কুড়িগ্রামে ২০২৫-২৬ মৌসুমে প্রথমবারের মতো পেঁয়াজের বীজ উৎপাদন শুরু হয়েছিল, আর উত্তরের এই জেলার কৃষকেরা একে আয়ের নতুন পথ হিসেবে দেখছিলেন। জাগো নিউজ ২৪ ২০২৬ সালের ১০ এপ্রিল এ খবর প্রকাশ করে। কুড়িগ্রাম দীর্ঘদিন ধরে ধান ও আলু চাষের ওপর নির্ভরশীল। প্রথম বীজখেতটি রাজারহাট উপজেলার সদর ইউনিয়নের ছাটমাধাই গ্রামের কৃষক রাসেল আহমেদের। তিনি ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ফসলটি রোপণ করেন এবং আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে ২০২৬ সালের এপ্রিলেই বীজ সংগ্রহের আশা করছিলেন।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, রাসেল আহমেদ দীর্ঘদিন প্রচলিত ফসল চাষ করেও কাঙ্ক্ষিত লাভ পাচ্ছিলেন না, তাই আয়ের বিকল্প পথ খুঁজছিলেন। সেই চিন্তা থেকেই ওই মৌসুমে তিনি প্রথমবারের মতো পেঁয়াজের বীজ উৎপাদনে নামেন। প্রতিবেদনে জাতটির নাম বলা হয়েছে পলিক্রস। ডিসেম্বরে প্রায় ৬০ শতক জমিতে তিনি এই পেঁয়াজ রোপণ করেন। এপ্রিলের শুরুতে তাঁর খেতের গাছগুলো সুস্থ ও সবল ছিল।
জেলার কৃষি বিভাগ পত্রিকাটিকে জানায়, কুড়িগ্রামে পেঁয়াজের বীজ উৎপাদনের উদ্যোগ এবারই প্রথম। এতদিন জেলার কৃষকদের বাইরে থেকে, বিশেষ করে দেশের মধ্যাঞ্চলের ফরিদপুর অঞ্চল থেকে বীজ আনতে হতো। কৃষি বিভাগের ভাষ্য, স্থানীয়ভাবে বীজ উৎপাদন হলে উৎপাদন খরচ কমবে এবং কৃষকের লাভ বাড়বে।
স্থানীয় শ্রমিকের কাজ, কৃষকের প্রত্যাশা
বীজখেতটি ঘিরে গ্রামে কাজের সুযোগ তৈরি হয়। প্রতিবেদন অনুযায়ী, স্থানীয় নারী ও পুরুষ শ্রমিকেরা প্রতিদিন সেখানে কাজ করছিলেন এবং দৈনিক ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত মজুরি পাচ্ছিলেন।
রাসেল আহমেদ জাগো নিউজকে বলেন, 'ব্যতিক্রমী চিন্তা থেকে পেঁয়াজের বীজ উৎপাদন শুরু করেছি। ফলন ভালো হলে আগামীতে আরও বড় পরিসরে করার পরিকল্পনা আছে। এখন গাছের অবস্থা দেখে আশাবাদী। বড় ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ না হলে ভালো লাভ হবে বলে আশা করছি।' লাভের কথাটি ছিল তখনকার প্রত্যাশা; প্রতিবেদনে তাঁর খরচ বা সম্ভাব্য বীজের পরিমাণের কোনো হিসাব দেওয়া হয়নি।
তিনি যে ঝুঁকির কথা বলেছেন, দেশের অন্য বীজচাষিদের কাছেও তা পরিচিত। দেশের প্রধান পেঁয়াজ বীজ উৎপাদনকারী জেলা ফরিদপুরের এক শ্রমিক ২০২৬ সালের মার্চে দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, ওই মৌসুমে বৃষ্টি কম হওয়ায় বরং বীজের মান ভালো হয়েছে। অর্থাৎ ফুল ফোটা ও বীজ তোলার সময়ের আবহাওয়াই বীজ ফসলের দামের বড় অংশ ঠিক করে দেয়। সেখানকার চাষিদের মজুরি বাবদও বড় অঙ্ক খরচ করতে হয়, কারণ এখন অনেক ফুলে হাত দিয়ে পরাগায়ন করাতে হয়।
