২০২৬ সালের ৩০ জানুয়ারি, শুক্রবার, জাগো নিউজ ২৪-এর লাইফস্টাইল ডেস্ক সাপ্তাহিক ছুটির দিনের রেসিপির ধারায় চিংড়ি পোলাওয়ের একটি রেসিপি প্রকাশ করে। ডেস্ক লিখেছিল, ছুটির দিন মানেই পরিবারের সঙ্গে বসে খাওয়ার আনন্দ, আর চিংড়ি পোলাও সেই খাওয়াকে আরও স্মরণীয় করে তোলে: সুগন্ধি বাসমতি বা পোলাও চালের সঙ্গে মসলা আর তাজা চিংড়ির কোমলতা। রেসিপিতে আধা কেজি চিংড়ি ও আধা কেজি চাল লাগে। চিংড়ি লবণ, হলুদ ও মরিচে মেখে ভেজে নেওয়া হয়, পেঁয়াজ, টমেটো, আদা, রসুন ও টকদইয়ে মসলা কষানো হয়, ভেজানো চাল সেই মসলায় রান্না হয়, আর শেষে কেওড়া জল ও গোলাপ জলে সুগন্ধ দেওয়া হয়।
এই প্রতিবেদনে জাগো নিউজের দেওয়া রেসিপিটি ধাপে ধাপে তুলে ধরা হলো। সঙ্গে আছে খাবারটির প্রতিটি অংশ নিয়ে নির্ভরযোগ্য সূত্রের তথ্য: পোলাও কী এবং শব্দটি কোথা থেকে এসেছে, বাসমতি ও দেশি সুগন্ধি চাল কী, বাংলাদেশের রান্নাঘরের দুই বড় চিংড়ি গলদা ও বাগদা কী এবং কোথায় চাষ হয়, মৎস্য অধিদপ্তরের হিসাবে দেশে কত চিংড়ি উৎপাদন হয়েছে, আর সামুদ্রিক খাবার নিরাপদে রাখা ও রান্না করা এবং চিংড়িতে অ্যালার্জি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ কী বলে।
জাগো নিউজের দেওয়া উপকরণ
প্রকাশিত রেসিপির উপকরণের তালিকা নিচে দেওয়া হলো। পরিমাণগুলো ডেস্কেরই দেওয়া।
- চিংড়ি: আধা কেজি
- পেঁয়াজ কুচি: ১ কাপ
- টমেটো কুচি: ১ কাপ
- কাঁচা মরিচ: ৪ থেকে ৫টি
- লবণ: স্বাদমতো
- বাসমতি বা পোলাও চাল: আধা কেজি
- আদা বাটা: ১ টেবিল চামচ
- রসুন বাটা: ২ টেবিল চামচ
- আস্ত গরম মসলা: ৫ গ্রাম
- তেজপাতা: ২টি
- শুকনো মরিচের গুঁড়া: ১ টেবিল চামচ
- হলুদ গুঁড়া: আধা টেবিল চামচ
- ধনে গুঁড়া: ১ টেবিল চামচ
- টকদই: আধা কাপ
- গোলাপ জল: ১ চা চামচ
- কেওড়া জল: আধা চা চামচ
রান্নার আগে প্রকাশিত লেখার দুটি বিষয় খেয়াল রাখা ভালো। রান্নার পদ্ধতিতে তেল ও সামান্য চিনির কথা আছে, কিন্তু উপকরণের তালিকায় এ দুটির পরিমাণ দেওয়া নেই, তাই রাঁধুনিকে আন্দাজমতো দিতে হবে। আবার তালিকায় আধা কাপ টকদইয়ের কথা থাকলেও পদ্ধতিতে মসলায় ২ টেবিল চামচ টকদই দেওয়ার কথা বলা হয়েছে; বাকিটা কোথায় লাগবে, রেসিপিতে তা বলা নেই। চাল সেদ্ধ করার পানির পরিমাণও রাঁধুনির ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে: ডেস্ক শুধু প্রয়োজনমতো গরম পানি দিতে বলেছে।
যেভাবে রাঁধবেন: ধাপে ধাপে
নিচের ধাপগুলো জাগো নিউজের রেসিপির ক্রম অনুযায়ী সাজানো।
- বাসমতি বা পোলাও চাল ধুয়ে এক ঘণ্টা ভিজিয়ে রাখুন। এরপর পানি ঝরিয়ে আলাদা রাখুন।
