২০২৬ সালের জুনের মাঝামাঝি, জ্যৈষ্ঠের তীব্র খরতাপের মধ্যে যশোরের শার্শা ও বেনাপোল অঞ্চলে কচি তালের শাঁসের চাহিদা বাড়ছিল বলে ১৫ জুন ২০২৬ তারিখে জাগো নিউজ২৪ প্রতিবেদন প্রকাশ করে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, অসহ্য গরমে একটুখানি প্রশান্তি আর শরীরের পানিশূন্যতা দূর করতে মানুষ নরম, রসালো এই শাঁস কিনছিলেন। ওই মৌসুমে ফলন কম হওয়ায় দাম কিছুটা চড়া ছিল, তবু ক্রেতারা এ ফলের স্বাদ নিতে কার্পণ্য করছিলেন না। প্রতিবেদনে বলা হয়, একদিকে এই ফল সাধারণ মানুষের তৃষ্ণা মেটাচ্ছিল, অন্যদিকে মৌসুমি এ ব্যবসাকে কেন্দ্র করে জীবিকা নির্বাহ করছিলেন স্থানীয় প্রায় শতাধিক পরিবার।
প্রতিবেদনটি এই ব্যবসাকে ওই পরিবারগুলোর ভাগ্যবদল হিসেবে তুলে ধরে। সে বর্ণনার পেছনের হিসাবগুলো এসেছে প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা বলা বিক্রেতা ও উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার কাছ থেকে; নিচে সেগুলো প্রতিবেদনে যেমন এসেছে, তেমনই দেওয়া হলো।
কোথায় বিক্রি হচ্ছিল তালশাঁস, দাম কত
প্রতিবেদন অনুযায়ী, শার্শা-বেনাপোলের ১১টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভার বিভিন্ন হাট-বাজারের মোড়ে বিক্রেতারা তালশাঁস বিক্রি করছিলেন। এ ছাড়া ভ্যানে করে ঘুরে ঘুরে তালশাঁস বিক্রি করা ভ্রাম্যমাণ বিক্রেতার সংখ্যাও কম ছিল না। তখন প্রতিটি তালশাঁস বিক্রি হচ্ছিল ৫ থেকে ৭ টাকায়।
মৌসুমি ব্যবসায়ী আব্দুস সাত্তার প্রতিবেদককে তাঁর খরচ ও আয়ের হিসাব দেন: '৩টি গাছের তাল ৪ হাজার টাকায় কিনেছি। গাছ থেকে তাল নামাতে ২ জন শ্রমিককে দিয়েছি ১ হাজার টাকা আর ভাড়া লেগেছে ২০০ টাকা। বেনাপোল বাজারে সড়কের পাশে প্রতিটি তাল বিক্রি হয় ১৫ থেকে ২৫ টাকা। এক থেকে দেড় মাস পর্যন্ত তালশাঁস বিক্রি করে আয় হয় প্রায় ২০-৩০ হাজার টাকা।'
নাভারন ও বাগআঁচড়ার ব্যবসায়ী সালাউদ্দিন ও আশিকুর প্রতিবেদককে জানান, ওই মৌসুমে তালের ফলন কম হওয়ায় তালশাঁসের সংকট ছিল, ফলে চড়া দামে বিক্রি করতে হচ্ছিল। তাঁদের হিসাবে দাম ছিল প্রতিটি ১৫ থেকে ২৫ টাকা, আর এ ব্যবসা থেকে তাঁরা দিনে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা আয় করছিলেন।
দুই রকম দামের কারণ তাল বিক্রির ধরনে। তালের ফল মাংসল ও আঁশযুক্ত, ভেতরে এক থেকে তিনটি বীজ থাকে; কচি অবস্থায় প্রতিটি বীজের ভেতরে থাকে আধা-শক্ত সাদা শাঁস, যা পানির মতো মিষ্টি রসে ভরা। তাই বিক্রেতারা একটি শাঁসের এক দাম আর গোটা একটি তালের আরেক দাম বলেন। রাজশাহী থেকে রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা বাসস ২০২৬ সালের ২৩ মে একই চিত্রের কথা জানিয়েছিল: আকারভেদে ৩ থেকে ৪টি শাঁসওয়ালা প্রতিটি কচি তাল বিক্রি হচ্ছিল ১৫ থেকে ২৫ টাকায়, আর অনেক জায়গায় প্রতি পিস শাঁস খুচরা বিক্রি হচ্ছিল ৫ থেকে ৮ টাকায়।
