টাঙ্গাইলের নাগরপুর উপজেলার মামুদ নগর ইউনিয়নের ভাতশালা গ্রামের ৩৮ বছর বয়সী জহুরুল ইসলাম রাজশাহীর মিষ্টি পান চাষ করে জেলায় পরিচিতি পেয়েছেন। ২০২৪ সালের ৭ নভেম্বর জাগো নিউজের টাঙ্গাইল প্রতিনিধির প্রতিবেদনে এই খবর আসে। মৃত সরব আলীর ছেলে জহুরুল আগে অন্যের টেইলারিং (দর্জি) দোকানে কাজ করতেন, অভাব-অনটনের মধ্যে সংসার চলত। প্রতিবেদন অনুযায়ী, পান চাষ তাঁর সংসারে সচ্ছলতা ফিরিয়েছে, আর জেলায় পানচাষিদের কাছে তিনি এখন একটি উদাহরণ।
তাঁর বাগানটি ছোট। রাজশাহীর এক বন্ধুর পরামর্শে সেখান থেকে প্রথমে ৫ হাজার মিষ্টি জাতের পানের চারা এনে বাড়ির পাশে ২৫ শতাংশ জমিতে পরীক্ষামূলকভাবে রোপণ করেন তিনি। প্রতিবেদন বলছে, প্রথম বছরেই তিনি লাভের মুখ দেখেন। জহুরুলের দাবি, নাগরপুর উপজেলায় তিনিই প্রথম রাজশাহীর মিষ্টি পানের চাষ শুরু করেন, আর বাগানে কোনো সমস্যা হলে এখনো রাজশাহীর চাষিদের পরামর্শ নেন।
দর্জির দোকান থেকে পানের বরজে
কীভাবে শুরু করলেন, সে কথা জহুরুল সংক্ষেপে বলেছেন। জাগো নিউজকে তিনি বলেন, '২০২১ সাল থেকে আমি পান চাষ করছি। নাগরপুর উপজেলায় আমিই প্রথম রাজশাহীর মিষ্টি পানের চাষ শুরু করি। কোনো সমস্যা হলে রাজশাহীর চাষিদের পরামর্শ নিই।' চারা, বন্ধুর পরামর্শ আর চাষের কৌশল, সবই এসেছে দেশের উত্তর-পশ্চিমের জেলা রাজশাহী থেকে।
পানের বাগানকে বাংলায় বরজ বলা হয়। এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশের জাতীয় জ্ঞানকোষ বাংলাপিডিয়া জানায়, একটি বরজের আয়তন সাধারণত বারো থেকে কুড়ি শতাংশের মধ্যে থাকে; জহুরুলের ২৫ শতাংশের বরজ তার চেয়ে খানিকটা বড়। বরজ এক মৌসুমের ফসল নয়, দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ। বাংলাপিডিয়ার তথ্যমতে, চারা রোপণের এক বছর পর পান তোলার উপযোগী হয় এবং বরজ তৈরির পর কয়েক বছর ধরে তা থেকে ফলন পাওয়া যায়।
প্রতিবেশীরাও বিষয়টি খেয়াল করেছেন। এলাকাবাসী মো. হামিদ খান জাগো নিউজকে বলেন, 'জহুরুল অনেক কষ্ট করে রাজশাহীর মিষ্টি পানের একটি বরজ তৈরি করেছে। আমরা তার এখান থেকে পান কিনে খাই। পানের স্বাদ রাজশাহীর পানের মতোই। এলাকায় যদি জহুরুলের মতো আরও উদ্যোক্তা তৈরি হয়, তাহলে জেলার পানের চাহিদা অনেকটা পূরণ হবে।'
খরচ, আয় আর এ বছরের ঝড়-বৃষ্টির ক্ষতি: চাষির নিজের ভাষায়
প্রতিবেদনের অঙ্কগুলো চাষির নিজের দেওয়া, এখানে সেগুলো তাঁর কথামতোই রাখা হলো। জহুরুল বলেন, 'পানের বরজ তৈরি করতে প্রায় ১ লাখ ৭০ হাজার টাকা খরচ হয়। পান চাষে এ পর্যন্ত ২ লাখ টাকা লাভ হয়েছে। আশা করছি আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে লাভের পরিমাণ বাড়বে।'