- চিংড়ি কেটে ধুয়ে লবণ, হলুদ ও মরিচের গুঁড়া মিশিয়ে মেরিনেট করে রাখুন।
- একটি প্যানে তেল গরম করে চিংড়িগুলো হালকা ভেজে তুলে রাখুন।
- একই প্যানে তেজপাতা, আস্ত গরম মসলা ও পেঁয়াজ কুচি ভেজে নিন।
- পেঁয়াজ হালকা সোনালি হলে টমেটো কুচি দিয়ে ভালো করে নেড়ে চেপে দিন।
- আদা ও রসুন বাটা মিশিয়ে কয়েক মিনিট কষিয়ে নিন।
- ২ টেবিল চামচ টকদই দিয়ে মসলা আরও কষান; সামান্য পানি দিয়ে মসলা ভালোভাবে কষাতে হবে।
- ধনে গুঁড়া, মরিচ গুঁড়া, লবণ ও কিছু কাঁচা মরিচ দিয়ে নেড়ে ৫ মিনিট কষান।
- তেল ওপরে উঠে এলে সামান্য চিনি ও ভেজে রাখা চিংড়ি মিশিয়ে ঢেকে ৫ মিনিট রান্না করুন।
- চিংড়িগুলো আলাদা একটি পাত্রে তুলে রাখুন।
- একই মসলায় ভেজানো চাল দিয়ে ভালোভাবে মিশিয়ে প্রয়োজনমতো গরম পানি ঢালুন। চাইলে এ সময় কয়েকটি কাঁচা মরিচ দিতে পারেন।
- চাল সেদ্ধ হওয়া পর্যন্ত ঢেকে রান্না করুন।
- চাল প্রায় সেদ্ধ হয়ে এলে পরিমাণমতো কেওড়া জল ও কয়েক ফোঁটা গোলাপ জল ছড়িয়ে দিয়ে আরও কিছুক্ষণ ঢেকে রাখুন।
- পোলাও নেড়ে চুলা বন্ধ করে ৫ মিনিট ঢেকে রাখুন, তারপর পরিবেশন করুন।
তুলে রাখা চিংড়ি কখন আবার পোলাওয়ে মেশাতে হবে, রেসিপিতে তা স্পষ্ট করে বলা নেই। পুরো পদ্ধতি পড়লে বোঝা যায়, চিংড়ি মসলায় রান্না করে আলাদা রাখা হয়, একই মসলায় চাল রান্না হয়, আর তৈরি পোলাওয়ের সঙ্গে চিংড়ি পরিবেশন করা হয়।
পোলাও কী
বাংলাদেশের জাতীয় জ্ঞানকোষ বাংলাপিডিয়া পোলাও, মোরগ-পোলাও, বিরিয়ানি ও তেহারিকে সুগন্ধি ছোট দানার চালের বিশেষ খাবার হিসেবে বর্ণনা করেছে, যা মুরগি, গরু বা খাসির মাংস, ঘি ও মসলা দিয়ে রান্না হয়। বাংলাপিডিয়ার ধান-চাল বিষয়ক ভুক্তিতে বলা হয়েছে, ধানের খোসা ছাড়ালে চাল, আর চাল রাঁধলে ভাত; এই বিশেষ খাবারগুলো রোজকার ভাত থেকে আলাদা, উৎসব বা বিশেষ আয়োজনের খাবার। চিংড়ি পোলাও এই পরিবারেরই খাবার, শুধু মাংসের জায়গায় এখানে চিংড়ি।
পোলাও আসলে এশিয়া ও তার বাইরের বহু দেশে পিলাফ, পিলাউ বা পুলাও নামে পরিচিত একটি খাবারের বাংলা রূপ। বিশ্বকোষের বর্ণনায় পিলাফ হলো চালের (কোনো কোনো অঞ্চলে গমের) এমন একটি পদ, যা সাধারণত মসলা এবং সবজি বা মাংসের মতো উপকরণ দিয়ে ঝোল বা স্টকে রান্না হয়, আর এমন কৌশলে রাঁধা হয় যাতে সেদ্ধ দানাগুলো একটির সঙ্গে আরেকটি লেগে না যায়। সেসব বর্ণনায় অক্সফোর্ড ইংলিশ ডিকশনারির সারসংক্ষেপ উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, ইংরেজি পিলাউ শব্দটি প্রথম ব্যবহৃত হয় ১৬০৯ সালে; এটি তুর্কি ভাষা হয়ে ফারসি 'পুলাও' থেকে এসেছে, আর তারও পেছনে আছে হিন্দি 'পুলাব' (চাল ও মাংসের পদ) এবং সংস্কৃত 'পুলাক' (ভাতের দলা)।
