সরাসরিবাজারদর
আটা (প্যাকেটজাত)৫৮—আদা - আমদানিকৃত১৬৭—আদা - দেশী১৫৪—আমন চাল - মাঝারি৫৬—আমন চাল - মোটা৪৮—আমন চাল - সরু৭২—আয়োডিনযুক্ত লবণ (প্যাকেটজাত)৩২—কাঁচা মরিচ২১৮—খামারের মুরগী১৬২—খাসী৯০০—চিনি (দেশী)১৩২—ছোলা - গোটা৮৫—ডিম ফার্ম - লাল৪৭—পেঁয়াজ - দেশী৬০—বোরো চাল - মাঝারি৫৫—বোরো চাল - মোটা৪৭—বোরো চাল - সরু৬৬—মাংসঃ– গরু৭২৯—মুগ ডাল১২২—রসুন - আমদানিকৃত১৯২—রসুন - দেশী১৭৩—সয়াবিন তেল১৬৩—
হালনাগাদ ১৬ অক্টোবর ২০২৬
ঢাকা২৮°পরিষ্কার আকাশআর্দ্রতা ৬২%বাতাস ৫ কিমি/ঘ

রমজানে নিত্যপণ্যের দাম বাড়ে, মাঠে ন্যায্য দাম পান না কৃষক

রমজান শুরুর পরদিন, ২০২৬ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি জাগো নিউজে প্রকাশিত এক লেখায় রাজশাহী কলেজের শিক্ষার্থী আবু রায়হান যুক্তি দেন, শুধু চাহিদা নয়, পরিকল্পনার ঘাটতি ও দুর্বল তদারকিই প্রতি রমজানে দাম বাড়ায়, অথচ কৃষক মাঠে কম দামে ফসল বেচতে বাধ্য হন।

রমজানে নিত্যপণ্যের দাম বাড়ে, মাঠে ন্যায্য দাম পান না কৃষক
এগ্রোবিজ

বাংলাদেশে পবিত্র রমজান মাস শুরুর পরদিন, ২০২৬ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি, অনলাইন সংবাদমাধ্যম জাগো নিউজ রাজশাহী কলেজের শিক্ষার্থী আবু রায়হানের একটি মতামত প্রকাশ করে। তাঁর যুক্তি, প্রতি রমজানে নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের দাম বাড়ে, অথচ যে কৃষকেরা এসব খাদ্যের বড় অংশ উৎপাদন করেন, তাঁরা তখনো ন্যায্য দাম পান না। ১৮ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় ঢাকার বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের সভাকক্ষে বৈঠকে বসে জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটি জানায়, নেত্রকোনা, সিরাজগঞ্জ ও কক্সবাজারে চাঁদ দেখা গেছে। ফলে ১৪৪৭ হিজরির রমজানের প্রথম দিন ছিল বৃহস্পতিবার, ১৯ ফেব্রুয়ারি। লেখাটি জাগো নিউজের কৃষি ও প্রকৃতি বিভাগে প্রকাশিত হয়। এই প্রতিবেদনে লেখকের যুক্তি এবং সেই দিন পর্যন্ত প্রকাশিত সরকারি পরিসংখ্যান ও আগের প্রতিবেদন তুলে ধরা হলো, যা বিষয়টি বুঝতে সাহায্য করে।

লেখকের যুক্তি: সংকট চাহিদার নয়, ব্যবস্থাপনার


রায়হান লেখা শুরু করেন বাজারের পাল্লা উল্টো পথে হাঁটার ছবি দিয়ে: গত সপ্তাহেও যে পণ্য নাগালে ছিল, এখন তা ছুঁয়ে দেখাও কঠিন; আলু, চাল, ডাল, ভোজ্যতেল, ছোলা, সবকিছুর গায়েই নতুন দাম। অর্থনীতির সাধারণ নিয়ম তিনি মেনে নেন: চাহিদা বাড়লে কৃষিপণ্যের দাম বাড়ে, আর রমজানে ভোগ্যপণ্যের চাহিদা কিছুটা বাড়ে, বিশেষ করে সূর্যাস্তে রোজা ভাঙার খাবার ইফতার এবং ভোরের আগের খাবার সেহরিকে ঘিরে। তাঁর প্রশ্ন ছিল, এই চাহিদা কি এতটাই অস্বাভাবিক যে প্রতি বছরই সবজির বাজার অস্থির হয়ে উঠতে হবে? তাঁর উত্তর, চাহিদার চেয়ে সংকট বেশি তৈরি হয় ব্যবস্থাপনা, নজরদারি আর নৈতিকতার অভাবে।