কুড়িগ্রাম কৃষি অফিস যা বলেছে
কুড়িগ্রাম কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আব্দুল্লাহ আল মামুন পত্রিকাটিকে বলেন, 'পেঁয়াজ দেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থকরী ফসল। কুড়িগ্রামের মাটি ও আবহাওয়া এ ফসলের জন্য উপযোগী। আগ্রহী কৃষকদের কৃষি বিভাগ থেকে প্রয়োজনীয় কারিগরি সহায়তা ও পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।'
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই) কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীন সরকারের কৃষি পরামর্শ সেবা সংস্থা; প্রতিটি জেলা ও উপজেলায় এর কার্যালয় আছে। জেলার পেঁয়াজচাষিরা বছরে কত বীজ ব্যবহার করেন বা এর পেছনে কত টাকা খরচ করেন, কুড়িগ্রাম কার্যালয় তার কোনো হিসাব দেয়নি। যে কৃষকেরা রাসেল আহমেদের পথ ধরতে চান, তাঁদের জন্য উপপরিচালকের কথার কাজের দিকটি হলো, কারিগরি পরামর্শ পাওয়া যাচ্ছে: বীজ ফসলের জাত বাছাই, রোপণের সময় এবং রোগ ও পোকা দমনের বিষয়গুলো উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার কাছ থেকে জেনে নেওয়াই নিয়ম।
কুড়িগ্রাম ও রাজারহাট: বড় নদীর পাড়ের কৃষিপ্রধান জনপদ
জাতীয় জ্ঞানকোষ বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী, রংপুর বিভাগের কুড়িগ্রাম জেলার আয়তন ২২৪৫.০৪ বর্গকিলোমিটার, অবস্থান দেশের একেবারে উত্তরে। এর উত্তরে ও পশ্চিমের একাংশে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, পূর্বে আসাম, দক্ষিণে গাইবান্ধা ও জামালপুর জেলা এবং পশ্চিমে রংপুর ও লালমনিরহাট জেলা। প্রধান নদী ব্রহ্মপুত্র, যমুনা, ধরলা, দুধকুমার, তিস্তা ও জিঞ্জিরাম। কুড়িগ্রাম মহকুমা গঠিত হয় ১৮৭৪ সালে, জেলা হয় ১৯৮৪ সালে। জেলায় উপজেলা ৯টি; সবচেয়ে বড় উলিপুর, সবচেয়ে ছোট চর রাজিবপুর।
বাংলাপিডিয়ায় উদ্ধৃত ২০১১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী, জেলার জনসংখ্যা ছিল ২০ লাখ ৬৯ হাজার ২৭৩। ৭০.৪১ শতাংশ পরিবারের আয়ের প্রধান উৎস ছিল কৃষি; দ্বিতীয় স্থানে থাকা ব্যবসার হার ছিল ৯.৪৫ শতাংশ। গড় সাক্ষরতার হার ছিল ৪২.৫ শতাংশ।
বীজখেতটি যে রাজারহাট উপজেলায়, তার আয়তন ১৬৬.৬৪ বর্গকিলোমিটার। এর উত্তরে ফুলবাড়ী ও লালমনিরহাট সদর উপজেলা, দক্ষিণে উলিপুর ও পীরগাছা, পূর্বে কুড়িগ্রাম সদর এবং পশ্চিমে লালমনিরহাট সদর ও কাউনিয়া। উপজেলার নদী ধরলা ও তিস্তা; উল্লেখযোগ্য জলাভূমি সরলা বিল, চাকিরপশার বিল ও ঘড়িয়ালডাঙ্গা বিল। রাজারহাট থানা গঠিত হয় ১৯৮১ সালে এবং ১৯৮৩ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর এটি উপজেলায় উন্নীত হয়। ২০১১ সালের আদমশুমারিতে এখানকার জনসংখ্যা ছিল ১ লাখ ৮২ হাজার ৯৮১।
