সরাসরিবাজারদর
আটা (প্যাকেটজাত)৫৮—আদা - আমদানিকৃত১৬৭—আদা - দেশী১৫৪—আমন চাল - মাঝারি৫৬—আমন চাল - মোটা৪৮—আমন চাল - সরু৭২—আয়োডিনযুক্ত লবণ (প্যাকেটজাত)৩২—কাঁচা মরিচ২১৮—খামারের মুরগী১৬২—খাসী৯০০—চিনি (দেশী)১৩২—ছোলা - গোটা৮৫—ডিম ফার্ম - লাল৪৭—পেঁয়াজ - দেশী৬০—বোরো চাল - মাঝারি৫৫—বোরো চাল - মোটা৪৭—বোরো চাল - সরু৬৬—মাংসঃ– গরু৭২৯—মুগ ডাল১২২—রসুন - আমদানিকৃত১৯২—রসুন - দেশী১৭৩—সয়াবিন তেল১৬৩—
হালনাগাদ ১৬ অক্টোবর ২০২৬
ঢাকা২৮°পরিষ্কার আকাশআর্দ্রতা ৬২%বাতাস ৫ কিমি/ঘ

গাঁদা ফুল চাষ পদ্ধতি: জাত, সার, পরিচর্যা ও রোগবালাই দমনে বারির পরামর্শ

শীতের সবচেয়ে চাহিদার ফুল গাঁদা। বারি গাঁদা-১ জাত, বপনের সময়, বারির সুপারিশ করা সার, রোগ-পোকা দমন আর ফুল তোলার নিয়ম জেনে লাভজনক গাঁদা চাষের পরিকল্পনা করুন।

গাঁদা ফুল চাষ পদ্ধতি: জাত, সার, পরিচর্যা ও রোগবালাই দমনে বারির পরামর্শ
ফুল

সূর্য ওঠার আগেই যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলার গদখালীতে ফুলের গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে। কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা ২০২০ সালে লিখেছিলেন, খুব ভোরেই এখানে জমে ওঠে দেশের সবচেয়ে বড় ফুলের বাজার; ঢাকাসহ নানা জায়গার ব্যবসায়ীরা ট্রাক বা পিকআপ ভর্তি করে ফুল নিয়ে যান শহরে। গোলাপ, রজনীগন্ধা আর গ্লাডিওলাসের স্তূপের মাঝে উজ্জ্বল কমলা ও হলুদ গাঁদা এমন এক ফুল, যা প্রায় সব ক্রেতারই দরকার হয়।

শীতকালের ফুলের মধ্যে গাঁদা অন্যতম। বিয়ে, জন্মদিন, বিবাহবার্ষিকী, গৃহসজ্জা, বিজয় দিবস, স্বাধীনতা দিবস ও শহীদ দিবসসহ প্রায় সব অনুষ্ঠানেই গাঁদা ফুলের দরকার পড়ে। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি) জানায়, গাঁদা সাধারণত লুজ ফুল হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

এই লেখায় জানা যাবে গাঁদা কী এবং দেশের ফুলের বাজারে এর অবস্থান কোথায়, কোন ধরন ও জাত চাষ হয়, কেমন আবহাওয়া, মাটি ও মৌসুম এর উপযোগী, কীভাবে চারা তৈরি ও রোপণ করতে হয়, বারি কতটুকু জৈব ও রাসায়নিক সার দেওয়ার সুপারিশ করে, পিঞ্চিং ও পরিচর্যা কীভাবে করতে হয়, প্রধান রোগ ও পোকা কীভাবে দমন করা যায় এবং কখন ফুল তুলতে হয়। নিচের প্রতিটি মাত্রা ও হার সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান যেভাবে দিয়েছে, সেভাবেই উল্লেখ করা হলো।

গাঁদা কী এবং কেন এর চাহিদা কমে না


গাঁদা অ্যাস্টারেসি (সূর্যমুখী) পরিবারের ট্যাজিটিস (Tagetes) গণের ফুল। যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ ক্যারোলাইনা স্টেট ইউনিভার্সিটির এক্সটেনশন গার্ডেনার প্ল্যান্ট টুলবক্স অনুযায়ী, নাম যা-ই হোক, আফ্রিকান গাঁদা (Tagetes erecta) ও ফরাসি গাঁদা (Tagetes patula) দুটিরই আদি নিবাস মেক্সিকো ও গুয়াতেমালা। বাংলাদেশের জাতীয় জ্ঞানকোষ বাংলাপিডিয়া দেশে সাধারণভাবে চাষ হওয়া ফুলের তালিকায় গাঁদাকে রেখেছে এবং দুই প্রজাতিরই হলুদ, লাল ও কমলা রঙের জাতের কথা বলেছে।