তিনি লেখেন, রমজান হঠাৎ আসে না; বছরের নির্দিষ্ট সময়েই এই মাস আসে। তবু তাঁর মতে ব্যবসায়ীরা আগেভাগে পণ্য মজুত করেন না, আমদানি ও সরবরাহ পরিকল্পনায় ঘাটতি থাকে। তাঁর অভিযোগ, অনেক ক্ষেত্রে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে দাম বাড়ানো হয়, আর কিছু অসাধু ব্যবসায়ী রমজানকে পণ্য মজুত ও অতিরিক্ত মুনাফার সুযোগ হিসেবে দেখেন; ফলে সংযমের মাস মুনাফার মাসে পরিণত হয়। এগুলো লেখকের নিজের দাবি; লেখায় কোনো ব্যবসায়ী, প্রতিষ্ঠান বা বাজারের নাম নেই।

মাঠের দাম ও বাজারের দাম: লেখায় যে ফারাক


লেখার মূল জায়গা কৃষকের দিকটি। রায়হানের ভাষ্য, কৃষক জমি থেকে আলু কেজিপ্রতি ১২ টাকায় বিক্রি করলেও বাজারে এসে সেই আলু হয়ে যায় ২৫ টাকা। তিনি লেখেন, পটলের কেজি ৪০০ টাকা, করলার কেজি ২০০ টাকায় উঠেছে, আর ২০ টাকার শিম বিক্রি হচ্ছে ৬০ টাকায়; খোঁজ নিলে দেখা যাবে, কৃষক এসব নামমাত্র দামে বিক্রি করে দিয়েছেন। এই দামগুলো লেখকের নিজের দেওয়া উদাহরণ; কোন বাজারের বা কোন দিনের দাম, তা লেখায় বলা হয়নি, তাই এখানে তা তাঁর বক্তব্য হিসেবেই উল্লেখ করা হলো।

আলুর যে ফারাকের কথা তিনি বলেছেন, আগের মাসগুলোর প্রতিবেদনেও তার মিল পাওয়া যায়। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে বার্তা সংস্থা ইউএনবি রংপুর থেকে জানায়, হিমাগারে আলু কেজিপ্রতি ১২ থেকে ১৪ টাকায় হাতবদল হচ্ছে, অথচ খুচরা বাজারে দাম ২০ থেকে ২২ টাকা; যদিও কৃষি মন্ত্রণালয় তখনই হিমাগার ফটকে কেজিপ্রতি ২২ টাকা ন্যূনতম দাম ঘোষণা করে এবং ৫০ হাজার টন আলু কেনার প্রতিশ্রুতি দেয়। কৃষকেরা ইউএনবিকে জানান, বীজ, সার, শ্রমিক ও সংরক্ষণ মিলিয়ে এক হেক্টরে আলু চাষে খরচ প্রায় ৪ লাখ থেকে ৪ লাখ ২০ হাজার টাকা, আর হেক্টরে ২০ থেকে ২২ টন ফলন ধরলে কেজিপ্রতি খরচ দাঁড়ায় ২৬ থেকে ২৮ টাকা। প্রতিবেদন অনুযায়ী, রংপুর বিভাগের পাঁচ জেলায় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) ১ লাখ ৬০ হাজার ২০০ হেক্টরের লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার হেক্টরে আলু চাষ হয় এবং উৎপাদন দাঁড়ায় ৩২ লাখ টনে। ওই অঞ্চলের ৭১টি হিমাগারের মোট ধারণক্ষমতা ছিল সাড়ে ৭ লাখ টন, ফলে আনুমানিক ২২ থেকে ২৪ লাখ টন আলু প্রচলিত পদ্ধতিতে বাইরে রাখা ছিল, যার বড় অংশ গরমে নষ্ট হওয়ার ঝুঁকিতে ছিল।

