লালমনিরহাটের আদিতমারী উপজেলার দৌলজোর এলাকার একটি খামারে বেড়ে ওঠা বিশালাকৃতির একটি ষাঁড় ২০২৬ সালের ঈদুল আজহার আগে জেলায় আলোচনার কেন্দ্রে ছিল। খামারের লোকজন আদর করে ষাঁড়টির নাম রেখেছিলেন ‘জায়েদ খান’। কিন্তু ঈদের আগের দিন, ২৭ মে পর্যন্ত আশানুরূপ দাম না পাওয়ায় খামারমালিক আইনজীবী মজমুল প্রামাণিক ষাঁড়টি বিক্রি করেননি। পরম যত্নে পালন করা শখের এই ষাঁড়টি তিনি নিজেই কোরবানি করার সিদ্ধান্ত নেন। ২৭ মে বিকেলে জাগো নিউজের লালমনিরহাট প্রতিনিধির পাঠানো প্রতিবেদনে এ খবর প্রকাশিত হয়।
জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটি ১৮ মে সন্ধ্যায় বায়তুল মোকাররমে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের সভাকক্ষে বৈঠক শেষে জানিয়েছিল, দেশের আকাশে জিলহজ মাসের চাঁদ দেখা গেছে এবং ২৮ মে বৃহস্পতিবার সারা দেশে ঈদুল আজহা উদ্যাপিত হবে। অর্থাৎ মালিকপক্ষ যখন ষাঁড়টি নিজেরাই কোরবানি দেওয়ার কথা জানান, তখন ঈদের বাকি ছিল এক দিন।
খামারে বেড়ে ওঠা ‘জায়েদ খান’
জাগো নিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, আদিতমারীর দৌলজোর এলাকার আইনজীবী মজমুল প্রামাণিকের খামারে ষাঁড়টি বেড়ে উঠেছে। তিনি কয়েক যুগ ধরে কোরবানির জন্য পশু প্রস্তুত করে আসছেন। এবারের ঈদে তাঁর খামারে সবচেয়ে বেশি নজর কাড়ে এই ষাঁড়টি। জাগো নিউজের বর্ণনায়, এর শরীরে সাদা ও কালো রঙের নজরকাড়া মিশ্রণ; খামারের ভাষায় এটি বার্মা জাতের ষাঁড়, যা দেখতে যেমন সুন্দর, স্বভাবে ঠিক ততটাই রাগী।
ফিতা দিয়ে মেপে দেখা গেছে, ষাঁড়টির উচ্চতা প্রায় সাড়ে পাঁচ ফুট এবং দৈর্ঘ্য ৯ ফুট। বুকের মাপ বা পেটের ঘের ছয় ফুটের কাছাকাছি। বিশাল শরীর নিয়ে ষাঁড়টি যখন দাঁড়িয়ে থাকত, তখন এক নজর দেখার জন্য অনেকে ভিড় জমাতেন। ওজন স্কেলে ষাঁড়টি তখনো মাপা হয়নি। তবে খামারে আসা অভিজ্ঞ গরুর ব্যাপারী ও পাইকারেরা আকার দেখে ধারণা করেছিলেন, জবাই করলে এটি থেকে অনায়াসে ২৬ থেকে ২৭ মণ নিট মাংস পাওয়া যাবে।
খামার সূত্র জাগো নিউজকে জানায়, অন্য একটি প্রজাতির গাভির সঙ্গে উন্নত জাতের বীজ দিয়ে কৃত্রিম প্রজননের মাধ্যমে ষাঁড়টির জন্ম। একে অত্যন্ত যত্ন নিয়ে বড় করা হয়েছে এবং খাওয়ানো হয়েছে দেশীয় খাবার। ‘জায়েদ খান’-এর সার্বক্ষণিক পরিচর্যা ও দেখভালের জন্য খামারে দুজন নিয়োজিত ছিলেন।
