২০২৬ সালের এপ্রিলে চিংড়ি রান্নার একটি ছোট ভিডিও দিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনায় আসেন ঢালিউডের চিত্রনায়িকা পরীমনি। ১৮ এপ্রিল ২০২৬, শনিবার রাতে তিনি নিজের ফেসবুকে ভিডিওটি শেয়ার করেন। সেদিন রাতেই জাগো নিউজ ২৪ খবরটি প্রকাশ করে, আর পরদিন রোববার, ১৯ এপ্রিল যুগান্তর, দেশ রূপান্তর ও বাংলাদেশ টাইমস প্রতিবেদন প্রকাশ করে। ভিডিওটির দৈর্ঘ্য ১৬ সেকেন্ড। তাতে দেখা যায়, আধুনিক একটি রান্নাঘরে চোখে চশমা, চুল বাঁধা নায়িকার হাতে খুন্তি, কড়াইতে চিংড়ি। গান বাজতে শুরু করলেই তিনি নাচতে শুরু করেন এবং গানের তালে তালে চিংড়ি নাড়তে থাকেন।
ভিডিওর ক্যাপশনে মজা করে তিনি লেখেন, "একজন চিংড়ি প্রিয় পরী, হিহি।" প্রকাশের পরপরই ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ে। প্রতিবেদনগুলো অনুযায়ী, অনেক দর্শক মন্তব্যে জানান, রান্নার সময় তাঁরাও গান শুনে নাচেন, আর হালকা মেজাজের মুহূর্তটি দর্শকদের ভালো লেগেছে। খবর বলতে এই ভিডিওটুকুই। এতে কোনো রেসিপি, উপকরণের তালিকা বা কড়াইয়ে কোন জাতের চিংড়ি ছিল, তার কোনো উল্লেখ নেই, তাই এই প্রতিবেদনও সে বিষয়ে কোনো অনুমান করছে না। বরং এখানে আলো ফেলা হয়েছে ভিডিওর কেন্দ্রে থাকা খাবারটির ওপর: চিংড়ি, যা বাংলাদেশের রান্নাঘরের সবচেয়ে প্রিয় খাবারগুলোর একটি এবং দেশের সবচেয়ে মূল্যবান চাষের পণ্যগুলোরও একটি।
ভিডিওতে কী দেখা গেল, খবর কীভাবে এল
দেশ রূপান্তর ২০২৬ সালের ১৯ এপ্রিল বিকেল ৩টা ৪৪ মিনিটে প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানায়, নায়িকা ১৮ এপ্রিল শনিবার রাতে ফেসবুকে ভিডিওটি শেয়ার করেন এবং একটি জনপ্রিয় হিন্দি গানের তালে নেচে নেচে চিংড়ি রান্না করেন। জাগো নিউজ ২৪ "নাচতে নাচতে চিংড়ি রান্না, ভাইরাল পরীমনির ভিডিও" শিরোনামের প্রতিবেদনে রান্নাঘর, খুন্তি, কড়াইয়ের চিংড়ি আর গান শুরু হতেই নাচের বর্ণনা দেয় এবং ক্যাপশনটি পুরোপুরি উদ্ধৃত করে। যুগান্তর প্রতিবেদনের শিরোনাম করে ক্যাপশন দিয়েই, "একজন চিংড়ি প্রিয় পরী", আর বাংলাদেশ টাইমস লেখে, গানের তালে তালে চিংড়ি রান্নায় মেতেছিলেন তিনি।
কোনো প্রতিবেদনেই পদের নাম, চিংড়ির জাত বা রান্নার পদ্ধতির উল্লেখ নেই, আর ১৬ সেকেন্ডের ভিডিওতে পুরো রেসিপি দেখানোও সম্ভব নয়। মূল বিষয়গুলোতে প্রতিবেদনগুলো একমত: পোস্টের তারিখ ও মাধ্যম, ভিডিওর দৈর্ঘ্য, রান্নাঘরের দৃশ্য, কড়াইয়ের চিংড়ি, নাচ এবং ক্যাপশন। এই লেখার বাকি অংশ চিংড়ি নিয়ে পটভূমি, যা নেওয়া হয়েছে বাংলাদেশি ও আন্তর্জাতিক তথ্যভান্ডার, ২০২৬ সালের এপ্রিলের আগে প্রকাশিত সরকারি পরিসংখ্যান এবং একই সময়ের সংবাদপত্রের প্রতিবেদন থেকে।