আগের রমজানগুলোতেও সবজির বাজারে একই চিত্র দেখা গেছে। ২০২৪ সালের ১২ মার্চ, সেই বছরের রোজার শুরুতে, দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস জানায়, ঢাকায় এক সপ্তাহে বেগুন, শসা ও লেবুর দাম দ্বিগুণেরও বেশি হয়েছে; আগের সপ্তাহে ৫০ টাকার শসা তখন বিক্রি হচ্ছিল কেজিপ্রতি প্রায় ১০০ থেকে ১২০ টাকায়। কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের (ডিএএম) তৎকালীন মহাপরিচালক মো. মাসুদ করিম পত্রিকাটিকে বলেন, তখন বেগুন ও শসার ভরা মৌসুম, এগুলোর উৎপাদন খরচ কেজিপ্রতি ১৬ থেকে ২০ টাকা, আর মাঠপর্যায়ে দাম সর্বোচ্চ ২৫ টাকা। পত্রিকাটির প্রতিবেদন অনুযায়ী, কনজিউমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সাধারণ সম্পাদক হুমায়ুন কবির ভূঁইয়া কৃষকের দামের চার গুণে বেগুন বিক্রিকে "দিনেদুপুরে ডাকাতি" বলে উল্লেখ করেন।

ময়মনসিংহ জেলার চরপুলিয়ামারীতে আলুখেতে কাজ করছেন এক নারী, জানুয়ারি ২০১১। ছবি: হৃদয়ে মাটি ও মানুষ / উইকিমিডিয়া কমন্স (সিসি বাই ২.০)
ময়মনসিংহ জেলার চরপুলিয়ামারীতে আলুখেতে কাজ করছেন এক নারী, জানুয়ারি ২০১১। ছবি: হৃদয়ে মাটি ও মানুষ / উইকিমিডিয়া কমন্স (সিসি বাই ২.০)

২০২৬ সালের রমজানের আগে বাজারের চিত্র


লেখাটি প্রকাশের আগের দিনগুলোতে জেলা প্রতিনিধিরা দাম বাড়ার খবর দেন। ২০২৬ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশন যশোর থেকে জানায়, ১৫ দিনের ব্যবধানে সয়াবিন তেলের দাম লিটারে ১০ টাকা বেড়েছে; দুই সপ্তাহ আগে ২০ টাকার এক হালি লেবু বিক্রি হচ্ছে ৪৮ টাকায়; শসার দাম কেজিতে ৩০ টাকা বেড়েছে; আর গরুর মাংস কেজিতে ১৫০ টাকা বেড়ে হয়েছে ৮০০ টাকা। তবে খেজুর, ছোলা, চিড়া, পেঁয়াজ, রসুন, ডাল, আলু ও চিনির দাম অপরিবর্তিত ছিল। চাঁদপুরে চ্যানেলটি দেখে, বেগুন, করলা, ফুলকপি, টমেটোসহ সব ধরনের সবজির দাম কেজিতে ৫ থেকে ১০ টাকা বেড়েছে, আর শসা কেজিতে ২০ টাকা বেড়ে ৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। খুলনায় খেজুর, কুড়িগ্রামে সবজি ও মসলা এবং পটুয়াখালীতে গরু ও খাসির মাংসের দাম বাড়ার খবরও দেয় চ্যানেলটি।

চ্যানেলটির সঙ্গে কথা বলা ব্যবসায়ীরা দাবি করেন, প্রায় সব পণ্যের সরবরাহ ও মজুত স্বাভাবিক, তবে কয়েক দফা হাতবদলের কারণে খোলা বাজারে দাম ওঠানামা করছে; একজন ব্যবসায়ী বলেন, বড় ব্যবসায়ীরা মাল মজুত করে রাখছেন। ভোক্তারা অভিযোগ করেন, প্রতি বছর রমজানে বেশি মুনাফার আশায় অসাধু ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেটের মাধ্যমে নিত্যপণ্যের দাম বাড়ান। এগুলো সাক্ষাৎকারদাতাদের অভিযোগ; প্রতিবেদনে কোনো সিন্ডিকেট চিহ্নিত করা হয়নি। সব প্রতিবেদনে অবশ্য একই চিত্র আসেনি: ২০২৬ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি দৈনিক ইত্তেফাক লেখে, ক্রেতা ও বিক্রেতারা বলছেন এবার পণ্যমূল্য তুলনামূলক স্থিতিশীল, যা ভোক্তাদের কিছুটা স্বস্তি দিচ্ছে।

