বরিশালের উজিরপুর উপজেলার প্রত্যন্ত এলাকা সাতলা বিলের বাসিন্দারা বছরের প্রায় ছয় মাস পানিবন্দী থাকেন। জমিতে বছরে একটি ফসল হয় বলে তাঁদের অভাব-অনটন লেগে থাকত। প্রথম আলো ২০১৯ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর জানায়, এই মানুষদের বিকল্প আয়ের পথ খুলে দিয়েছে ভাসমান সবজি চাষ। লাভজনক হওয়ায় সহস্রাধিক কৃষক এ পদ্ধতিতে সবজি চাষ করছিলেন, আর উপজেলায় তখন ১৫০ হেক্টর জলাশয়ে ভাসমান সবজি চাষ হচ্ছিল।
উজিরপুর বরিশাল জেলার একটি উপজেলা; আয়তন ২৪৮ দশমিক ৩৫ বর্গকিলোমিটার, ইউনিয়ন নয়টি, সাতলা তার একটি। ২০১১ সালের জনশুমারিতে উপজেলার জনসংখ্যা ছিল ২ লাখ ৩৪ হাজার ৯৫৯। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) ২০১৫ সালে বাংলাদেশের ভাসমান বাগান কৃষিপদ্ধতিকে বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ কৃষি ঐতিহ্য ব্যবস্থা (জিআইএএইচএস) হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। এফএওর তথ্য অনুযায়ী, গোপালগঞ্জ, পিরোজপুর ও বরিশালের প্রায় ২ হাজার ৫০০ হেক্টর এলাকায় এ পদ্ধতি চালু আছে, আর স্থানীয় কৃষকেরা প্রায় দুই শতাব্দী ধরে এভাবে চাষ করে আসছেন।
সাতলার গ্রামগুলো থেকে বর্ষার সবজি
সাতলার নয়াকান্দি, শিবপুর, রাজাপুর, উত্তর সাতলা ও পটিবাড়ী গ্রামের কৃষকেরা ভাসমান সবজি চাষের সঙ্গে যুক্ত। স্থানীয় সূত্রের বরাতে প্রথম আলো জানায়, বরিশাল সদর, গৌরনদী, উজিরপুর, বানারীপাড়া, আগৈলঝাড়া, বাকেরগঞ্জ ও আশপাশের পাইকারি ব্যবসায়ীরা আগে যশোর থেকে সবজি আনতেন। শীত মৌসুমে উজিরপুরের গুঠিয়া, জল্লা, বামরাইল ও হারতায় উৎপাদিত সবজিতে চাহিদা মেটে, কিন্তু বর্ষা মৌসুমে একমাত্র ভরসা সাতলার ভাসমান সবজি।
সাতলা বিলে এই চাষ কবে কীভাবে শুরু হয়েছিল, নির্দিষ্ট করে কেউ বলতে পারেননি। সাতলা গ্রামের কৃষক ভরত মণ্ডল (৭০) বলেন, ‘ছোটবেলা থেকেই ভাসমান সবজি চাষ দেখে আসছি। আমাদের বাবা-দাদারা এইভাবে চাষ করতেন। তাঁদের কাছে শুনেছি, এখানে রমেন বাড়ৈ নামের এক লোক প্রথমে এই চাষ শুরু করেছিলেন।’
উজিরপুরের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা রফিকুল ইসলাম জানান, ২০-২৫ বছর আগে এলাকায় সামান্য পরিমাণে ভাসমান সবজি চাষ হতো; ২০১০ সালের পরে তা ব্যাপকতা পায়। পরে ‘ভাসমান বেডে সবজি ও মসলা চাষ গবেষণা সম্প্রসারণ ও জনপ্রিয়করণ’ প্রকল্পের মাধ্যমে কৃষকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়, এতে চাষির সংখ্যা বাড়তে থাকে।

