সরাসরিবাজারদর
আটা (প্যাকেটজাত)৫৮—আদা - আমদানিকৃত১৬৭—আদা - দেশী১৫৪—আমন চাল - মাঝারি৫৬—আমন চাল - মোটা৪৮—আমন চাল - সরু৭২—আয়োডিনযুক্ত লবণ (প্যাকেটজাত)৩২—কাঁচা মরিচ২১৮—খামারের মুরগী১৬২—খাসী৯০০—চিনি (দেশী)১৩২—ছোলা - গোটা৮৫—ডিম ফার্ম - লাল৪৭—পেঁয়াজ - দেশী৬০—বোরো চাল - মাঝারি৫৫—বোরো চাল - মোটা৪৭—বোরো চাল - সরু৬৬—মাংসঃ– গরু৭২৯—মুগ ডাল১২২—রসুন - আমদানিকৃত১৯২—রসুন - দেশী১৭৩—সয়াবিন তেল১৬৩—
হালনাগাদ ১৬ অক্টোবর ২০২৬
ঢাকা২৮°পরিষ্কার আকাশআর্দ্রতা ৬২%বাতাস ৫ কিমি/ঘ

মৌলভীবাজারের কোরবানির হাটে ছোট ও মাঝারি গরুর চাহিদা বেশি, দাম নিয়ে দর-কষাকষি

২০২৬ সালের ঈদুল আজহার পাঁচ দিন আগে মৌলভীবাজারের পশুর হাটে ছোট ও মাঝারি গরুর চাহিদা ছিল সবচেয়ে বেশি। ক্রেতারা বলছিলেন, এসব গরুর জন্য বিক্রেতারা বেশি দাম চাইছেন; জেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরের হিসাবে চাহিদার চেয়ে বেশি, ৭৪ হাজার ৫৮৪টি পশু প্রস্তুত ছিল।

মৌলভীবাজারের কোরবানির হাটে ছোট ও মাঝারি গরুর চাহিদা বেশি, দাম নিয়ে দর-কষাকষি
লাইভস্টক

ঈদুল আজহার পাঁচ দিন আগে, ২০২৬ সালের ২৩ মে, মৌলভীবাজার জেলার পশুর হাটগুলোতে কোরবানির পশুর বেচাকেনা শুরু হয়ে গিয়েছিল। জেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরের হিসাবে সেবার জেলায় প্রায় ৭৪ হাজার দেশীয় পশু কোরবানির জন্য প্রস্তুত রাখা হয়েছিল, যা জেলার চাহিদার চেয়ে বেশি। হাটে আসা ক্রেতারা জাগো নিউজকে বলেছিলেন, বড় গরুর দাম তুলনামূলক কম থাকলেও ছোট ও মাঝারি আকারের গরুর জন্য বিক্রেতারা অনেক বেশি দাম চাইছেন। আগের বছরগুলোর মতো সেবারও বাজারে চাহিদা ছিল সবচেয়ে বেশি এই ছোট ও মাঝারি গরুরই।

জেলার বিভিন্ন হাটের ক্রেতাদের ভাষ্য ছিল, সে বছর গরুর দাম সার্বিকভাবে কম, কিন্তু ছোট ও মাঝারি গরুতে দাম তুলনামূলক বেশি। বড় গরুর চাহিদা ছিল অনেক কম। ক্রেতারা জানান, গ্রামাঞ্চলে সবচেয়ে বেশি কোরবানি হয় ছোট ও মাঝারি গরু। অন্যদিকে খামারি ও কৃষকেরা জানান, মৌলভীবাজারের সাতটি উপজেলায় ছোট-বড় মিলিয়ে অসংখ্য খামারি রয়েছেন, তাঁরা গরু হাটে তুলতে শুরু করেছেন এবং কেনাবেচাও শুরু হয়েছে। তাঁদের অভিযোগ ছিল, ক্রেতারা ন্যায্য দাম দিতে চান না। আর গোখাদ্যের দাম বেশি থাকায় গরুর দামও বেশি চাইতে হচ্ছে বলে তাঁরা জানান।