জাতীয় পরিসংখ্যানেও খাদ্যপণ্যের দামে চাপ দেখা যাচ্ছিল। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসাবে, ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের ৮ দশমিক ৪৯ শতাংশ থেকে ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়ায় ৮ দশমিক ৫৮ শতাংশে; খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৭১ থেকে বেড়ে হয় ৮ দশমিক ২৯ শতাংশ, আর খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ১৩ থেকে কমে হয় ৮ দশমিক ৮১ শতাংশ। ২০২৬ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি তথ্যটি প্রকাশ করে দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস জানায়, রমজানের আগে খাদ্যপণ্যের দাম বাড়াই এর মূল কারণ। তবে এক বছর আগের তুলনায় খাদ্য মূল্যস্ফীতি কম ছিল: ইউএনবির প্রকাশিত বিবিএসের তথ্যে ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে গ্রামে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ছিল ১০ দশমিক ৬১ শতাংশ ও শহরে ১০ দশমিক ৯৫ শতাংশ, যা ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে যথাক্রমে ৮ দশমিক ১৮ ও ৮ দশমিক ৬১ শতাংশ।

বাজারে অন্য সবজির সঙ্গে বিক্রির জন্য রাখা পটল, জুন ২০২২। ছবি: Billjones94 / উইকিমিডিয়া কমন্স (সিসি বাই-এসএ ৪.০)
বাজারে অন্য সবজির সঙ্গে বিক্রির জন্য রাখা পটল, জুন ২০২২। ছবি: Billjones94 / উইকিমিডিয়া কমন্স (সিসি বাই-এসএ ৪.০)

আমদানিনির্ভর পণ্যের প্রস্তুতি মাস কয়েক আগে থেকেই


সরবরাহ পরিকল্পনায় ঘাটতির যে অভিযোগ রায়হান করেছেন, তার পাশে আমদানিনির্ভর নিত্যপণ্যের ক্ষেত্রে এবারের রমজানের আগে নেওয়া পদক্ষেপগুলো রাখা যায়। ২০২৫ সালের ১২ নভেম্বর বাংলাদেশ ব্যাংক সব তফসিলি ব্যাংককে দশটি পণ্যের ঋণপত্র (এলসি) খোলায় নগদ মার্জিন যথাসম্ভব ন্যূনতম রাখার নির্দেশ দেয়: চাল, গম, পেঁয়াজ, ডাল, ভোজ্যতেল, চিনি, ছোলা, মটর, মসলা ও খেজুর। একই দিনের আরেক সার্কুলারে এসব পণ্য সরবরাহকারী বা ক্রেতার ঋণে সর্বোচ্চ ৯০ দিনের বাকিতে আমদানির সুযোগ দেওয়া হয়। দুটি সুবিধাই ২০২৬ সালের ৩১ মার্চ পর্যন্ত বহাল থাকার কথা ছিল। কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানায়, রমজানে এসব পণ্যের চাহিদা অনেক বেড়ে যায় বলে পর্যাপ্ত সরবরাহ ও স্থিতিশীল দাম নিশ্চিত করাই এর উদ্দেশ্য।

২০২৫ সালের নভেম্বরের শেষে দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড দেশের অন্যতম বড় পাইকারি বাজার চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জ থেকে জানায়, রমজানের প্রস্তুতি প্রায় শেষ এবং রমজানের নিত্যপণ্যের সরবরাহ স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি। ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) বাজারদরের তথ্য উদ্ধৃত করে পত্রিকাটি জানায়, খুচরা বাজারে ছোলা তখন কেজিপ্রতি ১০০ থেকে ১১০ টাকা, যা এক বছর আগে ছিল ১২৫ থেকে ১৪০ টাকা; চিনি ৯৫ থেকে ১১০ টাকা, এক বছর আগে ১২৫ থেকে ১৩৫ টাকা; তবে খোলা সয়াবিন তেলের দাম প্রায় ৪ শতাংশ এবং বোতলজাত সয়াবিনের দাম প্রায় ১৩ শতাংশ বেড়েছিল। সেখানকার ব্যবসায়ীরা স্থিতিশীল রমজান বাজারের আশা করলেও জোরালো তদারকির দাবি জানান। এগুলো আমদানিনির্ভর পণ্য। রায়হান যে সবজি ও আলুর কথা লিখেছেন, সেগুলো দেশেই উৎপাদিত হয়, আর সেগুলোর দাম নির্ভর করে মাঠ থেকে ব্যবসায়ী ও পাইকারি বাজার হয়ে খুচরা দোকান পর্যন্ত দেশীয় সরবরাহ শৃঙ্খলের ওপর।

