২০২৪ সালের ডিসেম্বরের মাঝামাঝি দ্য এগ্রো নিউজে যখন এই নির্দেশিকা প্রথম প্রকাশিত হয়, দেশে তখন শীতকাল। গ্রামের বাড়ির পাশে বাঁশের মাচা বেয়ে ওঠা নরম লতানো শাক পুঁইয়ের মূল মৌসুম তখন নয়। জাতীয় জ্ঞানকোষ বাংলাপিডিয়া মিষ্টিকুমড়া, করলা, ঢেঁড়স ও বরবটির সঙ্গে পুঁইশাককে দেশের প্রধান গ্রীষ্মকালীন সবজির তালিকায় রেখেছে। তাই শীতই পরিকল্পনার সময়: বসন্তে বপনের মৌসুম শুরুর আগে বীজ বাছাই, জমি তৈরি আর মাচার প্রস্তুতি।
এই প্রতিবেদনে জানা যাবে পুঁইশাক কী এবং কেন গুরুত্বপূর্ণ, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি) কোন কোন উন্নত জাত দিয়েছে, কখন ও কীভাবে বীজ বুনতে হয়, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই) কতটা বীজ ও সার দিতে বলে, লতার যত্ন কীভাবে নিতে হয়, কোন পোকা ও রোগের দিকে নজর রাখতে হয় এবং কতটা ফলন আশা করা যায়। প্রতিটি তথ্য যে সংস্থার, তার নাম উল্লেখ করা হয়েছে; বেশির ভাগ হিসাব নেওয়া হয়েছে ডিএইর বাংলাদেশ কৃষি আবহাওয়া তথ্য সেবা (বামিস) পোর্টালের ফসল-পাতা থেকে।
পুঁইশাক কী, কেন গুরুত্বপূর্ণ
উদ্ভিদবিজ্ঞানে পুঁইশাকের নাম বাসেলা আলবা (Basella alba), বাসেলেসি গোত্রের একটি বহুবর্ষজীবী, খাওয়ার উপযোগী লতা। এর আদি নিবাস ভারতীয় উপমহাদেশ, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও নিউগিনি; পরে তা ছড়িয়েছে চীন, গ্রীষ্মমণ্ডলীয় আফ্রিকা, ক্যারিবীয় অঞ্চল ও দক্ষিণ আমেরিকার কিছু অংশে। ইংরেজিতে একে মালাবার স্পিনাচ, ইন্ডিয়ান স্পিনাচ, সিলন স্পিনাচ বা ভাইন স্পিনাচ বলা হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ফ্লোরিডার ইনস্টিটিউট অব ফুড অ্যান্ড অ্যাগ্রিকালচারাল সায়েন্সেসের (ইউএফ/আইএফএএস) একটি নির্দেশিকা, যা ২০২০ সালের সেপ্টেম্বরে প্রথম প্রকাশিত হয়ে ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে হালনাগাদ হয়, জানায়, এই লতা খুব তেজি, ছয় ফুট বা তার বেশি লম্বা হয়, আর সাধারণত মাচা বা বেড়ায় তুলে চাষ করা হয়। এর পাতা পুরু, কিছুটা রসালো, স্বাদ হালকা; রান্নার পর খানিকটা পিচ্ছিল হয়। পুঁইয়ের সবুজ জাতের কাণ্ড ও পাতা সবুজ, আর লাল জাতের কাণ্ড লালচে বেগুনি; লাল রূপটিকে কখনো কখনো বাসেলা রুব্রা নামে আলাদা করে দেখানো হয়।
বাঙালি রান্নায় পুঁইশাক ঘরোয়া খাবার। মিষ্টিকুমড়া দিয়ে নিরামিষ হিসেবে যেমন রান্না হয়, তেমনি ইলিশ মাছের কাঁটা বা চিংড়ি দিয়েও রাঁধা হয়। কচি পাতা ও ডগাই বাজারে বিক্রি হয় এবং খাওয়া হয়।
ফসলটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ দেশের মানুষ যথেষ্ট সবজি খান না। বাংলাপিডিয়া জানায়, দেশে দেশি-বিদেশি প্রায় ১০০ রকম সবজি চাষ হয়, তবু মাথাপিছু দৈনিক ২০০ গ্রামের যে চাহিদার সুপারিশ, সবজির প্রাপ্যতা তার মাত্র পাঁচ ভাগের এক ভাগের কাছাকাছি। বৈরী আবহাওয়া ও পোকার আক্রমণে গ্রীষ্মকালীন সবজি চাষ বাধাগ্রস্ত হয় বলেও বাংলাপিডিয়া উল্লেখ করেছে। গরম ও বৃষ্টি সইতে পারে, বারবার কাটা যায় আর জায়গা কম লাগে, এমন একটি গ্রীষ্মের শাক সেই ঘাটতির কিছুটা পূরণ করে। এ কারণেই মাঠের পাশাপাশি বাড়ির বেড়া, ছাদ ও বারান্দাতেও পুঁইশাক চাষ হয়।
ডিএইর বামিস ফসল-পাতা অনুযায়ী প্রতি ১০০ গ্রাম পুঁইশাকে আছে ৯২ গ্রাম পানি, ২.২ গ্রাম আমিষ, ৪ গ্রাম শর্করা, ০.২ গ্রাম চর্বি, ১.৪ গ্রাম খনিজ, ২৭ কিলোক্যালরি খাদ্যশক্তি, ১৬৪ মিলিগ্রাম ক্যালসিয়াম, ১০ মিলিগ্রাম লৌহ, ৬৪ মিলিগ্রাম ভিটামিন সি এবং ১২,৭৫০ মাইক্রোগ্রাম ক্যারোটিন। যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগের (ইউএসডিএ) খাদ্য তথ্যভান্ডারে কাঁচা পাতার হিসাব কিছুটা ভিন্ন: প্রতি ১০০ গ্রামে ৯৩ শতাংশ পানি, ১০৯ মিলিগ্রাম ক্যালসিয়াম, ১.২ মিলিগ্রাম লৌহ ও ১০২ মিলিগ্রাম ভিটামিন সি।

বারির জাত: বারি পুঁইশাক-১ ও বারি পুঁইশাক-২
ডিএইর ফসল-পাতায় কৃষকদের জন্য দুটি উন্নত জাতের নাম দেওয়া আছে: বারি পুঁইশাক-১ ও বারি পুঁইশাক-২। দুটিই উদ্ভাবন করেছে বারি। বাংলাপিডিয়ার তথ্যমতে, কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীন এই স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান ধান, পাট, আখ ও চা ছাড়া সব ফসল নিয়ে গবেষণা করে, কারণ ওই চার ফসলের জন্য আলাদা ইনস্টিটিউট আছে। ১৯০৮ সালে ঢাকায় 'অ্যাগ্রিকালচারাল রিসার্চ ল্যাবরেটরি, বেঙ্গল' নামে এর যাত্রা শুরু; ১৯৭৬ সালে তা বারিতে রূপ নেয় এবং পরে গাজীপুরের জয়দেবপুরে সরে যায়। এর ছয়টি ফসলভিত্তিক গবেষণা কেন্দ্রের একটি উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্র।