সরেজমিনে জেলার বিভিন্ন হাট ঘুরে জাগো নিউজের প্রতিবেদক দেখেছিলেন, ঈদ সামনে রেখে হাটে প্রচুর গরু উঠেছে, কিন্তু বিক্রি হচ্ছে কম। বিক্রেতারা বেশি দাম চাওয়ায় অনেক ক্রেতা কিনতে পারছিলেন না, বিশেষ করে ছোট ও মাঝারি গরুর ক্ষেত্রে।

হাটে ক্রেতা ও খামারির অভিজ্ঞতা


হাটে দর-কষাকষির চিত্রটি উঠে এসেছিল ক্রেতা সিয়াম চৌধুরীর কথায়। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, তিনি ৯৫ হাজার টাকা দিয়ে কোরবানির গরু কিনেছেন। বিক্রেতারা দাম ছাড়তে রাজি ছিলেন না। প্রথমে গরুটির দাম তাঁর কাছে ১ লাখ ৩০ হাজার টাকা চাওয়া হয়েছিল, অথচ তাঁর ধারণায় গরুটির বাজারমূল্য ৯০ হাজার টাকার মতো। পরে দরদাম করে তিনি গরুটি কিনতে পেরেছেন।

বিক্রেতাদের দিকের চিত্রও ছিল ভিন্ন। জেলার খামারি সাইদুল ইসলাম বলেন, তাঁর খামারে ৮টি গরু আছে, সবগুলোই কোরবানির জন্য প্রস্তুত করেছেন। তার মধ্যে মাত্র দুটি গরু বিক্রি করতে পেরেছেন, তবে আশানুরূপ দাম পাননি। তাঁর ভাষায়, ক্রেতারা গরুর দাম কম বলছেন।

জেলার আদমপুর বাজার, টেংরা বাজার, ব্রাহ্মণবাজার, শমশেরনগর বাজার ও ভৈরব বাজারসহ কয়েকটি বড় পশুর হাটে দেখা গিয়েছিল, স্থানীয় পাইকারেরা কৃষকের কাছ থেকে একটি-দুটি করে গরু কিনে জেলার বড় পাইকারদের কাছে বিক্রি করছেন।

জেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরের হিসাব


জেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তর সূত্রে জাগো নিউজ জানিয়েছিল, সে বছর কোরবানির ঈদ সামনে রেখে জেলায় চাহিদার চেয়ে বেশি পশু প্রস্তুত করা হয়েছিল। জেলায় ছোট-বড় মিলিয়ে খামারি ছিলেন প্রায় ৬ হাজার ২২৫ জন। দপ্তরের হিসাবে প্রস্তুত পশুর তালিকা ছিল এমন:

  • গরু: ৩৯ হাজার ৪৮১টি
  • মহিষ: ১ হাজার ৪৪৬টি
  • ছাগল: ৩০ হাজার ৮২২টি
  • ভেড়া: ২ হাজার ৮৩৫টি

দপ্তরের হিসাবে সে বছর জেলায় কোরবানির পশুর চাহিদা ছিল ৭১ হাজার ৪৭২টি, আর প্রস্তুত করা হয়েছিল ৭৪ হাজার ৫৮৪টি পশু।

জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. আশরাফুল আলম খান জাগো নিউজকে বলেন, মৌলভীবাজারে কোরবানির পশু চাহিদার চেয়ে বেশি আছে। প্রতিটি হাটে গরু পরীক্ষার জন্য মেডিকেল টিম রাখা হবে বলে তিনি জানান। তিনি আরও বলেন, খামারিদের পাশাপাশি কৃষকের ঘরেও অনেক পশু আছে, যা জেলার চাহিদা মিটিয়ে অন্য জেলায় পাঠানো হচ্ছে।

যেসব হাটে কেনাবেচা: আদমপুর থেকে ব্রাহ্মণবাজার


প্রতিবেদনে যে হাটগুলোর নাম এসেছিল, সেগুলো জেলার পুরোনো ও পরিচিত গ্রামীণ বাজার। বাংলাপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, কমলগঞ্জ উপজেলার আয়তন ৪৮৫.২৬ বর্গকিলোমিটার, প্রধান নদী ধলাই। উপজেলায় ২০টি হাট-বাজার রয়েছে, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ভানুগাছ বাজার, শমশেরনগর বাজার, মুন্সীবাজার ও আদমপুর বাজার। এই উপজেলার প্রধান ফসল আমন ও আউশ ধান, গম, আখ, চা, সরিষা, আলু, পান ও শাকসবজি; প্রধান রপ্তানি পণ্য চা, আখের গুড়, পান ও সবজি। মণিপুরি তাঁতশিল্পও এই উপজেলার পরিচিত কুটিরশিল্প। লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানও কমলগঞ্জে।

