২০২৪-২৫ সালের শীত মৌসুমে টাঙ্গাইলের নাগরপুর উপজেলার চরাঞ্চলে টমেটোর বাম্পার ফলন হয়েছিল, কিন্তু ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারির শেষে চাষিরা যে দাম পাচ্ছিলেন, তা মৌসুমের শুরুর দামের চেয়ে অনেক নিচে নেমে যায়। এতে অনেক চাষি লোকসানের আশঙ্কায় হতাশ হয়ে পড়েন। জাগো নিউজের টাঙ্গাইল জেলা প্রতিনিধি ২০২৫ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি জানান, চাষিরা তখন গাছ থেকে টমেটো তুলতে ব্যস্ত, কিন্তু ক্রেতা মিলছে কম। প্রতিবেদনে এই টমেটোকে ‘বিষমুক্ত’ বলে বর্ণনা করা হয় এবং বলা হয়, এ অঞ্চলের টমেটো স্থানীয় বাজারের চাহিদা মিটিয়ে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় যাচ্ছে। উপজেলা কৃষি বিভাগ পত্রিকাটিকে জানায়, তারা কৃষকদের সার্বিক সহযোগিতা করছে।
বাম্পার ফলন, তবু পড়তি দাম
পত্রিকাটির সঙ্গে কথা বলা চাষিদের ভাষ্য অনুযায়ী, মৌসুমে বিক্রির শুরুতে টমেটো ২ হাজার থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকা মণ দরে বিক্রি হতো। ফেব্রুয়ারির শেষে তা বিক্রি হচ্ছিল ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা মণ দরে। কৃষকেরা জানান, সে মৌসুমে উপজেলায় বিভিন্ন জাতের টমেটো চাষ হয়েছে, আর এই দামে লাভের বদলে লোকসানের আশঙ্কা করছেন তারা।
মণ হলো বাংলাদেশের কাঁচাবাজারে এখনো প্রচলিত ওজনের প্রথাগত একক; সারা দেশে এক মণ ধরা হয় ৪০ কেজি। গ্রামে জমি এখনো সাধারণত শতাংশ বা ডেসিমেলে মাপা হয়। এক শতাংশ হলো এক একরের একশো ভাগের এক ভাগ, অর্থাৎ প্রায় ৪০.৪৭ বর্গমিটার। মেট্রিক এককের প্রচলনের পর এককটি দাপ্তরিকভাবে বাদ পড়লেও গ্রামের মানুষের দৈনন্দিন হিসাবে তা এখনো চালু আছে।
উপজেলা কৃষি বিভাগ পত্রিকাটিকে টমেটো চাষের জমির হিসাব দেয়। তাদের তথ্যমতে, চলতি মৌসুমে নাগরপুরে ১৫২ হেক্টর জমিতে টমেটো চাষ হয়েছে, আগের বছর যা ছিল ১৩০ হেক্টর। প্রতিবেদনে কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে উৎপাদনের কোনো পরিমাণ জানানো হয়নি। সরেজমিনে প্রতিবেদক দেখতে পান, চরের গ্রামগুলোতে চাষিরা দিনভর গাছ থেকে পাকা টমেটো তুলছেন, আর দামের কারণে তাদের মধ্যে হতাশা বিরাজ করছে।
চাষিরা যা বললেন
কৃষক বাদশা মিয়া জানান, তিনি ১১৫ শতাংশ জমিতে টমেটো চাষ করেছেন এবং বাম্পার ফলন পেয়েছেন। জাগো নিউজকে তিনি বলেন, ‘বাজারে গিয়ে ৩০০ টাকা মণ বিক্রি করতে হচ্ছে। আগে প্রতি মণ ১ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার টাকা বিক্রি হতো।’ দাম কমার কারণ হিসেবে তিনি উৎপাদন বেশি হওয়ার কথা বলেন: উৎপাদন বেশি, তাই বাজারে দাম কম। একই সময়ে সার ও বীজের দাম বেশি হওয়ায় তার খরচও বেড়েছে। তিনি বলেন, ‘এখন পর্যন্ত দেড় লাখ টাকার টমেটোও বিক্রি হয়নি।’