আব্দুস সাত্তারের হিসাবেই বোঝা যায় ব্যবসাটি কীভাবে চলে: ব্যবসায়ী গাছে থাকা অবস্থাতেই মৌসুমের তাল কিনে নেন, শ্রমিক দিয়ে তা নামান, তারপর কয়েক সপ্তাহ ধরে বাজারে বিক্রি করেন। নাটোর থেকে বাসস ৯ জুন ২০২৬ জানায়, এক দশকের বেশি সময় ধরে তালশাঁসের মৌসুমি ব্যবসা করা এক ব্যবসায়ী ওই মৌসুমে ৬০০ থেকে ৮০০ টাকা দরে ১৭টি গাছ কিনেছিলেন এবং প্রতিটি শাঁস বিক্রি করছিলেন ৫ টাকায়। রাজশাহীর প্রতিবেদনে বাসস জানিয়েছিল, ব্যবসায়ীরা খুব ভোরে গোদাগাড়ী, বাঘা, চারঘাট, তানোর ও পবা উপজেলার বিভিন্ন গ্রাম থেকে গাছচুক্তিতে কচি তাল সংগ্রহ করে মহানগরে নিয়ে আসেন।
ফলন কম, কমছে তালগাছও
শার্শা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা দীপক কুমার সাহা প্রতিবেদককে সংকটের কারণ ব্যাখ্যা করেন: 'চলতি মৌসুমে তালের ফলন কম হওয়ায় বিক্রেতাদের আনা তালশাঁস মুহূর্তের মধ্যেই শেষ হয়ে যাচ্ছে। গ্রীষ্মকালে তালপাতা পাখার বাতাস গ্রামের মানুষের শরীরে যেমন হিমেল পরশ দেয়। তেমনি ঝড়-বৃষ্টি থেকে বাড়িঘর ও প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষা করে। তাল গাছের অভাবে এখন আর চোখে পড়েনা বাবুই পাখির বাসা। পরিচর্যা ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে এ অঞ্চলে তালগাছ এখন বিলুপ্ত প্রায়। ফলে, ঐতিহ্যবাহী তালের রস, তালের গুড় ও তালের পাটালি এখন অনেকটাই বিলুপ্তির পথে।'
তালগাছ কমে যাওয়ার এই কথা সে মাসে অন্য জেলার কৃষি কর্মকর্তারাও বলছিলেন। ভোলা থেকে দেশ রূপান্তর ৯ জুন ২০২৬ জানায়, শহরে একটি কচি তাল (পানি তাল) বিক্রি হচ্ছিল ৩০ টাকায়। ভোলা সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মো. কামরুল হাসান পত্রিকাটিকে বলেন, একসময় বসতবাড়ির আশপাশে ও রাস্তার দুই পাশে প্রচুর তালগাছ ছিল; কিন্তু অবকাঠামোগত ও কৃষি উন্নয়নের কারণে দিনে দিনে গাছের সংখ্যা কমছে, তাতে কচি তালের উৎপাদনও কমছে। তাঁর দপ্তর কৃষি পুনর্বাসন কর্মসূচির আওতায় প্রতি অর্থবছর দুই থেকে তিনশ তালগাছের চারা রোপণ করে, যাতে গাছের সংখ্যা বাড়ে এবং মানুষ নিজে থেকেও রোপণে উৎসাহিত হয়।
বাগেরহাটের ফকিরহাট উপজেলা থেকে যুগান্তর ৭ জুন ২০২৬ জানায়, উপজেলা কৃষি অফিস গত ১২ বছরে প্রায় ১ হাজার ৫০০টি তালের চারা রোপণ করেছে, আর আগের বছর কৃষকদের প্রণোদনা ও উদ্বুদ্ধকরণের মাধ্যমে আরও প্রায় ২০০টি চারা রোপণ করা হয়েছে। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ সেখ সাখাওয়াত হোসেন তালকে পরিবেশবান্ধব ও জলবায়ু সহনশীল বৃক্ষ বলেন, যা ঝড়-জলোচ্ছ্বাসপ্রবণ উপকূলীয় অঞ্চলে প্রাকৃতিক সুরক্ষাবলয় হিসেবেও কাজ করে; এ কারণেই, তাঁর ভাষায়, তাঁরা তালগাছ সংরক্ষণ ও নতুন করে রোপণে গুরুত্ব দিচ্ছিলেন।