ঐতিহাসিকভাবেও আদমপুর ও শমশেরনগর নাম দুটি পুরোনো। ব্রিটিশ আমলে দক্ষিণ শ্রীহট্ট মহকুমার যে পরগনাগুলো ছিল, তার মধ্যে আদমপুর ও শমশেরনগর পরগনার নাম পাওয়া যায়। শমশেরনগরে একটি বিমানবন্দরও রয়েছে।

টেংরা বাজার রাজনগর উপজেলায়। বাংলাপিডিয়া জানায়, রাজনগরের আয়তন ৩৩৮.১৫ বর্গকিলোমিটার, সেখানে হাট-বাজার ৩২টি, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য টেংরা বাজার, মুন্সীবাজার, রাজনগর বাজার, হরিপাশা বাজার ও সরকার বাজার। রাজনগরে কাউয়াদীঘি হাওর রয়েছে; প্রধান ফসল ধান, চা, আলু, সরিষা, আদা, হলুদ ও শাকসবজি।

ব্রাহ্মণবাজার কুলাউড়া উপজেলায়। বাংলাপিডিয়ার হিসাবে কুলাউড়ার আয়তন ৫৪৫.৭৩ বর্গকিলোমিটার, সেখানে হাট-বাজার ৫১টি, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ব্রাহ্মণবাজার, কামিনীগঞ্জ, ফুলতলা ও রবির বাজার। উপজেলায় ৩৩টি চা-বাগান আছে; প্রধান ফসল ধান, গম, আলু, চা ও রাবার।

মৌলভীবাজার জেলা: চা-বাগান, হাওর ও কৃষি


মৌলভীবাজার সিলেট বিভাগের দক্ষিণ-পূর্ব প্রান্তের জেলা। বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী জেলার আয়তন ২,৭৯৯.৩৮ বর্গকিলোমিটার। উত্তরে সিলেট জেলা, দক্ষিণে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্য, পূর্বে আসাম ও ত্রিপুরা এবং পশ্চিমে হবিগঞ্জ জেলা। প্রধান নদী মনু, ধলাই, জুড়ী ও লংলা; হাকালুকি, হাইল ও কাউয়াদীঘি হাওর এই জেলার উল্লেখযোগ্য জলাভূমি। মৌলভীবাজার মহকুমা গঠিত হয় ১৯৬০ সালে, জেলা হয় ১৯৮৪ সালে।

জেলাটির সাতটি উপজেলা হলো মৌলভীবাজার সদর, কমলগঞ্জ, কুলাউড়া, রাজনগর, শ্রীমঙ্গল, বড়লেখা ও জুড়ী। ২০২২ সালের জনশুমারি অনুযায়ী জেলার জনসংখ্যা ২১ লাখ ২৩ হাজার ৪৪৭। জেলার নামের উৎস একটি বাজার: স্থানীয় ইতিহাস অনুযায়ী ১৭৭১ সালের দিকে মৌলভী সৈয়দ কুদরতউল্লাহ নিজের জমিদারির জমিতে নদীর তীরে একটি ছোট বাজার বসান, যা থেকে মৌলভীবাজার নামের উৎপত্তি।

কৃষিই এখানকার মানুষের প্রধান জীবিকা। বাংলাপিডিয়ায় উদ্ধৃত আদমশুমারির তথ্যে জেলার মানুষের প্রধান পেশার মধ্যে কৃষির অংশ ৪০.৩৭ শতাংশ, ব্যবসা ১১.২৯ শতাংশ। জেলার প্রধান পণ্যের মধ্যে আছে চা, বাঁশ, আনারস, বেত, কাঁঠাল, কমলা, আগর, রাবার, আম ও লেবু। শ্রীমঙ্গল 'দেশের চায়ের রাজধানী' নামে পরিচিত, সেখানে বাংলাদেশ চা গবেষণা ইনস্টিটিউটও অবস্থিত।