দুই জাতের তুলনা নিয়ে গবেষণাও হয়েছে। ময়মনসিংহের বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) গবেষকদের টবে করা একটি পরীক্ষার ফল ২০২০ সালের জুনে জার্নাল অব দ্য বাংলাদেশ এগ্রিকালচারাল ইউনিভার্সিটিতে প্রকাশিত হয়। তাতে দেখা যায়, বৃদ্ধি, ফলনে ভূমিকা রাখা বৈশিষ্ট্য ও পুষ্টিগুণে বারি পুঁইশাক-২ বারি পুঁইশাক-১-এর চেয়ে ভালো করেছে। একই গবেষণায় বায়োগ্যাস প্লান্টের তরল বর্জ্য বা বায়োস্লারির পাঁচটি মাত্রা সুপারিশকৃত রাসায়নিক সারের সঙ্গে তুলনা করা হয়। সুপারিশকৃত রাসায়নিক সারে লতা সবচেয়ে লম্বা হয়েছে, পাতা ও শাখাও বেশি হয়েছে; তবে হেক্টরে ২০ টন বায়োস্লারি প্রায় একই রকম ফল দিয়েছে। গবেষকদের সিদ্ধান্ত, পুঁইশাক চাষে রাসায়নিক সারের বিকল্প হতে পারে বায়োস্লারি।
বারির জাতের বীজ এলাকায় কোথায় পাওয়া যায়, তা উপজেলা কৃষি অফিস জানাতে পারে। নিচের চাষপদ্ধতি দুই জাতের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য।

আবহাওয়া, মাটি ও বপনের সময়
পুঁইশাক গ্রীষ্মমণ্ডলের উদ্ভিদ। ইউএফ/আইএফএএস জানায়, বাতাসের তাপমাত্রা অন্তত ৮০ ডিগ্রি ফারেনহাইট হলে এটি সবচেয়ে ভালো বাড়ে, এর নিচে বৃদ্ধি কমে যায়, আর ৬০ ডিগ্রি ফারেনহাইটের নিচে বা তুষারপাতে গাছ বাঁচে না। ওই গবেষণার উদ্ধৃতি দিয়ে উইকিপিডিয়ার নিবন্ধ বলছে, দিনের ২১ থেকে ৩২ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা এর পছন্দ, আর দিনের তাপমাত্রা ১০ থেকে ১৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে নামলে বৃদ্ধি দুর্বল হয়। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৫০০ মিটারের কম উচ্চতার গরম ও আর্দ্র এলাকায়, পূর্ণ রোদে এটি সবচেয়ে ভালো জন্মে; ছোট দিনের মাসগুলোতে ফুল আসে।
ডিএইর বামিস ফসল-পাতা অনুযায়ী বাংলাদেশে পুঁইশাক বোনার উপযুক্ত সময় চৈত্র থেকে ভাদ্র, অর্থাৎ মার্চ থেকে আগস্ট। এই নির্দেশিকার আগের সংস্করণে বলা হয়েছিল, শীতে তাপমাত্রা কম থাকার সময় বীজ বোনা ভালো; সেটি ডিএইর মৌসুম কিংবা ফসলটির উষ্ণতার চাহিদার সঙ্গে মেলে না, তাই এখানে সংশোধন করা হলো। মূল প্রতিবেদন অবশ্য ঠিকই বলেছিল যে গ্রীষ্ম ও বর্ষায় এর চাষ ভালো হয়, এবং আবহাওয়া উষ্ণ হলে মূল জমিতে লাগানোর জন্য ফেব্রুয়ারি থেকে মার্চে বেডে বা পলিব্যাগে চারা তৈরির পরামর্শ দিয়েছিল।
বীজ গজানোর জন্য ইউএফ/আইএফএএস মাটির উপযুক্ত তাপমাত্রা দিয়েছে ৬৫ থেকে ৭৫ ডিগ্রি ফারেনহাইট; মূল প্রতিবেদনে দেওয়া ১৮ থেকে ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াস এই পরিসরের মধ্যেই পড়ে। তবু বীজ গজাতে সময় লাগে, ইউএফ/আইএফএএসের হিসাবে দুই থেকে তিন সপ্তাহ; সময় কমাতে প্রতিষ্ঠানটি বীজ পানিতে ভিজিয়ে নেওয়ার পরামর্শ দেয়। মূল প্রতিবেদনে বোনার আগে বীজ ২৪ ঘণ্টা পানিতে ভিজিয়ে রাখতে বলা হয়েছিল।