আরেক চাষি রুবেল ইসলাম ক্রেতা না পাওয়ার কষ্টের কথা বলেন। তার ভাষায়, ‘টমেটোগুলো ক্ষেত থেকে তুলে বিক্রির জন্য রাখা হচ্ছে। কিন্তু ক্রেতা কম থাকায় ঠিকমতো বিক্রি করতে পারছি না।’ সার ও বীজের বাড়তি দামের কারণে এ ফসলে তার লোকসান হবে বলে আশঙ্কা করেন তিনি, আর সরকারের সহযোগিতা ও দাম বাড়াতে হস্তক্ষেপ চান।
কৃষক মো. রবিউল জানান, এবার সার ও কামলা দুটোর খরচই বেশি, ফলে চলতি মৌসুমে টমেটো আবাদে আগের চেয়ে বেশি খরচ হয়েছে। তিনি বলেন, ‘গ্রামের বেশিরভাগ কৃষকের একই অবস্থা।’
গৃহিণী আমেনা বেগম বাড়ির পাশের প্রায় ৪০ শতাংশ জমিতে টমেটো চাষ করেছিলেন। তিনি বলেন, বাম্পার ফলন হলেও ভালো দাম পাচ্ছেন না, আর দাম কম থাকলে তার অনেক লোকসান হবে। তবে সামনে দাম বাড়বে বলে আশা করছিলেন তিনি।

কৃষি বিভাগের বক্তব্য
উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা আব্দুল বাছেত মিয়া পত্রিকাটিকে বলেন, কৃষকেরা বাজারে ৩০ টাকা কেজি দরে টমেটো বিক্রি করছেন; ৪০ থেকে ৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি করতে পারলে তারা লাভবান হতেন। তিনি জানান, আরও দুই মাস মাঠে টমেটো থাকবে, আর দাম বেশি হলে চাষিরা লাভবান হবেন।
নাগরপুর উপজেলা কৃষি অফিসার এসএম রাশেদুল হাসান বলেন, উপজেলায় টমেটো চাষের ব্যাপক সম্ভাবনা আছে এবং নাগরপুরে টমেটোর আবাদ দিন দিন বাড়ছে। তার মতে, টমেটো চাষে কৃষকেরা লাভবান হচ্ছেন, আর তার দপ্তর চাষিদের সার্বিক সহযোগিতা করছে। মূল প্রতিবেদনে চাষি ও কর্মকর্তাদের এই দুই রকম ভাষ্য পাশাপাশি তুলে ধরা হয়।
এই দুই কর্মকর্তাই কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই)। এটি বাংলাদেশে কৃষি সম্প্রসারণের দায়িত্বপ্রাপ্ত সরকারি সংস্থা, যা কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীনে কাজ করে এবং যার সদর দপ্তর ঢাকায়। ১৯৮২ সালে কয়েকটি পুরোনো সংস্থা একীভূত করে অধিদপ্তরটি গঠিত হয়: কৃষি পরিদপ্তর (সম্প্রসারণ ও ব্যবস্থাপনা), পাট পরিদপ্তর, উদ্ভিদ সংরক্ষণ পরিদপ্তর, হর্টিকালচার বোর্ড, তামাক উন্নয়ন বোর্ড এবং কেন্দ্রীয় সম্প্রসারণ সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউট। ১৯৯০ সাল পর্যন্ত অধিদপ্তরটি কৃষকদের জন্য ‘প্রশিক্ষণ ও পরিদর্শন’ (ট্রেনিং অ্যান্ড ভিজিট) কর্মসূচি চালায়, এরপর দলভিত্তিক প্রশিক্ষণে যায়। ১৯৯৬ সালে গৃহীত নতুন কৃষি সম্প্রসারণ নীতি এর কাজের দিকনির্দেশনা দেয়।
নাগরপুর: নদী আর চরের উপজেলা