মৌলভীবাজার জেলার একটি চা-বাগান। ছবি: Sujitpauldu / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
মৌলভীবাজার জেলার একটি চা-বাগান। ছবি: Sujitpauldu / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)

আগের বছরগুলোতে মৌলভীবাজারের কোরবানির হাট


মৌলভীবাজারে কোরবানির পশুর জোগান ও চাহিদার হিসাব বছরে বছরে বদলেছে। ২০২০ সালের ৩১ জুলাই বাংলা ট্রিবিউনের প্রতিবেদনে জেলা প্রাণিসম্পদ অফিসের বরাতে বলা হয়েছিল, সে বছর জেলায় ৫০ হাজার ৯৭২টি গরু-মহিষ ও ১৯ হাজার ৩২৮টি ছাগল-ভেড়া কোরবানির জন্য প্রস্তুত ছিল, অথচ জেলায় মোট চাহিদা ছিল প্রায় ৯৫ হাজারেরও বেশি। করোনা মহামারির সেই বছরে হাটের প্রবেশমুখে হাত ধোয়ার ব্যবস্থা ও জীবাণুনাশক চেম্বার বসানো হয়েছিল। জেলা শহরের এম সাইফুর রহমান স্টেডিয়ামের বাইরের হাট ছাড়াও শ্রীমঙ্গল, কমলগঞ্জের আদমপুর ও শমশেরনগর, রাজনগর, কুলাউড়া, বড়লেখা ও জুড়ীতে হাট বসেছিল। ফেসবুক পেজভিত্তিক 'স্মার্ট হাটে'ও পশু বিক্রি হয়েছিল।

পরের বছর, ২০২১ সালের ১০ জুলাই জাগো নিউজের প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, জেলার সাতটি উপজেলায় তখন প্রায় আড়াই হাজার গবাদিপশুর খামার ছিল এবং ঈদুল আজহায় বিক্রির জন্য এসব খামারে প্রায় ৬৮ হাজার পশু মোটাতাজা করা হয়েছিল। সেই প্রতিবেদনে বলা হয়, কয়েক বছর ধরে ভারতীয় গরু আসা বন্ধ থাকায় মৌলভীবাজারে গবাদিপশু পালনকারীর সংখ্যা বেড়েছে। কঠোর লকডাউনে হাট বন্ধ থাকায় খামারিরা তখন হতাশায় ছিলেন। তৎকালীন জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা বলেছিলেন, জেলায় গবাদিপশুর চাহিদা ও উৎপাদন প্রায় সমান।

২০২৪ সালের ১২ জুন প্রথম আলোর এক প্রতিবেদনে মৌলভীবাজার সদর উপজেলার মোস্তফাপুরের একটি খামারের চিত্র উঠে এসেছিল, যেখানে স্থানীয় হাট জমার আগেই ১০০ গরুর মধ্যে ৮৫টি বিক্রি হয়ে গিয়েছিল। সেখানে গরু বিক্রি হচ্ছিল ওজন মেপে; সাধারণ দেশি গরুর প্রতি কেজির দাম ধরা হয়েছিল ৪৯০ টাকা এবং শাহিওয়ালের ৫১০ টাকা। খামারটিতে দেশি, শাহিওয়াল ও ব্রাহমা সংকর জাতের গরু পালন করা হতো; খাওয়ানো হতো কুঁড়া, খইল, ভুসি ও ঘাস। ক্রেতাদের মধ্যে মৌলভীবাজার শহর ও কুলাউড়া ছাড়াও সিলেট, চট্টগ্রাম ও ঢাকার মানুষ ছিলেন।

এই পুরোনো হিসাবগুলো থেকে বোঝা যায়, একসময় যে জেলায় চাহিদার চেয়ে পশু কম ছিল, সেখানে ২০২৬ সালে জেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তর চাহিদার চেয়ে বেশি পশুর হিসাব দিয়েছিল। তবে বিভিন্ন বছরের হিসাব একই পদ্ধতিতে করা কি না, প্রতিবেদনগুলোতে তা বলা হয়নি।