পানের বেশির ভাগ তিনি কাছের বাজারেই বিক্রি করেন। তাঁর ভাষায়, 'আমি এই বাগানের পান স্থানীয় হাট-বাজারে পাইকারি বিক্রি করি। মাঝে মাঝে বিক্রির জন্য রাজশাহীতেও পাঠাই।' ২০২৪ সালের আবহাওয়া তাঁর অনুকূলে ছিল না। তিনি বলেন, 'এ বছর ঝড় ও টানা বৃষ্টিতে বরজের প্রায় দেড় লাখ টাকার মতো ক্ষতি হয়েছে। বেশ কিছু পান গাছ মারা গেছে।' তবু তিনি ফসলটিকে লাভজনক বলেছেন: 'পোকার উপদ্রব ঠেকাতে ওষুধ ছিটানো ছাড়া অতিরিক্ত কোনো খরচ নেই বলে পান চাষ লাভজনক।'
জহুরুল জানান, শুরু থেকেই সরকারের কৃষি দপ্তর তাঁর পাশে আছে। তিনি বলেন, 'আমার পান চাষে কৃষি বিভাগ সার্বক্ষণিক পরিদর্শনের পাশাপাশি পরামর্শ দিয়ে সহযোগিতা করছে। আমার কাছে কেউ যদি পান চাষের বিষয়ে সহযোগিতা চান, তাহলে সহযোগিতা করবো। সরকার যদি সহযোগিতা করে, তাহলে ব্যবসার পরিধি বাড়ানো সম্ভব।'
আবহাওয়াজনিত ক্ষতির যে অভিজ্ঞতা তিনি বলেছেন, অন্য এলাকার চাষিদের কথাতেও তা মেলে। ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাজশাহী থেকে দ্য ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসের প্রতিবেদনে বাগমারার এক চাষি বলেন, বর্ষাকালে উৎপাদনে সমস্যা দেখা দেয়। আর ২০২৪ সালের মে মাসে প্রতিদিনের বাংলাদেশ রাজশাহীর চাষিদের বরাতে জানায়, পান চাষে ঝুঁকি ও রোগবালাই কম হলেও বর্ষায় মড়কের ঝুঁকি থাকে।
উপজেলা কৃষি অফিস যা বলছে
নাগরপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. ইমরান হোসাইন জাগো নিউজকে বলেন, উপজেলাটি এই ফসলের উপযোগী। তাঁর ভাষায়, 'পান চাষের উপযোগী এলাকা নাগরপুর। যার দৃষ্টান্ত উপজেলার মামুদ নগরের জহুরুল ইসলাম। আমরা সার্বক্ষণিক পরিদর্শনের পাশাপাশি কারিগরি পরামর্শ দিচ্ছি। এ ছাড়া উপজেলায় পান চাষের উদ্যোক্তা তৈরির জন্য চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।'
২০২৪ সালে একই দপ্তর উপজেলায় অন্য নতুন উদ্যোগেও উৎসাহ দিচ্ছিল। ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা বাসস নাগরপুরের গয়হাটা ইউনিয়ন থেকে খবর দেয়, একদল কৃষক প্রায় ২০০ শতাংশ জমিতে ক্ষতিকর কীটনাশক ছাড়া বেগুন, টমেটো ও শসা চাষ করছেন, আর উপজেলা কৃষি বিভাগ এলাকার নিরাপদ সবজি বিদেশে রপ্তানির পরিকল্পনা নিয়েছে। ওই প্রতিবেদনে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা বলেন, সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী দেশের খাদ্য নিরাপত্তার জন্য এক ইঞ্চি জমিও পতিত রাখা যাবে না।