এনসি স্টেট এক্সটেনশনের বর্ণনায় আফ্রিকান গাঁদা একটি কোমল, ফুল ফোটানো বর্ষজীবী গাছ; এর ফুল সুগন্ধি ও দৃষ্টিনন্দন, ফোটার মৌসুমও দীর্ঘ, আর পাতা ঘষলে বা চাপলে সুগন্ধ বের হয়। ফরাসি গাঁদা ছোট, ঝোপালো বর্ষজীবী গাছ; এর ফুল লাল, কমলা ও হলুদের নানা মিশ্রণে একক, আধা-দ্বৈত বা পূর্ণ দ্বৈত পাপড়ির হয়।

কৃষি তথ্য সার্ভিসের (এআইএস) মাসিক পত্রিকা কৃষিকথায় ২০২০ সালে কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের (ডিএএম) কর্মকর্তাদের লেখা এক নিবন্ধে বলা হয়, বিয়ে, জন্মদিন ও বিবাহবার্ষিকীর পাশাপাশি মাতৃভাষা দিবস, ভ্যালেনটাইনস ডে, স্বাধীনতা দিবস ও বিজয় দিবসের মতো অনুষ্ঠানে ফুলের ব্যবহার অনিবার্য হয়ে পড়েছে। এসব দিনে গাঁদার চাহিদাও বাড়ে।

আফ্রিকান গাঁদা (Tagetes erecta) ফুল। ছবি: Rezowan / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
আফ্রিকান গাঁদা (Tagetes erecta) ফুল। ছবি: Rezowan / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)

দেশের ফুলের বাজারে গাঁদার জায়গা


বাংলাদেশে বাণিজ্যিক ফুল চাষের ইতিহাস খুব পুরোনো নয়। ডিএএম কর্মকর্তারা ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে কৃষিকথায় লেখেন, ১৯৮৩ সালে যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলার পানিসারা গ্রামে শের আলী নামের এক কৃষক মাত্র ০.৮৩ ডেসিমাল জমিতে ফুল চাষ শুরু করেন; সেখান থেকেই বাণিজ্যিক ফুল উৎপাদনের সূচনা। ওই নিবন্ধ লেখার সময় দেশের ২৪টি জেলায় প্রায় ৩,৫২০ হেক্টর জমিতে বাণিজ্যিকভাবে ফুল চাষ হচ্ছিল। এর মধ্যে খুলনা বিভাগে সর্বোচ্চ ২,৬০০ হেক্টর বা ৭৪ শতাংশ, ঢাকা বিভাগে ৬৯০ হেক্টর এবং চট্টগ্রাম বিভাগে ১২১ হেক্টর।

একই নিবন্ধ অনুযায়ী, ফুল উৎপাদনে যুক্ত ছিলেন প্রায় ১৫,০০০ কৃষক, উৎপাদন ও বিপণনে সরাসরি নিয়োজিত ছিলেন অন্তত দেড় লাখ মানুষ, আর এই খাত থেকে জীবিকা নির্বাহ করতেন প্রায় ৭ লাখ মানুষ। ২০১৪-১৫ সালে দেশে ৫৭,০০০ টন ফুল উৎপাদিত হয়, যার বিক্রয়মূল্য প্রায় ৮০০ কোটি টাকা। এর মধ্যে গাঁদা (ম্যারিগোল্ড) ছিল ১২,৬২৪ টন এবং বাজারমূল্যে এর অংশ ছিল ৮ শতাংশ; গ্লাডিওলাস, গোলাপ ও রজনীগন্ধার পরেই এর স্থান।

বারির কৃষি প্রযুক্তি হাতবইয়ের নবম সংস্করণ (জানুয়ারি ২০২০) অবশ্য দেশের ফুলের বাজারের ভিন্ন হিসাব দিয়েছে: বছরে প্রায় ৫০০ কোটি টাকার ফুল কেনাবেচা হয় এবং চাহিদা উত্তরোত্তর বাড়ছে; বিশ্ববাজারে ফুলের বাণিজ্য প্রায় ৬০ বিলিয়ন ডলারের। হাতবই বলছে, গাঁদা সারা দেশে জনপ্রিয় হলেও যশোর, কুষ্টিয়া, ঝিনাইদহ, বগুড়া, রংপুর, রাজশাহী এবং চট্টগ্রাম অঞ্চলে এর বাণিজ্যিক চাষ হচ্ছে।