জুনের তাপপ্রবাহে যশোর
প্রতিবেদনের 'জ্যৈষ্ঠের তীব্র খরতাপ' যশোরে তার আগের দিনগুলোতে মাপা হয়েছিল। ঢাকা ট্রিবিউন বাংলা জানায়, বৃহস্পতিবার ৪ জুন ২০২৬ যশোরে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড হয় ৩৮.৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যা ছিল সেদিন দেশের সর্বোচ্চ। আগের দিন বুধবার ৩ জুন জেলায় সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ৩৮.২ ডিগ্রি। তথ্যটি নিশ্চিত করে যশোরের বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমান বিমান ঘাঁটির নিয়ন্ত্রণাধীন আবহাওয়া অফিস। পত্রিকাটি জানায়, প্রায় দুই সপ্তাহের মৃদু তাপপ্রবাহের পর জেলায় তখন মাঝারি তাপপ্রবাহ শুরু হয়েছিল।
৯ জুনের মধ্যে অন্যত্র গরম কিছুটা কমলেও যশোরে কমেনি। বাংলা ট্রিবিউন আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাস উদ্ধৃত করে জানায়, সেদিন সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় দেশের একমাত্র জেলা হিসেবে যশোরের ওপর দিয়ে মৃদু তাপপ্রবাহ বইছিল, সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ৩৭.২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। অধিদপ্তরের হিসাবে ৩৬ থেকে ৩৭.৯ ডিগ্রি মৃদু, ৩৮ থেকে ৩৯.৯ ডিগ্রি মাঝারি, ৪০ থেকে ৪১.৯ ডিগ্রি তীব্র এবং ৪২ ডিগ্রির বেশি অতি তীব্র তাপপ্রবাহ। একই পূর্বাভাসে বলা হয়, দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ু তখন বরিশাল, চট্টগ্রাম, সিলেট, ময়মনসিংহ ও রংপুর বিভাগ পর্যন্ত অগ্রসর হয়েছিল এবং দুই-তিন দিনের মধ্যে দেশের বাকি অংশে বিস্তারের অনুকূল পরিবেশ ছিল।
গরমের প্রভাব পড়ছিল যশোরের হাসপাতালেও। ঢাকা ট্রিবিউন বাংলা জানায়, যশোর জেনারেল হাসপাতালসহ জেলার বিভিন্ন হাসপাতাল, ক্লিনিক ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গরমজনিত অসুস্থ রোগীর সংখ্যা বাড়ছিল। জেলা ডেপুটি সিভিল সার্জন ডা. নাজমুস সাদিক রাসেল পত্রিকাটিকে বলেন, তাপমাত্রার সঙ্গে বাতাসে আর্দ্রতা বেশি থাকায় মানুষ বেশি অস্বস্তি বোধ করছেন; অতিরিক্ত ঘামে শরীর থেকে পানি ও ইলেকট্রোলাইট বেরিয়ে যাওয়ায় অনেকের পানিশূন্যতা, দুর্বলতা ও মাথা ঘোরার মতো সমস্যা দেখা দিচ্ছে। তিনি বিশেষ করে পথচারী, শ্রমজীবী মানুষ, শিক্ষার্থী ও বয়স্কদের পর্যাপ্ত বিশুদ্ধ পানি ও স্যালাইন গ্রহণের পরামর্শ দেন, যাতে হিটস্ট্রোক ও পানিশূন্যতার ঝুঁকি কমে, এবং প্রয়োজন ছাড়া রোদে বের না হওয়াই ভালো বলে জানান। গরমে অসুস্থ বোধ করলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
