সরাসরিবাজারদর
আটা (প্যাকেটজাত)৫৮—আদা - আমদানিকৃত১৬৭—আদা - দেশী১৫৪—আমন চাল - মাঝারি৫৬—আমন চাল - মোটা৪৮—আমন চাল - সরু৭২—আয়োডিনযুক্ত লবণ (প্যাকেটজাত)৩২—কাঁচা মরিচ২১৮—খামারের মুরগী১৬২—খাসী৯০০—চিনি (দেশী)১৩২—ছোলা - গোটা৮৫—ডিম ফার্ম - লাল৪৭—পেঁয়াজ - দেশী৬০—বোরো চাল - মাঝারি৫৫—বোরো চাল - মোটা৪৭—বোরো চাল - সরু৬৬—মাংসঃ– গরু৭২৯—মুগ ডাল১২২—রসুন - আমদানিকৃত১৯২—রসুন - দেশী১৭৩—সয়াবিন তেল১৬৩—
হালনাগাদ ১৬ অক্টোবর ২০২৬
ঢাকা২৬°পরিষ্কার আকাশআর্দ্রতা ৭৪%বাতাস ৩ কিমি/ঘ

মাছ ধরার পুরোনো পদ্ধতি খুচইন জাল

নদীর অগভীর জলে কোমরভেজা অবস্থায় দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটি যেন সময়ের সঙ্গে লড়াই করা এক প্রতীক। দুহাতে ছড়িয়ে ধরা জাল দিয়ে মাছ ধরছেন তিনি। ব্যবহার করছেন 'খুচইন জাল'। কোনো কোনো অঞ্চলে এটিকে 'ফেন্নি জাল' বলা হয়। নদীর জলে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটি কেবল মাছ ধরছেন না; তিনি বহন করছেন শত বছরের জ্ঞান, শ্রম আর সংস্কৃতি।

নদীর অগভীর জলে কোমরভেজা অবস্থায় দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটি যেন সময়ের সঙ্গে লড়াই করা এক প্রতীক। দুহাতে ছড়িয়ে ধরা জাল দিয়ে মাছ ধরছেন তিনি। ব্যবহার করছেন 'খুচইন জাল'। কোনো কোনো অঞ্চলে এটিকে 'ফেন্নি জাল' বলা হয়। নদীর জলে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটি কেবল মাছ ধরছেন না; তিনি বহন করছেন শত বছরের জ্ঞান, শ্রম আর সংস্কৃতি। আধুনিক যন্ত্রের দাপটে হারিয়ে যেতে বসা মাছ ধরার কৌশল আজও গ্রামবাংলার কিছু নদী, খাল ও মোহনায় টিকে আছে ঐতিহ্যের নীরব সাক্ষী হয়ে।

একজন শহুরে পাঠকের কাছে খুচইন জাল শুধু একটি 'গ্রামীণ দৃশ্য' মনে হতে পারে। অথচ এর ভেতরে লুকিয়ে আছে শ্রমনীতি, পরিবেশ ভাবনা ও লোকজ জ্ঞানের সমন্বয়—যা আধুনিক উন্নয়ন আলোচনার সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত।

কী এই খুচইনখুচইন মূলত হাতে চালানো এক ধরনের ঐতিহ্যবাহী জাল। বাঁশের দুই বা ততধিক দণ্ডের সঙ্গে যুক্ত জালটি ত্রিভুজ বা চওড়া ফানেলের মতো বিস্তৃত থাকে। জেলে ধীরে ধীরে পানির ভেতর হাঁটতে হাঁটতে জালটি সামনে ঠেলে দেন। মাছ স্রোতের সঙ্গে জালে ঢুকে পড়ে এবং শেষে জালের মুখ তুলে ধরা হয়। ছোট মাছ, পোনা কিংবা চিংড়ি—সবই ধরা পড়ে এ কৌশলে। এই জালে ধরা পড়ে পুঁটি, চেলা, টেংরা, কই, শিংসহ নানা জাতের মাছ। কোনো ইঞ্জিন নেই, নেই শব্দ; আছে কেবল মানুষের শরীরের তাল আর নদীর স্রোতের বোঝাপড়া। এ জালে ধরা মাছ সাধারণত টাটকা ও জীবিত অবস্থায় বাজারে আসে। তাই স্থানীয় হাটে এসব মাছের আলাদা কদর থাকে। বিশেষ করে দেশি ছোট মাছের চাহিদা বাড়লে খুচইন জালের জেলেরা তুলনামূলক ভালো দাম পান।