সরকারের সুলভ মূল্যে বিক্রির কর্মসূচি


রায়হান স্বীকার করেন, সরকার প্রতি বছরই সুলভ মূল্যে পণ্য বিক্রির উদ্যোগ নেয়; টিসিবির ট্রাকসেল, খোলাবাজারে বিক্রি (ওএমএস) ও ভ্রাম্যমাণ বাজারের কথা তিনি উল্লেখ করেন। তবে তাঁর মতে, চাহিদার তুলনায় এসব উদ্যোগ খুবই সীমিত; বড় একটি জনগোষ্ঠী এর বাইরে থেকে যায়, ফলে খোলাবাজারে চাপ বাড়ে এবং সেই সুযোগ নেয় মুনাফালোভীরা।

জাতীয় জ্ঞানকোষ বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী, ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন একটি স্বায়ত্তশাসিত রাষ্ট্রীয় বাণিজ্য প্রতিষ্ঠান, যা ১৯৭২ সালে রাষ্ট্রপতির ৬৮ নম্বর আদেশে প্রতিষ্ঠিত হয়। শুরুতে এর কাজের মধ্যে ছিল সরকারের প্রয়োজন অনুযায়ী পণ্য আমদানি, বাজার স্থিতিশীল রাখতে ন্যায্য দামে সেগুলো বিতরণ এবং নিত্যপণ্যের সরবরাহ ও দামের ওপর নজর রাখা। বাংলাপিডিয়া লিখেছে, দাম বাড়ার চাপ থেকে নিম্ন আয়ের মানুষকে রেহাই দিতে টিসিবি চিনি, সয়াবিন তেল, ডাল ও ছোলা আমদানি করে সারা দেশে ডিলারদের মাধ্যমে বিক্রি করে, আর জরুরি অবস্থায় পেঁয়াজ, ডাল, লবণ, শুকনা মরিচ, খেজুর, আদা ও ওষুধও আমদানি করেছে। এর প্রধান কার্যালয় ঢাকার কারওয়ান বাজারে; আঞ্চলিক কার্যালয় রয়েছে ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী, সিলেট, বরিশাল ও রংপুরে।

দৈনিক ইত্তেফাক ২০২৬ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি জানায়, রমজান উপলক্ষে টিসিবি মঙ্গলবার, ১৭ ফেব্রুয়ারি থেকে বিক্রি শুরু করবে। সারা দেশে বাজারদরের চেয়ে কম দামে ভোজ্যতেল, চিনি, ছোলা, ডাল ও খেজুর বিক্রি হবে স্মার্ট ফ্যামিলি কার্ডধারীদের কাছে এবং ট্রাক থেকে অন্য নিম্ন আয়ের ক্রেতাদের কাছে। টিসিবি জানায়, ৭৫ লাখ কার্ডধারী সুবিধাভোগীর বাইরে প্রতিদিন আরও প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার মানুষ ট্রাক থেকে পণ্য কিনতে পারবেন, তবে কার্ডধারীদের চেয়ে প্রতি প্যাকেজে তাঁদের ৬০ টাকা বেশি দিতে হবে। কার্ডধারীরা দুই লিটার সয়াবিন তেল পাবেন ২০০ টাকায়, ট্রাক থেকে কিনলে লাগবে ২৩০ টাকা; চিনি ও ডালে ট্রাকসেলে কেজিপ্রতি ১০ টাকা বেশি। রমজানজুড়ে প্রায় সাড়ে ৪০০ ট্রাকে এই কার্যক্রম চলার কথা ছিল। ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশন ১৮ ফেব্রুয়ারি জানায়, বরিশালে নগরীর ১০টি ওয়ার্ডের বিভিন্ন পয়েন্টে ট্রাকে বিক্রি শুরু হয়েছে, প্রতিদিন ৪ হাজার প্যাকেট বিক্রির কথা, একজন ক্রেতা সর্বোচ্চ পাঁচ কেজি পর্যন্ত পণ্য কিনতে পারবেন; তবে ডিলারদের অভিযোগ, সময়মতো পণ্য হাতে না পাওয়ায় বিতরণে দেরি হচ্ছে।

এসব কর্মসূচির কোনোটিতেই তাজা সবজি বা আলু নেই, আর এটিও রায়হানের যুক্তির অংশ: যে মাঠপর্যায়ে কৃষক কম দামে ফসল বেচেন বলে তিনি লিখেছেন, বাজারের সেই অংশটি ভর্তুকির কর্মসূচির পুরোপুরি বাইরে।