একই সূত্র অনুযায়ী, আধুনিক পিলাফের কাছাকাছি ধরনের ভাত রান্নার পদ্ধতি আব্বাসীয় খিলাফতের সময় বিশাল এক অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে, আর স্পেনের পায়েইয়া এবং দক্ষিণ এশিয়ার পোলাও বা পুলাও ও বিরিয়ানি এমন খাবার থেকেই বিবর্তিত হয়েছে। খাদ্য-ইতিহাসবিদ চার্লস পেরির মতে পিলাফ দশম শতকের পরের পূর্ব আরব অঞ্চলের উদ্ভাবন। ত্রয়োদশ শতকের আলেপ্পোর রান্নার বই 'কিতাব আল-উসলা'-তে আধুনিক পিলাফের মতো একটি পদের প্রথম রেসিপি পাওয়া যায়, আর এনসাইক্লোপিডিয়া ইরানিকার মতে শব্দটির প্রথম লিখিত উল্লেখ মেলে চতুর্দশ শতকের ফারসি কবি উবায়েদ জাকানির একটি ব্যঙ্গ কবিতায়।
জাগো নিউজের রেসিপির ধাপগুলোও এই পিলাফ-পদ্ধতিই মেনে চলে: চাল ধুয়ে ভিজিয়ে রাখা হয়, আস্ত মসলা আগে ভেজে তেলে তার ঘ্রাণ ছড়ানো হয়, তারপর একই মসলায় গরম পানি দিয়ে ঢেকে চাল রান্না হয়।
বাসমতি ও দেশের সুগন্ধি চাল
রেসিপিতে বাসমতি বা পোলাও চাল, যেকোনোটি ব্যবহার করার কথা বলা হয়েছে। বাসমতি লম্বা ও সরু দানার একটি সুগন্ধি চাল, যার উৎপত্তি ভারতীয় উপমহাদেশে, মূলত ভারত, পাকিস্তান ও নেপালের হরিয়ানা, পাঞ্জাব, সিন্ধসহ বিভিন্ন রাজ্য ও প্রদেশে। ভারতের কৃষি ও প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্য রপ্তানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (এপিইডিএ) নিয়ম অনুযায়ী, অন্যান্য মানদণ্ডের পাশাপাশি রান্নার আগে ছাঁটা চালের দানার গড় দৈর্ঘ্য অন্তত ৬.৬১ মিলিমিটার এবং গড় প্রস্থ সর্বোচ্চ ২ মিলিমিটার হলে তবেই কোনো চাল বাসমতি বলে গণ্য হয়। ২০১৯ সালের হিসাবে আন্তর্জাতিক বাসমতি বাণিজ্যের ৬৫ শতাংশ ছিল ভারতের, বাকি ৩৫ শতাংশ পাকিস্তানের। নামটির উৎস সংস্কৃত শব্দমূলে, যার অর্থের সঙ্গে সুগন্ধের যোগ আছে; আর এর প্রথম জানা উল্লেখ পাঞ্জাবি কবি ওয়ারিস শাহের ১৭৬৬ সালে রচিত মহাকাব্য 'হীর রাঞ্ঝা'-তে।
বাংলাদেশে পোলাও চাল বলতে সাধারণত লম্বা দানার বাসমতি নয়, দেশের নিজস্ব ছোট দানার সুগন্ধি চাল বোঝায়। ২০১৮ সালের এপ্রিলে উত্তরবঙ্গ থেকে প্রকাশিত দ্য ডেইলি স্টারের এক প্রতিবেদনে সেখানে চাষ হওয়া সুগন্ধি জাত হিসেবে চিনিগুঁড়া, কালিজিরা, কাটারিভোগ ও নেনিয়ার নাম আসে, পাশাপাশি বাসমতিরও। প্রতিবেদনে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের (ব্রি) উদ্ভাবিত উচ্চফলনশীল ব্রি