বাংলাপিডিয়ার তথ্যে দেখা যায়, উপজেলাটি জমির ওপর কতটা নির্ভরশীল, অথচ অনেকের নিজের জমি কত কম। ৭০.৩২ শতাংশ পরিবারের আয়ের প্রধান উৎস কৃষি, আর ভূমিহীন পরিবার ৪৬.৩৬ শতাংশ। প্রধান ফসল ধান, পাট, ভুট্টা, গম, মসুর, আলু, শাকসবজি, চীনাবাদাম ও বাঁশ; উপজেলা থেকে বাইরে যাওয়া প্রধান পণ্য ধান, পাট, আলু, সুপারি ও শাকসবজি। কোনো তালিকাতেই পেঁয়াজ নেই, আর সে কারণেই কৃষি বিভাগ রাসেল আহমেদের বীজ ফসলকে জেলায় প্রথম বলে উল্লেখ করেছে।

পেঁয়াজগাছে বীজ হয় যেভাবে
বাংলাপিডিয়া জানায়, পেঁয়াজ (Allium cepa) একটি কন্দজাতীয় বীরুৎ, যার খাওয়ার উপযোগী কন্দটি খাদ্য সঞ্চয়কারী পাতায় গঠিত; এর ঝাঁঝ আসে অ্যালাইল-প্রোপাইল ডাইসালফাইড নামের উদ্বায়ী তেল থেকে। একই সূত্রে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে সব ধরনের মাটিতে পেঁয়াজ হয়, চারা রোপণের উপযুক্ত সময় ডিসেম্বর বা জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহ, আর গুরুত্বপূর্ণ দুটি দেশি জাত তাহেরপুরী ও ফরিদপুরী; বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বারি) জাত বারি পেঁয়াজ-১-ও আছে।
কন্দ ফসল আর বীজ ফসল একই গাছের দুটি ধাপ। উইকিপিডিয়ার উদ্ভিদতাত্ত্বিক বর্ণনা অনুযায়ী, পেঁয়াজ দ্বিবর্ষজীবী উদ্ভিদ, তবে কৃষকেরা সাধারণত একে একবর্ষজীবী হিসেবে চাষ করে প্রথম মৌসুমেই তুলে ফেলেন। কন্দ রেখে দিয়ে আবার লাগালে এর মাঝখানের বাড়ন্ত অংশ থেকে নতুন পাতা আর লম্বা, মোটা, ফাঁপা একটি ডাঁটা বের হয়, যার মাথায় সাদা ফুলের গোলাকার ছত্রমঞ্জরি তৈরি হয়। ওই মঞ্জরিতে যে বীজ হয় তা চকচকে কালো, প্রস্থচ্ছেদে ত্রিকোণ। পেঁয়াজের বীজ বেশি দিন টেকে না, তাই পুরোনো বীজের চেয়ে টাটকা বীজ ভালো গজায়।
এ কারণে বীজচাষিরা বীজ থেকে নয়, বাছাই করা কন্দ থেকে শুরু করেন। ভারতের তামিলনাড়ু কৃষি বিশ্वविদ্যালয় বড় আকারের বেল্লারি পেঁয়াজের মানসম্মত বীজ উৎপাদনের নির্দেশিকায় ভারতের পরিবেশের জন্য পদ্ধতিটি ধাপে ধাপে বর্ণনা করেছে:
- প্রথমে স্বাভাবিক নিয়মে কন্দ উৎপাদন করে তোলা হয়, তারপর প্রায় ৪০ থেকে ৫০ গ্রাম ওজনের মাঝারি কন্দ বা নির্দিষ্ট ব্যাসের কন্দ বীজকন্দ হিসেবে বাছাই করা হয়।
- বাছাই করা প্রতিটি কন্দের ওপরের এক-তৃতীয়াংশ কেটে ফেলে রোপণের আগে ছত্রাকজনিত রোগের বিরুদ্ধে শোধন করা হয়।