তদারকি, আইন ও সংশ্লিষ্ট সংস্থা


লেখার আরেকটি অভিযোগ দুর্বল তদারকি নিয়ে। রায়হান লেখেন, বাজার মনিটরিং জোরদার করা হলেও তা অনেক সময় লোক দেখানো পর্যায়েই থেকে যায়; শাস্তির নজির কম থাকায় অসাধু ব্যবসায়ীরা বারবার একই কাজ করার সাহস পান; আর নিয়মিত ও কার্যকর নজরদারি না থাকায় বাজার নিয়ন্ত্রণ কাগজেই সীমাবদ্ধ থাকে। তাঁর ভাষায়, তাতে কপাল পোড়ে কৃষকের।

খুচরা বাজারে আইন প্রয়োগের প্রধান সংস্থা জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, যা ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ আইন, ২০০৯-এর অধীনে গঠিত একটি আধা-বিচারিক সরকারি দপ্তর এবং পণ্য ও সেবা নিয়ে ভোক্তাদের অভিযোগ শুনানি করে। ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশন জানায়, ২০২৬ সালের রমজানের আগের সপ্তাহে কয়েকটি জেলায় জেলা প্রশাসন ও অধিদপ্তর অভিযান চালাচ্ছিল। চাঁদপুরে অধিদপ্তরের এক সহকারী পরিচালক তিনটি প্রতিষ্ঠানকে মোট ৮ হাজার টাকা জরিমানা করেন এবং প্রথম রমজান থেকে অভিযান অব্যাহত রাখার আশ্বাস দেন; বগুড়ায় অধিদপ্তর মেয়াদোত্তীর্ণ খেজুর ধ্বংস করে এবং দুটি দোকানকে ১৫ হাজার টাকা করে জরিমানা করে; হিলিতে মূল্যতালিকা প্রদর্শন না করায় ভ্রাম্যমাণ আদালত দুটি মুদি দোকানকে ৫ হাজার টাকা জরিমানা করে; আর নেত্রকোনায় জেলা প্রশাসক দোকানে মূল্যতালিকা প্রদর্শনের নির্দেশ দেন। যশোরে অধিদপ্তর জানায়, রোজায় বাজারদর নিয়ন্ত্রণে প্রশাসনের একাধিক দল মাঠে নেমেছে।

মাঠপর্যায়ের বিপণন দেখে কৃষি মন্ত্রণালয়ের কৃষি বিপণন অধিদপ্তর। জাতিসংঘ পরিবেশ কর্মসূচির আইনি তথ্যভান্ডারের সারসংক্ষেপ অনুযায়ী, কৃষি বিপণন আইন, ২০১৮ (২০১৮ সালের ৪৪ নম্বর আইন) অধিদপ্তরের কাজ নির্ধারণ করেছে, যার মধ্যে আছে কৃষি বিপণনের উন্নয়ন, বাজার সংযোগ তৈরি, মূল্য সহায়তা এবং মান নিয়ন্ত্রণ ও পরিবীক্ষণ। আইনটি সরকারকে কৃষিপণ্য কেনাবেচার জন্য প্রজ্ঞাপিত বাজার ঘোষণার ক্ষমতা দেয়; কৃষিপণ্যের রপ্তানিকারক, আমদানিকারক, ডিলার, মিলার, সরবরাহকারী ও প্রক্রিয়াজাতকারী এবং গুদাম ও হিমাগার পরিচালনাকারীদের জন্য লাইসেন্স বাধ্যতামূলক করে; জাতীয়, জেলা, উপজেলা ও বাজার পর্যায়ে কৃষি বিপণন সমন্বয় কমিটি গঠনের বিধান রাখে; আর ব্যবসায়ী, কৃষক, ক্রেতা-বিক্রেতা, হিমাগারের মালিক ও মজুতদারদের মধ্যে বিরোধ নিষ্পত্তিতে অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের ভূমিকা নির্ধারণ করে।