বাঙালির রান্নাঘরে চিংড়ি
বাংলাদেশের জাতীয় বিশ্বকোষ বাংলাপিডিয়া চিংড়িকে কাঁকড়া ও লবস্টারের আত্মীয় ডেকাপোডা বর্গের ক্রাস্টেশিয়ান বা খোলসযুক্ত জলজ প্রাণী হিসেবে বর্ণনা করেছে, যা পৃথিবীর সব ধরনের জলাশয়ে পাওয়া যায়। বিশ্বকোষটি বলছে, চিংড়ি সারা বিশ্বে জনপ্রিয় খাবার, দেশে ও বিদেশে এর ভালো বাজার আছে। বাঙালির রান্নাঘরে চিংড়ি শব্দটি নদীর ছোট চিংড়ি থেকে শুরু করে বড় গলদা ও বাগদা পর্যন্ত সবকিছুকে বোঝায়, আর বিশেষ করে বড় চিংড়িকে উৎসবের খাবার হিসেবেই দেখা হয়।
উৎসবের সবচেয়ে পরিচিত চিংড়ির পদ চিংড়ির মালাইকারি, যাকে মালাই চিংড়ি বা প্রন মালাই কারিও বলা হয়। বিশ্বকোষের বর্ণনায় এটি বাগদা ও বড় চিংড়ি দিয়ে নারকেলের দুধে মসলা মিশিয়ে রাঁধা একটি বাঙালি কারি। পুরো বাংলায় পদটি জনপ্রিয়, বিয়ে ও উৎসবে বা অতিথি আপ্যায়নে পরিবেশন করা হয়, আর কলকাতায় ব্রিটিশদের মধ্যেও এটি খুব জনপ্রিয় ছিল। মালাই শব্দটি সাধারণত পদে ব্যবহৃত নারকেলের দুধের সঙ্গে যুক্ত করা হয়, যদিও এর উৎস দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে ঐতিহাসিক বাণিজ্য ও রান্নার যোগাযোগেও খোঁজা হয়।
আরেকটি বিখ্যাত পদ ডাব চিংড়ি, যা কচি ডাবের খোলের ভেতরে রান্না করে সেখানেই পরিবেশন করা হয়। এর পুরে থাকে বড় চিংড়ি, মাখন, ঘি বা সরিষার তেল, পেঁয়াজ, হলুদ, কুচি করা কাঁচা মরিচ, রসুন ও আদা বাটা, ওপরে নানা মসলা। মিশ্রণটি ফাঁপা করা কচি ডাবে ভরে মুখ বন্ধ করা হয়, প্রথাগতভাবে ময়দার খামির বা কাদা দিয়ে, তারপর ধীর আঁচে রান্না করা হয়, আর যে খোলে রান্না হয়েছে সেই খোলেই পদটি পরিবেশন করা হয়। পহেলা বৈশাখ, দুর্গাপূজা ও অন্যান্য বিশেষ উপলক্ষে প্রায়ই এটি রান্না হয়, আর কলকাতা, মুম্বাই ও বেঙ্গালুরুর রেস্তোরাঁর মেনুতেও এর বিশেষ জায়গা আছে।

চেনা রেসিপি: গলদা চিংড়ির মালাইকারি
ভিডিওতে কী রান্না হচ্ছিল তা দেখা যায়নি, তাই নিচের রেসিপিটি নায়িকার নয়। এটি বাংলাদেশের শীর্ষ ইংরেজি দৈনিক দ্য ডেইলি স্টারের খাবার পাতায় প্রকাশিত গলদা চিংড়ির মালাইকারির প্রথাগত রেসিপি। প্রথাগত রেসিপির মতোই পত্রিকাটির সংস্করণে টাটকা বানানো নারকেলের দুধ ব্যবহার করা হয়েছে। একটি পদের উপকরণ:
- গলদা চিংড়ি ৫০০ গ্রাম
- ঘন নারকেলের দুধ আধা কাপ
- পাতলা নারকেলের দুধ এক কাপ
- মরিচের গুঁড়া এক চা-চামচ
- হলুদের গুঁড়া এক চা-চামচ
- পেঁয়াজ বাটা আধা কাপ
- এলাচ দুটি
- দারুচিনি দুই টুকরা
- কাঁচা মরিচ পাঁচটি, মাঝ বরাবর চেরা
- তেল আধা কাপ
- চিনি এক চা-চামচ
- লবণ স্বাদমতো