মাটির ক্ষেত্রে ইউএফ/আইএফএএস জৈব পদার্থে সমৃদ্ধ বেলে দোআঁশ মাটির কথা বলে, যার অম্লমান (পিএইচ) ৫.৫ থেকে ৭.০; তবে গাছটি ৪.৩ থেকে ৭.৫ পর্যন্ত সইতে পারে। জমিতে পানি নিষ্কাশনের ভালো ব্যবস্থা থাকতে হবে। মূল প্রতিবেদন সতর্ক করেছিল, গাছের গোড়ায় পানি জমলে গোড়া পচে যেতে পারে।
বীজ, চারা ও রোপণ: ধাপে ধাপে
প্রধান বিষয়গুলোতে ডিএইর হিসাব ও মূল প্রতিবেদন একমত:
- বীজের হার: সারিতে বুনলে প্রতি শতকে ৮ থেকে ১০ গ্রাম বীজ লাগে; ডিএইর ফসল-পাতা ও মূল প্রতিবেদন দুটিতেই এই হিসাব। ছিটিয়ে বুনলে বীজ বেশি লাগে।
- বীজ শোধন: বোনার আগে বীজ পানিতে ভিজিয়ে নিন; মূল প্রতিবেদনে ২৪ ঘণ্টার কথা বলা হয়েছিল।
- চারা: বেডে বা পলিব্যাগে চারা তৈরি করুন। মূল প্রতিবেদন অনুযায়ী ১৫ থেকে ২০ দিনের চারা লাগানো যায়, আর সরাসরি বোনা জমির ফাঁকা জায়গা পূরণে দুই সপ্তাহের চারাও ব্যবহার করা যায়।
- জমি তৈরি: আগাছা পরিষ্কারের পর মূল প্রতিবেদনের পরামর্শমতো ৫ থেকে ৬টি চাষ ও মই দিয়ে মাটি ঝুরঝুরে করুন; ডিএইর ফসল-পাতাও মাটি ভালোভাবে ঝুরঝুরে করে নিতে বলে।
- দূরত্ব: ডিএইর ফসল-পাতায় লাইন থেকে লাইন ৪০ ইঞ্চি এবং চারা থেকে চারা ২০ ইঞ্চি। মূল প্রতিবেদনে সারি থেকে সারি ১ মিটার ও সারিতে চারা থেকে চারা ৫০ সেন্টিমিটার, যা প্রায় একই বিন্যাস।
- মাচা: লতা দ্রুত বাড়ে বলে আগেভাগেই মাচা বা বাঁশের কাঠামো বানিয়ে নিন। মূল প্রতিবেদন অনুযায়ী বাউনি দিলে ফলন বাড়ে।

সার ব্যবস্থাপনা: শতকপ্রতি ডিএইর মাত্রা
ডিএইর বামিস ফসল-পাতায় প্রতি শতক পুঁইশাকের জমির জন্য সারের মাত্রা দেওয়া আছে এভাবে:
- কম্পোস্ট বা পচা গোবর: ৬০ কেজি
- ইউরিয়া: ৮০০ গ্রাম
- টিএসপি (ট্রিপল সুপার ফসফেট): ৪০০ গ্রাম
ইউরিয়া ছাড়া বাকি সব সার শেষ চাষের সময় সমানভাবে ছিটিয়ে মাটিতে মিশিয়ে দিতে হয়। ইউরিয়া উপরি প্রয়োগ করতে হয় তিন কিস্তিতে: চারার বয়স ১০ থেকে ১৫ দিন হলে প্রথম কিস্তি, এর ৩০ থেকে ৪০ দিন পর দ্বিতীয় কিস্তি, আর প্রথমবার শাক তোলার পর তৃতীয় কিস্তি। মূল প্রতিবেদনেও ইউরিয়া তিন কিস্তিতে দেওয়ার কথা ছিল, আর গোবর, ইউরিয়া ও টিএসপির পরিমাণও একই ছিল।