শার্শা ও বেনাপোল
শার্শা যশোর জেলার ভারত সীমান্তবর্তী একটি উপজেলা। বাংলাদেশের জাতীয় জ্ঞানকোষ বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী, এর আয়তন ৩৩৬.২৮ বর্গকিলোমিটার। উপজেলার উত্তরে পশ্চিমবঙ্গ ও চৌগাছা উপজেলা, দক্ষিণে কলারোয়া উপজেলা, পূর্বে ঝিকরগাছা উপজেলা এবং পশ্চিমে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য। শার্শা থানা গঠিত হয় ১৯১০ সালে, উপজেলা হয় ১৯৮৩ সালের ৩ জুলাই। ২০১১ সালের আদমশুমারিতে এখানে জনসংখ্যা ছিল ৩ লাখ ৪১ হাজার ৩২৮। প্রধান নদী বেতনা।
উপজেলায় নয়টি ওয়ার্ড নিয়ে একটি পৌরসভা এবং ১১টি ইউনিয়ন: উলাশী, কায়বা, গোগা, ডিহি, নিজামপুর, পুটখালী, বাগআঁচড়া, বাহাদুরপুর, বেনাপোল, লক্ষ্মণপুর ও শার্শা। প্রতিবেদনে যে '১১টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা'র হাট-বাজারে তালশাঁস বিক্রির কথা বলা হয়েছে, সেগুলো এগুলোই। বাংলাপিডিয়া উপজেলায় ৩০টি হাট-বাজারের হিসাব দেয় এবং উল্লেখযোগ্য হাট হিসেবে শার্শা, নাভারন, বেনাপোল, বাগআঁচড়া, উলাশী, লক্ষ্মণপুর, নিজামপুর, টেংরা, কায়বা, কাশিপুর, গোগা ও বাহাদুরপুর হাটের নাম করে; এর মধ্যে নাভারন ও বাগআঁচড়ার বাজারেই প্রতিবেদনের দুই ব্যবসায়ী তালশাঁস বিক্রি করছিলেন।
বাংলাপিডিয়ার তথ্যে শার্শার ৬৬.৩২ শতাংশ পরিবারের আয়ের প্রধান উৎস কৃষি, আর ১২.৪০ শতাংশের বাণিজ্য। প্রধান ফসল ধান, পাট, আলু, গম, সরিষা, মসুর, তিল ও শাকসবজি; প্রধান ফল আম, কাঁঠাল, জাম, নারিকেল, আমড়া ও খেজুর। প্রধান রপ্তানিপণ্যের তালিকায় আছে খেজুরের গুড়, তিল ও শাকসবজি।
আব্দুস সাত্তার যেখানে সড়কের পাশে তাল বিক্রি করছিলেন, সেই বেনাপোল শার্শা উপজেলার একটি শহর; সীমান্তের ওপারে ভারতের পেট্রাপোল শুল্ক স্টেশন। বেনাপোলে রয়েছে দেশের সবচেয়ে বড় স্থলবন্দর, যা পরিচালনা করে বাংলাদেশ স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষ; পেট্রাপোল-বেনাপোল সীমান্ত থেকে কলকাতার দূরত্ব প্রায় ৮০ কিলোমিটার। খুলনা বিভাগের যশোর জেলা গঠিত হয় ১৭৮১ সালে; এর আয়তন ২৬০৬.৯৪ বর্গকিলোমিটার, উপজেলা আটটি, শার্শা তার একটি।
তালগাছ ও তার কচি ফল
এই ব্যবসার মূলে যে গাছ, তার বৈজ্ঞানিক নাম বোরাসাস ফ্ল্যাবেলিফার (Borassus flabellifer), ইংরেজিতে পালমিরা পাম, বাংলায় তাল। বাংলাপিডিয়া জানায়, বাংলাদেশে অন্তত ২০ প্রজাতির পাম জাতীয় গাছ প্রাকৃতিকভাবে জন্মায়, আর খেজুর ও তালের ফল 'গৌণ হলেও জনপ্রিয়'। তাল দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ক্রান্তীয় ও উপক্রান্তীয় অঞ্চলের পাখার মতো পাতার একটি পাম গাছ। গাছটি ২০ থেকে ৩০ মিটার পর্যন্ত লম্বা হয়, মাথায় থাকে পাখার আকৃতির বড় বড় পাতার মুকুট।
