শীত পড়লে গ্রামাঞ্চলে খেজুরের রস খাওয়ার ধুম পড়ে। কিন্তু কাঁচা রস থেকে নিপাহ ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি আছে, তাই ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে রস সংগ্রহের মৌসুমের শুরুতে এ নিয়ে সতর্ক থাকা জরুরি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্যে, বাংলাদেশে প্রায় প্রতিবছর ডিসেম্বর থেকে মে মাসের মধ্যে নিপাহর প্রাদুর্ভাব দেখা যায়, আর দেশে খেজুরের রস সংগ্রহ হয় নভেম্বর থেকে মার্চ পর্যন্ত।
নিপাহ ভাইরাস কী
নিপাহ একটি জুনোটিক ভাইরাস, অর্থাৎ প্রাণী থেকে মানুষে ছড়ায়; দূষিত খাবারের মাধ্যমে এবং এক মানুষ থেকে আরেক মানুষেও ছড়াতে পারে। রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) স্বাস্থ্যবার্তা অনুযায়ী, ১৯৯৮-৯৯ সালে মালয়েশিয়ার সুঙ্গাই নিপাহ গ্রামে এ রোগ প্রথম ধরা পড়ে, সেই গ্রামের নামেই ভাইরাসটির নাম। বাংলাদেশে এটি প্রথম শনাক্ত হয় ২০০১ সালে। ডব্লিউএইচওর ২০২৩ সালের প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশে বছরে রোগী ছিল শূন্য থেকে সর্বোচ্চ ৬৭ জন (২০০৪ সালে)।
ডব্লিউএইচওর হিসাবে নিপাহ রোগে মৃত্যুহার ৪০ থেকে ৭৫ শতাংশ। ভাইরাসটির প্রাকৃতিক বাহক টেরোপাস গণের ফলভোজী বাদুড়, যারা নিজেরা অসুস্থ হয় না। বাংলাদেশে এই বাদুড় হলো বড় আকারের টেরোপাস জাইগান্টিয়াস।

খেজুরের রস থেকে কীভাবে ছড়ায়
রাতে গাছে বাঁধা হাঁড়িতে রস জমে। সেই সময় বাদুড় রস খায় এবং লালা, প্রস্রাব বা মলে রস দূষিত হতে পারে। জাতীয় নিপাহ নির্দেশিকা অনুযায়ী বাংলাদেশে মানুষে নিপাহ ছড়ানোর দুটি প্রধান পথ চিহ্নিত হয়েছে: ভাইরাসযুক্ত কাঁচা খেজুরের রস খাওয়া এবং আক্রান্ত রোগীর ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শ। বাদুড়ের আধখাওয়া ফল খেলে কিংবা আক্রান্ত শূকরের ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শে এলেও সংক্রমণ হতে পারে।
২০০৪ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০০৫ সালের জানুয়ারিতে টাঙ্গাইলের বাসাইলে এক প্রাদুর্ভাবে ১২ জন আক্রান্ত হন, তাঁদের ১১ জন মারা যান। ইমার্জিং ইনফেকশাস ডিজিজেস সাময়িকীতে প্রকাশিত সেই গবেষণায় দেখা যায়, রোগীদের ৬৪ শতাংশ কাঁচা রস খেয়েছিলেন, অথচ তুলনার জন্য বেছে নেওয়া সুস্থ মানুষদের মধ্যে খেয়েছিলেন ১৮ শতাংশ। ডব্লিউএইচও জানায়, ২০০১ থেকে ২০০৮ সালে বাংলাদেশের প্রায় অর্ধেক রোগী আক্রান্ত হয়েছিলেন রোগীর সেবা করতে গিয়ে।
সংক্রমণের পর সাধারণত ৪ থেকে ১৪ দিনের মধ্যে লক্ষণ দেখা দেয়, তবে ৪৫ দিন পর্যন্ত সময় লাগার ঘটনাও পাওয়া গেছে। জাতীয় নির্দেশিকা বলছে, বাংলাদেশে একবার কাঁচা রস খাওয়ার পর অসুস্থ হতে মাঝামাঝি সময় (মিডিয়ান) লেগেছে ৭ দিন।