ডেইলি স্টারের দেওয়া ক্রম অনুযায়ী রান্নার ধাপ:
- চিংড়ি পরিষ্কার করে ধুয়ে সামান্য লবণ ও হলুদের গুঁড়া মাখিয়ে সরিয়ে রাখুন।
- মরিচের গুঁড়া, হলুদের গুঁড়া ও পেঁয়াজ বাটা এক টেবিল-চামচ পানি দিয়ে মিশিয়ে মসলার পেস্ট তৈরি করুন।
- কড়াইয়ে তেল গরম করুন; ধোঁয়া উঠতে শুরু করলে এলাচ ও দারুচিনি দিন।
- মসলার পেস্ট দিয়ে কয়েক মিনিট নাড়ুন।
- পাতলা নারকেলের দুধ, লবণ ও কাঁচা মরিচ দিয়ে ফুটিয়ে পাতলা দুধ অর্ধেক হওয়া পর্যন্ত জ্বাল দিন।
- চিংড়ি ও ঘন নারকেলের দুধ দিয়ে ভালো করে নেড়ে ঢেকে পাঁচ মিনিট রান্না করুন।
- ঢাকনা খুলে চিনি দিয়ে আরও দুই মিনিট রান্না করুন।
- ঝোলের ওপর তেল ভেসে উঠলে চুলা থেকে নামিয়ে নিন।
রেসিপিটিতে দুটি পরামর্শ আছে। চিংড়ি বেশি রান্না করা যাবে না, তাহলে তা শক্ত ও রাবারের মতো হয়ে যায়; আর চিংড়ি মাথার দিক থেকে ঝোলে ডোবাতে হবে, যাতে মাথা আগে তেলে রান্না হয়। চিংড়ির নিজের রান্নার সময় যে এত কম, ঢেকে পাঁচ মিনিট আর খোলা অবস্থায় আরও দুই মিনিট, তা থেকেই বোঝা যায় তাপ পেলে চিংড়ির মাংস কত তাড়াতাড়ি জমে যায়।
গলদা ও বাগদা: বাংলাদেশের পাতের দুই চিংড়ি
বাংলাদেশের বাজারে, আর মালাইকারির হাঁড়িতেও, যে দুটি বড় চিংড়ির আধিপত্য, তা হলো গলদা ও বাগদা। গলদা হলো মিঠাপানির বড় চিংড়ি, বৈজ্ঞানিক নাম Macrobrachium rosenbergii। ইংরেজিতে একে জায়ান্ট রিভার প্রন বা মালয়েশিয়ান প্রনও বলা হয়, আর বাংলাদেশ ও ভারতে এর পরিচিত নাম গলদা চিংড়ি। ভারত থেকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও উত্তর অস্ট্রেলিয়া পর্যন্ত ইন্দো-প্রশান্ত অঞ্চলের গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ও উপক্রান্তীয় এলাকা এর আদি আবাস, আর এটি পৃথিবীর সবচেয়ে বড় মিঠাপানির চিংড়িগুলোর একটি। পুরুষ চিংড়ির মোট দৈর্ঘ্য ৩৪ সেন্টিমিটার এবং স্ত্রী চিংড়ির ২৬ সেন্টিমিটার পর্যন্ত হতে পারে। দ্বিতীয় জোড়া হাঁটার পায়ে থাকে বড় দাঁড়া, যা পুরুষ চিংড়িতে শরীরের চেয়েও লম্বা হতে পারে। বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী বাংলাদেশে এর আবাস নদী, শাখানদী, খাল ও নদীর মোহনা, আর প্রজননকাল জানুয়ারি থেকে জুলাই।
গলদা মিঠাপানির প্রাণী হলেও এর লার্ভা নির্ভর করে লোনা-মিঠা মেশানো পানির ওপর। স্ত্রী চিংড়ি নিষিক্ত ডিম ফোটা পর্যন্ত নিজের শরীরে বহন করে, সাধারণত তিন সপ্তাহের কম সময়, আর বছরে পাঁচবার পর্যন্ত ১০ হাজার থেকে ৫০ হাজার ডিম দিতে পারে। লার্ভা লোনা পানিতে কয়েকটি ধাপ পেরিয়ে ডিম ফোটার ৩২ থেকে ৩৫ দিন পর প্রায় ৭ থেকে ১০ মিলিমিটার দৈর্ঘ্যের পোস্ট-লার্ভায় রূপ নেয়, তারপর আবার মিঠাপানিতে ফিরে যায়। গলদা চিংড়ি তিন বছর পর্যন্ত বাঁচে।