তালগাছ ভিন্নলিঙ্গ বা ডায়োসিয়াস: প্রতিটি গাছ হয় পুরুষ, নয় স্ত্রী, আর ফুল আসার আগে দুটিকে আলাদা করে চেনা যায় না। ফল ধরে স্ত্রী গাছে। প্রতিটি ফল আড়াআড়ি ১৫ থেকে ২০ সেন্টিমিটার, ওজন দেড় থেকে আড়াই কেজি; কচি অবস্থায় নীলচে, পাকলে কালো থেকে বাদামি হয়। একটি পূর্ণবয়স্ক গাছে বছরে ২০০ থেকে ৩০০টি ফল ধরে। গাছ পরিণত হতে প্রায় ১২ থেকে ২০ বছর লাগে, তবে এরপর শত বছরের বেশি সময় ফল দিতে পারে।
তালগাছ কিছুটা খরা সহ্য করতে পারে এবং শুষ্ক জমি থেকে উপকূলের বালুময় মাটি পর্যন্ত নানা পরিবেশে জন্মায়। সাধারণত ধানখেতের আইল আর বসতবাড়ির আশপাশে এটি দেখা যায়। শিকড় গভীরে যায় বলে একবার অঙ্কুরিত হওয়ার পর চারা অন্যত্র সরানো কঠিন, তাই সাধারণত যেখানে গাছ দাঁড়াবে সেখানেই বীজ বোনা হয়।

দেশের অন্য জেলায় এবারের মৌসুম
যশোরের প্রতিবেদনের আগের সপ্তাহগুলোতে অন্য জেলা থেকে আসা খবরেও একই মৌসুমের ছবি পাওয়া যায়। চট্টগ্রাম থেকে প্রথম আলো ১৮ মে ২০২৬ জানায়, নগরের ফলমুন্ডী এলাকায় কাঁচা তাল উঠতে শুরু করেছে এবং আকারভেদে পাইকারিতে প্রতিটি বিক্রি হচ্ছে ৭ থেকে ১৫ টাকায়; নোয়াখালী, চাঁদপুর, ময়মনসিংহ, কুমিল্লা, রাজশাহী ও খুলনা থেকে সবচেয়ে বেশি তাল আসছে। পত্রিকাটি লেখে, তাপমাত্রা বাড়লে কাঁচা তালের শাঁসের বেচাকেনাও বাড়ে।
রাজশাহী থেকে বাসস ২৩ মে ২০২৬ জানায়, মহানগরীর সাহেববাজার জিরোপয়েন্ট, রেলস্টেশন চত্বর, লক্ষ্মীপুর মোড়, ভদ্রা মোড়, কোর্ট চত্বরসহ বিভিন্ন জায়গায় মৌসুমি ব্যবসায়ীরা ভ্যানে কচি তালের পসরা সাজিয়েছেন। বাঘা থেকে আসা এক পাইকারি ব্যবসায়ী সংস্থাটিকে বলেন, আগের বছর ১০০টি কাঁচা তাল ৭০০ থেকে ৯০০ টাকায় কেনা গেলেও এবার কিনতে হচ্ছে ১০০০ থেকে ১২০০ টাকায়; তার ওপর পরিবহন খরচ যোগ হওয়ায় খুচরা দাম কিছুটা বেড়েছে।
বাগেরহাটের ফকিরহাটে উপজেলা কৃষি অফিসের তথ্যে ফলন্ত তালগাছ ছিল ১০ হাজার ৫০৪টি, যুগান্তর ৭ জুন ২০২৬ জানায়। প্রতিটি গাছে গড়ে ২০ থেকে ২৫টি কাঁদি, প্রতি কাঁদিতে গড়ে ১৫টি তাল ধরে। কৃষক পর্যায়ে মাঠ থেকে শাঁসযুক্ত প্রতিটি তাল মাত্র ১ টাকায় বিক্রি হলেও ভোক্তা পর্যায়ে দাম ৫ থেকে ১০ টাকা পর্যন্ত ওঠে, আর কৃষি বিভাগের হিসাবে শুধু তালের শাঁসকে কেন্দ্র করেই ফকিরহাটের গ্রামীণ অর্থনীতিতে বছরে প্রায় ১ কোটি ১০ লাখ টাকার বাণিজ্য হয়। পাইকারি ব্যবসায়ীরা এ উপজেলা থেকে ঢাকা ও চট্টগ্রামে তালের শাঁস নিয়ে যান।
নাটোর থেকে বাসস ৯ জুন ২০২৬ জানায়, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) নাটোর জেলা কার্যালয়ের হিসাবে জেলায় তালগাছ প্রায় ৪০ হাজার, তবে ফলবিহীন ও পুরুষ গাছ বাদ দিলে ফলবান গাছ প্রায় ২০ হাজার। ডিএই নাটোরের উপপরিচালক মো. হাবিবুল ইসলাম খান সংস্থাটিকে বলেন, জেলায় নতুন করে তালগাছ রোপণের ফলে গাছের সংখ্যা বাড়ছে এবং তালশাঁস বিক্রির সঙ্গে জড়িত অনেক মানুষের মৌসুমি কর্মসংস্থান হয়েছে।