একই দিন সকালে প্রকাশিত প্রথম আলোর লালমনিরহাট প্রতিনিধির প্রতিবেদনে খামারটির আরও পরিচয় পাওয়া যায়। সেখানে বলা হয়, ষাঁড়টি পালন করা হচ্ছে আদিতমারীর সাপ্টিবাড়ি ইউনিয়নের পূর্ব দৈলজোর এলাকার আয়কর আইনজীবী মজমুল হোসেন প্রামাণিকের মালিকানাধীন ‘মৌরি অ্যাগ্রো ট্রেডার্স’ খামারে। ঈদের আগের সোমবার প্রথম আলোর প্রতিনিধি খামারে গিয়ে ষাঁড়টিকে পাকা মেঝেতে বসে থাকতে দেখেন; পত্রিকাটি এর রং ধূসর-ছাই বলে বর্ণনা করে। খামারের কর্মীরা জানান, ষাঁড়টি চঞ্চল স্বভাবের এবং লাফঝাঁপ করে। খামারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের হিসাবে, ষাঁড়টির পেছনে প্রতিদিন খাবার খরচ ছিল চার থেকে পাঁচ শ টাকা।
খামারের তত্ত্বাবধায়ক নবুর হোসেন প্রথম আলোকে জানান, তিনি প্রায় দুই যুগ ধরে এই খামারে কাজ করছেন। তাঁর প্রশ্ন ছিল, এত বড় ষাঁড় কোরবানির সময়ও যদি বিক্রি না হয়, তাহলে আর কবে হবে; মালিক খুব চিন্তায় আছেন বলেও তিনি জানান। ষাঁড়টির বয়স নিয়ে দুই প্রতিবেদনে দুই রকম তথ্য আছে: খামারমালিক প্রথম আলোকে বয়স সাড়ে পাঁচ বছর বলেছেন, আর তাঁর ছোট ভাই জাগো নিউজকে বলেছেন, সাত বছর ধরে গরুটিকে লালন-পালন করা হয়েছে।

হাটে না তুলে খামার থেকে বিক্রির চেষ্টা
জাগো নিউজ জানায়, বিশালাকৃতির ষাঁড়টি হাটে তুলতে গেলে যেকোনো সময় আঘাত পাওয়ার আশঙ্কা ছিল। তা ছাড়া গরমে ও ভিড়ে ক্লান্ত হয়ে এটি শুকিয়েও যেতে পারত। এই আশঙ্কা থেকে মালিকপক্ষ ষাঁড়টি হাটে না তুলে খামার থেকেই বিক্রির সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। কিন্তু ঈদের আগমুহূর্ত পর্যন্ত খামারে যে দু-একজন ক্রেতা এসেছিলেন, তাঁরা আশানুরূপ দাম বলেননি।
প্রথম আলোর প্রতিবেদনে খামারমালিক মজমুল হোসেন প্রামাণিক বলেন, দৈর্ঘ্য-প্রস্থের হিসাবে ষাঁড়টির ওজন এক হাজার কেজির কম নয়। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, আগের বছর ঈদের আগে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, চুয়াডাঙ্গা ও যশোরের পাইকারেরা স্থানীয় ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে যোগাযোগ করে সাত থেকে আট লাখ টাকা পর্যন্ত দাম প্রস্তাব করেছিলেন, তবে তিনি চেয়েছিলেন ১০ লাখ টাকা। আফসোসের সুরে তিনি বলেন, ‘ঈদের বাজারে এমন দাম অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু এবার একজন পাইকারও দাম বললেন না।’
মজমুল হোসেন প্রথম আলোকে আরও জানান, এবারের ঈদের মৌসুমে তাঁর খামারের আরও ছয়টি গরু ৭ লাখ ৭০ হাজার টাকায় বিক্রি হয়েছে। কিন্তু প্রত্যাশিত মূল্য না পাওয়ায় বড় ষাঁড়টি তিনি বিক্রি করছেন না। তাঁর ভাষায়, ‘কম দামে বিক্রি করলে অনেক লোকসান হবে। এখনো কেউ উপযুক্ত দাম দিলে আমরা উপকৃত হতাম। এত বড় গরু নিয়ে এখন বিপদেই আছি।’ স্থানীয় গরুর পাইকার সলু মিয়া পত্রিকাটিকে বলেন, এত বড় গরুর ক্রেতা ওই এলাকায় খুব কম, তাই ষাঁড়টি বিক্রি করতে সমস্যা হচ্ছে। প্রথম আলো আরও জানায়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘জায়েদ খান’ নামে ষাঁড়টির ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে পড়ায় প্রতিদিনই অনেকে খামারে এসে এর সঙ্গে ছবি ও ভিডিও করছিলেন।