বাগদা হলো জায়ান্ট টাইগার প্রন, বৈজ্ঞানিক নাম Penaeus monodon, যাকে এশিয়ান টাইগার শ্রিম্প বা ব্ল্যাক টাইগার শ্রিম্পও বলা হয়। এটি সামুদ্রিক ক্রাস্টেশিয়ান, যার খোলস ও পেটে আড়াআড়ি পালাক্রমে রঙের ডোরা থাকে। স্ত্রী বাগদা সাধারণত ২৫ থেকে ৩০ সেন্টিমিটার লম্বা ও ২০০ থেকে ৩২০ গ্রাম ওজনের হয়, পুরুষ একটু ছোট, ২০ থেকে ২৫ সেন্টিমিটার ও ১০০ থেকে ১৭০ গ্রাম। প্রকৃতিতে এর বাচ্চারা বালুময় মোহনা ও ম্যানগ্রোভে থাকে, আর বড় হলে গভীর পানিতে চলে যায়। বাংলাপিডিয়া বঙ্গোপসাগর ও মোহনায় এর উপস্থিতি এবং নভেম্বর থেকে মার্চ প্রজননকাল উল্লেখ করেছে। সারা বিশ্বে চাষের দিক থেকে এটি দ্বিতীয় সর্বাধিক চাষ হওয়া চিংড়ি, প্রথম স্থানে আছে বাণিজ্যে ভেনামি নামে পরিচিত হোয়াইটলেগ শ্রিম্প। লবণাক্ততা সহ্য করার ক্ষমতা ও দ্রুত বৃদ্ধির জন্য চাষিরা বাগদাকে মূল্য দেন, তবে এটি ছত্রাক, ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণে সহজে আক্রান্ত হয়, আর হোয়াইট স্পট ও ইয়েলোহেড রোগ বিশ্বজুড়ে চিংড়িশিল্পে বড় ক্ষতি করেছে।
বাংলাদেশের পানিতে চিংড়ি শুধু এই দুটি নয়। বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী দেশের সাগর, মোহনা ও মিঠাপানিতে মোট ৫৬ প্রজাতির চিংড়ি পাওয়া গেছে, যার ৩৭টি লোনাপানির বা সামুদ্রিক, ১২টি লোনা-মিঠা মেশানো পানির এবং ৭টি মিঠাপানির; এগুলো ছয়টি গোত্রে বিভক্ত। মিঠাপানির প্রজাতিগুলো পেলিমোনিডি (Palaemonidae) গোত্রের। বাণিজ্যিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ প্রজাতির তালিকায় আছে সারা বছর প্রজনন করা Macrobrachium malcolmsonii, ভারতীয় সাদা চিংড়ি Penaeus indicus এবং খুলনা ও পটুয়াখালীর নদীর মোহনায় পাওয়া ব্যানানা প্রন Penaeus merguiensis।

বাংলাদেশে চিংড়ি চাষ যেভাবে হয়
বাংলাপিডিয়ার চিংড়ি চাষ অংশে বলা হয়েছে, বিশ্বে ও বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি চাষ হওয়া দুটি প্রজাতি হলো বাগদা ও গলদা। চাষের পদ্ধতি প্রথাগত ও সম্প্রসারিত থেকে শুরু করে আধা-নিবিড়, নিবিড় ও অতি-নিবিড় পর্যন্ত, যা ভাগ করা হয় মূলত পোনা বা পোস্ট-লার্ভা কতটা ঘন করে ছাড়া হয় এবং পুকুর কীভাবে ব্যবস্থাপনা করা হয় তার ভিত্তিতে। এককভাবে চাষ, মিশ্র চাষ, ধানের সঙ্গে পালাক্রমে বা একই সময়ে সমন্বিত চাষ এবং বাটা, কার্প ও তেলাপিয়ার মতো মাছের সঙ্গে চাষ, সবই প্রচলিত। বাগদা চাষ শুরু হয় লোনাপানিতে, গলদা চাষ মূলত মিঠাপানিতে, তবে দুটিরই হ্যাচারিতে ডিম ফোটাতে লোনাপানি লাগে।