ডিএএমের নিবন্ধে চাষিদের সমস্যার কথাও এসেছে: অনেক কৃষকের উৎপাদন প্রযুক্তির জ্ঞানের অভাব, দেশে ফুলের বীজ ও চারার অপ্রাপ্যতা এবং ভারত থেকে আমদানির ওপর নির্ভরতা, বড় শহরগুলোতে স্থায়ী পাইকারি ফুলের বাজারের অভাব, আর কৃষক থেকে খুচরা বিক্রেতা পর্যন্ত পৌঁছাতে প্রায় ২০ শতাংশ ফুল নষ্ট হওয়া। নিবন্ধে যশোর সদর থেকে প্রায় পঁচিশ কিলোমিটার দূরের গদখালীকে দেশের বৃহত্তম ফুলের বাজার বলা হয়েছে।

যশোরের ঝিকরগাছার গদখালীতে খোলা আকাশের নিচে গাঁদা ফুলের পাইকারি বাজার, ওপর থেকে তোলা, জানুয়ারি ২০২৪। ছবি: Muhammad Amdad Hossain / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
যশোরের ঝিকরগাছার গদখালীতে খোলা আকাশের নিচে গাঁদা ফুলের পাইকারি বাজার, ওপর থেকে তোলা, জানুয়ারি ২০২৪। ছবি: Muhammad Amdad Hossain / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)

ধরন ও জাত: আফ্রিকান, ফরাসি ও বারি গাঁদা-১


আমাদের দেশে চাইনিজ, রাজগাঁদা, আফ্রিকান ও ফরাসি গাঁদার চাষ বেশি হয়। রং ভেদে গাঁদার জাত হলুদ, লাল, কমলা, গাঢ় খয়েরি, লাল-হলুদের মিশ্রণ ইত্যাদি। প্রধান দুই উদ্ভিদতাত্ত্বিক ধরনের মধ্যে আকারে স্পষ্ট পার্থক্য আছে।

  • আফ্রিকান গাঁদা (Tagetes erecta): গাছ সোজা ও লম্বা। এনসি স্টেট এক্সটেনশন এর উচ্চতা দিয়েছে ১ থেকে ৪ ফুট; দ্বৈত পাপড়ির ফুল ২ থেকে ৬ ইঞ্চি চওড়া, রং হলুদ, কমলা, মেহগনি, ব্রোঞ্জ, হালকা সাদা ও দুই রঙা। লম্বা জাতে খুঁটি লাগতে পারে।
  • ফরাসি গাঁদা (Tagetes patula): গাছ খাটো ও ঝোপালো। এনসি স্টেট এক্সটেনশনের হিসাবে উচ্চতা ৬ থেকে ১২ ইঞ্চি, ফুল ১ থেকে ২ ইঞ্চি চওড়া, ফুল ধরে প্রচুর। বেড, কিনারা ও টবের জন্য উপযোগী।
  • বারি গাঁদা-১: বারির উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্রের ফুল বিভাগ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের নার্সারি থেকে জার্মপ্লাজম সংগ্রহ করে বাছাই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ২০০৯ সালে জাতটি উদ্ভাবন করে। বারির হাতবই অনুযায়ী, এর ফুল আকর্ষণীয় কমলা রঙের, সাধারণত লুজ ফুল হিসেবে ব্যবহৃত হয়; গাছ ৬০-৯০ সেমি উঁচু হয় এবং হেক্টরপ্রতি ফলন প্রায় ৭-৮ টন। বারি বলছে, জাতটি বাংলাদেশের সর্বত্র চাষাবাদ উপযোগী।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যানতত্ত্ব বিভাগের রাখা বারির জাতের তালিকায় জাতটি বারি ম্যারিগোল্ড-১ নামে ২০০৯ সালে অবমুক্ত হিসেবে লেখা আছে।