কচুরিপানার ভাসমান বেড যেভাবে তৈরি হয়
পানির ওপর লম্বালম্বিভাবে দুটি বাঁশ বা কলাগাছ ফেলে তার ওপর কচুরিপানার স্তূপ করা হয়, পরে স্তূপটি শেওলা দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়। কেউ কেউ নারকেলের ছোবড়াও ব্যবহার করেন। শেওলা পচে শুকিয়ে গেলে ওপরে সামান্য মাটি ছিটিয়ে লালশাক, পালংশাক ও পুঁইশাকের বীজ বোনা হয়। ঢ্যাঁড়স, লাউ, শসা, শিম, কাঁকরোল, মিষ্টিকুমড়া ও বেগুনের জন্য কচুরিপানার ধাপই যথেষ্ট: উঁচু করে বানানো ধাপ পচে যাওয়ার ৫-৭ দিন পরেই তাতে সরাসরি বীজ বোনা হয়।
একেকটি বেড এক মৌসুমের জন্য তৈরি হয়। সবজি তোলা শেষ হলে পচা ধাপটি বোরো চাষের আগে জমিতে জৈব সার হিসেবে দেওয়া হয়। এফএও জানায়, এ পদ্ধতিতে সারের প্রায় দরকারই পড়ে না, কীটনাশকও প্রায় দেওয়া হয় না, আর একই আয়তনের মাটির জমির তুলনায় উৎপাদনশীলতা প্রায় দশ গুণ বলে ধারণা করা হয়।
প্রথম আলোর তথ্য অনুযায়ী, ২০ মিটার লম্বা ও ২ থেকে আড়াই মিটার চওড়া একটি বেড তৈরিতে সাড়ে ৩ হাজার থেকে ৪ হাজার টাকা খরচ হয়, আর এক মৌসুমে একেকটি বেড থেকে ৯ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকার সবজি বিক্রি হয়। দক্ষিণ সাতলার শুকচাঁদ বিশ্বাস (৪৮) বলেন, ‘এবার ১০টি বেডে সবজি চাষ করেছি। বেড তৈরি করতে খরচ হয়েছে ৩৫ হাজার টাকা। ৬০ হাজার টাকার সবজি বিক্রি করেছি। এখন ৭০-৮০ হাজার টাকার সবজি বিক্রি করতে পারব।’

হাটে বিক্রি, বাড়ি থেকেও কেনেন ব্যবসায়ীরা
প্রতিবেদন প্রকাশের আগের বুধবার সরেজমিনে দেখা যায়, সাতলা বিলের পানিতে ভাসমান বেডে শসা, কাঁকরোল, মিষ্টিকুমড়া, লাউ, বেগুন, লালশাক ও পালংশাকসহ নানা সবজি। বিল ছাড়াও বাড়ির পাশের জলাশয়ে এ পদ্ধতিতে সবজি চাষ হচ্ছিল।
শিবপুর গ্রামের শুকলাল বাড়ৈ (৪৫) জানান, এলাকার বেশির ভাগ জমিতে এক ফসল হয় এবং বছরে প্রায় ছয় মাস জমি পানিতে তলিয়ে থাকে; আগে অভাব-অনটন লেগেই থাকত, পরে তিনি ভাসমান সবজি চাষ শুরু করেন। তিনি বলেন, ‘সপ্তাহে দুদিন বানারীপাড়ার বিশারকান্দি ও চৌমহনী হাটে সবজি নিয়ে বিক্রি করি। কখনো কখনো ব্যবসায়ীরা এসে বাড়ি থেকেই সবজি কিনে নিয়ে যান। বিষমুক্ত হওয়ায় প্রচুর চাহিদা রয়েছে এসব সবজির।’
একই গ্রামের আনোয়ার বাহাদুর বলেন, ‘এলাকার অনেককে ভাসমান পদ্ধতিতে সবজি চাষ করতে দেখে আমিও শুরু করি। এতে অল্প পুঁজিতে বেশি লাভ হয়। বর্ষার মৌসুমে মানুষের কষ্ট হয়। তবে সাতলা বিলের মানুষের জন্য তা আশীর্বাদ।’
ছবি: Nazmulhuqrussell / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY 3.0)
সূত্র: প্রথম আলো, জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও), উইকিপিডিয়া





মন্তব্য
(০)