বিশ্বকোষটি বলছে, বাংলাদেশের পরিবেশ ও আর্থসামাজিক অবস্থায় সম্প্রসারিত ও উন্নত সম্প্রসারিত পদ্ধতিই সফল হয়েছে। ১৯৯৩ থেকে ১৯৯৫ সালে কক্সবাজার এলাকায় আধা-নিবিড় চাষের চেষ্টা দুর্বল ব্যবস্থাপনা এবং ব্যাকটেরিয়া ও ভাইরাসজনিত রোগের প্রাদুর্ভাবে ব্যর্থ হয়। উন্নত সম্প্রসারিত পদ্ধতির পঞ্জিকা এ রকম: ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারিতে ঘের, অর্থাৎ বাঁধ দিয়ে ঘেরা পুকুর বা জমি প্রস্তুত করা; ফেব্রুয়ারি ও মার্চে প্রাকৃতিক ও হ্যাচারির পোনা ছাড়া; প্রয়োজনমতো পানি বদল, চুন ও সার প্রয়োগ; আর জুন থেকে নভেম্বর পর্যন্ত চিংড়ি আহরণ ও নতুন পোনা ছাড়া। গলদা চাষ কম ঘনত্বের ও দীর্ঘমেয়াদি, এক চক্রে পাঁচ থেকে আট মাস, পুকুরে ও ধানক্ষেতে এককভাবে, মাছের সঙ্গে বা ধানের সঙ্গে মিলিয়ে করা হয়।
শতাব্দীর সন্ধিক্ষণের সময়ের খাতের বর্ণনা দেওয়া ওই ভুক্তিতে বলা হয়েছে, সাতক্ষীরা, খুলনা, বাগেরহাট ও কক্সবাজারের (চকরিয়া ও টেকনাফসহ) উপকূলীয় ও জোয়ারভাটার প্রায় ১ লাখ ৪৫ হাজার হেক্টর জমিতে বাগদা চাষ হতো, আর গলদা চাষ হতো প্রায় ৩০ হাজার হেক্টরে প্রায় ৬০ হাজার পুকুর ও ধানক্ষেতে, প্রধানত বাগেরহাট, খুলনা, যশোর, পটুয়াখালী, বরিশাল, চট্টগ্রাম, লক্ষ্মীপুর, ফেনী, গোপালগঞ্জ, মাদারীপুর, ফরিদপুর, কিশোরগঞ্জ, রাজবাড়ী ও ঢাকায়। ১৯৯৯ সালে চাষের বাগদা ও গলদার উৎপাদন ছিল ৬৩ হাজার ১৬৪ টন (মাথাসহ)। কক্সবাজার ও টেকনাফ এলাকার প্রায় ৪৮টি বাগদা হ্যাচারি বছরে প্রায় ৪০০ কোটি পোনা উৎপাদন করত। আশি ও নব্বইয়ের দশকে পোনার প্রধান উৎস ছিল উপকূলীয় ও জোয়ারভাটার পানি থেকে ধরা প্রাকৃতিক পোনা। এ পেশায় যুক্ত ছিলেন প্রায় ৪ লাখ ৪০ হাজার মানুষ, যাঁদের বেশির ভাগ নারী, শিশু ও ভূমিহীন। লোনাপানির চিংড়ি পুকুরের আয়তন ১৯৮০ সালে ২০ হাজার হেক্টরের কম থেকে বেড়ে ১৯৮৫ সালে প্রায় ৭০ হাজার এবং ১৯৮৯ সালে ১ লাখ ১৫ হাজার হেক্টরে দাঁড়ায়।
একই ভুক্তিতে এর মূল্যের কথাও স্পষ্ট করে বলা আছে। যেসব রোগে চিংড়ি গণহারে মারা যায়, তার মধ্যে আছে হোয়াইট স্পট সিনড্রোম ভাইরাস, ভিব্রিওসিস, নরম খোলস, কালো ফুলকা ও পেশির পচন, আর অনেক প্রাদুর্ভাবের জন্য পুকুরের তলা ও পানির মানের দুর্বল ব্যবস্থাপনাকে দায়ী করা হয়েছে। হ্যাচারিতে মা চিংড়ি ও পোনা পরীক্ষা ভাইরাস সংক্রমণ ঠেকাতে কার্যকর হয়েছে, আর ধান ও মাছের সঙ্গে সমন্বিত মিশ্র চাষ বেশি টেকসই পদ্ধতি হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে। দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে প্রায় ১৮ হাজার ২০০ হেক্টরের চকরিয়া সুন্দরবন ম্যানগ্রোভ বনের অর্ধেকের বেশি চিংড়ি পুকুরের জন্য কেটে ফেলা হয়, আর দক্ষিণ-পশ্চিমে লোনাপানির ঘের বিস্তারে সাতক্ষীরার মতো এলাকায় ধানচাষ ও স্থানীয় প্রথাগত ধানের জাত হারিয়ে যেতে থাকে।