সেদিন বিকেলের মধ্যে মালিকপক্ষ সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করে। খামারের স্বত্বাধিকারী মজমুল প্রামাণিকের ছোট ভাই জনি জাগো নিউজকে জানান, ষাঁড়টির চেহারা ও আকার অনুযায়ী প্রত্যাশিত দাম না পাওয়ায় এটি আর বিক্রি করা হয়নি। তিনি বলেন, ‘দীর্ঘ সাত বছর ধরে পরম যত্নে গরুটিকে লালন-পালন করেছি। যেহেতু চাহিদা অনুযায়ী দাম পাওয়া গেল না, তাই এটি আমরা নিজেরাই কোরবানি করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’
মণ, ফিতার মাপ আর আনুমানিক মাংসের হিসাব
ব্যাপারীরা ষাঁড়টির মাংসের যে অনুমান দিয়েছিলেন, তা মণের হিসাবে। মণ উপমহাদেশের একটি প্রচলিত ওজনের একক। ব্রিটিশ ভারতে এটি প্রথম প্রমিত করা হয় ১৮৩৩ সালে বেঙ্গল প্রেসিডেন্সিতে, ১০০ ট্রয় পাউন্ড ধরে; স্বাধীনতার পর ভারত ও পাকিস্তানে মেট্রিক পদ্ধতিতে এক মণ ধরা হয় ৩৭.৩২৪২ কেজি। বাংলাদেশে সাধারণভাবে এক মণ বলতে ৪০ কেজি বোঝায়, আর পুরোনো হিসাবে এক মণ সমান ৪০ সের।
জাগো নিউজের প্রতিবেদনে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, ‘জায়েদ খান’ তখনো ওজন স্কেলে মাপা হয়নি; ২৬ থেকে ২৭ মণ নিট মাংসের সংখ্যাটি খামারে আসা ব্যাপারী ও পাইকারদের চোখের অনুমান। প্রথম আলোকে মালিক যে ‘এক হাজার কেজির কম নয়’ বলেছেন, সেটিও দৈর্ঘ্য-প্রস্থের মাপ থেকে করা হিসাব, যন্ত্রে মাপা ওজন নয়। কোরবানির মৌসুমে বড় ষাঁড়ের ক্ষেত্রে এমন অনুমাননির্ভর ওজনই সাধারণত প্রচারে আসে। যেমন, ২০২৫ সালের ঈদের আগে পাবনার সাঁথিয়ার ‘মোহন রাজ’ নামের একটি ষাঁড়কে প্রথম আলো প্রায় ২৫ মণ, অর্থাৎ এক হাজার কেজি ওজনের বলে উল্লেখ করেছিল।
কৃত্রিম প্রজনন: সংকর গরুর পেছনের প্রযুক্তি
খামারের দাবি অনুযায়ী ‘জায়েদ খান’-এর জন্ম কৃত্রিম প্রজননে। বাংলাদেশে গবাদিপশুর কৃত্রিম প্রজনন বা এআই কর্মসূচির শুরু ১৯৫৮ সালে, সাভারে কেন্দ্রীয় গো-প্রজনন ও দুগ্ধ খামার প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে। ২০২৪ সালে ‘ভেটেরিনারি সায়েন্সেস: রিসার্চ অ্যান্ড রিভিউস’ সাময়িকীতে প্রকাশিত সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের একটি প্রবন্ধে বলা হয়েছে, এই কর্মসূচির লক্ষ্য ছিল দেশের পরিবেশ উপযোগী সংকরায়ণের মাধ্যমে দেশি গরুর উন্নয়ন। ১৯৬৯ থেকে ১৯৮২ সাল পর্যন্ত জার্মান বিশেষজ্ঞরা সাভারের খামারে হালচাষ ও দুধের উপযোগী জাত তৈরির কাজ করেন, আর জার্মানি, যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, অস্ট্রেলিয়া ও জাপান থেকে হিমায়িত বীজ আমদানি করে দেশি গরুর উন্নয়নে ব্যবহার করা হয়।