ভোক্তার দায় ও রমজানের শিক্ষা


রায়হান ভোক্তাদেরও ছাড় দেননি। তিনি লেখেন, রমজান এলেই আমরা প্রয়োজনের চেয়ে বেশি কিনি; পরে দাম বাড়বে, এই আশঙ্কায় একসঙ্গে অনেক পণ্য কিনে ফেলি। এতে চাহিদা হঠাৎ বেড়ে যায়, সরবরাহ ব্যবস্থায় চাপ পড়ে, আর বাজারের অস্থিরতা দাম আরও উসকে দেয়। বাংলাপিডিয়া লিখেছে, এই মাসে দেশের বাজারের চেহারা কীভাবে বদলায়: ইফতারের খাবার বিক্রির জন্য রাস্তার পাশে দোকান গজিয়ে ওঠে, প্রায় সব রেস্তোরাঁ ইফতারের বিশেষ খাবার তৈরি করে, আর কাপড়, শাড়ি ও গয়নার দোকানে কেনাবেচা জমে ওঠে। রমজানে ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত রোজা রাখা ইসলামের পাঁচ স্তম্ভের একটি, আর প্রথাগতভাবে খেজুর ও ঠান্ডা কোনো পানীয় দিয়ে রোজা ভাঙা হয়।

লেখকের কাছে এটিই এই মৌসুমের মূল স্ববিরোধ। রমজান শেখায় সংযম, সহানুভূতি ও ন্যায়বোধ, অথচ এই মাসেই সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস ওঠে। তাঁর যুক্তি, বাজার নিয়ন্ত্রণ শুধু সরকারের একার দায়িত্ব নয়; কৃষক, ব্যবসায়ী, ভোক্তা ও প্রশাসন, সব পক্ষেরই সম্মিলিত দায় আছে। তিনি আগাম প্রস্তুতি, কঠোর নজরদারি এবং সর্বোপরি নৈতিকতার চর্চার আহ্বান জানান। না হলে, তিনি লেখেন, সংযমের মাস বারবার মূল্যবৃদ্ধির মাসে পরিণত হবে, যার বোঝা বইতে হবে সাধারণ মানুষকে, আর কৃষকের উৎপাদিত ফসল কৃষককেই বেশি দামে কিনতে হবে।

পুরান ঢাকার চকবাজারের ইফতার বাজারে বিক্রির জন্য সাজানো ইফতারি, মার্চ ২০২৩। ছবি: Rafsanahmed123 / উইকিমিডিয়া কমন্স (সিসি বাই-এসএ ৪.০)
পুরান ঢাকার চকবাজারের ইফতার বাজারে বিক্রির জন্য সাজানো ইফতারি, মার্চ ২০২৩। ছবি: Rafsanahmed123 / উইকিমিডিয়া কমন্স (সিসি বাই-এসএ ৪.০)

বাংলাদেশের সবজি: ফলন বড়, কৃষকের লাভ সামান্য


লেখায় যে চাপের কথা এসেছে, তা পড়ছে দ্রুত বাড়তে থাকা একটি খাতের ওপর। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসের উদ্ধৃত বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০-২১ অর্থবছরের ১ কোটি ৪৮ লাখ ২০ হাজার টন থেকে পাঁচ বছরে দেশে সবজি উৎপাদন ১৫ শতাংশের বেশি বেড়েছে। কৃষকেরা প্রায় ১০ লাখ হেক্টর জমিতে প্রায় ১০০ ধরনের সবজি চাষ করেন এবং বছরে প্রায় ১ কোটি ৭০ লাখ টন সবজি উৎপাদন করেন; জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) সবজি উৎপাদনে চীন ও ভারতের পরেই বাংলাদেশকে বিশ্বে তৃতীয় স্থানে রেখেছে। একই প্রতিবেদনে বিশেষজ্ঞরা বলেন, তবু সবজির দাম নিম্নমধ্যবিত্ত ও দরিদ্র পরিবারের জন্য বোঝা হয়ে আছে, আর এর জন্য তাঁরা কৃষিপণ্য বিপণনের সমস্যা, যেমন মধ্যস্বত্বভোগীদের অতিমুনাফা ও পরিবহন খরচকে দায়ী করেন। দেশের ৮৫ লাখ হেক্টর আবাদি জমির ৭৫ শতাংশের বেশি দখল করে আছে ধান ও অন্যান্য দানাশস্য, ফলে সবজির জন্য জমি সীমিত।