ধান৩৪-কে সবচেয়ে জনপ্রিয় সুগন্ধি জাত বলা হয়। এতে বলা হয়, ব্রি ধান৩৪ সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি পর্যন্ত রোপণ করা যায়, তাই আমন ধানের তুলনায় বর্ষায় এর ক্ষতির আশঙ্কা কম। ওই মৌসুমে উত্তরাঞ্চলে ১৩ হাজার ৭৭৯ হেক্টর জমিতে সুগন্ধি ধানের চাষ হয়েছিল, যা আগের মৌসুমের চেয়ে ৭৬২ হেক্টর বেশি।
একই প্রতিবেদনে এক কৃষক পত্রিকাটিকে জানান, হেক্টরপ্রতি সুগন্ধি ধান হয় প্রায় ২.৭ টন, যা বিক্রি হয় প্রায় ১ লাখ ২২ হাজার টাকায়; অন্যদিকে আমন হয় ৩.৬ টন, বিক্রি হয় প্রায় ৮৬ হাজার টাকায়। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের শাহ আলম পত্রিকাটিকে বলেন, এ ধরনের চাল ছাড়া উৎসব বা আনন্দ-আয়োজনের খাবারের কথা ভাবাই কঠিন। সুগন্ধি চাল আর বিশেষ দিনের খাবারের এই সম্পর্কের কথা মাথায় রেখেই জাগো নিউজের ডেস্ক চিংড়ি পোলাওকে ছুটির দিনের খাবার বলেছে।

গলদা ও বাগদা: দুই বড় চিংড়ি
চিংড়ি বলতে অনেক প্রাণী বোঝায়। বাংলাপিডিয়ার তথ্যমতে বাংলাদেশে ৫৬ প্রজাতির চিংড়ি পাওয়া যায়: ৩৭টি লোনা পানির, ১২টি আধা-লোনা পানির এবং ৭টি মিঠা পানির; এগুলো ছয়টি গোত্রের অন্তর্ভুক্ত। মিঠা পানির প্রজাতিগুলো পেলিমোনিডি (Palaemonidae) গোত্রের। চাষ ও রান্নাঘর, দুই জায়গাতেই প্রধান দুটি প্রজাতি: গলদা (ইংরেজিতে জায়ান্ট রিভার প্রন, Macrobrachium rosenbergii) আর বাগদা (জায়ান্ট টাইগার প্রন, Penaeus monodon)। মৎস্য অধিদপ্তর চাষ হওয়া প্রজাতির মধ্যে হরিণা (Metapenaeus monoceros) ও চাকা (Fenneropenaeus indicus) চিংড়িরও নাম দেয়।
গলদা বিশ্বের সবচেয়ে বড় মিঠা পানির চিংড়িগুলোর একটি। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) তার চাষযোগ্য জলজ প্রজাতির তথ্যপত্রে লিখেছে, পুরুষ গলদা মোট ৩২০ মিলিমিটার আর স্ত্রী গলদা ২৫০ মিলিমিটার পর্যন্ত লম্বা হতে পারে; দেহ সাধারণত সবুজাভ থেকে বাদামি-ধূসর, শুঁড় প্রায়ই নীল, আর দাঁড়া নীল বা কমলা। দ্বিতীয় জোড়া হাঁটার পায়ে থাকে বড় দাঁড়া, যা পরিণত পুরুষে অনেক লম্বা হতে পারে। মিঠা পানিতে বাস করলেও এর লার্ভার আধা-লোনা পানি লাগে: ডিমওয়ালা স্ত্রী চিংড়ি নদীর ভাটিতে মোহনায় নেমে যায়, সেখানে ডিম ফোটে, আর রূপান্তরের পর বাচ্চা চিংড়ি আবার উজানে মিঠা পানির দিকে ফেরে। বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী বাংলাদেশে পুরুষ গলদার গড় আকার ৩৪ সেন্টিমিটার, স্ত্রীর ২৬.৭ সেন্টিমিটার; এদের বাস নদী, শাখানদী, খাল ও নদীর মোহনায়, আর প্রজননকাল জানুয়ারি থেকে জুলাই।