নাগরপুর টাঙ্গাইল জেলার দক্ষিণের উপজেলা। বাংলাদেশের জাতীয় জ্ঞানকোষ বাংলাপিডিয়ার তথ্যমতে, এর আয়তন ২৬২.৭০ বর্গকিলোমিটার। উপজেলাটির উত্তরে টাঙ্গাইল সদর ও দেলদুয়ার, দক্ষিণে মানিকগঞ্জের দৌলতপুর ও সাটুরিয়া, পূর্বে মির্জাপুর ও ধামরাই, আর পশ্চিমে যমুনার ওপারে চৌহালী ও শাহজাদপুর উপজেলা। চারটি নদী এর ভেতর দিয়ে বা পাশ দিয়ে বয়ে গেছে: যমুনা, ধলেশ্বরী, পুরাতন ধলেশ্বরী ও বংশী। গাইঘাটা খাল ও ভারুয়া বিল এখানকার উল্লেখযোগ্য জলাশয়।
উপজেলায় ১২টি ইউনিয়ন, ২১৭টি মৌজা ও ২৪৫টি গ্রাম রয়েছে। ২০১১ সালের আদমশুমারিতে এর জনসংখ্যা ছিল ২ লাখ ৮৮ হাজার ৯২ জন; এর মধ্যে পুরুষ ১ লাখ ৩৬ হাজার ৫৮৫ ও নারী ১ লাখ ৫১ হাজার ৫০৭ জন, আর প্রতি বর্গকিলোমিটারে বাস করেন প্রায় ১ হাজার ৯৭ জন। ৬১.৬৩ শতাংশ পরিবারের আয়ের প্রধান উৎস কৃষি, এরপর ব্যবসা ১১.২০ শতাংশ ও চাকরি ১০.৫০ শতাংশ। বাংলাপিডিয়া বলছে, ৬৫.৭৮ শতাংশ পরিবারের নিজস্ব জমি আছে, আর ৩৪.২২ শতাংশ ভূমিহীন।
বাংলাপিডিয়ায় নাগরপুরের প্রধান ফসল হিসেবে ধান, পাট, গম, সরিষা ও আখের নাম আছে; প্রধান ফল আম, কাঁঠাল, কলা, পেঁপে, জাম ও বরই, আর প্রধান রপ্তানি পণ্য ধান, পাট, কলা ও আখ। বিলুপ্ত বা বিলুপ্তপ্রায় ফসলের তালিকায় আছে তিল, তিসি, কাউন, মিষ্টি আলু, চীনা ও কলাই। উপজেলায় ২৩টি হাটবাজার রয়েছে, যার মধ্যে নাগরপুর, সলিমাবাদ, সহবতপুর ও ধুনিপাড়া হাট উল্লেখযোগ্য; এসব হাট দিয়েই গ্রামের ফসল ব্যবসায়ীদের হাতে পৌঁছায়। নাগরপুর থানা গঠিত হয় ১৯০৬ সালে, আর উপজেলা হয় ১৯৮৩ সালের ৯ সেপ্টেম্বর।

টাঙ্গাইল জেলার আয়তন ৩ হাজার ৪১৪.৩৫ বর্গকিলোমিটার; এটি ঢাকা বিভাগের অন্তর্গত। জেলার উত্তরে জামালপুর, দক্ষিণে ঢাকা ও মানিকগঞ্জ, পূর্বে ময়মনসিংহ ও গাজীপুর, আর পশ্চিমে সিরাজগঞ্জ। জেলায় ১২টি উপজেলা, আর এর নদীর মধ্যে আছে যমুনা, ধলেশ্বরী, লৌহজং, বংশী, তুরাগ ও ঝিনাই। ২০১১ সালের আদমশুমারিতে জেলার জনসংখ্যা ছিল ৩৬ লাখ ৫ হাজার ৮৩ জন, আর ৫৭.২৮ শতাংশ পরিবারের আয়ের প্রধান উৎস ছিল কৃষি।
নাগরপুরের নদীগুলোর একটি ধলেশ্বরী, যমুনার একটি শাখানদী, যার উৎপত্তি টাঙ্গাইল জেলার উত্তর-পশ্চিম অংশে। বাংলাপিডিয়ার বর্ণনায় এটি প্রায় ১৬০ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি আঁকাবাঁকা নদী, যা টাঙ্গাইল ও মানিকগঞ্জের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে মানিকগঞ্জের কাছে দুই শাখায় ভাগ হয়েছে, নারায়ণগঞ্জের কাছে শীতলক্ষ্যার সঙ্গে মিশেছে এবং শাইটনলের কাছে মেঘনায় গিয়ে নিজের আলাদা অস্তিত্ব হারিয়েছে।

চর কী, সেখানে চাষ কেমন