মূল প্রতিবেদনে শতকপ্রতি ৫০০ গ্রাম সরিষার খৈল ও ৪০০ গ্রাম এমওপি (মিউরিয়েট অব পটাশ) দেওয়ার কথাও ছিল, আর বলা হয়েছিল গোবর ও টিএসপির অর্ধেক জমি তৈরির সময় এবং বাকি অর্ধেক চারা রোপণের সময় গর্তে দিতে হবে। পুঁইশাকের জন্য ডিএইর বর্তমান ফসল-পাতায় এগুলো নেই, তাই এখানে বাদ রাখা হলো। জমিভেদে মাটির গুণ আলাদা হয়; তাই যাঁরা পটাশ বা খৈল দিতে চান, তাঁরা উপজেলা কৃষি অফিসে পরামর্শ নিন। সেখান থেকে মাটি পরীক্ষার ব্যবস্থাও করা যায়।
সেচ, আগাছা দমন, মাচা ও ডগা কাটা
মূল প্রতিবেদন অনুযায়ী বর্ষায় সাধারণত সেচ লাগে না, তবে মাটিতে রস না থাকলে অবশ্যই সেচ দিতে হবে। শুকনো মৌসুমের জন্য ডিএইর ফসল-পাতা আরও নির্দিষ্ট: এক সপ্তাহ পরপর সেচ দিতে হবে, নইলে শাক খসখসে হয়ে যায়। ইউএফ/আইএফএএস যোগ করেছে, নিয়মিত সেচে মাটিতে টানা রস থাকলে পাতা তেতো হয় না এবং ফুল আসা পিছিয়ে যায়।
পানি দেওয়ার মতোই জরুরি পানি সরানো। ডিএইর ফসল-পাতা বলছে, অতিবৃষ্টিতে জমিতে পানি জমে গেলে নালা কেটে দ্রুত পানি সরাতে হবে। মূল প্রতিবেদন জানিয়েছিল, বেশি বৃষ্টিতে গাছের গোড়ার মাটি ধুয়ে যেতে পারে, তাই বৃষ্টির পর গোড়ায় মাটি চেপে দিতে হবে, আর মাঝে মাঝে মাটি আলগা করে দিতে হবে।
আগাছার বিষয়ে ডিএইর পরামর্শ: নিয়মিত জমি দেখুন, সেচ ও সার দেওয়ার পর জো আসামাত্র নিড়ানি দিন, চারা গজানোর ২০ থেকে ২৫ দিন পর আগাছা দমন করুন, আর গাছ খুব ঘন হলে পাতলা করে দিন।
দুটি সহজ কাজে ফলন বাড়ে। প্রথমটি বাউনি: লতা বেয়ে ওঠার জন্য মাচা বা কাঠামো লাগে। দ্বিতীয়টি ডগা কাটা। মূল প্রতিবেদন অনুযায়ী চারা ২৫ থেকে ৩০ সেন্টিমিটার উঁচু হলে আগা কেটে দিলে গাছ শাখা ছেড়ে ঝোপালো হয়; এরপর মাঝে মাঝে ডগা কাটতে হয়। কাটা ডগা খাওয়া যায়, আর গাছে নতুন ডগা বের হয়। ইউএফ/আইএফএএসও নিয়মিত কাটাকে গাছের আকার ঠিক রাখা ও শাক তোলা, দুটিরই উপায় বলে বর্ণনা করেছে।
পোকামাকড় ও রোগবালাই
মূল প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, পাতার বিটল বা ফ্লি বিটল ছাড়া আর কোনো পোকা পুঁইশাকের তেমন ক্ষতি করে না। ফ্লি বিটল পাতায় ছোট ছোট গোল ছিদ্র করে। ডিএইর ফসল-পাতা এর সঙ্গে যোগ করেছে সুড়ঙ্গকারী পোকা (লিফ মাইনার), যার কীড়া পাতার ভেতরে সুড়ঙ্গ করে খায়। ইউএফ/আইএফএএস শামুক ও শিকড়ের ক্ষত সৃষ্টিকারী কৃমিকেও (রুট-লেশন নেমাটোড) এই ফসলের সমস্যার তালিকায় রেখেছে; আবার জানিয়েছে, পাতায় থাকা কিছু যৌগের কারণে তামাকের কাটুই পোকা (স্পোডোপটেরা লিটুরা) এই গাছের তেমন ক্ষতি করতে পারে না।