চাষির জন্য জাত বাছাই একটি ব্যবহারিক সিদ্ধান্ত। বারির হাতবই বলছে, আফ্রিকান গাঁদার চেয়ে ফরাসি গাঁদার প্রতিকূল আবহাওয়ায় খাপ খাওয়ানোর ক্ষমতা বেশি, আর আফ্রিকান গাঁদা দীর্ঘ দিন ও কম তাপমাত্রায় সবচেয়ে ভালো ফুল দেয়। এআইএসের পরামর্শ অনুযায়ী, ভালো জাতের বীজ বা চারা সরকারি হর্টিকালচার সেন্টার বা বিশ্বস্ত নার্সারি থেকে সংগ্রহ করা উচিত।

বাংলাদেশে ফোটা ফরাসি গাঁদা (Tagetes patula)। ছবি: কামরুল ইসলাম শাহীন / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
বাংলাদেশে ফোটা ফরাসি গাঁদা (Tagetes patula)। ছবি: কামরুল ইসলাম শাহীন / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)

আবহাওয়া, মাটি ও উপযুক্ত মৌসুম


গাঁদা চাষের জন্য মৃদু আবহাওয়া প্রয়োজন। বারির হাতবই অনুযায়ী, বাংলাদেশের আবহাওয়ায় সারা বছর গাঁদা ফুলের চাষ করা যায়, তবে আবহাওয়াজনিত কারণে শীতকালের চেয়ে গ্রীষ্ম ও বর্ষাকালে ফলন কম হয়। আফ্রিকান গাঁদা দীর্ঘ দিবস ও স্বল্প তাপমাত্রায় (১৫-২১ ডিগ্রি সেলসিয়াস) উত্তম ফুল দেয়; তাপমাত্রা খুব বেশি হলে গাছের বৃদ্ধি কমে যায়, ফুলের আকার ছোট হয় এবং উৎপাদন ব্যাহত হয়।

জমি হতে হবে উঁচু ও সুনিষ্কাশিত, যাতে গাছের গোড়ায় কখনো পানি না জমে। ভারতের তামিলনাড়ু কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (টিএনএইউ) সুনিষ্কাশিত দোআঁশ মাটির সুপারিশ করে, যার পিএইচ ৭.০ থেকে ৭.৫; তাদের মতে লবণাক্ত ও অম্লীয় মাটি গাঁদা চাষের উপযোগী নয়। এনসি স্টেট এক্সটেনশন জানায়, পূর্ণ রোদে গাঁদা সবচেয়ে ভালো হয়, রোদ ফুল ফোটাতে সাহায্য করে, আর পুরো ছায়া এর পছন্দ নয়। চার-পাঁচবার চাষ ও মই দিয়ে মাটি ঝুরঝুরে করে জমি তৈরি করতে হয়।

বপনের সময় নিয়ে বিভিন্ন সূত্রে ভিন্ন ভিন্ন সময়সূচি আছে; চাষি কোন মৌসুমে ফুল চান, সেই অনুযায়ী বেছে নিতে পারেন:

  • শীতের ফসল: এআইএস ২০২৪ সালের অক্টোবরের কৃষিকথায় লিখেছে, সেপ্টেম্বর-অক্টোবর মাস গাঁদাসহ শীতকালীন সবজি ও ফুল চাষের উপযুক্ত সময়, তবে আগস্টের শেষ সপ্তাহ থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত বীজ থেকে চারা তৈরি করে রোপণ করা যায়। মূল প্রতিবেদনের সময়সূচি, অর্থাৎ নভেম্বরে বীজতলায় বীজ বপন ও ডিসেম্বরে চারা রোপণ, এই সময়ের মধ্যেই পড়ে।
  • বারির হাতবইয়ের সময়সূচি: জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি মাসে বীজতলায় বীজ বপন করতে হয় এবং সাধারণত ৩-৪ পাতাবিশিষ্ট ২৫-৩০ দিনের চারা ফেব্রুয়ারি-মার্চ মাসের মধ্যে মাঠে লাগাতে হয়।

চারা তৈরি থেকে রোপণ: ধাপে ধাপে


বীজ এবং কাণ্ড কাটিং, দুইভাবেই গাঁদার চারা তৈরি করা যায়। বারির হাতবই বলছে, বীজ থেকে উৎপাদিত গাছ স্বাস্থ্যবান, লম্বা ও অধিক ফলনশীল হয়, আর কাটিংয়ের মাধ্যমে সহজে এবং জাতের গুণাগুণ অক্ষুণ্ণ রেখে গাঁদার বংশবিস্তার করা যায়।