বাংলাদেশে চর বলতে নদী তার নিজের খাত বা মোহনার ভেতরে যে জমি গড়ে তোলে, তাকে বোঝায়; এমন জমিতে গাছপালা জন্মালে সাধারণভাবে তাকে চর বলা হয়। বাংলাপিডিয়া দুই ধরনের চরের কথা বলে: দ্বীপচর, যা সারা বছর পানিবেষ্টিত থাকে, আর সংযুক্ত চর, যা স্বাভাবিক প্রবাহের সময় মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে যুক্ত থাকে। জ্ঞানকোষটির উল্লেখ করা একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে, প্রথম চার বছরে যে চর ভাঙনে হারায় না, চার বছর শেষে তা চাষাবাদ বা বসতির কাজে লাগানো যায়।
নাগরপুরের পশ্চিম পাশের যমুনাই চরের নদী। বাংলাপিডিয়ার হিসাবে ১৯৯৩ সালে বাংলাদেশে মোট চরের আয়তন ছিল প্রায় ১ হাজার ৭২২ বর্গকিলোমিটার, আর ১৯৯২ সালে যমুনার দুই তীরের মাঝের এলাকার প্রায় ৪৫ শতাংশই ছিল চর। সে বছর যমুনার চর ছিল প্রায় ১ লাখ হেক্টর জুড়ে, যা অন্য সব নদীর চর মিলিয়েও বেশি। ১৯৯৩ সালে প্রায় ৬ লাখ ৩১ হাজার মানুষ চরে বাস করতেন, যাদের ৬৫ শতাংশ যমুনার চরে; আর ১৯৮১ থেকে ১৯৯৩ সালের মধ্যে নদীভাঙনে প্রায় ৭ লাখ ২৯ হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হন, যাদের অর্ধেকের বেশি যমুনার তীরের।
চরে চাষাবাদে বিশেষ ঝুঁকি আছে। বাংলাপিডিয়া বলছে, কোথাও কোথাও দুর্বল মাটি, ভাঙনের অনিশ্চয়তা ও ঘন ঘন বন্যার কারণে দ্বীপচর ও সংযুক্ত চর সাধারণত পাশের মূল ভূখণ্ডের চেয়ে কম উৎপাদনশীল। প্রতি বছর চরের বড় অংশ প্লাবিত হয়, আর আগাম বন্যায় ফসলের ক্ষতি হতে পারে। উজানের যমুনায় নতুন গড়ে ওঠা মাটি বেশির ভাগই মোটা বালু, যা চাষের জন্য কম উপযোগী; অন্য জায়গায় মাটি ও পানির অবস্থা বসতি ও চাষের অনুকূল। নদীতে পানি প্রচুর থাকলেও বেশির ভাগ চরে সেচনির্ভর ফসল কম বলে জ্ঞানকোষটি উল্লেখ করেছে। জাগো নিউজের প্রতিবেদনের বর্ণনামতে, নাগরপুরের টমেটো এই চরাঞ্চলেরই শীতের ফসল।
ফসল হিসেবে টমেটো
টমেটো (বৈজ্ঞানিক নাম Solanum lycopersicum; বাংলাপিডিয়ায় এর পুরোনো নাম Lycopersicon esculentum লেখা) বেগুন-আলুর পরিবার সোলানেসির উদ্ভিদ। এর বুনো পূর্বপুরুষের আদি নিবাস দক্ষিণ আমেরিকার পশ্চিমাঞ্চল, আর খ্রিস্টপূর্ব ৫০০ সালের মধ্যেই দক্ষিণ মেক্সিকোতে টমেটোর চাষ হতো। স্প্যানিশ ঔপনিবেশিকেরা গাছটি ইউরোপে নিয়ে যায়, যেখানে ১৫৪০-এর দশকের মধ্যে এর চাষ শুরু হয়; তারা এটি ফিলিপাইনেও নিয়ে যায়, সেখান থেকে টমেটো দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া হয়ে গোটা এশিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে।
বাংলাপিডিয়া টমেটোকে মৃদু অম্লস্বাদযুক্ত, শাঁসালো ফল হিসেবে বর্ণনা করে, যা সাধারণত লাল, কখনো হলুদ, আর সবজি হিসেবে খাওয়া হয়। বাংলাদেশে সাধারণত ২৫ থেকে ৩০ দিন বয়সী চারা নভেম্বর-ডিসেম্বরে রোপণ করা হয়, আর ৮০ থেকে ৯০ দিনে ফসল তোলার উপযোগী হয়। জ্ঞানকোষটির হিসাবে গড় ফলন হেক্টরপ্রতি প্রায় ৪০ থেকে ৫০ টন। এতে দুই ধরনের গাছের কথা বলা হয়েছে: নির্ধারিত বৃদ্ধির গাছ, যার কাণ্ডের মাথায় ফুলের কুঁড়ি হয়, আর অনির্ধারিত বৃদ্ধির গাছ, যার কাণ্ডের মাথায় অঙ্গজ কুঁড়ি থাকে এবং গাছ বাড়তেই থাকে।