উপজেলা কৃষি অফিস হলো কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) মাঠপর্যায়ের দপ্তর; প্রতিটি উপজেলায় এই সরকারি সংস্থা কৃষকদের পরামর্শ দেয়। পানের জন্য ডিএইর কৃষি-আবহাওয়া তথ্যসেবা (বামিস) একটি ফসল-পাতা প্রকাশ করে, যেখানে অনুমোদিত জাত, রোপণের সময় এবং প্রধান পোকামাকড় ও রোগের তালিকা আছে। বরজে কোনো রাসায়নিক ব্যবহারের আগে চাষিদের উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার পরামর্শ নিতে বলা হয়।
নাগরপুর ও টাঙ্গাইল
নাগরপুর টাঙ্গাইল জেলার দক্ষিণ-পশ্চিমে। বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী, উপজেলাটির আয়তন ২৬২.৭০ বর্গকিলোমিটার। এর উত্তরে টাঙ্গাইল সদর ও দেলদুয়ার, দক্ষিণে দৌলতপুর (মানিকগঞ্জ) ও সাটুরিয়া, পূর্বে মির্জাপুর ও ধামরাই এবং পশ্চিমে চৌহালী ও শাহজাদপুর উপজেলা। প্রধান নদী যমুনা, ধলেশ্বরী, পুরাতন ধলেশ্বরী ও বংশী; গাইঘাটা খাল ও ভারুয়া বিল উল্লেখযোগ্য জলাশয়। নাগরপুর থানা গঠিত হয় ১৯০৬ সালে, উপজেলা হয় ১৯৮৩ সালের ৯ সেপ্টেম্বর।
উপজেলায় ইউনিয়ন ১২টি; জহুরুলের ইউনিয়ন মামুদ নগরের আয়তন বাংলাপিডিয়ায় ৭,৯৫৯ একর লেখা আছে। বাংলাপিডিয়ার উদ্ধৃত ২০১১ সালের আদমশুমারিতে নাগরপুরের জনসংখ্যা ২,৮৮,০৯২। এখানে ৬১.৬৩ শতাংশ পরিবারের আয়ের প্রধান উৎস কৃষি। জ্ঞানকোষটি প্রধান ফসল হিসেবে ধান, পাট, গম, সরিষা ও আখ এবং প্রধান ফল হিসেবে আম, কাঁঠাল, কলা, পেঁপে, জাম ও বরইয়ের নাম দিয়েছে। সেই তালিকায় পানের নাম নেই। উপজেলায় হাট-বাজার ২৩টি, তার মধ্যে নাগরপুর হাট, সলিমাবাদ হাট, সহবতপুর হাট ও ধুনিপাড়া হাট বেশি পরিচিত; জহুরুলের মতো চাষিরা এ ধরনের স্থানীয় হাটেই পাইকারি বিক্রি করেন।
ঢাকা বিভাগের টাঙ্গাইল জেলার আয়তন ৩,৪১৪.৩৫ বর্গকিলোমিটার, উপজেলা ১২টি। জেলার উত্তরে জামালপুর, দক্ষিণে ঢাকা ও মানিকগঞ্জ, পূর্বে ময়মনসিংহ ও গাজীপুর এবং পশ্চিমে সিরাজগঞ্জ। বাংলাপিডিয়া জেলার প্রধান নদী হিসেবে যমুনা, ধলেশ্বরী, লৌহজং, বংশী, তুরাগ ও ঝিনাইয়ের নাম দিয়েছে। জেলার ৫৭.২৮ শতাংশ পরিবারের আয়ের প্রধান উৎস কৃষি।

পান কী, বরজ যেভাবে তৈরি হয়
পান হলো পিপুল (মরিচ) পরিবারের গুল্মজাতীয় লতা Piper betle-এর পাতা, যা গ্রীষ্মমণ্ডলীয় অঞ্চলে জন্মে। বাংলাপিডিয়া বলছে, এর কাণ্ড আধা-কাষ্ঠল, অনেক ছোট ছোট শিকড়ের সাহায্যে বেয়ে ওঠে; পাতা বড়, চওড়া ডিম্বাকার, ১৫ থেকে ২০ সেন্টিমিটার লম্বা। দক্ষিণ এশিয়া, উপসাগরীয় দেশ, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের মানুষ পান খায়। বাংলায় পান দীর্ঘদিন ধরে সামাজিক রীতির অংশ: অনুষ্ঠানে পান পরিবেশন করে প্রথাগতভাবে বোঝানো হতো যে অতিথিদের বিদায়ের সময় হয়েছে।