  • বীজতলা বা ট্রে তৈরি করুন। চারা তৈরির জন্য এআইএস ৫০ ভাগ কোকোপিট ও ৫০ ভাগ অন্যান্য সার, বালু ও মাটির মিশ্রণকে পটিং মিডিয়া হিসেবে ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছে। বীজ পাতলা করে ছড়িয়ে ওপরে হালকা করে মিডিয়া দিন।
  • চারা ঠিকমতো দাঁড়িয়ে না যাওয়া পর্যন্ত নিয়মিত হালকা সেচ দিয়ে বীজতলা ভিজিয়ে রাখুন।
  • কাটিং দিয়ে চারা করতে চাইলে সুস্থ গাছের শাখা থেকে এক-দুটি পর্বসহ টুকরো কেটে ভেজা বীজতলায় রোপণ করুন, যেমনটি মূল প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
  • সঠিক বয়সে চারা রোপণ করুন। বারি ৩-৪ পাতাবিশিষ্ট ২৫-৩০ দিনের চারা লাগানোর পরামর্শ দেয়; টিএনএইউ চার সপ্তাহ পর চারা রোপণ করে।
  • দূরত্ব বজায় রাখুন। টিএনএইউ ৪৫ সেমি x ৩৫ সেমি দূরত্বে আইলের এক পাশে চারা লাগানোর সুপারিশ করে; তাদের হিসাবে বীজতলার জন্য হেক্টরপ্রতি ১.৫ কেজি বীজ লাগে।
  • রোপণের পরপরই সেচ দিন। টিএনএইউ রোপণের সঙ্গে সঙ্গে এবং তৃতীয় দিনে আবার সেচ দেওয়ার পরামর্শ দেয়।
  • ফাঁকা জায়গা পূরণ করুন: কোনো চারা মারা গেলে সেখানে নতুন চারা লাগান, আর চারা ঘন হলে পাতলা করে দিন।

টব, পাত্র বা পলিব্যাগে চাষ করলে দোআঁশ বা এঁটেল দোআঁশ মাটির সঙ্গে পচা গোবর মিশিয়ে সার-মাটি তৈরি করে ভরতে হয়, আর পাত্রের নিচ দিয়ে পানি বের হওয়ার ব্যবস্থা থাকতে হয়। এআইএস জানায়, ছাদবাগানে সাধারণত টবের মাটির ওপরের দুই ইঞ্চি শুকালে আবার পানি দিতে হয়।

জৈব ও রাসায়নিক সার এবং সেচ


বারির হাতবইয়ে সারের সুপারিশ হেক্টরপ্রতি হিসাবে দেওয়া আছে। গাঁদার জমি চূড়ান্তভাবে তৈরির সময় হেক্টরপ্রতি ১০ টন পচা গোবর, ১৭৫ কেজি টিএসপি ও ১৫০ কেজি এমওপি সার উত্তমরূপে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিতে হবে। হেক্টরপ্রতি ২০০ কেজি ইউরিয়ার অর্ধেক চারা রোপণের ২০-২৫ দিন পর উপরি প্রয়োগ করতে হবে, বাকি অর্ধেক ফুল আসার আগে প্রয়োগ করতে হবে।

তুলনার জন্য, তামিলনাড়ুতে আফ্রিকান গাঁদার জন্য টিএনএইউর সুপারিশ হলো হেক্টরপ্রতি ২৫ টন খামারজাত সার, মৌল সার হিসেবে হেক্টরপ্রতি ৪৫:৯০:৭৫ কেজি নাইট্রোজেন, ফসফরাস ও পটাশ, এবং রোপণের ৪৫ দিন পর উপরি প্রয়োগ হিসেবে হেক্টরপ্রতি ৪৫ কেজি নাইট্রোজেন। মাটি জায়গাভেদে আলাদা, তাই বাংলাদেশের চাষির উচিত বারির মাত্রা অনুসরণ করা বা উপজেলা কৃষি অফিসের মাধ্যমে মাটি পরীক্ষা করে সার দেওয়া।

মাটি শুকানোর আগেই সেচ দিতে হবে, আর গাছের গোড়ায় পানি জমলে নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করতে হবে। টিএনএইউ সপ্তাহে একবার বা প্রয়োজন অনুযায়ী সেচ দিতে এবং পানি জমতে না দিতে বলে। শীতকালে কুয়াশা কেটে রোদ উঠলে সেচ দেওয়া উত্তম বলে এআইএস জানিয়েছে; তাদের মতে অতিরিক্ত বা অতি কম পানি দুটিই গাছের জন্য ক্ষতিকর, আর নেতিয়ে পড়া গাছে হঠাৎ বেশি পানি না দিয়ে অল্প অল্প করে পানি দিতে হয়।