দেশজুড়ে ২০২৬ সালের কোরবানির প্রস্তুতি


মৌলভীবাজারের এই চিত্র ছিল জাতীয় প্রস্তুতিরই অংশ। ২০২৬ সালের ৩ মে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ে ঈদুল আজহা উপলক্ষে পশুর চাহিদা নিরূপণ, সরবরাহ ও পরিবহন পরিস্থিতি নিয়ে এক আন্তঃমন্ত্রণালয় সভা ও ব্রিফিং হয়। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মন্ত্রণালয় জানায়, সে বছর দেশে কোরবানির পশুর সম্ভাব্য চাহিদা ১ কোটি ১ লাখ ৬ হাজার ৩৩৪টি, বিপরীতে কোরবানিযোগ্য পশু রয়েছে ১ কোটি ২৩ লাখ ৩৩ হাজার ৮৪০টি। মন্ত্রণালয়ের হিসাবে প্রায় ২২ লাখ ২৭ হাজার ৫০৬টি পশু উদ্বৃত্ত থাকার কথা।

মন্ত্রণালয়ের দেওয়া শ্রেণিভিত্তিক হিসাব ছিল এমন:

  • গরু-মহিষ: ৫৬ লাখ ৯৫ হাজার ৮৭৮টি
  • ছাগল-ভেড়া: ৬৬ লাখ ৩২ হাজার ৩০৭টি
  • অন্যান্য প্রজাতি (উট, দুম্বা ইত্যাদি): ৫ হাজার ৬৫৫টি

সেই ব্রিফিংয়ে জানানো হয়, সারা দেশে ৩ হাজার ৬০০টির বেশি পশুর হাট বসবে। পশুবাহী ট্রাকে চাঁদাবাজি বন্ধে সরকার কঠোর থাকবে এবং হাটে ক্রেতা-বিক্রেতার নিরাপত্তায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সার্বক্ষণিক তৎপর থাকবে বলেও জানানো হয়। দেশীয় খামারিদের স্বার্থ রক্ষায় সীমান্তবর্তী এলাকায় পশুর হাট না বসানোর নীতিগত সিদ্ধান্তের কথাও জানানো হয়েছিল। এ ছাড়া অনলাইনে পশু কেনায় কোনো খাজনা বা হাসিল না নেওয়া এবং কোরবানির চামড়া নষ্ট না হওয়ার জন্য পেশাদার ও অপেশাদার কসাইদের প্রশিক্ষণের কথাও বলা হয়।

ঈদের তারিখ ঠিক হয় ১৮ মে। দেশ রূপান্তরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সেদিন সন্ধ্যায় ইসলামিক ফাউন্ডেশনের বায়তুল মোকাররম সভাকক্ষে জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটির সভায় জানানো হয়, দেশের আকাশে ১৪৪৭ হিজরির জিলহজ মাসের চাঁদ দেখা গেছে, ফলে ২৮ মে বৃহস্পতিবার মুসলিমদের অন্যতম বড় ধর্মীয় উৎসব ঈদুল আজহা পালিত হবে। সে বছর ঈদুল আজহায় সাত দিনের সরকারি ছুটিও ঘোষণা করা হয়েছিল।

ঈদুল আজহার আগে ঢাকায় বিক্রির জন্য আনা ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগল, ২০০৭ সালে তোলা। ছবি: Ragib Hasan / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
ঈদুল আজহার আগে ঢাকায় বিক্রির জন্য আনা ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগল, ২০০৭ সালে তোলা। ছবি: Ragib Hasan / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)

বাজারের গতিপ্রকৃতি: খামারিদের দাবি ও আগের বছরের হিসাব


মৌলভীবাজারের প্রতিবেদন প্রকাশের দিন সকালে, ২৩ মে, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড ঢাকার হাটগুলোর প্রস্তুতি নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। তাতে বলা হয়, আগের কয়েক বছর শেষ সময়ে পশুর দাম পড়ে যাওয়ার আশঙ্কায় থাকতেন বিক্রেতারা, কিন্তু সে বছর সেই উদ্বেগ অনেকটা কম। সীমান্তঘেঁষা হাট বন্ধ থাকা এবং ভারতের পশ্চিমবঙ্গে গরু পরিবহনে কড়াকড়ির ফলে বাজারে ভারতীয় পশুর প্রবেশ কমেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