বাংলাপিডিয়ায় উল্লিখিত জনপ্রিয় জাতের মধ্যে আছে অক্সহার্ট, মারগ্লোব, সানমারজিনো, রোমা ভিএফ ও পুসা রুবি। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি) নিজস্ব জাতও উদ্ভাবন করেছে, যেমন রতন, মানিক, বারি টমেটো-৩, বারি টমেটো-৪, বারি টমেটো-৫, চৈতি, অপূর্ব, শীলা, লালিমা ও হাইব্রিড অনুপমা; এর মধ্যে বারি টমেটো-৪, বারি টমেটো-৫, চৈতি, লালিমা ও অনুপমা গরম মৌসুমের উপযোগী। ১৯৭৬ সালে কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীনে স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান হিসেবে যাত্রা শুরু করা বারির কেন্দ্রীয় গবেষণা কেন্দ্র গাজীপুরের জয়দেবপুরে। ধান, পাট, আখ ও চা ছাড়া অন্য ফসল নিয়ে গবেষণা এর দায়িত্ব, কারণ ওই চার ফসলের আলাদা ইনস্টিটিউট আছে। রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা বাসস ২০২২ সালের অক্টোবরে জানায়, বারি গ্রীষ্মকালীন তিনটি হাইব্রিড জাত, হাইব্রিড টমেটো-৪, ৮ ও ১১ অবমুক্ত করেছে, আর রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলায় আউশ ধান কাটার পর প্রায় ৩ হাজার হেক্টর জমিতে গ্রীষ্মকালীন টমেটোর চাষ হচ্ছে।
টমেটো কাঁচা সালাদে বা রান্না করে খাওয়া হয়, আর এ থেকে স্যুপ, আচার, চাটনি, কেচাপ ও সস তৈরি হয়। বাংলাপিডিয়া বলছে, এতে ভিটামিন এ ও সি, ক্যালসিয়াম ও ফসফরাস প্রচুর। পুষ্টি সারণির হিসাবে ১০০ গ্রাম কাঁচা লাল টমেটোতে থাকে প্রায় ৯৪.৫ গ্রাম পানি, ১৮ কিলোক্যালরি শক্তি ও ১৪ মিলিগ্রাম ভিটামিন সি; এ ছাড়া আছে লাইকোপিন, যে রঞ্জক পদার্থ পাকা টমেটোকে লাল রং দেয়।
একই মৌসুমে অন্য জেলায় দাম
২০২৪-২৫ মৌসুমে এমন অবস্থা শুধু নাগরপুরের চাষিদের ছিল না। দ্য ডেইলি স্টার ২০২৫ সালের ৮ জানুয়ারি পদ্মাপারের রাজবাড়ী সদর উপজেলা থেকে জানায়, স্থানীয় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সূত্রমতে সেখানকার টমেটোচাষিরা বাম্পার ফলনে খুশি। চারটি ইউনিয়নে ১৩২ হেক্টর জমিতে বাণিজ্যিকভাবে টমেটো চাষ হয়েছিল, জাতের মধ্যে ছিল টিএম ১২০, মিতালী ও রেড জুয়েলের মতো হাইব্রিড। এক চাষি পত্রিকাটিকে বলেন, প্রথম সপ্তাহে দাম ছিল মণপ্রতি ৪ হাজার ৪০০ টাকা, পরে স্থানীয় পাইকারি বাজারে তা নেমে আসে ১ হাজার ৬০০ টাকায়। আরেক চাষি জানান, ১০০ শতাংশ জমিতে টমেটো চাষে তার খরচ হয়েছে ১ লাখ ১৫ হাজার টাকা।