এই ফসলের জন্য বিশেষ জমি ও নিবিড় যত্ন লাগে। বাংলাপিডিয়ার তথ্যমতে, বরজের জমি সাধারণত একটু উঁচু, মাটি শক্ত এবং জলাশয় বা পুকুরের কাছাকাছি হয়; পাশের জমি থেকে মাটি কেটে এনে জায়গাটি উঁচু করা হয়। প্রথাগত সার ছিল সরিষার খৈল ও গোবর, এখন তার সঙ্গে রাসায়নিক সারও ব্যবহার হয়। মে ও জুন মাসে প্রায় দুই ফুট দূরত্বে সমান্তরাল সারিতে লতা রোপণ করে বাঁশের শলা বা খুঁটির সঙ্গে জড়িয়ে দেওয়া হয়। রোদ আর গরু-ছাগল থেকে বাঁচাতে বরজের চারদিকে ৫-৬ ফুট উঁচু বাঁশ ও শলার বেড়া এবং একই উপকরণে ওপরে মাচান তৈরি করা হয়; শুকনো মৌসুমে নিয়মিত সেচ দিতে হয়।
সারা বছরই পান তোলা হয়, তবে জ্ঞানকোষটি তিনটি প্রধান ফলনের কথা লিখেছে, যেগুলোর নাম সংশ্লিষ্ট বাংলা মাসের নামে: কার্তিক, ফাল্গুন ও আষাঢ়। পানসেবীদের বিচারে কার্তিকের পান সবচেয়ে ভালো। পান তোলার সময় প্রতিটি লতায় অন্তত ষোলটি পাতা রেখে দেওয়ার নিয়ম।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের পান-বিষয়ক ফসল-পাতায় চাষিদের জন্য সরকারি নির্দেশনার রূপরেখা আছে। সেখানে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বারি) জাত বারি পান-১, বারি পান-২ ও বারি পান-৩ এবং স্থানীয় জাত মিঠা পান, সাচি ও খাসিয়া পানের নাম আছে। রোপণের সময় মে থেকে সেপ্টেম্বর (জ্যৈষ্ঠ থেকে আশ্বিন), খাসিয়া পানের জন্য জুন থেকে আগস্ট। প্রতিটি বেডে দুটি সারি থাকে, প্রতি সারিতে ৬-৮ ইঞ্চি পরপর গর্ত করে প্রতিটি গর্তে একটি করে কাটিং লাগাতে হয়; লতা বাড়লে প্রায় দুই মিটার লম্বা চিকন বাঁশের কাঠির সঙ্গে বেঁধে দিতে হয়, আর মরে যাওয়া গাছের জায়গায় নতুন কাটিং বসাতে হয়। জাতভেদে প্রতি শতাংশে ৩২০ থেকে ৪০০টি লতা লাগে এবং ফলন প্রতি শতাংশে ৪০ থেকে ৭২ কেজি।
একই পাতায় চাষিকে যেসব সমস্যার দিকে নজর রাখতে বলা হয়েছে সেগুলো হলো থ্রিপস, জাবপোকা, কালো মাছি ও সাদা মাছি; উইপোকা ও কালো গুবরে পোকা; লাল মাকড়; এবং পাতায় দাগ পড়া ও কাণ্ড-পাতা পচা রোগ। দিনের প্রথম ভাগে সেচ দেওয়া, ভারী বৃষ্টির পর জমে থাকা পানি দ্রুত বের করে দেওয়া এবং খারাপ আবহাওয়ার পর বেড়া ও ছাউনি মেরামত করার পরামর্শও আছে। কোন বালাইয়ে কোন ওষুধ কতটুকু লাগবে তা পোকা ও বরজভেদে আলাদা, তাই স্প্রে করার আগে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার পরামর্শ নেওয়া, লেবেলের নির্দেশনা মানা, সুরক্ষা পোশাক পরা এবং খোলা জলাশয়ে স্প্রের পানি না ফেলার কথা বলা হয়েছে।

রাজশাহীর মিষ্টি পান: জহুরুল যে জাত এনেছেন