একই প্রতিবেদনে খামারিদের দাবি তুলে ধরা হয়েছিল যে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের হিসাবের সঙ্গে বাস্তব পরিস্থিতির মিল নেই। খামারিদের ভাষ্য অনুযায়ী, ব্যাংকঋণ সংকট, পশুখাদ্যের চড়া দাম, গরু চুরি এবং রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রভাবে আগের দেড় বছরে দেশে এক হাজারের বেশি খামার বন্ধ হয়ে গেছে, শুধু চট্টগ্রামেই পাঁচ শতাধিক। এই দাবির পক্ষে অধিদপ্তরের কোনো বক্তব্য প্রতিবেদনে ছিল না। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, নিয়ম অনুযায়ী অস্থায়ী হাটগুলো ঈদের পাঁচ দিন আগে শুরু হওয়ার কথা।

আগের বছরের হিসাবও ছিল প্রেক্ষাপটের অংশ। প্রথম আলোর ২০২৫ সালের ১০ জুনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের হিসাবে ২০২৫ সালের ঈদুল আজহায় দেশে ৯১ লাখ ৩৬ হাজার ৭৩৪টি পশু কোরবানি হয়েছিল, যার মধ্যে গরু-মহিষ ৪৭ লাখ ৫ হাজার ১০৬টি এবং ছাগল-ভেড়া ৪৪ লাখ ৩০ হাজার ৬৬৮টি। তার আগের বছর, ২০২৪ সালে, কোরবানি হয়েছিল ১ কোটি ৪ লাখ ৮ হাজার ৯১৮টি পশু। ২০২৫ সালে অবিক্রীত ছিল ৩৩ লাখ ১০ হাজার ৬০৩টি পশু। মন্ত্রণালয় জানিয়েছিল, প্রতিটি উপজেলার ছোট, মাঝারি ও বড় তিনটি গ্রাম থেকে অন্তত ১ শতাংশ নমুনা নিয়ে স্তরায়িত দৈব নমুনায়নের ভিত্তিতে এই হিসাব করা হয়।

সেই হিসাবে ২০২৫ সালে দেশে সবচেয়ে কম পশু কোরবানি হয়েছিল সিলেট বিভাগে, ৩ লাখ ১৯ হাজার ৮২৩টি। মৌলভীবাজার এই বিভাগেরই জেলা। ২০২৪ সালের ১৮ জুন যুগান্তরে প্রকাশিত মন্ত্রণালয়ের হিসাবে সে বছর সিলেট বিভাগে ৩ লাখ ৯৩ হাজার ৭৪২টি পশু কোরবানি হয়েছিল, যার মধ্যে গরু ২ লাখ ১ হাজার ১৪৩টি, মহিষ ১ হাজার ৩৫৮টি, ছাগল ১ লাখ ৭৩ হাজার ২২৩টি এবং ভেড়া ১৮ হাজার ১৪টি। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের পশুপালন অনুষদের ডিন মো. রুহুল আমিন ২০২৫ সালে প্রথম আলোকে বলেছিলেন, মানুষের অর্থনৈতিক অবস্থা হয়তো ভালো না থাকায় সে বছর কোরবানি কম হয়েছে, আর সাধারণত রাজনৈতিক নেতারা কোরবানির জন্য বড় আকারের গরু কেনেন।

দেশি গরু: আকার, জাত ও খাদ্য


মৌলভীবাজারে কোরবানির জন্য প্রস্তুত পশুগুলো ছিল দেশীয়। বাংলাপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের অধিকাংশ গরু নির্দিষ্ট জাতবিহীন দেশি জেবু (কুঁজওয়ালা) ধরনের বহুমুখী পশু, যা চাষাবাদ, মালবহন, দুধ ও মাংস সবকাজেই ব্যবহৃত হয়। উপমহাদেশের জেবু গরু (Bos indicus) সাধারণভাবে আকারে ছোট, বৃদ্ধির হার কম, তবে কিছু সংক্রামক রোগ প্রতিরোধে সক্ষম।