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের ২০০৬ সালে ‘লাইভস্টক রিসার্চ ফর রুরাল ডেভেলপমেন্ট’ সাময়িকীতে প্রকাশিত গবেষণায় কৃত্রিম প্রজননকে গরুর জিনগত উন্নয়নের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কৌশল বলা হয়েছে, কারণ বাছাই করা অল্প কয়েকটি ষাঁড়ের বীজ দিয়ে বছরে হাজার হাজার গাভিকে প্রজনন করানো যায়। ওই গবেষণায় সাভারের কেন্দ্রীয় গো-প্রজনন কেন্দ্রের সংকর ষাঁড় নিয়ে কাজ করা হয়, যেগুলোর কয়েকটি দেশি গরু ও ফ্রিজিয়ানের সংকর এবং একটি শাহিওয়াল ও ফ্রিজিয়ানের সংকর। সেখানে সংগৃহীত বীজ পাতলা করে ঠান্ডা করা হতো, ০.২৫ মিলিলিটারের ছোট নলে (স্ট্র) ভরে মাইনাস ১৯৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসে তরল নাইট্রোজেনে সংরক্ষণ করা হতো, তারপর জেলা কৃত্রিম প্রজনন কেন্দ্র হয়ে উপকেন্দ্রে পৌঁছাত। গবেষকেরা দেখেছিলেন, পাতলা করা, ঠান্ডা করা, হিমায়ন ও দীর্ঘ সংরক্ষণের প্রতিটি ধাপে শুক্রাণুর সচলতা কমে যায়, তাই হিমায়ন পদ্ধতি এবং পরিবহন ও সংরক্ষণের সময় বীজের যত্ন বাড়ানোর সুপারিশ করেছিলেন তাঁরা।
লালমনিরহাটের প্রতিবেশী ঠাকুরগাঁও জেলায় ২০২১ সালের ১ জুলাই থেকে ২০২২ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত কৃত্রিম প্রজনন করানো ৩৬০টি গাভির তথ্য নিয়ে করা ওই ২০২৪ সালের গবেষণায় দেখা যায়, ২৫০টি গাভির আর গরম হওয়ার লক্ষণ দেখা যায়নি; গবেষকেরা এই সাফল্যের হার ৬৯.৪৪ শতাংশ বলে উল্লেখ করেন। সেখানে প্রজনন করানো গাভিগুলো ছিল দেশি জেবু জাত এবং হলস্টেইন ফ্রিজিয়ান ও শাহিওয়ালের সঙ্গে তাদের সংকর। গবেষকদের মতে, দেশি গরুর দুধ উৎপাদন উন্নত জাতের চেয়ে কম হওয়ায় কৃত্রিম প্রজনন যত ছড়াচ্ছে, দেশে সংকর গরুর সংখ্যাও তত বাড়ছে। তবে দুর্বল পুষ্টি, পালন-পদ্ধতির ঘাটতি ও অবকাঠামোর অভাবে এ কর্মসূচির সাফল্য সন্তোষজনক নয় বলেও তাঁরা মত দেন।

লালমনিরহাট ও আদিতমারী: সীমান্তঘেঁষা কৃষিনির্ভর জনপদ
লালমনিরহাট রংপুর বিভাগের একটি জেলা, আয়তন ১,২৪৭.৩৭ বর্গকিলোমিটার। বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী, জেলার উত্তরে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, দক্ষিণে রংপুর জেলা, পূর্বে কুড়িগ্রাম জেলা ও পশ্চিমবঙ্গ এবং পশ্চিমে নীলফামারী ও রংপুর। জেলাটি গঠিত হয় ১৯৮৪ সালে। প্রধান নদী ধরলা ও তিস্তা। পাঁচ উপজেলার মধ্যে হাতীবান্ধা সবচেয়ে বড় আর আদিতমারী সবচেয়ে ছোট। ২০১১ সালের আদমশুমারিতে জেলার জনসংখ্যা ছিল ১২ লাখ ৫৬ হাজার ৯৯। জেলার মানুষের আয়ের প্রধান উৎস কৃষি, বাংলাপিডিয়ার হিসাবে ৭২.৭৮ শতাংশ।