জীবিকা ও সংস্কৃতির মিলনখুচইন জাল শুধু মাছ ধরার উপকরণ নয়, এটি বহু পরিবারের জীবনের অংশ। ভোরের আলো ফোটার আগেই নদীতে নামা, দুপুরের রোদে জাল শুকানো, সন্ধ্যায় ধরা মাছ নিয়ে হাটে যাওয়া—এ চক্রেই আবর্তিত হয় খুচইন জেলেদের দিন। অনেক এলাকায় এ জাল চালানো শেখানো হয় প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে, কোনো বই বা প্রশিক্ষণ ছাড়াই। অনেক নদী-পাড়ের এলাকায় খুচইন জাল ব্যবহারে নারীরাও সক্রিয় ভূমিকা রাখেন। কেউ সরাসরি জলে নামেন, কেউ জাল মেরামত, সুতা বাঁধা কিংবা ধরা মাছ বাছাইয়ের কাজ করেন। এ পদ্ধতির সঙ্গে নারীদের শ্রম ও দক্ষতা অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত।

গ্রামীণ লোকগাথা, স্মৃতি আর গল্পে এ জালের উপস্থিতি এখনো চোখে পড়ে। খুচইন জাল ঘিরে আছে নানা লোকবিশ্বাস। অনেক জেলে নতুন জাল প্রথমদিন নদীতে নামানোর আগে বিশেষ নিয়ম মানেন—কেউ নির্দিষ্ট দিনে জাল নামান, কেউ আবার প্রথম ধরা মাছ কাউকে দান করেন। এসব বিশ্বাস নদীর সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের এক আধ্যাত্মিক রূপ তুলে ধরে।

দক্ষতা ও ধৈর্যের পরীক্ষাখুচইন জাল চালানো সহজ কাজ নয়। পানির গভীরতা, স্রোতের গতি, নদীর তলদেশ—সবকিছুর হিসাব রাখতে হয়। সামান্য ভুলে জাল ফাঁকা হয়ে যেতে পারে। খুচইন জাল সারাবছর সমানভাবে ব্যবহার করা হয় না। বর্ষায় নদীর পানি ফুলে উঠলে জাল চালানো হয় অপেক্ষাকৃত শান্ত তীরঘেঁষা এলাকায়। শীতকালে আবার খাল ও শাখা নদীতে এর কার্যকারিতা বেশি। তাই এ পদ্ধতিতে মাছ ধরতে দরকার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা, ধৈর্য আর নদীকে বোঝার ক্ষমতা। অনেক জেলে বলেন, 'নদীর ভাষা না বুঝলে খুচইন জাল চলে না।'

পরিবেশবান্ধব মাছ ধরাআধুনিক ট্রল বা কারেন্ট জালের বিপরীতে খুচইন জাল পরিবেশের জন্য তুলনামূলক নিরাপদ। এটি নদীর তলদেশ নষ্ট করে না, অতিরিক্ত ছোট মাছ নিধনও করে না। আবার বড় মাছ বা মা মাছ সহজে রক্ষা পায়। প্রয়োজনমতো জাল টেনে নেওয়া যায় বলে অপ্রয়োজনীয় মাছ জীবিত অবস্থায় ছেড়ে দেওয়া যায়। ফলে জীববৈচিত্র্যের ওপর চাপ কম পড়ে। এককথায় পরিবেশগত দিক থেকে খুচইন জাল অত্যন্ত নিরাপদ ও গুরুত্বপূর্ণ। কারেন্ট জাল বা ট্রলের মতো নির্বিচার নিধন এখানে নেই। ফলে প্রাকৃতিক মাছের প্রজনন প্রক্রিয়া তুলনামূলকভাবে সুরক্ষিত থাকে।

বিলুপ্তির ঝুঁকিতে ঐতিহ্যখুচইন জাল বানানোও একটি আলাদা দক্ষতা। বাঁশ কাটা থেকে শুরু করে শুকানো, মাপজোক, সুতা গাঁথা—সবকিছুই হাতে করা হয়। অনেক এলাকায় নির্দিষ্ট পরিবার বা কারিগররা এ জাল তৈরি করেন। তবে বাস্তবতা হলো—এ আদি সংস্কৃতি আজ সংকটে। নদী ভরাট, দূষণ, আধুনিক যন্ত্রচালিত জালের আগ্রাসন আর তরুণ প্রজন্মের আগ্রহহীনতা খুচইন জালকে ঠেলে দিচ্ছে প্রান্তে। কম আয় ও বেশি পরিশ্রমের কারণে খুচইন জাল থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে নতুন প্রজন্ম। অনেক জায়গায় এ জাল এখন শুধু বয়স্ক জেলেদের হাতেই দেখা যায়। অনেকেই বলছেন, 'আয় কম, কষ্ট বেশি—তাই সহজ পথ বেছে নিচ্ছে নতুন প্রজন্ম।'