লক্ষণ, রোগনির্ণয় ও চিকিৎসা
শুরুতে জ্বর, মাথাব্যথা, পেশিতে ব্যথা, বমি ও গলাব্যথা হতে পারে। এরপর মাথা ঘোরা, ঝিমুনি, অসংলগ্ন আচরণ ও মস্তিষ্কের প্রদাহ বা এনকেফালাইটিসের লক্ষণ দেখা দেয়। কারও কারও নিউমোনিয়া ও তীব্র শ্বাসকষ্ট হয়। গুরুতর ক্ষেত্রে খিঁচুনি হয় এবং ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে রোগী অচেতন হয়ে পড়েন। যাঁরা বেঁচে যান, তাঁদের প্রায় ২০ শতাংশের খিঁচুনির সমস্যা বা আচরণে পরিবর্তনের মতো স্নায়বিক জটিলতা থেকে যায়।
রোগ নিশ্চিত করতে রক্ত বা মস্তিষ্ক-মেরুরসে (সিএসএফ) আইজিএম অ্যান্টিবডির এলাইজা পরীক্ষা এবং গলার সোয়াব, প্রস্রাব বা সিএসএফের আরটি-পিসিআর পরীক্ষা করা হয়। নিপাহর কোনো নির্দিষ্ট ওষুধ বা টিকা নেই; শ্বাসতন্ত্র ও স্নায়ুর জটিলতায় নিবিড় সহায়ক চিকিৎসাই ভরসা।
সংক্রমণ এড়াতে যা করবেন
আইইডিসিআর, জাতীয় নির্দেশিকা ও ডব্লিউএইচওর পরামর্শ:
- খেজুরের কাঁচা রস কোনোভাবেই খাবেন না। ফোটানো রস, খেজুরের গুড় ও রান্না করা রসের পায়েস নিরাপদ; আইইডিসিআর জানায়, ৭০ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার বেশি তাপে নিপাহ ভাইরাস নষ্ট হয়।
- ফল ভালো করে ধুয়ে, সম্ভব হলে খোসা ছাড়িয়ে খান; বাদুড়ে খাওয়া বা আধখাওয়া ফল ফেলে দিন।
- রস সংগ্রহের সময় গাছের চাঁছা অংশ ও হাঁড়ি বাঁশের চাটাই বা পলিথিনের আবরণে ঢেকে রাখুন। ২০১২ সালে প্লস ওয়ান সাময়িকীতে প্রকাশিত গবেষণায় এমন আবরণ দেওয়া গাছে মাত্র ২ শতাংশ রাতে বাদুড় রসের নাগাল পায়, আবরণহীন গাছে ৮৩ শতাংশ রাতে।
- রোগীর সংস্পর্শে আসার পর সাবান-পানি দিয়ে হাত ভালো করে ধুয়ে নিন, রোগী থেকে অন্তত এক হাত দূরত্ব রাখুন, আলাদা বিছানায় ঘুমান এবং রোগীর ব্যবহার্য জিনিস আলাদা রাখুন।
- নিপাহর লক্ষণ দেখা দিলে রোগীকে দ্রুত নিকটস্থ সরকারি হাসপাতালে নিয়ে যান।

ছবি: Azaman666 / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (নিপাহ ভাইরাস তথ্যপত্র; বাংলাদেশে নিপাহ প্রাদুর্ভাব প্রতিবেদন, ফেব্রুয়ারি ২০২৩), আইইডিসিআর (নিপাহ স্বাস্থ্যবার্তা), স্বাস্থ্য অধিদপ্তর (নিপাহ ব্যবস্থাপনা, প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণের জাতীয় নির্দেশিকা), ইমার্জিং ইনফেকশাস ডিজিজেস (লুবি ও অন্যান্য, ২০০৬), প্লস ওয়ান (খান ও অন্যান্য, ২০১২)





মন্তব্য
(০)