দেশি গরুর কিছু সুবিধাও বাংলাপিডিয়ায় উল্লেখ আছে: এরা রোগ ও পরজীবী প্রতিরোধে তুলনামূলক সক্ষম, নিম্নমানের খড়-ঘাস খেয়েও টিকে থাকতে পারে এবং কঠিন আবহাওয়ায় খাপ খাইয়ে নেয়। দেশে কিছু উন্নত দেশি ধরনও গড়ে উঠেছে, যেমন পাবনা গরু, রেড চিটাগাং, মুন্সীগঞ্জ গরু ও নর্থ বেঙ্গল গ্রে। দেশি গরুর উৎপাদনক্ষমতা বাড়াতে হলস্টেইন-ফ্রিজিয়ান, জার্সি, শাহিওয়াল, সিন্ধিসহ বিভিন্ন বিদেশি জাতের সঙ্গে সংকরায়ণ করা হয়েছে।

গরু মোটাতাজাকরণ নিয়ে বাংলাপিডিয়ায় বলা হয়েছে, বাংলাদেশে ঈদুল আজহায় মৌসুমি চাহিদা তৈরি হয় এবং এ সময় মানুষ সাধারণত সুস্থ-সবল পশু কোরবানি দিতে চান। প্রচলিত ও অপ্রচলিত খাদ্য খাইয়ে এক বছর বয়সী ষাঁড় বাছুরের দৈনিক ওজন প্রায় ১ কেজি পর্যন্ত বাড়ে। আবার বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিএলআরআই) উদ্ভাবিত ইউরিয়া-মোলাসেস মেশানো খড় খাওয়ালে প্রায় ৯৮ কেজি ওজনের এক বছর বয়সী দেশি গরুর দৈনিক বৃদ্ধি হয় প্রায় ৪৫০ গ্রাম। বাংলাপিডিয়া আরও জানায়, দেশে গবাদিপশুর আঁশজাতীয় খাদ্যের বড় অংশ আসে ধান, গম ও ডালের খড় থেকে; এর সঙ্গে কুঁড়া, খইল, ঝোলাগুড় এবং রাস্তার ধার ও বাঁধের ঘাস ব্যবহৃত হয়। দেশে সুনির্দিষ্ট চারণভূমি নেই বললেই চলে; বনের প্রান্ত, রাস্তার ধার ও বাঁধের পতিত জমিই সাধারণ চারণক্ষেত্র।

জাতীয় পরিসংখ্যানে প্রাণিসম্পদ খাতের আকারও বড়। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের 'লাইভস্টক ইকোনমি অ্যাট আ গ্ল্যান্স ২০২৩-২৪' অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে দেশে গরু ছিল ২৫০.১৩ লাখ, মহিষ ১৫.২৪ লাখ, ছাগল ২৭১.১৭ লাখ এবং ভেড়া ৩৯.০৩ লাখ। স্থির মূল্যে জাতীয় জিডিপিতে প্রাণিসম্পদের অবদান ছিল ১.৮০ শতাংশ এবং কৃষি জিডিপিতে ১৬.৩৩ শতাংশ। দেশের ২০ শতাংশ মানুষ সরাসরি এবং ৫০ শতাংশ আংশিকভাবে এই খাতের ওপর নির্ভরশীল বলে অধিদপ্তরের হিসাবে উল্লেখ আছে। সেই অর্থবছরে মাংসের উৎপাদন ছিল ৯২.২৫ লাখ মেট্রিক টন, যেখানে চাহিদা ধরা হয়েছিল ৭৬.২১ লাখ মেট্রিক টন।

চট্টগ্রামের আনন্দবাজার এলাকায় দেশি গরু, ২০১৪ সালে তোলা। ছবি: Raihan Rana / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
চট্টগ্রামের আনন্দবাজার এলাকায় দেশি গরু, ২০১৪ সালে তোলা। ছবি: Raihan Rana / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)