বাগদা সামুদ্রিক প্রাণী। এফএও লিখেছে, প্রাপ্তবয়স্ক বাগদা ৩৩ সেন্টিমিটার পর্যন্ত লম্বা হতে পারে, আর স্ত্রী বাগদা সাধারণত পুরুষের চেয়ে বড় হয়। তলদেশ, খাবার ও পানির ঘোলাটে ভাব অনুযায়ী এর দেহের রং বদলায়, আর পেট ও খোলসে পর্যায়ক্রমে নীল বা কালো এবং হলুদ ডোরা থাকে। এটি কেবল গ্রীষ্মমণ্ডলীয় সমুদ্রে প্রাপ্তবয়স্ক হয় ও প্রজনন করে, আর লার্ভা, কিশোর ও প্রায়-প্রাপ্তবয়স্ক অবস্থা কাটায় উপকূলের মোহনা, উপহ্রদ ও ম্যানগ্রোভ এলাকায়। বাংলাপিডিয়া বাগদার বাসস্থান হিসেবে বঙ্গোপসাগর ও মোহনার কথা বলেছে, আর প্রজননকাল নভেম্বর থেকে মার্চ।
রান্নাঘরের জন্য জরুরি একটি কথা এফএও বলেছে: মিঠা পানির চিংড়ি আর সামুদ্রিক চিংড়ি আলাদা পণ্য, আর সামুদ্রিক চিংড়ির রান্নার নিজস্ব গুণ আছে। সংস্থাটি সতর্ক করেছে, ঠিকভাবে নাড়াচাড়া ও প্রক্রিয়াজাত না করলে মিঠা পানির চিংড়ি নরম হয়ে থলথলে হয়ে যায়, আর তাজা অবস্থায় বিক্রির চিংড়ি তিন দিনের বেশি বরফে রাখা উচিত নয়। জাগো নিউজের রেসিপিতে কোনো নির্দিষ্ট প্রজাতির নাম নেই; গলদা বা বাগদা, যেকোনোটি দিয়েই রাঁধা যায়।

দেশের চিংড়ি কোথা থেকে আসে
মৎস্য অধিদপ্তরের 'ইয়ারবুক অব ফিশারিজ স্ট্যাটিসটিকস অব বাংলাদেশ ২০২৩-২৪' প্রকাশিত হয় ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে। এর হিসাবে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে দেশে মোট চিংড়ি উৎপাদন ছিল ২ লাখ ৬০ হাজার ৪৮৬ টন, যা আগের বছরের ২ লাখ ৭১ হাজার ৩০২ টনের চেয়ে ৩.৯৯ শতাংশ কম। দেশের মোট ৫০.১৮ লাখ টন মাছ উৎপাদনের ৫.১৯ শতাংশ ছিল চিংড়ি। এর মধ্যে খামার থেকে এসেছে ১ লাখ ৪৭ হাজার ৮২৪ টন, অন্যান্য অভ্যন্তরীণ জলাশয় থেকে ৮৬ হাজার ৩৯৩ টন এবং সাগর থেকে ২৬ হাজার ২৬৯ টন; সাগর থেকে আহরণ ২০২২-২৩ সালের চেয়ে ৪৩.৮৩ শতাংশ কম ছিল।
সব উৎস মিলিয়ে ইয়ারবুকে ২০২৩-২৪ সালে বাগদা ৭৭ হাজার ৬২৪ টন, গলদা ৬৭ হাজার ৭১৬ টন, হরিণা ১২ হাজার ৪৮২ টন এবং চাকা ৫ হাজার ৪২২ টন উৎপাদনের হিসাব আছে; বাকিটা অন্যান্য প্রজাতির। শুধু খামারের হিসাবে বাগদা চাষ হয়েছে ১ লাখ ৯০ হাজার ৭৫.৪৩ হেক্টরে, উৎপাদন ৭৫ হাজার ৯৯০ টন, হেক্টরপ্রতি ৪০০ কেজি; আর গলদা চাষ হয়েছে ৭২ হাজার ১৪১.৭২ হেক্টরে, উৎপাদন ৫৭ হাজার ৫৮৩ টন, হেক্টরপ্রতি ৭৯৮ কেজি।