আদিতমারী উপজেলার আয়তন ১৯৫.০৩ বর্গকিলোমিটার। এর উত্তরে পশ্চিমবঙ্গ, দক্ষিণে গঙ্গাচড়া ও লালমনিরহাট সদর, পূর্বে লালমনিরহাট সদর এবং পশ্চিমে কালীগঞ্জ উপজেলা। ১৯৮০ সালে কালীগঞ্জ থানার কিছু অংশ নিয়ে আদিতমারী থানা গঠিত হয়, যা ১৯৮৩ সালের ৭ নভেম্বর উপজেলায় উন্নীত হয়। ২০১১ সালের আদমশুমারিতে উপজেলার জনসংখ্যা ছিল ২ লাখ ২৪ হাজার ৭৯৬। উপজেলায় ইউনিয়ন আটটি; ‘জায়েদ খান’-এর খামার যে সাপ্টিবাড়ি ইউনিয়নে, সেটি তার একটি। ধরলা, তিস্তা ও স্বর্ণামতী নদী এবং নামুরির বিল এ উপজেলার উল্লেখযোগ্য জলাশয়।
বাংলাপিডিয়ার তথ্যে আদিতমারীর মানুষের আয়ের ৭৭.৩২ শতাংশ আসে কৃষি থেকে। প্রধান ফসল ধান, তামাক, আলু, ভুট্টা, সরিষা ও সবজি; প্রধান ফল কাঁঠাল, সুপারি, আম, লিচু, জাম্বুরা ও নারিকেল। উপজেলায় বেশ কিছু মৎস্য, দুগ্ধ ও হাঁস-মুরগির খামার রয়েছে। হাট-বাজার ১২টি, এর মধ্যে নামুরির হাট, দুর্গাপুর, ভেলাবাড়ী ও কুমরির হাট উল্লেখযোগ্য।

রংপুর বিভাগ ও লালমনিরহাটে কোরবানির পশুর হিসাব
ঈদের আগে ১৭ মে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের প্রতিবেদনে বিভাগীয় প্রাণিসম্পদ দপ্তরের হিসাব তুলে ধরা হয়। তাতে বলা হয়, রংপুর বিভাগের আট জেলায় সে বছর প্রায় ২০ লাখ ২৩ হাজার কোরবানির পশু প্রস্তুত করা হয়েছে এবং স্থানীয় চাহিদা মিটিয়েও প্রায় পাঁচ লাখ ৫৬ হাজারের বেশি পশু উদ্বৃত্ত থাকবে। বিভাগে ছোট-বড় মিলিয়ে খামারি প্রায় ২১ হাজার। প্রস্তুত পশুর মধ্যে গরুর সংখ্যাই সবচেয়ে বেশি, এর বাইরে আছে মহিষ, ছাগল ও ভেড়া।
ওই হিসাবে লালমনিরহাট জেলায় ষাঁড়, বলদ, গাভি, মহিষ, ছাগল ও ভেড়া মিলিয়ে কোরবানিযোগ্য পশু ছিল দুই লাখ ছয় হাজার ৪৬২টি, আর জেলার কোরবানির চাহিদা ধরা হয়েছিল এক লাখ ৫২ হাজার ৮৮৪টি। বিভাগের অন্য জেলার হিসাবও প্রতিবেদনে ছিল:
- রংপুর: পশু তিন লাখ ৬৬ হাজার ৫৯১টি, চাহিদা দুই লাখ ২৬ হাজার ৯৯৯টি।
- কুড়িগ্রাম: পশু তিন লাখ ৩৬ হাজার ৯১৯টি, চাহিদা দুই লাখ ৬১ হাজার ২৪৬টি।
- দিনাজপুর: পশু চার লাখ ২৬ হাজার ৫২৩টি, চাহিদা দুই লাখ ৭৩ হাজার ২৬২টি।
- নীলফামারী: পশু দুই লাখ ৮২ হাজার ৮৫০টি, চাহিদা দুই লাখ ৩২ হাজার ৬৭৬টি।
- গাইবান্ধা: পশু এক লাখ ৭৭ হাজার ৯৮৩টি, চাহিদা এক লাখ ৩৭ হাজার ৫০০টি।
- পঞ্চগড়: পশু এক লাখ ৩০ হাজার ৩০৩টি, চাহিদা এক লাখ ৩ হাজার ৬৫০টি।
- ঠাকুরগাঁও: পশু ৯৫ হাজার ৪৩৬টি, চাহিদা ৭৮ হাজার ৮৪৩টি।