তালের রস, গুড় ও পাটালি
তালের রস, গুড় ও পাটালি হারিয়ে যাওয়ার যে আশঙ্কার কথা কৃষি কর্মকর্তা বলেছেন, তা একই গাছের আরেকটি ফসল। বাংলাপিডিয়ার বর্ণনায়, তালগাছের ফুলের ছড়া কেটে যে রস বের হয়, তা জ্বাল দিয়ে তালের গুড় তৈরি হয়। ফল ধরা ছড়া থেকে ফলহীন ছড়ার চেয়ে বেশি রস পাওয়া যায়। সাধারণত মধ্য এপ্রিল থেকে মধ্য জুন পর্যন্ত রস সংগ্রহ করা হয়: লম্বা বাঁশ বেয়ে গাছে উঠে ধারালো দা দিয়ে ছড়া কাটা হয়, আর রসের ফোঁটা জমে হাঁড়িতে। দিনে দুবার ছড়া কাটা হয়, আর গেঁজে যাওয়া ঠেকাতে রস দ্রুত জ্বাল দিতে হয়। তালের গুড় বেশ জনপ্রিয়, এ দিয়ে নানা রকম পিঠা ও সুস্বাদু খাবার তৈরি হয়।
বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী, পাম চিনি বা গুড় তৈরি বাংলাদেশে বহু পুরোনো চর্চা, আর খেজুর ও তালের রসই বাণিজ্যিক গুড়-চিনির প্রধান উৎস; জ্ঞানকোষটি দেশে বছরে প্রায় ৩০ হাজার টন পাম চিনি উৎপাদনের কথা বলে। কাঁচা রসে চিনির পরিমাণ প্রায় ১০ থেকে ২০ শতাংশ। যশোর অবশ্য তালের চেয়ে খেজুরের জন্য বেশি পরিচিত: বাংলাপিডিয়া মাদারীপুরের হাজারি গুড়ের পাশাপাশি যশোরের খেজুর গুড়ের বিশেষ পাটালিকে বিখ্যাত বলে উল্লেখ করে, এবং জানায় যে ঘরবাড়ি তৈরি আর ইটভাটার জ্বালানির জন্য নির্বিচারে খেজুরগাছ কাটার ফলে গুড় উৎপাদন অনেক কমে গেছে।
কাঁচা রস পানে স্বাস্থ্যঝুঁকি আছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) জানায়, নিপাহ ভাইরাসের প্রাকৃতিক বাহক ফলখেকো বাদুড়; বাদুড়ের সংস্পর্শে দূষিত খেজুরের কাঁচা রস পান করলে মানুষের মধ্যে এ ভাইরাস ছড়াতে পারে, আর ২০০১ সাল থেকে বাংলাদেশে প্রায় প্রতিবছরই নিপাহর প্রাদুর্ভাব দেখা গেছে। সংস্থাটির পরামর্শ, রস সংগ্রহের জায়গা ঢেকে বাদুড়কে দূরে রাখা এবং সদ্য সংগ্রহ করা খেজুরের রস পান করার আগে ফুটিয়ে নেওয়া; বাদুড়ে কামড়ানোর চিহ্ন আছে এমন ফল ফেলে দেওয়া উচিত। কাঁচা রস পান করবেন না।
তালপাখা, বাবুই পাখি ও তালগাছ রোপণের উদ্যোগ
কৃষি কর্মকর্তা যে তালপাতার পাখার কথা বলেছেন, তা এ গাছের বহু ব্যবহারের একটি। তালগাছের প্রায় প্রতিটি অংশই কাজে লাগে: ফল ও অঙ্কুর খাওয়া হয়; রস থেকে তৈরি হয় তাড়ি, চিনি, গুড় ও মিছরি; পাতা ও আঁশ দিয়ে ঘরের ছাউনি, বুনন ও হস্তশিল্প হয়; আর শক্ত কাণ্ড লাগে ঘরবাড়ি ও আসবাব তৈরিতে। উচ্চতা ও গড়নের কারণে গাছটি বাতাসের বিরুদ্ধে প্রাকৃতিক ঢাল হিসেবেও কাজ করে।