পাতার আকার, কোমলতা, ঝাঁজ ও সুগন্ধে পানের অনেক রকমফের আছে, আর প্রায় প্রতিটি পান উৎপাদনকারী জেলার নিজস্ব একটি জাত আছে। বাংলাপিডিয়া প্রচলিত জাতের মধ্যে সুপারি পান, মিষ্টি (মিঠা) পান ও সাঁচি পানের নাম দিয়েছে এবং লিখেছে, বাংলা পানকে অনেকে মিঠা পান বা রাজশাহীর পান নামেও ডাকেন।
গবেষণাতেও এর সমর্থন মেলে। ২০২০ সালের সেপ্টেম্বরে দ্য অ্যাগ্রিকালচারিস্টস সাময়িকীতে প্রকাশিত এক গবেষণায় ঢাকার শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীরা বারির একজন গবেষকের সঙ্গে মিলে ২০১৬ সালের মার্চ থেকে ২০১৭ সালের মার্চ পর্যন্ত একটি পরীক্ষামূলক বরজে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে সংগ্রহ করা ১৩টি পানের জাত তুলনা করেন। মিষ্টি পান হিসেবে চিহ্নিত জাতটির পাতায় তাঁরা কোনো ঝাঁজ পাননি; এর ফলনও ছিল সর্বোচ্চগুলোর একটি, বছরে হেক্টরপ্রতি ২৩.৪৬ টন, যা বারি পান-১-এর ২৩.৮২ টনের কাছাকাছি। গবেষকেরা সিদ্ধান্তে বলেন, ফলন ও পাতার মান দুই দিক থেকেই মিষ্টি পান তুলনামূলক ভালো জাত বলে মনে হয়েছে।
রাজশাহীতে মিষ্টি পানেরই আধিপত্য। ২০২৩ সালের মার্চে দুর্গাপুর উপজেলার এক চাষি বাসসকে বলেন, এলাকায় দুই ধরনের পান চাষ হয়, মিষ্টি পান ও সাচি পান; মোট চাষের ৭০ শতাংশই মিষ্টি পান এবং এটিই বেশি জনপ্রিয়। ২০২৪ সালের মে মাসে প্রতিদিনের বাংলাদেশ জানায়, জেলায় মূলত তিনটি জাত চাষ হয়, মিষ্টি পান, সাচি পান ও দুধসর, আর রাজশাহীতে পানের চাষ চলছে ৫০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে।
২০২৪ সালে এই পান জাতীয় স্বীকৃতি পায়। দৈনিক ইত্তেফাকের তথ্য অনুযায়ী, রাজশাহীর জেলা প্রশাসক ২০২৩ সালের আগস্টে রাজশাহীর পানকে ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্য হিসেবে নিবন্ধনের আবেদন করেন। দেশ রূপান্তর জানায়, ২০২৪ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি শিল্প মন্ত্রণালয় তিনটি নতুন পণ্য, যশোরের খেজুরের গুড়, রাজশাহীর মিষ্টি পান ও জামালপুরের নকশিকাঁথাকে জিআই হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে জার্নাল প্রকাশ করে; এতে দেশে অনুমোদিত জিআই পণ্যের সংখ্যা দাঁড়ায় ৩১টি। ২০২৪ সালের ২৫ এপ্রিল শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীন পেটেন্ট, ডিজাইন ও ট্রেডমার্কস অধিদপ্তর (ডিপিডিটি) নিবন্ধন সনদ হস্তান্তর করে, জানায় ইত্তেফাক। জিআই একটি পণ্যের নামকে সেই এলাকার সঙ্গে যুক্ত করে, যার মাটি, জলবায়ু ও জ্ঞান পণ্যটিকে বিশেষ করে তোলে; দেশের প্রথম জিআই পণ্য জামদানি শাড়ি, স্বীকৃতি পায় ২০১৬ সালে।

অঙ্কে রাজশাহীর পানের অর্থনীতি