২০২৬ সালের এপ্রিলের আগে চিংড়ি খাতের পরিসংখ্যান
চিংড়ি উৎপাদন নিয়ে সরকারি ও শিল্পখাতের হিসাবে দীর্ঘদিন ধরে ফারাক রয়েছে। ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড জানায়, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের বার্ষিক প্রতিবেদনে ২০২২-২৩ অর্থবছরে মোট মাছ উৎপাদন দেখানো হয়েছে ৪৯ দশমিক ১৫ লাখ টন, আগের বছর যা ছিল ৪৭ দশমিক ৫৯ লাখ টন, আর মোট চিংড়ি উৎপাদন ২ দশমিক ৬১ লাখ টন। "কমার্শিয়াল ভেনামি ফার্মিং ইন বাংলাদেশ" শিরোনামের মন্ত্রণালয়ের একটি নথিতে বাগদা উৎপাদন দেখানো হয় ৭২ হাজার ৮০৯ টন। শিল্পখাতের অংশীজনেরা বড় অঙ্কগুলো নিয়ে প্রশ্ন তোলেন; বাংলাদেশ ফ্রোজেন ফুডস এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএফএফইএ) একজন সদস্য পত্রিকাটিকে বলেন, দেশের চিংড়ি উৎপাদন ১ লাখ টনের বেশি নয়, আর চাষি ও রপ্তানিকারকদের হিসাবে গলদার উৎপাদন বাগদার এক-তৃতীয়াংশের বেশি নয়।
রপ্তানির হিসাবে দেখা যায় পতন ও আংশিক ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প। ২০২৫ সালের নভেম্বরে সংবাদ সংস্থা ইউএনবির প্রতিবেদন, যা দ্য ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসও প্রকাশ করে, জানায়, রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে চিংড়ি রপ্তানি থেকে আয় হয়েছিল ৫২ কোটি ৯০ লাখ ডলার, এরপর তা তীব্রভাবে কমে; ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১৯ শতাংশ বাড়লেও তা আগের তুলনায় অনেক কম, ৩০ কোটি ডলারের নিচে। বিএফএফইএর সহসভাপতি এস কে কামরুল আলম বলেন, ভারত ১ লাখ ২ হাজার হেক্টরে চিংড়ি চাষ করে ১০ লাখ টনের বেশি উৎপাদন করে, আর বাংলাদেশ আড়াই লাখ হেক্টরের বেশি জমিতে চাষ করে বাগদা উৎপাদন করে প্রায় ১ লাখ টন। তাঁর হিসাবে বাগদার হেক্টরপ্রতি ফলন প্রায় ৫০০ কেজি, ভেনামির ১২ থেকে ১৫ টন, আর বিশ্বের চিংড়ি রপ্তানির ৮০ শতাংশই ভেনামি। বিএফএফইএর জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি তারিকুল ইসলাম জহির বলেন, ২০২৪-২৫ সালের বৃদ্ধি মূলত ডলারে দাম বাড়ার ফল, পরিমাণ বাড়ার নয়, আর একসময় চিংড়ি রপ্তানিতে থাকা প্রায় ১০০টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৭০টি কাঁচামালের অভাবে বন্ধ হয়ে গেছে।