- অক্টোবর-নভেম্বরে আইলের ওপর ৫০ বাই ২০ সেন্টিমিটার দূরত্বে বীজকন্দ রোপণ করা হয়।
- মার্চে, যখন মঞ্জরির প্রায় অর্ধেক বীজ কালো হয়ে যায়, তখন মাথাগুলো কেটে নেওয়া হয়, যাতে বীজ ঝরে নষ্ট না হয়।
- মাথাগুলো রোদে শুকিয়ে নমনীয় লাঠি দিয়ে পিটিয়ে বীজ ছাড়ানো হয়, তারপর চালুনিতে বাছাই করা হয়।
- বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাবে হেক্টরে বীজের ফলন ৫০০ থেকে ৬০০ কেজি; সংরক্ষণের আগে বীজের আর্দ্রতা ৬ থেকে ৮ শতাংশে নামিয়ে পলিথিনের ব্যাগে রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
এসব তথ্য দক্ষিণ ভারতের; বাংলাদেশে মৌসুম ও জাত আলাদা। প্রথম আলো ২০২৫ সালের মার্চে জানায়, ফরিদপুরে নভেম্বর-ডিসেম্বরে বীজ পেঁয়াজের আবাদ শুরু হয়ে ফলন ওঠে এপ্রিল-মে মাসে, আর তখন মাঠজুড়ে দেখা যায় সাদা গোল ফুল, পত্রিকাটির ভাষায় 'সাদা কদম ফুলের সমারোহ'। কুড়িগ্রামে রাসেল আহমেদের সময়সূচিও ছিল একই ধাঁচের: ডিসেম্বরে রোপণ, এপ্রিলে বীজ তোলার আশা। বাংলাদেশের পরিবেশে বীজ ফসলে সার ও ছত্রাকনাশকের মাত্রা উপজেলা কৃষি অফিস থেকে জেনে নেওয়া উচিত।

ফরিদপুরের 'কালো সোনা'
কুড়িগ্রামের কৃষকেরা যে বীজ কিনতেন, তার বেশির ভাগ আসত ফরিদপুর থেকে, যেখানে পেঁয়াজের বীজ এতটাই দামি যে একে 'কালো সোনা' বলা হয়। কুড়িগ্রামের প্রতিবেদনের দুই সপ্তাহেরও কম আগে, ২০২৬ সালের ২৮ মার্চ দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড জানায়, জেলাটি রেকর্ড ফলনের পথে। কৃষক ও স্থানীয় কৃষি বিভাগের হিসাবে উৎপাদন প্রায় ১ হাজার ১০০ টনে পৌঁছাতে পারে, যার বাজারমূল্য প্রায় ৫৫০ কোটি টাকা। পত্রিকাটির তথ্যমতে, দেশের মোট পেঁয়াজ বীজ উৎপাদনের প্রায় ৭০ শতাংশই হয় ফরিদপুরে।
ওই প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ মৌসুমে ফরিদপুরে পেঁয়াজ বীজের আবাদ লক্ষ্যমাত্রা সামান্য ছাড়িয়ে যায়: কৃষি বিভাগের পরিকল্পনা ছিল ১ হাজার ৮৫০ হেক্টর, আবাদ হয় প্রায় ১ হাজার ৮৬৫ হেক্টরে, সবচেয়ে বেশি অম্বিকাপুর ইউনিয়নের গোবিন্দপুর গ্রামে। আগের বছর পেঁয়াজ বীজের গড় বাজারদর ছিল কেজিপ্রতি প্রায় ৫ হাজার টাকা, আর কৃষকেরা এবারও কাছাকাছি দাম আশা করছিলেন। ফলনের প্রায় ৩০ শতাংশ ফরিদপুরের ভেতরের চাহিদা মেটাবে এবং বাকি ৭০ শতাংশ যাবে সারা দেশের বাজারে।