বাংলাপিডিয়া উৎপাদনের পরিসর ও উদ্দেশ্য অনুযায়ী বাংলাদেশের সবজি চাষকে কয়েকটি ভাগে ভাগ করেছে, যার মধ্যে আছে বসতবাড়ির আঙিনায় চাষ, যা মূলত পরিবারের নিজের খাওয়ার জন্য এবং উদ্বৃত্ত বিক্রি হয়, আর যেখানে নারীরাই প্রধান ভূমিকা রাখেন, এবং বাজারের জন্য মাঠে বাণিজ্যিক চাষ। অনুকূল পরিবেশ ও ভালো বিপণন সুবিধার কারণে কিছু সবজির চাষ নির্দিষ্ট এলাকায় কেন্দ্রীভূত, যেমন বগুড়ায় পটল, ফরিদপুরে পেঁয়াজ ও চট্টগ্রামে শিম। জ্ঞানকোষটি করলা ও কাঁকরোলকে প্রধান গ্রীষ্মকালীন সবজির তালিকায় এবং বেগুনকে দুই মৌসুমেই চাষ হওয়া সবজির তালিকায় রেখেছে। বাংলাপিডিয়ার ভাষ্যে, আলু এখন বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান খাদ্য; শর্করাসমৃদ্ধ এই কন্দ আমিষ, ভিটামিন সি, বি ভিটামিন, পটাশিয়াম, ফসফরাস ও লৌহেরও ভালো উৎস।

রায়হান লেখাটির শেষে নিজের পরিচয় দিয়েছেন রাজশাহী কলেজের শিক্ষার্থী হিসেবে। বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী, কলেজটি ১৮৭৩ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং অল্প সময়ের মধ্যেই পূর্ববঙ্গ, উত্তরবঙ্গ, বিহার, পূর্ণিয়া ও আসামের শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষার অন্যতম প্রধান কেন্দ্রে পরিণত হয়।

ছবি: NahidSultan / উইকিমিডিয়া কমন্স (সিসি বাই-এসএ ৩.০)

সূত্র: জাগো নিউজ, ঢাকা ট্রিবিউন (বাসস), ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশন, দৈনিক ইত্তেফাক, দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস, ইউএনবি, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস), ইত্তেফাক ইংরেজি সংস্করণ, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, বাংলাপিডিয়া, জাতিসংঘ পরিবেশ কর্মসূচির আইনি সহায়তা প্ল্যাটফর্ম (লিপ)

অনলাইন ডেস্কদা এগ্রো নিউজ

এগ্রোবিজ

সম্পর্কিত খবর

ফসল

ইংল্যান্ডে যবের ফলন ১৪ বছরে সর্বনিম্ন, গম সামান্য বেশি

যুক্তরাজ্যের কৃষি মন্ত্রণালয় ডেফরার প্রাথমিক হিসাবে ইংল্যান্ডে যব উৎপাদন ১১ শতাংশ কমে ৩৭ লাখ টন হয়েছে, গম ০ দশমিক ৮ শতাংশ বেড়ে ১ কোটি ৮ লাখ টন; গমের তুলনায় পশুখাদ্যের যব বিক্রি হচ্ছে অনেক কম দামে।

Farmers Weekly১৬ অক্টোবর ২০২৬২ মিনিটের পড়া
এগ্রোটেক

নিজস্ব কারখানা ছেড়ে চুক্তিভিত্তিক ও যৌথ কারখানায় ঝুঁকছে উদ্ভিজ্জ মাংস

চাহিদা অনিশ্চিত থাকায় উদ্ভিজ্জ মাংসের ব্র্যান্ডগুলো নিজস্ব কারখানার বদলে চুক্তিভিত্তিক উৎপাদন, যৌথ অবকাঠামো ও মাংস প্রক্রিয়াকরণের পুরোনো যন্ত্রপাতির দিকে ঝুঁকছে বলে জানিয়েছেন শিল্পসংশ্লিষ্টরা।

FoodNavigator১৬ অক্টোবর ২০২৬২ মিনিটের পড়া
এগ্রোবিজ

সারের দাম দেখার প্ল্যাটফর্ম ক্লিয়ারকস্টে বিনিয়োগ, সালফার সংকটে কমছে ফসফরাস

কৃষকদের সারের দাম ও চালান দেখার এবং সরবরাহ চুক্তির সুযোগ দেওয়া কানাডার স্টার্টআপ ক্লিয়ারকস্ট সিরিজ এ তহবিল পেয়েছে; ২০২৭ সালের শুরুতে উত্তর আমেরিকাজুড়ে নতুন প্ল্যাটফর্ম চালু করবে তারা।

AgNavigator১৬ অক্টোবর ২০২৬১ মিনিটের পড়া

মন্তব্য

(০)