পরিচর্যা: পিঞ্চিং, খুঁটি, আগাছা দমন ও মালচিং


পিঞ্চিং করলে গাছ ঝোপালো হয় এবং ফুলের সংখ্যা বাড়ে। টিএনএইউ রোপণের প্রায় ৩০ দিন পর গাছের ডগা ভেঙে দেওয়ার পরামর্শ দেয়, যাতে শাখা বের হয়। এআইএসের ব্যাখ্যায়, চারা ৬-৮ ইঞ্চি হলে পাতা বা কুঁড়ির শেষ অংশটি সরিয়ে ফেলাকে পিঞ্চিং বলে; এতে গাছে দুই-তিনটি পার্শ্বীয় কাণ্ড বের হয়। ফুল ধরার পর শুকিয়ে যাওয়ার আগেই কেটে দিলে ফুলের সংখ্যা বাড়ে বলেও এআইএস জানিয়েছে।

লম্বা আফ্রিকান গাঁদা হেলে বা ভেঙে পড়তে পারে। এনসি স্টেট এক্সটেনশন বলছে, লম্বা জাতে খুঁটি দিতে হতে পারে, অথবা জোরালো বাতাস ও ভারী বৃষ্টি থেকে আড়াল আছে এমন জায়গায় লাগাতে হয়; ফোটা শেষ ফুল দ্রুত সরিয়ে ফেলা উচিত, কারণ ভারী ফুলের মাথা ডাল ভেঙে দিতে পারে। মূল প্রতিবেদনের পরামর্শ অনুযায়ী, একটি শাখায় ঘন হয়ে অনেক কুঁড়ি ধরলে ওপরের একটি বা দুটি রেখে বাকিগুলো ভেঙে দিলে ফুল বড় হয়।

আগাছা জন্মালেই নিড়ানি দিয়ে পরিষ্কার করতে হবে। এআইএস গাছের বাকল, পাতা বা কাঠের টুকরোর মতো জৈব উপাদান দিয়ে মালচিংয়েরও পরামর্শ দেয়: চারার গোড়ার চারপাশে এক ইঞ্চি ফাঁকা রেখে বাকি অংশ ১-১.৫ ইঞ্চি পুরু করে ঢেকে দিতে হয়। এতে মাটিতে পানি ধরে থাকে, আগাছা কম জন্মায় এবং জৈব উপাদান পচে মাটির গুণাগুণ বাড়ে।

রোগ ও পোকামাকড় দমন: বারির পরামর্শ


গাঁদা শক্ত ফসল, তবে বারির হাতবইয়ে কয়েকটি প্রধান রোগ ও পোকার নাম এবং দমন ব্যবস্থা দেওয়া আছে। নিচের বালাইনাশক ও মাত্রা বারির দেওয়া; স্প্রে করার আগে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার কাছ থেকে জেনে নিন কোন পণ্য বর্তমানে নিবন্ধিত, এবং লেবেল ও নিরাপত্তা নির্দেশনা মেনে চলুন।