ফেব্রুয়ারির শুরুতে দক্ষিণ-পশ্চিমে দরপতন ছিল আরও তীব্র। ঢাকা ট্রিবিউন ২০২৫ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি ইউএনবির একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে, যাতে বলা হয়, শীতের শেষে স্থানীয় বাজারে সরবরাহ বেড়ে যাওয়ায় বাগেরহাটের টমেটোচাষিরা ফসল বিক্রিতে বড় সমস্যায় পড়েছেন। সেখানে খুচরা বাজারে টমেটো বিক্রি হচ্ছিল কেজি ৮ থেকে ১০ টাকায়, পাইকারিতে ৪ থেকে ৫ টাকায়; কোনো কোনো চাষি টমেটো তোলাই বন্ধ করে দিয়েছিলেন, পাকা টমেটো মাঠেই পচছিল। চরবানিয়ারী গ্রামের এক চাষি বার্তা সংস্থাটিকে জানান, দাম কেজিপ্রতি ৫০ থেকে ৬০ টাকা থেকে নেমে ৩ থেকে ৪ টাকায় দাঁড়িয়েছে। স্থানীয় এক উদ্যোক্তা তখন বাগেরহাটের টমেটো মালয়েশিয়ায় পাঠাতে শুরু করেন; ২০২৫ সালের ২৫ জানুয়ারি থেকে ৪০ টন পাঠানো হয়েছিল, আরও ২৬ টন পাঠানোর কথা ছিল, আর রপ্তানিকারকেরা চাষিদের কেজিপ্রতি ১২ থেকে ১৩ টাকা দিচ্ছিলেন। বাগেরহাট কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক জানান, রপ্তানি করা টমেটো মান যাচাইয়ের সব ধাপ পার হয়েছে।
রাজধানীতে প্রথম আলো ২০২৫ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি জানায়, ঢাকার খুচরা বাজারে টমেটো কেজিপ্রতি ১৫ থেকে ২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, আর কারওয়ান বাজারে ভালো মানের টমেটোর এক পাল্লা বিক্রি হচ্ছে ১০০ টাকায়। কারওয়ান বাজারের এক ব্যবসায়ী পত্রিকাটিকে বলেন, ভরা মৌসুমের শেষ পর্যায়ে থাকায় শীতের সবজি, বিশেষ করে টমেটো, শিম ও ফুলকপির দাম বেশ কমেছে।

আগের মৌসুমগুলোতেও দরপতন
শীতের শেষে টমেটোর দরপতন বাংলাদেশে নতুন নয়। প্রথম আলো ২০১৮ সালের ১৩ মার্চ জানায়, সে বছর টমেটোর দাম এত কমে যায় যে অনেক চাষি ফসল তোলেননি; সে বছরের ফেব্রুয়ারির শেষে বাগেরহাটে এক মণ টমেটোর দাম ছিল প্রায় এক কেজি মোটা চালের দামের সমান। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি ব্যবসা ও বিপণন বিভাগের এক অধ্যাপক পত্রিকাটিকে বলেন, ফসল তোলার সময় নির্ধারণ খুব গুরুত্বপূর্ণ, কারণ চাষিরা সাধারণত সরবরাহ যখন সবচেয়ে বেশি তখনই ফসল তোলেন; তিনি অতি-উৎপাদন ও বাজার তথ্যের ঘাটতির কথাও বলেন। প্রতিবেদনে সিএপিএসএর ২০১৫ সালের একটি সমীক্ষার উল্লেখ ছিল, যাতে বাংলাদেশে সবজির ফসল-পরবর্তী ক্ষতি ১৮ থেকে ৪৪ শতাংশ বলে হিসাব করা হয়।
২০১৮ সালের ওই প্রতিবেদনে ইউএসএআইডির অর্থায়নে পরিচালিত কোল্ড চেইন বাংলাদেশ অ্যালায়েন্সের সাবেক চিফ অব পার্টি বলেন, সাধারণ অবস্থায় টমেটো মাত্র চার-পাঁচ দিন ভালো থাকে, তবে কাঁচা টমেটো হিমাগারে প্রায় ৩০ দিন রাখা যায়। তার ভাষ্যমতে, দেশে ৩০০টির বেশি হিমাগার থাকলেও সেগুলো মূলত আলুর জন্য ব্যবহৃত হয়; স্বল্প সংরক্ষণকাল, ব্যয়বহুল পরিবহন, শীতাতপনিয়ন্ত্রিত গাড়ির অভাব আর তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রিত কেন্দ্রীয় পাইকারি বাজার না থাকায় সবজি সংরক্ষণ পিছিয়ে আছে। শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক অধ্যাপক উদ্বৃত্ত টমেটো কাজে লাগাতে প্রক্রিয়াজাতকরণ ও রপ্তানির কথা বলেন।
