কুষ্টিয়া সদর উপজেলার উজানগ্রাম ইউনিয়নের কৃষকদের মধ্যে ২০২৪ সালের নভেম্বরে বিষমুক্ত সবজি চাষে আগ্রহ বাড়ছিল। সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা (আইপিএম) পদ্ধতিতে কীটনাশকের বদলে জৈব বালাইনাশক ও সেক্স ফেরোমন ফাঁদ ব্যবহার, উপকারী পোকামাকড় সংরক্ষণ এবং পরিচ্ছন্ন চাষাবাদে কম খরচে বেশি উৎপাদন হচ্ছে বলে কৃষকেরা জাগো নিউজকে জানান। খবরটি প্রকাশিত হয় ২০২৪ সালের ৩০ নভেম্বর।
উজানগ্রামে ১০০ একরে ১৫ ধরনের সবজি
কুষ্টিয়া কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সে সময় উজানগ্রাম ইউনিয়নের কয়েকটি গ্রামে প্রায় ১০০ একর জমিতে বিষমুক্ত সবজি চাষ হচ্ছিল। কৃষি বিভাগের কারিগরি সহায়তা ও পরামর্শে সেখানে টমেটো, বেগুন, শিম, লাউ, পটোল, লালশাকসহ প্রায় ১৫ ধরনের সবজি কীটনাশক ছাড়াই উৎপাদন করা হচ্ছিল।
উজানগ্রাম কুষ্টিয়া সদর উপজেলার ১৪টি ইউনিয়নের একটি। খুলনা বিভাগের এই উপজেলার আয়তন ৩১৮.২২ বর্গকিলোমিটার; ২০২২ সালের জনশুমারিতে এখানে জনসংখ্যা ছিল ৫ লাখ ৬০ হাজার ৯৬৩।

কৃষকদের অভিজ্ঞতা: খরচ কম, লাভ বেশি
উজানগ্রাম ইউনিয়নের বারুইপাড়া গ্রামের কৃষক আসাদুজ্জামান জানান, তিনি কীটনাশক ছাড়াই আইপিএম পদ্ধতিতে ৪৬ শতক জমিতে টমেটো চাষ করছেন। তাঁর ভাষায়, এ পদ্ধতিতে উৎপাদন খরচ তুলনামূলক কম, আর বাজারে বিষমুক্ত সবজির চাহিদা থাকায় কৃষকেরা লাভবান হচ্ছেন।
আসাদুজ্জামান বলেন, ‘টমেটো চাষ করে এত লাভ হবে, কখনো ভাবিনি। সামনের মৌসুমে আরও বেশি জমিতে টমেটো চাষ করবো। এ টমেটো বিষমুক্ত। টমেটোর জমিতে কোনো কীটনাশক ব্যবহার করা হয়নি। ফল ও ডগা ছিদ্রকারী পোকার জন্য টমেটো গাছে সবচেয়ে বেশি বিষ প্রয়োগ করতে হয়। কীটনাশকের বদলে জৈব বালাইনাশক ও সেক্স ফেরোমন ফাঁদের ব্যবহার করায় সবজি চাষে বিষ প্রয়োগ করতে হয়নি। এর আগে প্রতি সপ্তাহে আড়াই হাজার থেকে তিন হাজার টাকার বিষ প্রয়োগ করতে হতো।’
আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে ৪৬ শতক জমির টমেটো থেকে খরচ বাদে কমপক্ষে ১ লাখ টাকা লাভ হবে বলে তিনি আশা করছিলেন।
একই এলাকার কৃষক আব্দুস সাত্তার বলেন, ‘২৫ শতক জমিতে পটোলের চাষ করছি। আইপিএম পদ্ধতি ব্যবহারে আগের চেয়ে খরচ কমেছে। ফলে লাভ বেশি হচ্ছে।’