চিংড়ি চাষ মূলত দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল ও কক্সবাজার উপকূলে কেন্দ্রীভূত। ইয়ারবুকের ২০২৩-২৪ সালের জেলাভিত্তিক সারণি অনুযায়ী সাতক্ষীরায় ৫৮ হাজার ২৯৪ হেক্টর বাগদা খামারে উৎপাদন হয়েছে ২৬ হাজার ৪৮৫ টন, বাগেরহাটে ৫২ হাজার ৫৫১ হেক্টরে ২০ হাজার ৯৪০.৩০ টন, কক্সবাজারে ৪২ হাজার ১২৫ হেক্টরে ১৪ হাজার ৩৯৮.৮০ টন এবং খুলনায় ৩২ হাজার ৯৯৮.৩৩ হেক্টরে ১২ হাজার ৬৭৫.৪৫ টন। গলদায় শীর্ষে বাগেরহাট, ১৯ হাজার ৭৭৩.৩০ হেক্টরে ১৯ হাজার ৭১৬.৭৪ টন; এরপর খুলনা, ১৯ হাজার ১৬.৪৪ হেক্টরে ১৩ হাজার ৪১৫.২০ টন; যশোর, ১৬ হাজার ৬৩৪.১৬ হেক্টরে ৯ হাজার ৮৪৭.৮০ টন; এবং সাতক্ষীরা, ৯ হাজার ৩৮৯ হেক্টরে ৯ হাজার ১৮৫ টন। পুরো খুলনা বিভাগের খামারে বাগদা উৎপাদন হয়েছে ৬০ হাজার ৫৬৫.৭৫ টন এবং গলদা ৫৪ হাজার ২১৫.২৯ টন।
বাংলাপিডিয়া এই চাষের ধরন বর্ণনা করেছে। বাগদা চাষ হয় উপকূলীয় ও জোয়ার-ভাটার জমিতে ঘের ও পুকুরে; খুলনা এলাকায় কখনো ধানের সঙ্গে পালা করে, চকরিয়ায় লবণের সঙ্গে। গলদা চাষ হয় পুকুর ও ধানখেতে, কম ঘনত্বে, পাঁচ থেকে আট মাসের দীর্ঘ চক্রে, প্রায়ই অন্য মাছের সঙ্গে। হ্যাচারিতে ডিম ফোটাতে দুই প্রজাতিরই লোনা পানি লাগে। জ্ঞানকোষটি খামারে গণহারে চিংড়ি মারা যাওয়ার কারণ হিসেবে হোয়াইট স্পট সিনড্রোম ভাইরাস ও ভিব্রিওসিসসহ কয়েকটি রোগের নাম দিয়েছে।
চিংড়ি দেশের প্রধান রপ্তানি পণ্যগুলোরও একটি। ইয়ারবুকে রপ্তানি হওয়া প্রজাতির মধ্যে গলদা, বাগদা ও হরিণার নাম আছে। এতে বলা হয়েছে, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৭৭ হাজার ৪০৭.৯৪ টন মাছ ও মৎস্যপণ্য রপ্তানি করে দেশ আয় করেছে ৪ হাজার ৫৩১.৮৬ কোটি টাকা; ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, রাশিয়া ও চীনসহ ৫০টির বেশি দেশে এসব পণ্য যায়, যার প্রধান ক্রেতা ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলো। ইয়ারবুকে আরও বলা হয়েছে, দেশের বাগদা চিংড়ি 'বাংলাদেশ টাইগার শ্রিম্প' নামে ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) নিবন্ধন পেয়েছে।

কেওড়া জল ও গোলাপ জল
রেসিপির শেষ ধাপে কেওড়া জল ও কয়েক ফোঁটা গোলাপ জলে পোলাওয়ে সুগন্ধ দেওয়া হয়। কেওড়া তৈরি হয় সুগন্ধি কেয়া গাছের (Pandanus odorifer) পুরুষ ফুল পাতন করে; গাছটি গ্রীষ্মমণ্ডলীয় এশিয়া, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও অস্ট্রালেশিয়ার স্থানীয় উদ্ভিদ। এর ফুলের ঘ্রাণ মিষ্টি ও সুরভিত, অনেকটা গোলাপের মতো তবে আরও ফলের মতো। বিশ্বকোষের বর্ণনায় দক্ষিণ এশিয়ায়, বিশেষ করে মুসলিম সমাজের বিশেষ উপলক্ষের খাবারে এর ব্যবহারের কথা আছে। রান্নার জন্য যে কেওড়া জল বিক্রি হয়, তা পাতিত নির্যাসের পাতলা জলীয় রূপ। বাংলাদেশে সেন্ট মার্টিন দ্বীপে এই কেয়া গাছ প্রচুর জন্মায়, যদিও পর্যটন-স্থাপনার কারণে অনেক গাছ নষ্ট হয়েছে।