২০২২ সালের জুলাইয়ে দ্য ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস জানায়, ২০২১-২২ অর্থবছরে দেশে টমেটোর উৎপাদন রেকর্ড ১৭ লাখ ৫০ হাজার টনে পৌঁছালেও বাংলাদেশ ৭৬ হাজার টন টমেটো আমদানি করেছে। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলে বীজ নিয়ে এক অনুষ্ঠানে তৎকালীন কৃষিমন্ত্রী এ আমদানি নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেন, কারণ তখন ভরা মৌসুমের সরবরাহ-জটে কিছু চাষি বিনিয়োগের টাকাও তুলতে পারেননি; সারা বছর সরবরাহ ছড়িয়ে দিতে তিনি গ্রীষ্মকালীন টমেটোর উৎপাদন বাড়ানোর তাগিদ দেন।
উৎপাদন খরচ: সার, বীজ ও শ্রম
নাগরপুরের চাষিরা তিনটি খরচ বাড়ার কথা বলেন: সার, বীজ ও কামলা বা মজুরি। এর মধ্যে সারের দাম বাড়ার তথ্য নথিভুক্ত। ২০২৩ সালের ১০ এপ্রিল কৃষি মন্ত্রণালয় ও অর্থ মন্ত্রণালয় পৃথক প্রজ্ঞাপনে প্রধান চারটি রাসায়নিক সারের কৃষক পর্যায়ের দাম কেজিপ্রতি ৫ টাকা বাড়ায়। দ্য ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস ২০২৩ সালের ১২ এপ্রিল জানায়, নতুন দাম ইউরিয়া কেজিপ্রতি ২৭ টাকা, ডিএপি ২১ টাকা, টিএসপি ২৭ টাকা ও এমওপি ২০ টাকা। এর আগে ২০২২ সালের আগস্ট থেকে ইউরিয়ার দাম ছিল কেজিপ্রতি ২২ টাকা।
মন্ত্রণালয় এই পরিবর্তনকে বিশ্ববাজারের দামের সঙ্গে সমন্বয় বলে বর্ণনা করে এবং জানায়, এরপরও সরকার প্রতি কেজিতে ভর্তুকি দেবে: ইউরিয়ায় ২১ টাকা, ডিএপিতে ৪৯ টাকা, টিএসপিতে ২৩ টাকা ও এমওপিতে ৪০ টাকা। ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস উল্লেখ করে, আগের ছয় মাসে বিশ্ববাজারে ইউরিয়া ও এমওপির দাম আসলে কমেছিল; পত্রিকাটির উদ্ধৃত এক কৃষি অর্থনীতিবিদের হিসাবে এতে কৃষকের বাড়তি খরচ হবে ৩ হাজার ৪০০ কোটি টাকা, অর্থাৎ বিঘাপ্রতি মোটামুটি ৫০০ থেকে ৫৫০ টাকা। নাগরপুরের প্রতিবেদনে বীজ ও শ্রমের খরচের কোনো অঙ্ক দেওয়া হয়নি; চাষিরা শুধু বলেছেন, তা আগের চেয়ে বেশি।
ছবি: Frameofashik / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: জাগো নিউজ, বাংলাপিডিয়া, দ্য ডেইলি স্টার, ঢাকা ট্রিবিউন (ইউএনবি), প্রথম আলো, দ্য ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস, বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস), উইকিপিডিয়া





মন্তব্য
(০)