এক দশকের বেশি সময় ধরে পেঁয়াজ বীজ উৎপাদনে যুক্ত কৃষক সাহিদা বেগম পত্রিকাটিকে জানান, ওই মৌসুমে তিনি প্রায় ১০০ একরে আবাদ করেছেন এবং প্রায় ৪০ টন বীজ পাওয়ার আশা করছেন, যার দাম তাঁর হিসাবে ৫ কোটি টাকা হতে পারে। তাঁর মতে, বীজ চাষ ঝুঁকিপূর্ণ ও ব্যয়বহুল, তবে মানসম্মত বীজের চাহিদা বেশি বলে লাভও ভালো। আরেক চাষি মো. হোসেন বলেন, ফরিদপুরের বীজ মানের জন্য পরিচিত; তিনি বিদেশ, বিশেষ করে ভারত থেকে নিম্নমানের বীজ আমদানি বন্ধে সরকারের পদক্ষেপ চান। এটি তাঁর মত; প্রতিবেদনে এ বিষয়ে কর্তৃপক্ষের কোনো প্রতিক্রিয়া ছিল না। ফরিদপুর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ কার্যালয়ের উপপরিচালক মো. শাহাদুজ্জামান বলেন, 'শুরু থেকেই আমরা কৃষকদের পূর্ণ সহায়তা দিচ্ছি, কারিগরি পরামর্শ থেকে শুরু করে বীজের মান যাচাই পর্যন্ত।'
ফরিদপুরের বীজ ব্যবসা কয়েক বছর ধরেই বাড়ছিল। ২০২৪ সালের মার্চে দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড জানায়, জেলা কৃষি অফিস সেই মৌসুমে ৯টি উপজেলায় ১ হাজার ৮৯০ হেক্টর জমিতে পেঁয়াজ বীজের আবাদ ধরেছে এবং কৃষকেরা ৩০০ কোটি টাকার ফসলের লক্ষ্য রাখছেন। প্রতিবেদনে বলা হয়, জেলাটি তখন দেশের পেঁয়াজ বীজের চাহিদার ৫০ শতাংশ মেটাতে পারত। গোবিন্দপুরের দম্পতি লাভলী আক্তার ও ইমতিয়াজ মোল্লা দুই বিঘা দিয়ে শুরু করে ৪০ বিঘায় আবাদ বাড়িয়েছিলেন; তাঁদের হিসাবে বিঘাপ্রতি চাষের খরচ ১ লাখ টাকার বেশি, আর তাঁরা জমি থেকে দুই থেকে আড়াই মণ বীজ আশা করছিলেন। এক বছর পর, ২০২৫ সালের মার্চে প্রথম আলো জানায়, সেই মৌসুমে ফরিদপুর থেকে অন্তত ৫০০ কোটি টাকার বীজ বাণিজ্যের আশা করছে কৃষি বিভাগ।

মৌমাছি, হাতে পরাগায়ন ও শ্রমের খরচ
পেঁয়াজ বীজচাষিরা ফুলের পরাগায়নের জন্য মৌমাছির ওপর নির্ভর করেন, আর ফরিদপুরে সেই সহায়তা কমে আসছে। ২০২৪ সালের মার্চে দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড জানায়, মৌমাছির অভাবে পরাগায়ন কমে যাওয়ায় কৃষকেরা হাতে পরাগায়নের পথ নিয়েছেন, যদিও তাতে প্রাকৃতিক পরাগায়নের মতো ফল না-ও মিলতে পারে। ২০২৫ সালের মার্চে প্রথম আলোর ছবির প্রতিবেদনে দেখা যায়, ওই মৌসুমে মৌমাছি কম থাকায় কিষান-কিষানিরা হাত দিয়ে ফুলে পরাগায়ন করছেন।
২০২৬ সালের মার্চে এসে এটি নিয়মিত খরচে পরিণত হয়। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড জানায়, মৌমাছি কমে যাওয়ায় অনেক চাষিকে হাতে পরাগায়ন করতে হচ্ছে, ফলে শ্রমের খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। গোবিন্দপুরের একটি খামারে শ্রমিকেরা হাত দিয়ে এক ফুল থেকে আরেক ফুলে পরাগরেণু ছোঁয়াচ্ছিলেন, যে কাজে ধৈর্য ও নিখুঁত হাত দুটোই লাগে। রফিকুল নামের এক শ্রমিক পত্রিকাটিকে বলেন, তাঁরা মাসে ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা আয় করেন, যা পরিবারের কাজে লাগে, তবে কাজটি ক্লান্তিকর।