জহুরুল যে ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন, তার পরিসর বড়। ২০২৩ সালের মার্চে বাসস রাজশাহী জেলার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের হিসাব তুলে ধরে: সেই মৌসুমে প্রায় ৩৮ হাজার ৯০০ কৃষক ৪ হাজার ৪৯৬ হেক্টর জমিতে পান চাষ করছিলেন, লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৭৬ হাজার ৬৭৮ টন, যার মূল্য প্রায় ৬২৩ কোটি ৮২ লাখ টাকা। এর আগের মৌসুমে ৩৭ হাজার ৯৩২ কৃষক ৪ হাজার ৩৬১ হেক্টর জমি থেকে ৭৩ হাজার ৭৭১ টন পান তুলেছিলেন। ডিএইর একজন উপপরিচালক সংস্থাটিকে বলেন, মোহনপুর, বাগমারা, দুর্গাপুর, পুঠিয়া ও পবার জলবায়ু ও ভূপ্রকৃতি পান চাষের উপযোগী, জেলার সব উপজেলাতেই পান চাষ হয় এবং মোহনপুর এ ক্ষেত্রে পথিকৃৎ।
২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে ডিএইর হিসাব আরও বাড়ে। দ্য ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস রাজশাহী থেকে জানায়, জেলায় পানচাষি ৩৯ হাজার ১০১ জন, পানের বরজ ৩৯ হাজার ৮৭৬টি; ২০২৩-২৪ অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে ৪ হাজার ৫৮০ হেক্টর জমি থেকে ৭৭ হাজার ২১৯ টন পান উৎপাদন হয়েছে; জেলার ২০টি হাটে চাষিরা পান বিক্রি করেন, আর বাগমারা, মোহনপুর ও দুর্গাপুর শীর্ষ উপজেলা। পত্রিকাটি লেখে, এই বাণিজ্য বছরে আড়াই হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায় বলে জানা যায়। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ডিএই রাজশাহীতে দেশের প্রথম পান গবেষণা কেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে; মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে এবং সম্ভাব্যতা যাচাই শেষে মোহনপুরের মৌগাছি এলাকায় জায়গা বাছাই করা হয়েছে।
খরচ ও আয় নিয়ে রাজশাহীর চাষি ও কর্মকর্তারা পত্রিকাগুলোকে যা বলেছেন, তা-ও জানা যায়, তবে অঙ্কগুলো ভিন্ন ভিন্ন। ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস ডিএইর বরাতে লেখে, এক বিঘা বরজ থেকে একজন চাষি মাসে অন্তত ৩৫ হাজার টাকা আয় করতে পারেন, আর এক বিঘা বরজ তৈরিতে খরচ ২ থেকে আড়াই লাখ টাকা; চাষিদের মতে একটি বরজ ৩০ থেকে ৪০ বছর টেকে। প্রতিদিনের বাংলাদেশের হিসাবে বেড়া, ছাউনি, শ্রমিক ও লতা মিলিয়ে এক বিঘা বরজ তৈরিতে খরচ ১ থেকে দেড় লাখ টাকা, প্রথম বছরের পর খরচ খুব কম। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষিতত্ত্ব বিভাগের একজন অধ্যাপক ২০২৩ সালে বাসসকে বলেন, আধুনিক পদ্ধতিতে এক বিঘা থেকে ২ থেকে ৩ লাখ টাকা আয় করা যায়। এগুলো রাজশাহীর জন্য পত্রিকা ও তাদের সূত্রের দেওয়া অঙ্ক, নাগরপুরের নয়; জহুরুলের নিজের খরচ ও আয়ের হিসাব ওপরে তাঁর কথাতেই দেওয়া হয়েছে।