রোগের মধ্যে মূল প্রতিবেদনে সারকোস্পোরা পাতার দাগকে মারাত্মক বলা হয়েছিল; ইউএফ/আইএফএএস ছত্রাকটিকে সারকোস্পোরা বেটিকোলা হিসেবে চিহ্নিত করেছে, যা গাছের বৃদ্ধি ও পাতার মান কমায়। ডিএইর ফসল-পাতায় আছে পাতায় দাগ রোগ ও গোড়া পচা রোগ। ইউএফ/আইএফএএসের পরামর্শ, ঘন ঘন জমি পর্যবেক্ষণ করা এবং আক্রান্ত পাতা তুলে নষ্ট করে ফেলা, যাতে রোগ না ছড়ায়।
আক্রমণ বেশি হলে ডিএইর বামিস ফসল-পাতায় এই দমন ব্যবস্থা দেওয়া আছে:
- সুড়ঙ্গকারী পোকা ও ফ্লি বিটল: সাইপারমেথ্রিন জাতীয় কীটনাশক (১০ শতাংশ তরল) প্রতি ১০ লিটার পানিতে ২০ মিলিলিটার মিশিয়ে প্রতি ৫ শতকে, ১০ দিন পরপর ২ বার স্প্রে।
- গোড়া পচা ও পাতায় দাগ রোগ: কার্বেন্ডাজিম জাতীয় ছত্রাকনাশক প্রতি ১০ লিটার পানিতে ২০ গ্রাম মিশিয়ে প্রতি ৫ শতকে, ১২ থেকে ১৫ দিন পরপর ২ থেকে ৩ বার স্প্রে।
প্রতিটি স্প্রের সঙ্গে ডিএই কিছু নিরাপত্তা নিয়মও দিয়েছে: বোতল বা প্যাকেটের লেবেল ভালো করে পড়ে নির্দেশনা মেনে চলুন, নিরাপত্তা পোশাক পরুন, স্প্রের সময় ধূমপান ও পানাহার করবেন না, স্প্রে করা জমির পানি যেন মুক্ত জলাশয়ে না মেশে সেদিকে খেয়াল রাখুন, আর স্প্রের অন্তত ৭ থেকে ১৫ দিন পর শাক বাজারে নিন। পুঁইশাক বারবার কেটে খাওয়া পাতার ফসল, তাই এই অপেক্ষার সময়টা খুবই জরুরি। যেকোনো রাসায়নিক ব্যবহারের আগে পণ্য ও মাত্রা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার কাছ থেকে নিশ্চিত হয়ে নিন।
শাক তোলা, ফলন ও বীজ সংরক্ষণ
ইউএফ/আইএফএএসের হিসাবে ভালো পরিবেশে বীজ বোনার প্রায় ৭০ দিন পর প্রথম শাক তোলা যায়; প্রতিষ্ঠানটি হাতে পাতা ও কচি ডগা কেটে তোলার পরামর্শ দেয়, কারণ বাজারে এগুলোরই চাহিদা। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) ইকোক্রপ তথ্যভান্ডার পুঁইকে স্বল্পায়ু বহুবর্ষজীবী উদ্ভিদ বলেছে, যার শাক তোলার সময়কাল চারা রোপণের পর ৫৫ থেকে ১৮০ দিন। এ কারণেই একবার লাগালে এক মৌসুমে অনেকবার শাক কাটা যায়।
ফলনের বিষয়ে ডিএইর বামিস ফসল-পাতা জাতভেদে শতকপ্রতি ১৯০ থেকে ২০০ কেজির কথা বলে। এই নির্দেশিকার আগের সংস্করণে আরও বেশি, শতকপ্রতি ২০০ থেকে ২৮০ কেজি বা হেক্টরে ৫০ থেকে ৭০ টন, বলা হয়েছিল। এফএওর ইকোক্রপে সম্ভাব্য ফলন দেওয়া আছে হেক্টরে প্রায় ৫০ টন। প্রকৃত ফলন নির্ভর করে জাত, মাটি, পরিচর্যা আর কত দিন ধরে লতা থেকে শাক কাটা হয় তার ওপর।