মোটাতাজাকরণে নিষিদ্ধ উপাদান ও হাটে পশুর স্বাস্থ্য পরীক্ষা


কোরবানির আগে পশু মোটাতাজাকরণ নিয়ে ভোক্তাদের একটি বড় উদ্বেগ ক্ষতিকর ওষুধ ও হরমোনের ব্যবহার। বাংলাদেশে মৎস্যখাদ্য ও পশুখাদ্য আইন, ২০১০ মাছ ও প্রাণীর খাদ্য নিয়ন্ত্রণ করে এবং বিশেষভাবে পশু ও মাছের খাদ্যে হরমোন ও বৃদ্ধি-উদ্দীপক উপাদানের ব্যবহার নিষিদ্ধ করে।

মৌলভীবাজারে এ নিয়ে নজরদারির কথা আগেও বলা হয়েছিল। ২০২১ সালের প্রতিবেদনে তৎকালীন জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা জাগো নিউজকে জানিয়েছিলেন, স্টেরয়েড, অ্যান্টিবায়োটিক, হরমোন ইত্যাদি ব্যবহার করে কৃত্রিম উপায়ে কেউ যাতে গরু মোটাতাজা করতে না পারে, তা নিয়মিত তদারকি করা হচ্ছে এবং নিরাপদ প্রাণিজ আমিষ নিশ্চিত করতে খামারি পর্যায়ে পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। ২০২৪ সালের প্রথম আলোর প্রতিবেদনে উল্লেখ করা খামারেও গরুকে কুঁড়া, খইল, ভুসি ও ঘাস খাওয়ানোর কথা বলা হয়েছিল।

২০২৬ সালে জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা প্রতিটি হাটে গরু পরীক্ষার জন্য মেডিকেল টিম রাখার কথা জানিয়েছিলেন। জাতীয় পর্যায়েও ৩ মের ব্রিফিংয়ে ঢাকার হাটগুলোতে ভেটেরিনারি মেডিকেল টিম সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করবে বলে জানানো হয়েছিল।

ছবি: Wasiul Bahar / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)

সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, ঢাকা টাইমস, দেশ রূপান্তর, প্রথম আলো, যুগান্তর, বাংলা ট্রিবিউন, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর, বাংলাপিডিয়া, এএমপি ইআইডি, উইকিপিডিয়া

অনলাইন ডেস্কদা এগ্রো নিউজ

লাইভস্টক

সম্পর্কিত খবর

লাইভস্টক

সৌরপ্যানেলের নিচে ভেড়া চরালে বাড়ে মৌমাছি, তবে সংখ্যা রাখতে হবে কম

কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণায় দেখা গেছে, সৌরখামারে হেক্টরপ্রতি দুটি ভেড়া চরালে ঘাস কাটার তুলনায় উপকারী পোকা ৩৮ শতাংশ বাড়ে। খামারিদের জন্য ভেড়ার পাল পরিকল্পনার একটি সহায়ক টুলও তৈরি করেছেন গবেষকেরা।

Farms.com১৬ অক্টোবর ২০২৬২ মিনিটের পড়া
লাইভস্টক

প্রোটিনের চাহিদায় বদলে গেল কানাডার দুধের বাজার, মাখনের উদ্বৃত্ত শেষ

দুগ্ধজাত প্রোটিনের চাহিদা বাড়ায় পাঁচ বছরের মধ্যে কানাডার দুধের বাজারে মাখনচর্বির কাঠামোগত উদ্বৃত্ত মিটে গেছে, দুধের দাম নির্ধারণেও এসেছে পরিবর্তন।

Manitoba Co-operator১৬ অক্টোবর ২০২৬১ মিনিটের পড়া
লাইভস্টক

সিকি হেক্টরে ওটের বীজ চাষ, ইথিওপিয়ার এক কৃষকের পারিবারিক ব্যবসা

ইথিওপিয়ার এক ক্ষুদ্র কৃষক মাত্র শূন্য দশমিক ২৫ হেক্টর জমিতে বীজের জন্য ওট চাষ করে প্রথম ফসল ৪৫ হাজার বির্রে বিক্রি করেন এবং পরের বছর চাষ বাড়ান। আইএলআরআইয়ের পশুখাদ্যের বীজকে ব্যবসায় রূপ দেওয়ার উদ্যোগের অংশ এটি।

ILRI১৬ অক্টোবর ২০২৬২ মিনিটের পড়া

মন্তব্য

(০)