রাসেল আহমেদের খেতে দৈনিক ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা মজুরি দেখায়, একই ধরনের কাজ রাজারহাটেও পৌঁছেছে। বাংলাপিডিয়ার হিসাবে যে উপজেলার প্রায় অর্ধেক পরিবারের নিজের জমি নেই, সেখানে শীতে রোপণ থেকে বসন্তে বীজ তোলা পর্যন্ত অনেক হাতের প্রয়োজন হয় এমন একটি ফসল চাষির বাইরেও অনেকের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
বীজ যখন গজায় না: ২০২১ ও ২০২৪ সালের অঙ্কুরোদ্গম সমস্যা
কেনা বীজ ব্যর্থ হলে নির্ভরযোগ্য স্থানীয় বীজের মূল্য সবচেয়ে স্পষ্ট হয়। ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড জানায়, বগুড়ায় বন্যাক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সরকারিভাবে দেওয়া পেঁয়াজের বীজ সারিয়াকান্দি উপজেলার প্রায় ১৫০ কৃষকের জমিতে গজায়নি। কৃষকদের অভিযোগ ছিল, তাঁদের নিম্নমানের বীজ দেওয়া হয়েছে, আর তাঁরা ১ কোটি টাকার বেশি ক্ষতির কথা বলেন। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তারা বীজের মান ভালো ছিল বলে দাবি করেন এবং শীতের নিম্ন তাপমাত্রা ও দেরিতে বপনকে দায়ী করেন। সারিয়াকান্দির এক উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা বলেন, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিজ্ঞানীরা তাঁদের জানিয়েছেন, বপনের পর মাটির তাপমাত্রা ১৫ থেকে ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াস থাকা দরকার, অথচ সেই মৌসুমে তা ৬ থেকে ১০ ডিগ্রির মধ্যে ওঠানামা করেছে।
এর চেয়ে বড় ঘটনা ঘটে ২০২৪ সালের শেষে। ওই বছরের ৯ ডিসেম্বর কৃষি মন্ত্রণালয় কম অঙ্কুরোদ্গম হারের পেঁয়াজবীজ বিতরণের ঘটনায় রাষ্ট্রায়ত্ত বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) দুই কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্ত করে। মন্ত্রণালয় জানায়, ২০২৪ সালের ৭ নভেম্বর মূল্যায়ন কমিটির প্রতিবেদনে বিএডিসির কেনা তাহেরপুরী জাতের পেঁয়াজবীজের অঙ্কুরোদ্গম হার দেখানো হয়েছিল ৮০ ও ৮১ শতাংশ, কিন্তু কৃষকের মাঠে, বিশেষ করে ফরিদপুর ও রাজবাড়ী জেলায়, তা পাওয়া যায় ১০ থেকে ২০ শতাংশ। মন্ত্রণালয় ওই দুই কর্মকর্তার 'অবহেলা, অসদাচরণ ও অদক্ষতা' পায় এবং আরও তদন্ত করে জড়িতদের ও সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানায়।
কোনো ঘটনাই কুড়িগ্রামের নয়, তবে দুটিই বোঝায় কেন জেলা কৃষি অফিস ঘরের বীজে কম খরচ ও বেশি লাভের কথা বলেছে। কাছেই বীজ উৎপাদন করলে কৃষক দেখতে পান বীজটি কীভাবে উৎপাদন ও সংরক্ষণ করা হয়েছে; অন্য অঞ্চল বা বিদেশ থেকে আনা বীজের ওপর ভরসা করতে হয় না।