  • পাতার দাগ: পাতার ওপর বাদামি-ধূসর রঙের দাগ পড়ে; অতি আক্রমণে পাতা শুকিয়ে যেতে পারে, গাছ দুর্বল হয়। বারির পরামর্শ, ৪ গ্রাম ট্রাইকোডারমা প্রতি লিটার পানিতে মিশিয়ে ১০ দিন পরপর স্প্রে করা যেতে পারে, অথবা রোগ দেখামাত্র অটোস্টিন বা বেনলেট (০.১%) ১৫ দিন পরপর তিনবার স্প্রে করতে হবে।
  • ফুল পচা: ফুলের পাঁপড়িতে ধূসর রঙের দাগ হয়, পাঁপড়ির ভাঁজে ছত্রাকের অসংখ্য স্পোর দেখা যায় এবং পুরো ফুল কালো হয়ে পচে যায়। রোভরাল (০.২%) নামের ছত্রাকনাশক ১০ দিন পরপর স্প্রে করে এ রোগ দমন করা যায়।
  • গ্রে মোল্ড: ফুলের পাঁপড়ি, পাতা, এমনকি কাণ্ডেও বাদামি পানিভেজা দাগ দেখা যায়, পরে ধূসর থেকে বাদামি পাউডারের মতো আস্তরণ পড়ে। যথাযথ রোপণ দূরত্ব মেনে গাছে পর্যাপ্ত আলো-বাতাসের ব্যবস্থা করতে হবে; সেই সঙ্গে ক্যাপটান (০.১%) বা থিরাম ৭৫ (০.৩%) স্প্রে করা যেতে পারে।
  • লাল মাকড়: শুষ্ক মৌসুমে, অর্থাৎ নভেম্বর থেকে এপ্রিল পর্যন্ত আক্রমণ বেশি হয়, বৃষ্টি শুরু হলে কমে। পাতা বিবর্ণ হয়, গাছ মাকড়ের জালে ঢেকে যায় এবং শেষে মারা যায়। শুকনো মৌসুমে পাতার নিচের দিকে ৩-৪ দিন পরপর পানি স্প্রে করতে হবে; আক্রমণ বেশি হলে ভার্টিমেক ১.৮ ইসি (১ মিলি/লিটার পানিতে) অথবা মেজিস্টার ১০ ইসি (২ মিলি/লিটার পানিতে) ৭-১৫ দিন পরপর ছিটাতে হবে।
  • পাতাখেকো লেদা পোকা: তাপমাত্রা কম থাকলে এ পোকার কীড়া কাণ্ড ও পাতা খেয়ে ফেলে। কীড়া মেরে ফেলতে হবে এবং জমিতে ডাল পুঁতে পাখি বসার ব্যবস্থা করতে হবে; আক্রমণ বেশি হলে স্পিনোস্যাড ৪৫ এসসি (ট্রেসার) ১ মিলি/লিটার পানিতে মিশিয়ে ছিটাতে হবে।
  • মিলিবাগ বা ছাতরা পোকা: গাছের রস চুষে খেয়ে গাছ দুর্বল করে এবং ছত্রাকের আশ্রয় হিসেবে কাজ করে। আক্রমণ দেখা গেলে এডমায়ার ২০ এসএল (১.২ মিলি/লিটার), রগর ৪০ ইসি (১.২ মিলি/লিটার), ম্যালাটাফ ৫৭ ইসি (২ মিলি/লিটার) অথবা ফাইফানন ৫৭ ইসি (২ মিলি/লিটার) ৭-১৫ দিন পরপর স্প্রে করতে হবে।

এনসি স্টেট এক্সটেনশন গাঁদার সম্ভাব্য সমস্যার তালিকায় পাউডারি মিলডিউ, ফাইটোফথোরা ও থ্রিপস পোকাও রেখেছে।

ফুল তোলা, ফলন এবং কোথায় পরামর্শ মিলবে


বারির পরামর্শ, ফুল আকারে পূর্ণতা পেলে অল্প বোঁটা রেখে কাঁচি দিয়ে কাটাই উত্তম; এতে ফুল বেশিক্ষণ তাজা থাকে। মূল প্রতিবেদনে খুব ভোরে ফুল তোলার কথা বলা হয়েছে। বারির হাইড্রোপনিক পরীক্ষায় দেখা গেছে, সাধারণত চারা লাগানোর ৫০-৬০ দিনের মধ্যে ফুল আসে এবং প্রতিটি গাছ থেকে ১৫-২০টি ফুল পাওয়া যায়। টিএনএইউ জানায়, তামিলনাড়ুতে রোপণের ৬০ দিন পর থেকে প্রতি তিন দিনে একবার ফুল তোলা হয়, ফসলের মেয়াদ প্রায় ১৩০-১৫০ দিন এবং গড় ফলন হেক্টরপ্রতি প্রায় ১৮ টন।

বারি মাটির বদলে পুষ্টি দ্রবণে, অর্থাৎ হাইড্রোপনিক পদ্ধতিতেও গাঁদা চাষ পরীক্ষা করেছে। হাতবই অনুযায়ী, চারার বয়স ৪-৫ সপ্তাহ হলে রোপণের উপযুক্ত সময়; রোপণের পর দ্রবণের পিএইচ ৫.৫-৬.২ এবং ইসি ১.০-১.৫ এর মধ্যে রাখতে হয়, আর ফুল আসা শুরু হলে ইসি বাড়িয়ে ১.৫-২.০ এর মধ্যে রাখতে হয়। মাঝে মাঝে গাছের নিচের দিকের বয়স্ক পাতা কেটে দিতে হয়, গাছ যেন পর্যাপ্ত আলো পায় তার ব্যবস্থা করতে হয়, আর পিঞ্চিং করে ডগা কেটে দিলে শাখা-প্রশাখা ও ফুল বাড়ে।