গোলাপ জল তৈরি হয় গোলাপের পাপড়ি পানিতে ভিজিয়ে; সাধারণত গোলাপের তেল তৈরির জন্য পাপড়ি পাতনের উপজাত হিসেবে এটি পাওয়া যায়। এর উৎপত্তি সম্ভবত পারস্যে, যেখানে একে বলা হয় 'গোলাব', অর্থাৎ গোলাপ আর পানি, আর ইরান এখনো এর বড় উৎপাদক। দক্ষিণ এশিয়ার রান্নায় মিষ্টান্ন, দুধ ও পায়েস জাতীয় খাবারে এর ব্যবহার বেশি। দুটি জলেরই ঘ্রাণ কড়া; সে কারণেই জাগো নিউজের রেসিপিতে গোলাপ জল মাপা হয়েছে ফোঁটায়, আর কেওড়া জল দেওয়া হয়েছে একেবারে শেষে, চাল প্রায় সেদ্ধ হয়ে এলে।
চিংড়ি কেনা, রাখা ও রান্নায় নিরাপত্তা
যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসন (এফডিএ) ২০২৪ সালের মার্চ পর্যন্ত হালনাগাদ নির্দেশনায় বলেছে, মাছ কিনতে হবে কেবল ফ্রিজে রাখা বা তাজা বরফের পুরু স্তরের ওপর সাজানো অবস্থায়। মাছের গন্ধ হবে তাজা ও মৃদু; আঁশটে, টক বা অ্যামোনিয়ার মতো গন্ধ থাকবে না। চিংড়ির মাংস হবে স্বচ্ছ, মুক্তার মতো রঙের, আর গন্ধ থাকবে সামান্য বা একেবারেই না।
এফডিএর পরামর্শ, কেনার দুই দিনের মধ্যে খাওয়া হলে সামুদ্রিক খাবার পরিষ্কার ফ্রিজে ৪০ ডিগ্রি ফারেনহাইট বা তার কম তাপমাত্রায় রাখতে হবে; তা না হলে ভালো করে মুড়ে ফ্রিজারে রাখতে হবে। হিমায়িত সামুদ্রিক খাবার সবচেয়ে ভালোভাবে গলে রাতভর ফ্রিজে রেখে; তাড়াতাড়ি গলাতে চাইলে বন্ধ প্লাস্টিকের ব্যাগে ভরে ঠান্ডা পানিতে ডুবিয়ে রাখা যায়। কাঁচা খাবার ধরার পর সাবান ও কুসুম গরম পানিতে অন্তত ২০ সেকেন্ড হাত ধুতে হবে, আর কাটার বোর্ড, থালা, রান্নার সরঞ্জাম ও রান্নাঘরের তাক সাবান ও গরম পানিতে ধুতে হবে।
এফডিএ বলেছে, বেশির ভাগ সামুদ্রিক খাবার ভেতরের তাপমাত্রা ১৪৫ ডিগ্রি ফারেনহাইট পর্যন্ত রান্না করা উচিত। থার্মোমিটার না থাকলে চিংড়ির মাংস শক্ত, মুক্তার মতো ও অস্বচ্ছ হলে বুঝতে হবে রান্না হয়েছে। রান্না করা সামুদ্রিক খাবার ও অন্যান্য পচনশীল খাবার দুই ঘণ্টার বেশি ফ্রিজের বাইরে রাখা যাবে না; তাপমাত্রা ৯০ ডিগ্রি ফারেনহাইটের বেশি হলে এক ঘণ্টার বেশি নয়। এই রেসিপিতে চিংড়ি প্রথমে ভাজা হয়, তারপর চাল দেওয়ার আগে ৫ মিনিট মসলায় রান্না হয়; রাঁধুনিকে দেখে নিতে হবে চিংড়ি শক্ত ও অস্বচ্ছ হয়েছে কি না, আর বেঁচে যাওয়া পোলাও ওই সময়সীমার মধ্যে ফ্রিজে তুলে রাখতে হবে।
চিংড়িতে অ্যালার্জি