প্রতিবেদনে রংপুর বিভাগের খামারিরা ক্রেতা কম থাকায় দুশ্চিন্তার কথা জানান এবং ঈদের শেষ সময়ে ক্রেতা বাড়বে বলে আশা করেন। লালমনিরহাটসহ সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে ভারতীয় গরু অবৈধভাবে ঢোকা ঠেকাতে বিজিবি ও পুলিশের কড়া নজরদারির দাবিও জানান তাঁরা। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের রংপুর বিভাগীয় পরিচালক ডা. মো. আব্দুল হাই সরকার বলেছিলেন, দেশে কোরবানির জন্য পর্যাপ্ত দেশীয় পশু প্রস্তুত আছে এবং চোরাচালান রোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ায় খামারিরা ন্যায্য দাম পাবেন বলে আশা করা হচ্ছে।
দেশজুড়ে কোরবানির পশুর জোগান ও চাহিদা
৩ মে সচিবালয়ে সংবাদ সম্মেলনে কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ এবং খাদ্যমন্ত্রী আমিন উর রশিদ ইয়াছিন প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের হিসাব তুলে ধরেন। সে অনুযায়ী দেশে কোরবানিযোগ্য পশু প্রস্তুত ছিল ১ কোটি ২৩ লাখ ৩৩ হাজার ৮৪০টি, আর সম্ভাব্য চাহিদা ১ কোটি ১ লাখ ৬ হাজার ৩৩৪টি; উদ্বৃত্ত থাকার সম্ভাবনা প্রায় ২২ লাখ ২৭ হাজার ৫০৬টি। প্রস্তুত পশুর মধ্যে গরু ও মহিষ প্রায় ৫৬ লাখ ৯৫ হাজার ৮৭৮টি, ছাগল ও ভেড়া ৬৬ লাখ ৩২ হাজার ৩০৭টি এবং উট-দুম্বাসহ অন্যান্য পশু ৫ হাজার ৬৫৫টি। মন্ত্রী জানান, সে বছর কোরবানির জন্য বিদেশ থেকে পশু আমদানির প্রয়োজন হবে না।
২২ মে বাংলা ট্রিবিউনের এক প্রতিবেদনে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের হিসাব উল্লেখ করে বলা হয়, বিভাগভেদে জোগানে বৈষম্য রয়েছে। ঢাকা বিভাগে সম্ভাব্য চাহিদা ২১ লাখ ৫৮ হাজার ৮৬৯টি হলেও প্রাপ্যতা ১৪ লাখ ৪৩ হাজার ৯৪২টি, চট্টগ্রামেও প্রায় ৫০ হাজার পশুর ঘাটতি; অন্যদিকে রাজশাহী, রংপুর, খুলনা ও ময়মনসিংহ বিভাগে বড় উদ্বৃত্ত। তাই রাজধানীর বাজারের বড় অংশ উত্তরাঞ্চল থেকে আসার কথা। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের তথ্যে সারা দেশে সে বছর তিন হাজার ৬০০টির বেশি পশুর হাট বসার কথা ছিল।
আগের বছরের অভিজ্ঞতাও একই রকম ছিল। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের ২০২৫ সালের ১০ জুনের বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ঈদুল আজহায় দেশে ৯১ লাখ ৩৬ হাজার ৭৩৪টি পশু কোরবানি হয়, যার মধ্যে গরু-মহিষ ৪৭ লাখ ৫ হাজার ১০৬টি। সে বছর অবিক্রীত ছিল ৩৩ লাখ ১০ হাজার ৬০৩টি পশু। অধিদপ্তরের ৯ বছরের হিসাবে সবচেয়ে বেশি পশু কোরবানি হয়েছিল ২০১৯ সালে, এক কোটি ছয় লাখের বেশি।