একই প্রতিবেদনে বাংলাদেশে ভেনামির আগমনের বিবরণও আছে: ২০২১ সালে খুলনার পাইকগাছার গবেষণাকেন্দ্রে পরীক্ষামূলক চাষ শুরু হয়; ২০২২ সালে আটটি প্রতিষ্ঠান পরীক্ষামূলক অনুমতি পায় এবং পরে আরও চারটি অনুমোদন পায়; আর ২০২৫ সালের নভেম্বরে প্রতিবেদনটির ভাষায়, বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু হয়েছিল আগের বছর। শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশিং অ্যান্ড পোস্ট-হারভেস্ট টেকনোলজি বিভাগের অধ্যাপক আসিফ ওয়ারেস নেওয়াজ বেলজিয়ামের মতো বাজার হারানোর পেছনে আন্তর্জাতিক মানের নিচে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার, বাগদায় হোয়াইট স্পট রোগ ও ওষুধের অনুপযুক্ত ব্যবহারের কথা বলেন এবং জানান, বেশির ভাগ চাষি তদারকির বাইরে রয়ে গেছেন।
চিংড়ি বাণিজ্যের কেন্দ্র খুলনা। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে ইউএনবি মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য উদ্ধৃত করে জানায়, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে খুলনা অঞ্চলে চিংড়ি উৎপাদন হয়েছে ১ লাখ ২৩ হাজার ১৫১ টন, রপ্তানি হয়েছে ১৯ হাজার ৫১২ টন, আয় ২ হাজার ৪৯৯ কোটি টাকা; আর ২০২০ থেকে ২০২৫ অর্থবছরের মধ্যে অঞ্চলটি থেকে ১ লাখ ২ হাজার ৩৩৯ টন চিংড়ি রপ্তানি হয়েছে, যার মূল্য ১১ হাজার ৩০১ কোটি টাকা। প্রতিবেদন অনুযায়ী, অঞ্চলটিতে একসময় ৬৩টি চিংড়ি প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা ছিল, যার ৩৩টি বন্ধ হয়ে গেছে। বিভাগীয় মৎস্য পরিদর্শন ও মান নিয়ন্ত্রণ কর্মকর্তা লিপটন সরদার চিংড়ির জন্য আলাদা নীতিকাঠামো, চাষ এলাকার জোনিং এবং চিংড়ির রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসার সক্ষমতা গড়ে তোলার ওপর জোর দেন। সাগরের চিত্রও ছিল কঠিন: ২০২৫ সালের নভেম্বরে বঙ্গোপসাগরের মৎস্য নিয়ে এক প্রতিবেদনে প্রথম আলো মৎস্য অধিদপ্তরের বরাতে জানায়, ২০২৩-২৪ সালে আগের বছরের তুলনায় চিংড়ি উৎপাদন প্রায় ৪৪ শতাংশ কমেছে, আর একটি প্রকল্পের কর্মকর্তা জানান, চিংড়ি ট্রলারের লাইসেন্স ২০২৮ সাল পর্যন্ত নবায়ন করা হবে না।
চিংড়ি কেনা, রাখা ও নিরাপদে রান্না
ঘরের রাঁধুনিদের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসনের (এফডিএ) সামুদ্রিক খাবার বিষয়ক নির্দেশনায় কিছু সহজ পরীক্ষার কথা আছে। কেনার সময় চিংড়ির মাংস হবে স্বচ্ছ, মুক্তার মতো রঙের, আর গন্ধ থাকবে খুব কম বা একেবারেই না। দুই দিনের মধ্যে রান্না করলে পরিষ্কার ফ্রিজে ৪০ ডিগ্রি ফারেনহাইট বা তার কম তাপমাত্রায় রাখতে হবে; না হলে প্লাস্টিক, ফয়েল বা আর্দ্রতারোধী কাগজে শক্ত করে মুড়ে ডিপ ফ্রিজে রাখতে হবে। জমাট চিংড়ি গলাতে হবে ধীরে, সারা রাত ফ্রিজের সাধারণ অংশে রেখে। কাঁচা সামুদ্রিক খাবারের ব্যাকটেরিয়া যাতে না ছড়ায়, সে জন্য কাঁচা ও রান্না করা খাবারের মাঝে কাটার বোর্ড, থালা, বাসন ও রান্নাঘরের তাক সাবান ও গরম পানি দিয়ে ধুতে হবে।
