রবি মৌসুমের শুরুতে, ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে মানিকগঞ্জের বিভিন্ন উপজেলায় হালি বা চারা পেঁয়াজ রোপণে ব্যস্ত হয়ে পড়েন কৃষকেরা। ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত মাঠে মাঠে দলবদ্ধভাবে জমি তৈরি করে সারি ধরে চারা লাগানো হচ্ছিল; কেউ সেচ দিচ্ছিলেন, কেউ সার ছিটাচ্ছিলেন। জাগো নিউজ ২৪ ২৬ ডিসেম্বর এ খবর দেয়। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই) এ মৌসুমে হালি পেঁয়াজ থেকে ৭০ হাজার ৫৭৫ মেট্রিক টন উৎপাদনের লক্ষ্য ঠিক করেছিল।
লক্ষ্যমাত্রা ও রোপণের অগ্রগতি
ডিএইর হিসাবে, আগের অর্থবছরে জেলার সাত উপজেলায় ৪ হাজার ১৪৯ হেক্টর জমিতে চারা পেঁয়াজ চাষ করে উৎপাদন হয়েছিল ৬৫ হাজার ৭৪০ মেট্রিক টন। ২০২৫-২৬ মৌসুমে হালি পেঁয়াজের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয় ৪ হাজার ৪৫২ হেক্টর। প্রতিবেদনের দিন পর্যন্ত ৪৩০ হেক্টরে রোপণ শেষ হয়েছিল। হরিরামপুর ও শিবালয় উপজেলায় সবচেয়ে বেশি পেঁয়াজ চাষ হয়।
জেলায় সব ধরনের পেঁয়াজ মিলিয়ে মোট লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৭ হাজার ৮৬৭ হেক্টর: হালি পেঁয়াজ ৪ হাজার ৪৫২ হেক্টর, মুড়িকাটা পেঁয়াজ ৩ হাজার ৩৮৬ হেক্টর এবং বীজ পেঁয়াজ ২৯ হেক্টর। দৈনিক ইনকিলাব ২০২৫ সালের ১৯ নভেম্বর জানায়, শুধু হরিরামপুরেই সে মৌসুমে ১ হাজার ১৪০ হেক্টরে মুড়িকাটা পেঁয়াজ আবাদের লক্ষ্য ছিল, উৎপাদন লক্ষ্য ১৯ হাজার ৫১৬ টন।

হালি ও মুড়িকাটা: পেঁয়াজ চাষের দুই পদ্ধতি
হালি পেঁয়াজ বীজতলায় তৈরি চারা থেকে চাষ হয় এবং মৌসুমের শেষ দিকে তোলা হয়। মুড়িকাটা আগাম জাতের পেঁয়াজ; ঢাকা ট্রিবিউনের ২০২৫ সালের জানুয়ারির প্রতিবেদন অনুযায়ী, এটি বীজ থেকে নয়, আগের বছরের ছোট আকারের পেঁয়াজ বা ‘গুটি’ লাগিয়ে চাষ করা হয় এবং সাধারণত ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারির মধ্যে ওঠে। প্রথম আলো ২০২৫ সালের নভেম্বরে জানায়, মুড়িকাটা পেঁয়াজ ডিসেম্বরের দ্বিতীয়ার্ধে বাজারে আসতে শুরু করে।
মানিকগঞ্জ ঢাকা বিভাগের একটি জেলা, আয়তন ১ হাজার ৩৮৩.৬৬ বর্গকিলোমিটার। দৌলতপুর, ঘিওর, হরিরামপুর, মানিকগঞ্জ সদর, সাটুরিয়া, শিবালয় ও সিংগাইর এর সাত উপজেলা। পদ্মা, যমুনা, কালীগঙ্গা, ধলেশ্বরী ও ইছামতী নদী জেলার ভেতর দিয়ে বয়ে গেছে। স্থানীয় কৃষকেরা জানান, এখানকার মাটি পেঁয়াজের উপযোগী, তাই এটি জেলার একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থকরী ফসল।