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের ‘লাইভস্টক ইকোনমি অ্যাট আ গ্ল্যান্স ২০২৩-২৪’ অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে দেশে গরুর সংখ্যা ছিল ২৫০.১৩ লাখ, মহিষ ১৫.২৪ লাখ, ছাগল ২৭১.১৭ লাখ ও ভেড়া ৩৯.০৩ লাখ। ওই বছর মাংস উৎপাদন হয় ৯২.২৫ লাখ মেট্রিক টন। স্থির মূল্যে দেশের মোট দেশজ উৎপাদনে প্রাণিসম্পদ খাতের অবদান ছিল ১.৮০ শতাংশ এবং কৃষি খাতের জিডিপিতে এর অংশ ১৬.৩৩ শতাংশ। একই সারণিতে কর্মসংস্থানে এ খাতের অংশ সরাসরি ২০ শতাংশ এবং আংশিক ৫০ শতাংশ দেখানো হয়েছে।
বড় গরুর ক্রেতা কম, খামার থেকেই বিক্রির ঝোঁক
২০২৬ সালের ঈদের আগে একাধিক প্রতিবেদনে বড় গরুর চাহিদা কমার কথা আসে। বাংলা ট্রিবিউনের ২২ মের প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশ ডেইরি ফার্মার্স অ্যাসোসিয়েশনের জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি নিলয় হোসেন কয়েক দিন আগে সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, এবার বড় গরুর চাহিদা কমে গেছে এবং খাদ্য ও পরিবহন ব্যয় বাড়ায় বড় খামারিরা বেশি ঝুঁকিতে পড়েছেন। ঢাকার উত্তরখানের এক খামারি একই প্রতিবেদনে বলেন, ছোট গরুর চাহিদা বেশি থাকায় সেগুলোর দাম তুলনামূলক বেশি, তবে বড় গরুর দাম তুলনামূলক কম।
আগের বছরও এমন চিত্র দেখা গিয়েছিল। ২০২৫ সালের ২৮ মে প্রথম আলো পাবনার বেড়া ও সাঁথিয়া থেকে জানায়, বড় বা বিশেষ আকারের গরু পালনে সাধারণ গরুর চেয়ে কয়েক গুণ বেশি খরচ হলেও সে বছর হাটে এগুলোর চাহিদা ছিল না বললেই চলে; ক্রেতাদের আগ্রহ ছিল মাঝারি আকারের গরুতে। সাঁথিয়ার শামুকজানি গ্রামের ‘মোহন রাজ’ নামের ষাঁড়টির মালিক ১০ লাখ টাকা আশা করলেও শেষে ছয় লাখ টাকায় বিক্রি করেন বলে পত্রিকাটি জানায়।
হাটে না তুলে বাড়ি বা খামার থেকে পশু বিক্রির প্রবণতাও সে সময় বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে আসে। ২২ মে প্রথম আলো যশোর সদর উপজেলার কয়েকটি গ্রাম থেকে জানায়, সেখানকার খামারিরা অন্তত পাঁচ বছর ধরে গরু হাটে তোলেন না। উদ্যোক্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, হাটে তোলার পর অন্য পশুর সংস্পর্শে রোগাক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে, আর একটি এঁড়ে গরু বাজারে নিতে কমপক্ষে তিনজন মানুষ লাগে। ২৭ মে প্রথম আলোর আরেক প্রতিবেদনে বলা হয়, ফেসবুকে ছবি-ভিডিও দেখে দরদাম ঠিক করে পরে সরাসরি খামারে গিয়ে পশু কেনেন অনেক ক্রেতা; করোনাকালে শুরু হওয়া অনলাইন পশুর হাট বদলে গেছে ‘ডিজিটাল প্রচার, সরাসরি বিক্রি’ মডেলে। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য উদ্ধৃত করে পত্রিকাটি জানায়, ২০২৪ সালে দেশের বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্ম থেকে ৫ লাখ ৫ হাজার ৪৯৪টি পশু বিক্রি হয়েছিল।