গাছ নাড়াচাড়ায় কিছুটা সতর্কতা দরকার। এনসি স্টেট এক্সটেনশন আফ্রিকান ও ফরাসি দুই গাঁদাকেই স্বল্পমাত্রার বিষাক্ত বৈশিষ্ট্যের গাছ হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে: কাটা বা ছড়ে যাওয়া ত্বকে গাছের রস লেগে রোদ পড়লে ত্বক লাল হওয়া, জ্বালাপোড়া ও ফোসকা হতে পারে, আর ফুলের গন্ধে নাক ও চোখে অস্বস্তি হতে পারে। ত্বকে এমন প্রতিক্রিয়া হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

বীজ, প্রশিক্ষণ ও পরামর্শের জন্য চাষিরা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা, নিকটস্থ সরকারি হর্টিকালচার সেন্টার, অথবা গাজীপুরের জয়দেবপুরে বারির উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্রের ফুল বিভাগের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন। বারির হাতবই অনুযায়ী, এই বিভাগ ফুলের জাত উদ্ভাবন, বীজ ও কাটিংয়ের মাধ্যমে উৎপাদন বৃদ্ধি, ফুল সতেজ রাখার সঠিক পদক্ষেপ এবং উন্নত উৎপাদন কলাকৌশল নিয়ে গবেষণা করে।

ছবি: Muhammad Amdad Hossain / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)

সূত্র: দ্য এগ্রো নিউজ (নিজস্ব প্রতিবেদক), বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (কৃষি প্রযুক্তি হাতবই, নবম সংস্করণ, জানুয়ারি ২০২০; বারি প্রযুক্তি তথ্যভান্ডার), কৃষি তথ্য সার্ভিস (কৃষিকথা, ফেব্রুয়ারি ২০২০ ও অক্টোবর ২০২৪), বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যানতত্ত্ব বিভাগ, তামিলনাড়ু কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, এনসি স্টেট এক্সটেনশন, বাংলাপিডিয়া

অনলাইন ডেস্কদা এগ্রো নিউজ

ফুল

সম্পর্কিত খবর

জৈব

গরুর চারণের আচ্ছাদন ফসলে সূর্যমুখী, সেই মাঠেই ফুল তুলতে আসেন দর্শনার্থী

কানাডার ম্যানিটোবার আর্নেসের দুগিদ পরিবার পুনরুৎপাদনশীল চারণের আচ্ছাদন ফসলে কাটা ফুলের সূর্যমুখী জাত যোগ করেছে। এখন একই মাঠ তাদের গরুর খাবার জোগায়, আবার দর্শনার্থীদের নিজ হাতে ফুল তোলার দিনেও ভিড় টানে।

Manitoba Co-operator১৫ অক্টোবর ২০২৬২ মিনিটের পড়া
ফুল

আগুনরঙা সুগন্ধি পানামা রোজ: গোলাপ নয়, রঙ্গনের আত্মীয়; কাটিংয়েই চারা

মিরপুরের জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যানে ফোটা কমলা-লাল পানামা রোজ (Rondeletia odorata) পানামা ও কিউবার গুল্ম; অক্টোবর থেকে মে পর্যন্ত ফোটে, ১০-১৫ সেন্টিমিটার ডাল কেটে পুঁতলে তিন থেকে পাঁচ সপ্তাহে শিকড় গজায়।

সমকাল১৪ অক্টোবর ২০২৬২ মিনিটের পড়া
ফুল

পাবনার বিল-ঝিলে লাল-সাদা শাপলার সমারোহ, তবু কমছে শাপলা জন্মানোর জায়গা

গাজনার বিল, ডিকশির বিল, চলনবিলসহ পাবনার জলাশয়ে এখন লাল ও সাদা শাপলা ফুটেছে; তবে জলাশয় ভরাট, অপরিকল্পিত মাছ চাষ আর কীটনাশকে শাপলার জায়গা সংকুচিত হচ্ছে বলে জানান স্থানীয়রা।

দেশ রূপান্তর১২ অক্টোবর ২০২৬১ মিনিটের পড়া

মন্তব্য

(০)