খরচ, সার আর আমদানি নিয়ে কৃষকের দুশ্চিন্তা
বাজারে চাহিদা ভালো থাকলেও সার সংকট ও শ্রমিকের বাড়তি মজুরি কৃষকদের চাপে ফেলেছিল। কাঞ্চনপুর ইউনিয়নের কোটকান্দি গ্রামের জিন্নাত আলী মোল্লা জাগো নিউজকে বলেন, ‘গত বছর তিন বিঘা জমিতে হালি পেঁয়াজের চাষ করেছিলাম। অনেক খরচ হয়েছিল, লস গুনতে হয়েছে। এবারো তিন বিঘা জমিতেই পেঁয়াজ চাষ করবো। প্রতি বিঘায় কম হলেও ৫০ হাজার টাকা খরচ হবে।’ কুটিরহাটখোলা গ্রামের হজরত ফকির জানান, এ এলাকার পেঁয়াজ ঢাকা, সিলেট ও চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন জেলার চাহিদা মেটায়, তবে খরচ এত বেশি যে লাভ প্রায় থাকে না।
হরিরামপুরের জাকির হোসেন প্রতি বছর প্রায় ১৫ বিঘা জমিতে পেঁয়াজ চাষ করেন। তিনি বলেন, তখনকার বাজারদর বজায় থাকলে কৃষক আগের বছরের লোকসান পুষিয়ে নিতে পারবেন, কিন্তু ভরা মৌসুমে বিদেশ থেকে পেঁয়াজ আমদানি হলে ক্ষতির মুখে পড়বেন। তাঁর ভাষায়, হালি পেঁয়াজের মৌসুমে সারের তীব্র সংকট দেখা দেয়; তিনি সার ও বীজ সহজলভ্য করার আবেদন জানান।
এই শঙ্কার পটভূমি ছিল জাতীয় বাজার। দ্য ডেইলি স্টার জানায়, ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের শুরুতে ঢাকার খুচরা বাজারে পেঁয়াজ কেজিপ্রতি ১৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছিল এবং কৃষি মন্ত্রণালয় ৭ ডিসেম্বর থেকে সীমিত আমদানির অনুমতি দেয়: দিনে ৫০টি আমদানি অনুমতিপত্র, প্রতিটিতে সর্বোচ্চ ৩০ টন, মোট দিনে ১ হাজার ৫০০ টন। ডিএইর হিসাবে আগের মৌসুমে দেশে ৩৯ লাখ টনের বেশি পেঁয়াজ উৎপাদিত হয়েছিল, তবু সংগ্রহোত্তর ক্ষতি পোষাতে ৬ থেকে ৭ লাখ টন আমদানির প্রয়োজন ধরা হয়। প্রথম আলোর তথ্যে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৪ লাখ ৮৩ হাজার টন পেঁয়াজ আমদানি হয়, যার ৯৯ শতাংশ এসেছিল ভারত থেকে।
সারের দাম নিয়েও অভিযোগ ছিল। দ্য ডেইলি স্টার ২০২৫ সালের অক্টোবরের শেষে পাবনা, ফরিদপুর ও রাজবাড়ীর পেঁয়াজচাষিদের কথা তুলে ধরে জানায়, সেখানে ৫০ কেজির ডিএপি সারের বস্তা ২ হাজার ৩০০ থেকে ২ হাজার ৪০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছিল, যেখানে সরকারি দাম ১ হাজার ৫০ টাকা। কর্মকর্তারা সংকটের কথা অস্বীকার করে ব্যবসায়ীদের তৈরি কৃত্রিম সংকটকে দায়ী করেন।

কৃষি বিভাগ যা জানায়
মানিকগঞ্জ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক শাহজাহান সিরাজ জাগো নিউজকে জানান, বাকি জমিতে হালি পেঁয়াজ রোপণ পরের ১৫ থেকে ২০ দিনের মধ্যে শেষ হবে। তিনি বলেন, ‘আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় এবং কৃষি অফিসের পরামর্শ অনুযায়ী চাষাবাদ হওয়ায় এবার পেঁয়াজের উৎপাদন বাড়বে বলে আশা করছি।’ কৃষকেরাও আশা করছিলেন, ফলন ভালো হলে বাড়তি খরচের ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়া যাবে।
ছবি: RockyMasum / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, দ্য ডেইলি স্টার, প্রথম আলো, ঢাকা ট্রিবিউন, দৈনিক ইনকিলাব, উইকিপিডিয়া





মন্তব্য
(০)