‘জায়েদ খান’-এর মালিকপক্ষও হাটের ঝুঁকি এড়াতে খামার থেকে বিক্রির পথ বেছে নিয়েছিল, আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ষাঁড়টির ছবি-ভিডিও ছড়িয়েও পড়েছিল। তবু প্রথম আলোকে স্থানীয় পাইকার যেমন বলেছিলেন, এত বড় গরুর ক্রেতা ওই এলাকায় কম; শেষ পর্যন্ত চাহিদামতো দাম আসেনি।
কোরবানির পশু নিয়ে ইসলামের বিধান
ইসলামের বিধান অনুযায়ী, ঈদুল আজহায় কোরবানি দেওয়া যায় গৃহপালিত চতুষ্পদ পশু দিয়ে: উট, গরু, মহিষ, বকরি বা ছাগল, ভেড়া ও দুম্বা। ইত্তেফাকের ১১ মের একটি ধর্মীয় প্রতিবেদনে বলা হয়, এগুলো ছাড়া অন্য কোনো পশু দিয়ে কোরবানি বৈধ নয়। কোরবানির সময় শুরু হয় ঈদুল আজহার নামাজের পর থেকে এবং তা থাকে জিলহজ মাসের ১২ তারিখ সূর্যাস্ত পর্যন্ত; এর আগে বা পরে জবাই করলে কোরবানি আদায় হয় না। জবাই করতে হয় শরিয়ত অনুযায়ী, আল্লাহর নামে, এবং ছুরি ধারালো রাখতে হয়, যাতে পশুর কষ্ট কম হয়।
প্রথম আলোর ২৫ মের একটি ধর্মীয় প্রতিবেদনে সহিহ মুসলিমের হাদিসের সূত্রে বলা হয়, কোরবানির গরু বা মহিষের বয়স অন্তত দুই বছর এবং ছাগলের এক বছর হওয়া বাধ্যতামূলক, আর পশুর চোখ, কান, পা বা অন্য অঙ্গে বড় ধরনের ত্রুটি থাকা চলবে না। বাংলা ট্রিবিউনের ১৫ মের প্রতিবেদনে জামে তিরমিজির হাদিস উদ্ধৃত করে বলা হয়, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সাহাবিরা একটি গরুতে সাতজন শরিক হয়ে কোরবানি করেছেন; এ কারণে বাংলাদেশে একটি গরু বা মহিষে সাত ভাগে কোরবানির প্রচলন আছে। কোরবানির মাংস সাধারণত তিন ভাগ করে এক ভাগ নিজের, এক ভাগ আত্মীয়দের এবং এক ভাগ দরিদ্রদের মধ্যে বণ্টনের রীতি প্রচলিত।
নিজের খামারের পশু নিজে কোরবানি দেওয়াও এই বিধানের মধ্যেই পড়ে। ইত্তেফাকের প্রতিবেদনে বলা হয়, কোরবানির পশু নিজ হাতে জবাই করা উত্তম, তবে অন্যকে দিয়েও জবাই করানো যায়। বিক্রি না হওয়া ‘জায়েদ খান’-কে তাই ঈদের দিনে মালিকপক্ষ নিজেরাই কোরবানি দেওয়ার সিদ্ধান্ত জানিয়েছিল।
ছবি: Wasiul Bahar / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, প্রথম আলো, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম, বাংলা ট্রিবিউন, দৈনিক ইত্তেফাক, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর (লাইভস্টক ইকোনমি অ্যাট আ গ্ল্যান্স ২০২৩-২৪), বাংলাপিডিয়া, লাইভস্টক রিসার্চ ফর রুরাল ডেভেলপমেন্ট (২০০৬), ভেটেরিনারি সায়েন্সেস: রিসার্চ অ্যান্ড রিভিউস (২০২৪), উইকিপিডিয়া




মন্তব্য
(০)