তাজা পুঁইশাক দ্রুত নেতিয়ে যায়। ইউএফ/আইএফএএস জানায়, ৫০ থেকে ৬০ ডিগ্রি ফারেনহাইটে রাখলে পাতা ১২ থেকে ১৪ দিন ভালো থাকে; এর চেয়ে গরমে পাতা হলুদ হয়, আর বেশি ঠান্ডায় শীতজনিত ক্ষতি হয়। কাটা ডাঁটা ফ্রিজে প্রায় এক সপ্তাহ টেকে; ফ্রিজে না রাখলে ডাঁটা পানিতে ডুবিয়ে রাখা ভালো।
বীজের জন্য ডিএইর পরামর্শ: কয়েক দিন রোদে শুকিয়ে বীজের আর্দ্রতা ৮ শতাংশে নামিয়ে আনুন, তারপর প্লাস্টিক বা টিনের কৌটা, ড্রাম কিংবা পলিব্যাগের মতো বায়ুরোধী পাত্র বীজে পূর্ণ করে মুখ ভালোভাবে আটকে দিন। পাত্রে চিহ্ন বা লেবেল দিয়ে ঘরের মেঝেতে না রেখে শুকনো, ঠান্ডা জায়গায় মাচায় রাখুন। পাত্র আধা ভরা থাকলে বা মুখ ভালোভাবে না আটকালে বীজ গজানোর হার কমে যায়।

বাড়ির টবে পুঁইশাক এবং পরামর্শ কোথায় পাবেন
ছাদ বা বারান্দায় চাষের জন্য পুঁইশাক সবচেয়ে সহজ সবজিগুলোর একটি। ২০২০ সালের জুনে বাংলা ট্রিবিউনের জীবনযাপন বিভাগের এক প্রতিবেদনে বাজার থেকে কেনা পুঁইয়ের ডাঁটা থেকে কলম তৈরির পদ্ধতি বলা হয়েছিল: মোটা ডাঁটা বেছে নিন, পাতা ছাড়িয়ে নিচের দিক সমান করে কাটুন, তারপর কাচের পাত্রে পানিতে ভিজিয়ে রাখুন; ৮ থেকে ১০ দিনের মধ্যে গোড়ায় শিকড় গজায়। এরপর এক মুঠো জৈব সার মেশানো মাটিতে টবে বা ওপরের সরু অংশ কেটে নেওয়া প্লাস্টিকের পাত্রে শিকড়সহ ডাঁটা লাগাতে হয়; পানি যেন না জমে, সে জন্য পাত্রের নিচে দুই-তিনটি ছিদ্র থাকা চাই। আলো-বাতাস পেলে লতা বারান্দার গ্রিল বা ছাদের ছোট মাচা বেয়ে ওঠে।
মাঠে চাষের ক্ষেত্রে প্রথম ভরসা ডিএইর উপজেলা কৃষি অফিস, যেখান থেকে বীজ, সার ও পোকামাকড়ের সমস্যা নিয়ে পরামর্শ পাওয়া যায়। জাত নিয়ে পরামর্শ দিতে পারে বারি ও এর আঞ্চলিক কেন্দ্রগুলো। কৃষকেরা সরকারি কৃষি কল সেন্টারের ১৬১২৩ নম্বরেও ফোন করতে পারেন; ২০১৬ সালের অক্টোবরে ঢাকা ট্রিবিউনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, ঢাকার খামারবাড়ি থেকে পরিচালিত এই সেবায় প্রতি মিনিট ২৫ পয়সায় ফসল, সার ও কীটনাশক ব্যবহার নিয়ে পরামর্শ মেলে।
ছবি: তানভীর রাহাত / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: দ্য এগ্রো নিউজ (নিজস্ব প্রতিবেদক), কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (বামিস ফসল-পাতা), বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট, জার্নাল অব দ্য বাংলাদেশ এগ্রিকালচারাল ইউনিভার্সিটি, ইউনিভার্সিটি অব ফ্লোরিডা আইএফএএস এক্সটেনশন, এফএও ইকোক্রপ, বাংলাপিডিয়া, উইকিপিডিয়া, বাংলা ট্রিবিউন, ঢাকা ট্রিবিউন




মন্তব্য
(০)