সংরক্ষণ প্রয়োজনখুচইন জাল টিকিয়ে রাখতে দরকার সচেতনতা ও প্রণোদনা। স্থানীয় পর্যায়ে এ পদ্ধতিকে পরিবেশবান্ধব মাছ ধরার মডেল হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া যেতে পারে। পর্যটন কিংবা ডকুমেন্টেশনের মাধ্যমে তুলে ধরা গেলে, নতুন করে আগ্রহ তৈরি হতে পারে। মানুষকে বোঝাতে হবে, খুচইন জাল শুধু একটি জাল নয়, এটি নদীমাতৃক বাংলার এক নীরব ঐতিহ্য, যা বাঁচিয়ে রাখা আমাদেরই দায়িত্ব।

পরিবেশ বিষয়ক নাগরিক প্লাটফর্ম 'ধরিত্রী রক্ষায় আমরা'র (ধরা) আমতলী-তালতলীর (বরগুনা) সমন্বয়ক আরিফুর রহমান বলেন, 'খুচইন জালকে পরিবেশবান্ধব ঐতিহ্যবাহী মাছ ধরার পদ্ধতি হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া যেতে পারে। নদীকেন্দ্রিক পর্যটন, তথ্যচিত্র নির্মাণ, স্থানীয় প্রশিক্ষণ ও সরকারি সহায়তা পেলে এ সংস্কৃতি আবার প্রাণ ফিরে পেতে পারে।'

উপকূলীয় জেলে আনিসুর রহমানের কথা থেকে জানা গেল, খুচইন জাল চালাতে হয় ঘণ্টার পর ঘণ্টা ঠান্ডা পানিতে দাঁড়িয়ে। ফলে শীতকালে বাতব্যথা, ত্বকের রোগ, পেশির টান—এগুলো জেলেদের নিত্যসঙ্গী। তবু বিকল্প না থাকায় অনেকেই এ কষ্ট মেনে নেন। দিকটি খুচইন জালের বাস্তবতার একটি নীরব অধ্যায়। তবুও জেলেরা মনে করেন, খুচইন জাল কেবল মাছ ধরার উপকরণ নয়—এটি নদীমাতৃক বাংলার শত বছরের অভিজ্ঞতা, শ্রম ও সহাবস্থানের গল্প।

নদীর জলে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটি আমাদের মনে করিয়ে দেন, প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই নয়—বরং বোঝাপড়ার মধ্যেই টিকে থাকার আসল কৌশল।

জাগো নিউজ ২৪সূত্র

মৎস্য

সম্পর্কিত খবর

মৎস্য

কেরালার উপকূলীয় নারীদের ৮৪টি মাছের ব্যবসা, পারিবারিক আয় বেড়েছে ৩০-৩৫ শতাংশ

আইসিএআর-সিএমএফআরআইয়ের এক কর্মসূচির সহায়তায় ২০২২ থেকে ২০২৬ সালে কেরালার আট জেলায় ৮৪টি মৎস্যভিত্তিক ক্ষুদ্র উদ্যোগ গড়ে উঠেছে; সরাসরি উপকৃত ৪৬৯ জন, যাঁদের বেশির ভাগ তফসিলি জাতিভুক্ত।

আইসিএআর১৬ অক্টোবর ২০২৬১ মিনিটের পড়া
মৎস্য

সৌরশক্তির রিসার্কুলেটিং ট্যাংকে পাহাড়ে ট্রাউট চাষ, পানি লাগবে ৮০ শতাংশ কম

ভারতের উত্তরাখণ্ডের এক খামারে সৌরশক্তিচালিত হাইব্রিড রিসার্কুলেটিং অ্যাকুয়াকালচার সিস্টেম চালু করেছে আইসিএআর-সিআইসিএফআর; প্রতিষ্ঠানটির দাবি, এতে পানি প্রায় ৮০ শতাংশ কম লাগে এবং একজন ট্রাউটচাষি বছরে ৪ থেকে ৫ লাখ রুপি উদ্বৃত্ত পেতে পারেন।

আইসিএআর১৬ অক্টোবর ২০২৬১ মিনিটের পড়া
মৎস্য

আট পদের পাঁচটিই শূন্য, তিনজনে চলছে শায়েস্তাগঞ্জের সরকারি মৎস্য বীজ খামার

১৯৬২ সালে প্রতিষ্ঠিত হবিগঞ্জের শায়েস্তাগঞ্জ সরকারি মৎস্য বীজ উৎপাদন খামারে ১২টি পুকুরে পোনা উৎপাদন চললেও আট পদের পাঁচটি শূন্য, নৈশপ্রহরী নেই, বরাদ্দ না থাকায় চাষি প্রশিক্ষণও বন্ধ।

মানবজমিন১৫ অক্টোবর ২০২৬১ মিনিটের পড়া

মন্তব্য

(০)