যে বাবুই পাখির বাসা আর চোখে পড়ে না বলে কৃষি কর্মকর্তা আক্ষেপ করেছেন, সে গ্রামবাংলার চেনা পাখি। বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী, পৃথিবীতে প্রায় ১১৭ প্রজাতির বাবুই আছে, বাংলাদেশে তিনটি: কালোবুক বাবুই, দাগি বাবুই ও দেশি বাবুই; শেষেরটি খোলা আবাদি এলাকায় ঝাঁক বেঁধে থাকে। পাতার আঁশ ঝুড়ির মতো বুনে বাসা বানায় বলে এদের নাম তাঁতি পাখি (উইভার); ঝুলন্ত বাসায় থাকে জটিল প্রবেশসুড়ঙ্গ, আর দেশি বাবুই সাধারণত কাঁটাওয়ালা গাছে বা তালের পাতায় বাসা ঝোলায়। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে চুয়াডাঙ্গার জীবননগর থেকে মানবকণ্ঠ জানায়, একসময় গ্রামের তালগাছে যে বাবুইয়ের বাসা দেখা যেত, তা এখন বিরল। স্থানীয়রা এর জন্য নির্বিচারে তালগাছ কাটা, ফসলি জমিতে মাত্রাতিরিক্ত কীটনাশক, শিকারিদের দৌরাত্ম্য আর জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবকে দায়ী করেন; পত্রিকাটি জানায়, একটি পুরুষ বাবুই মৌসুমে সর্বোচ্চ ৬টি বাসা বানাতে পারে।

বজ্রপাত থেকে সুরক্ষার উপায় হিসেবেও দেশে তালগাছ লাগানো হয়েছে। ২০১৭ সালের জানুয়ারিতে সরকার সারা দেশে ১০ লাখ তালগাছ রোপণ শুরু করে বলে বার্তা সংস্থা এএফপির বরাতে সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট জানায়; তখনকার দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সচিব শাহ কামাল বলেছিলেন, ওই বছরের জুনের মধ্যে রোপণ শেষ হবে। ২০১৬ সালে সরকারি হিসাবে বজ্রপাতে ২০০ জনের বেশি মানুষের মৃত্যুর পর কর্তৃপক্ষ বজ্রপাতকে প্রাকৃতিক দুর্যোগ ঘোষণা করে। ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে প্রথম আলো জানায়, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর ২০১৭ সালে কাবিখা ও টিআর কর্মসূচির আওতায় সারা দেশে ৪০ লাখ তালগাছ রোপণের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল এবং রোপণে প্রায় ১০০ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছিল। পত্রিকাটির প্রতিবেদন অনুযায়ী, দুই বছরের মধ্যে কোথাও গাছ মরে যায়, কোথাও গাছ না লাগিয়েই টাকা আত্মসাৎ করা হয়; আর ২০২২ সালের মে মাসে একজন প্রতিমন্ত্রী বলেছিলেন, তালগাছ বড় হতে ৩০ থেকে ৪০ বছর লাগে বলে প্রকল্পটি বাতিল করা হয়েছে। অধিদপ্তরের হিসাবে দেশে বছরে গড়ে ২৪২ জন বজ্রপাতে মারা যান।
ছবি: Ashikul Islam Anik / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY 4.0)
সূত্র: জাগো নিউজ২৪, প্রথম আলো, বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস), যুগান্তর, দেশ রূপান্তর, ঢাকা ট্রিবিউন বাংলা, বাংলা ট্রিবিউন, মানবকণ্ঠ, বাংলাপিডিয়া, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট (এএফপি), প্রথম আলো ইংরেজি, উইকিপিডিয়া





মন্তব্য
(০)