২০২৬ সালের মৌসুমের আগে পেঁয়াজের উৎপাদন ও বাজার
বীজ দিয়েই শুরু হয় বাংলাদেশের সবচেয়ে আলোচিত ফসলগুলোর একটির চক্র। ২০২৫ সালের আগস্টে দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড জানায়, ২০২৪-২৫ মৌসুমে দেশে ২ লাখ ৮০ হাজার হেক্টর জমিতে ৪২ লাখ ৪৫ হাজার টন পেঁয়াজ উৎপাদিত হয়েছে, যা ৩৮ লাখ ২১ হাজার টনের লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৪ লাখ ২৪ হাজার টন বেশি এবং দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। আগের বছরগুলোর যে হিসাব পত্রিকাটি দেয়: ২০২৩-২৪ সালে ৩৯ লাখ ১১ হাজার টন, ২০২২-২৩ সালে ৩৪ লাখ ৫৬ হাজার টন, ২০২১-২২ সালে ৩৬ লাখ ৪০ হাজার টন এবং ২০২০-২১ সালে ৩৩ লাখ ৬২ হাজার টন। একই প্রতিবেদনে বলা হয়, উৎপাদন, সংগ্রহ, বিপণন ও সংরক্ষণের সময় ২০ থেকে ২৫ শতাংশ পেঁয়াজ নষ্ট হয়।
সরকারি হিসাব নিয়ে সবাই একমত ছিলেন না। বগুড়ার মসলা গবেষণা কেন্দ্রের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. নূর আলম চৌধুরী পত্রিকাটিকে বলেন, ওই বছর উৎপাদন প্রায় ৩৬ লাখ টন, অথচ দেশের চাহিদা অন্তত ৪০ লাখ টন, আর সংরক্ষণের সময় প্রায় এক-চতুর্থাংশ পেঁয়াজ নষ্ট হয়। শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আবু নোমান ফারুক আহম্মেদ বলেন, বাজার স্থিতিশীল রাখতে উৎপাদনের সঠিক তথ্য অপরিহার্য।
রাসেল আহমেদের বীজখেতে ফুল আসার আগের মাসগুলোতে দাম ব্যাপকভাবে ওঠানামা করে। ২০২৫ সালের ২৬ নভেম্বর কৃষি উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেন, স্থানীয় কৃষকদের সুরক্ষায় সরকার পেঁয়াজ আমদানির অনুমতি দেয়নি, আর কেজিপ্রতি ১২০ থেকে ১৩০ টাকায় ওঠার পর দাম নেমে ৯৫ থেকে ১০০ টাকার কাছাকাছি এসেছে। দশ দিন পর, ২০২৫ সালের ৬ ডিসেম্বর, কৃষি মন্ত্রণালয় জানায়, ৭ ডিসেম্বর থেকে সীমিত পরিসরে আমদানির অনুমতি দেওয়া হবে; প্রতিদিন ৫০টি আমদানি অনুমতিপত্র দেওয়া হবে এবং প্রতিটির সীমা ৩০ টন। তখন খুচরা বাজারে পেঁয়াজের কেজি ১৫০ টাকায় পৌঁছেছিল।

ছবি: דינה שנן רמות, পিকিউইকি ইসরায়েল / উইকিমিডিয়া কমন্স (সিসি বাই ২.৫)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, বাংলাপিডিয়া (বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি), দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, প্রথম আলো, তামিলনাড়ু কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, উইকিপিডিয়া





মন্তব্য
(০)