এফডিএ কাঁকড়া, লবস্টার ও চিংড়ির মতো খোলসযুক্ত ক্রাস্টেশিয়ান প্রাণীকে যুক্তরাষ্ট্রের নয়টি প্রধান খাদ্য-অ্যালার্জেনের একটি হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে। সংস্থাটির তালিকায় অ্যালার্জির লক্ষণের মধ্যে আছে আমবাত, ত্বক লাল হওয়া বা ফুসকুড়ি, মুখের ভেতরে ঝিনঝিন বা চুলকানি, মুখমণ্ডল, জিহ্বা বা ঠোঁট ফুলে যাওয়া, বমি বা ডায়রিয়া, পেটে মোচড়, কাশি বা শ্বাসে সাঁইসাঁই শব্দ, মাথা ঘোরা, গলা ও স্বরযন্ত্র ফুলে যাওয়া, শ্বাসকষ্ট এবং জ্ঞান হারানো। মারাত্মক প্রতিক্রিয়া বা অ্যানাফাইল্যাক্সিসে শ্বাসনালি সংকুচিত হতে পারে, রক্তচাপ ভীষণভাবে কমে শক হতে পারে, কিংবা গলা ফুলে দম বন্ধ হয়ে যেতে পারে। এফডিএর পরামর্শ, জানা খাদ্য-অ্যালার্জি থাকা কারও লক্ষণ দেখা দিলে সঙ্গে সঙ্গে খাওয়া বন্ধ করতে হবে, এপিনেফ্রিনের মতো জরুরি চিকিৎসার দরকার আছে কি না বিবেচনা করতে হবে এবং চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে।
ইংল্যান্ডের ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিস (এনএইচএস) চিংড়ি, কাঁকড়া ও লবস্টারের মতো খোলসযুক্ত প্রাণীকে সবচেয়ে বেশি অ্যালার্জি তৈরি করা খাবারের তালিকায় রেখেছে, এবং বলেছে লক্ষণ খাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বা কয়েক দিন পরেও দেখা দিতে পারে। ঠোঁট, মুখ, গলা বা জিহ্বা হঠাৎ ফুলে গেলে, খুব দ্রুত শ্বাস নিতে হলে বা শ্বাস নিতে কষ্ট হলে, গলা আঁটসাঁট লাগলে, কিংবা ত্বক, জিহ্বা বা ঠোঁট নীল, ধূসর বা ফ্যাকাশে হয়ে গেলে সঙ্গে সঙ্গে জরুরি সেবায় ফোন করতে বলেছে এনএইচএস; যাঁর কাছে অ্যাড্রেনালিন অটো-ইনজেক্টর আছে, তাঁকে সেটি তখনই ব্যবহার করে অ্যাম্বুলেন্স ডাকতে হবে। নিজের বা সন্তানের খাদ্য-অ্যালার্জি আছে বলে সন্দেহ হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। চিংড়িতে অ্যালার্জি আছে জানা থাকলে চিংড়ি পোলাও খাওয়া চলবে না, আর একই মসলায় রান্না হওয়া চালেও একই ঝুঁকি থাকে।
ছবি: Sumit Surai / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, মৎস্য অধিদপ্তর (ইয়ারবুক অব ফিশারিজ স্ট্যাটিসটিকস অব বাংলাদেশ ২০২৩-২৪), জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (চাষযোগ্য জলজ প্রজাতির তথ্যপত্র), বাংলাপিডিয়া (চিংড়ি, ধান), দ্য ডেইলি স্টার, যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসন (এফডিএ), যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিস (এনএইচএস), উইকিপিডিয়া (পিলাফ, বাসমতি, কেওড়া, কেয়া, গোলাপ জল, গলদা চিংড়ি, বাগদা চিংড়ি)





মন্তব্য
(০)