আইপিএম ও সেক্স ফেরোমন ফাঁদ কী
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) আইপিএমকে বর্ণনা করে এমন একটি পদ্ধতি হিসেবে, যেখানে বালাই দমনের সব উপায় বিবেচনা করে এমন ব্যবস্থাগুলো একসঙ্গে নেওয়া হয়, যাতে ক্ষতিকর পোকার সংখ্যা বাড়তে না পারে। এতে জৈবিক, রাসায়নিক, ভৌত ও ফসলভিত্তিক চাষাবাদ কৌশল মিলিয়ে সুস্থ ফসল ফলানো এবং কীটনাশকের ব্যবহার যতটা সম্ভব কমানো হয়; প্রাকৃতিক বালাই দমন ব্যবস্থাকে উৎসাহ দেওয়া হয় এবং মানুষের স্বাস্থ্য ও পরিবেশের ঝুঁকি কমানো লক্ষ্য থাকে।
সেক্স ফেরোমন হলো স্ত্রী পোকার নিঃসৃত একধরনের রাসায়নিক, যা দিয়ে সে মিলনের জন্য পুরুষ পোকাকে আকর্ষণ করে। ফাঁদে এই গন্ধের টোপ রাখলে নির্দিষ্ট প্রজাতির পুরুষ পোকা ধরা পড়ে, অন্য পোকার তেমন ক্ষতি হয় না; ফলে ফাঁদটি দিয়ে খেতে পোকার উপস্থিতিও নজরে রাখা যায়। তবে ফাঁদে কেবল পূর্ণবয়স্ক পোকা আসে, ক্ষতিকর কীড়া নয়।
বাংলাদেশে বেগুনের সবচেয়ে ক্ষতিকর পোকাগুলোর একটি হলো বেগুনের ডগা ও ফল ছিদ্রকারী পোকা (Leucinodes orbonalis)। ডিম ফোটার এক ঘণ্টার মধ্যেই এর কীড়া কচি ডগা, ফুল বা ফলে ঢুকে পড়ে; সামান্য আক্রান্ত ফলও বাজারে বিক্রির অযোগ্য হয়ে যায়। ২০১১ সালের জুনে দ্য ডেইলি স্টারের এক প্রতিবেদনে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বারি) তৎকালীন মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা সৈয়দ নূরুল আলমের বরাতে বলা হয়, দেশে জৈব বালাইনাশকের আওতা ২০০৯-১০ সালে ১৬ হাজার হেক্টরে পৌঁছেছিল। একই প্রতিবেদনে বলা হয়, রাসায়নিক কীটনাশকে বেগুন চাষের খরচ হেক্টরপ্রতি ৬৫ হাজার টাকা ছাড়িয়ে যায়, জৈব বালাইনাশকে সেই খরচ ১১ হাজার টাকা।

কৃষি বিভাগ যা বলেছিল
উজানগ্রাম ইউনিয়নের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা সাইদুর রহমান বলেন, ‘পরিবেশবান্ধব কৌশলের মাধ্যমে জৈব বালাইনাশক ব্যবহার করে বিভিন্ন সবজি চাষ হচ্ছে। এখানে সম্পূর্ণ আইপিএম পদ্ধতি ব্যবহার করেই প্রায় ১৫ ধরনের সবজি উৎপাদন করা হচ্ছে। নিরাপদ উপায়ে এসব সবজি চাষের জন্য কৃষকদের মোটিভেশনের পাশাপাশি বিভিন্ন কৃষক সমাবেশের মাধ্যমে আধুনিক জৈবপ্রযুক্তি সম্পর্কে জানানো হচ্ছে এবং জনগণকেও সচেতন করা হচ্ছে।’
কুষ্টিয়া কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক সুফি মো. রফিকুজ্জামান বলেন, ‘সবজি ক্ষেতে পোকা দমনে যেসব কীটনাশক ব্যবহার করা হয়, তা মানবদেহের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। এ কারণে কৃষকদের কীটনাশক ব্যবহারে নিরুৎসাহিত করে বিষমুক্ত ও স্বাস্থ্যবান্ধব সবজি চাষে পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।’ তিনি জানান, কৃষি বিভাগের সঙ্গে বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থাও কৃষকদের পরামর্শ দিচ্ছে। শুরুতে কৃষকদের এ পদ্ধতিতে আগ্রহী করতে বেগ পেতে হলেও উৎপাদনে সাফল্য দেখে উপজেলার কৃষকেরা দিন দিন এতে উদ্বুদ্ধ হচ্ছেন।
ছবি: Geronimatrix / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও), দ্য ডেইলি স্টার, উইকিপিডিয়া





মন্তব্য
(০)