রান্নার বিষয়ে এফডিএ বলছে, বেশির ভাগ সামুদ্রিক খাবার ভেতরের তাপমাত্রা ১৪৫ ডিগ্রি ফারেনহাইট পর্যন্ত রান্না করা উচিত, আর চিংড়ি ও লবস্টার রান্না হয়েছে বোঝা যায় যখন মাংস শক্ত, মুক্তার মতো উজ্জ্বল ও অস্বচ্ছ হয়ে ওঠে। ডেইলি স্টারের রেসিপির বেশি রান্না না করার সতর্কতার সঙ্গে এটি মিলে যায়: চিংড়ি কয়েক মিনিটেই সেদ্ধ হয়ে যায়, বেশি রাঁধলে কেবল শক্তই হয়।
চিংড়ি চর্বি কম এমন প্রোটিনের উৎসও। যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগের (ইউএসডিএ) ফুডডেটা সেন্ট্রালের তথ্য অনুযায়ী, ১০০ গ্রাম রান্না করা চিংড়িতে থাকে ৯৯ কিলোক্যালরি, ২৪ গ্রাম প্রোটিন, শূন্য দশমিক ২৮ গ্রাম চর্বি, ১৮৯ মিলিগ্রাম কোলেস্টেরল, ১১১ মিলিগ্রাম সোডিয়াম ও ১ দশমিক ৬৪ মিলিগ্রাম জিংক। মালাইকারির মতো ঘন পদে এর সঙ্গে যোগ হয় নারকেলের দুধ ও তেলের চর্বি ও শক্তি।
যেসব খাবারে সবচেয়ে বেশি অ্যালার্জি হয়, খোলসযুক্ত প্রাণী তার মধ্যে অন্যতম। যুক্তরাজ্যের জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা (এনএইচএস) চিংড়ি, কাঁকড়া ও লবস্টারের মতো খোলসযুক্ত প্রাণীকে সবচেয়ে সাধারণ অ্যালার্জি সৃষ্টিকারী খাবারের তালিকায় রেখেছে; উপসর্গের মধ্যে থাকতে পারে চুলকানিযুক্ত ফুসকুড়ি বা আমবাত, ঠোঁট, মুখ ও চোখ ফুলে যাওয়া, কাশি, শ্বাসে সাঁই সাঁই শব্দ বা শ্বাসকষ্ট, পেটব্যথা, বমি ও ডায়রিয়া। গলা আঁটসাঁট লাগা বা শ্বাস নিতে কিংবা গিলতে কষ্ট হওয়ার মতো তীব্র প্রতিক্রিয়া জরুরি অবস্থা, তখন সঙ্গে সঙ্গে চিকিৎসা নিতে হবে। যাঁদের চিংড়িতে অ্যালার্জির সন্দেহ আছে, কিংবা যাঁদের কোলেস্টেরল বা লবণ কম খেতে বলা হয়েছে, তাঁরা নিয়মিত চিংড়ি খাওয়ার আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
ছবি: Rupak76 / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, যুগান্তর, দেশ রূপান্তর, বাংলাদেশ টাইমস, বাংলাপিডিয়া (বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি), দ্য ডেইলি স্টার, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, ইউএনবি ও দ্য ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস, প্রথম আলো, উইকিপিডিয়া, যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসন (এফডিএ), ইউএসডিএ ফুডডেটা সেন্ট্রাল, এনএইচএস





মন্তব্য
(০)