনক পেশা হিসেবে দেখছেন।

ছবি: Balaram Mahalder / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, দ্য ডেইলি স্টার, জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও)




মন্তব্য
(০)