পান বিক্রি হয় গুনে, ওজনে নয়। ২০২৪ সালের মে মাসে প্রতিদিনের বাংলাদেশ জানায়, ৬৪টি পানে এক বিড়া, আর ৩২ বিড়া বা ২,০৪৮টি পানে বড় একক, যাকে ব্যবসায়ীরা পোয়া বলেন। পত্রিকাটি প্রধান সাপ্তাহিক হাট হিসেবে মোহনপুরের একদিলতলা, বাগমারার মাচমইল, দুর্গাপুরের দাওকান্দি ও পুঠিয়ার বানেশ্বরের নাম দেয় এবং জানায়, বেশির ভাগ পান যায় ঢাকায়, সেখান থেকে মধ্যপ্রাচ্যে; কিছু পান যায় ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড়, দিনাজপুর ও নীলফামারীতে।
দেশের অন্যান্য এলাকায় পান চাষ ও রপ্তানি
শুধু রাজশাহী নয়, অন্য জেলাতেও পান চাষ হয়, মিষ্টি পানও হয়। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম রাজবাড়ীর বালিয়াকান্দি উপজেলা থেকে জানায়, সেখানে ৮৫ হেক্টর জমিতে ৮১৪টি বরজে পান চাষ হয়, যার ৫১৬টিতে সাচি আর ২৯৮টিতে মিষ্টি পান; বিদেশে যাচ্ছে শুধু মিষ্টি পান। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা বলেন, চাষিরা বছরে প্রায় ৭০ থেকে ৭৬ কোটি টাকার পান বিক্রি করেন। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, কৃষি বিভাগ পান চাষে কৃষকদের প্রশিক্ষণ দেয় না, শুধু পরামর্শ দেয়।
সব জায়গায় অবশ্য পান চাষ বাড়ছে না। ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশ পোস্ট চুয়াডাঙ্গা থেকে জানায়, জেলার চার উপজেলায় ১ হাজার ৬০৭ হেক্টর জমিতে পান চাষ হলেও ২০১৫ সাল থেকে তা আর বাড়েনি, কারণ বাঁশ, সার, কীটনাশক ও দক্ষ শ্রমিকের খরচ বেড়েছে, কিন্তু পানের দাম সে হারে বাড়েনি; সেখানকার চাষিরা রোগবালাই ও প্রতিকূল আবহাওয়াকেও ক্ষতির কারণ বলেছেন। বাংলাপিডিয়াও লিখেছে, পান উৎপাদনে অধিক পুঁজি লাগে এবং অন্য ফসল বেশি লাভজনক হওয়ায় পান চাষের জমি কমছে। জ্ঞানকোষটির ইংরেজি সংস্করণ দেশে পান চাষের মোট আয়তন প্রায় ১৪ হাজার ১৭৫ হেক্টর এবং বার্ষিক উৎপাদন প্রায় ৭২ হাজার ৫০০ টন বলে উল্লেখ করেছে, তবে কোন বছরের হিসাব তা বলেনি।
রপ্তানির ইতিহাস যেমন পুরোনো, তেমনি সাম্প্রতিক বাধাও আছে। বাংলাপিডিয়া জানায়, বাংলাদেশ ১৯৭৪-৭৫ সাল থেকে ইউরোপে এবং ১৯৯১ সাল থেকে সৌদি আরবে পান পাঠাচ্ছে, যার ক্রেতা মূলত প্রবাসী দক্ষিণ এশীয়রা; রপ্তানিযোগ্য পান আসে নাটোর, কুষ্টিয়া, রাজশাহী, বরিশাল, খুলনা ও চুয়াডাঙ্গা থেকে। দ্য ডেইলি স্টার ২০২১ সালের মে মাসে জানায়, পানে সালমোনেলা ব্যাকটেরিয়া পাওয়ায় ২০১৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউরোপীয় ইউনিয়ন বাংলাদেশি পান আমদানি নিষিদ্ধ করে, পরে সেই নিষেধাজ্ঞা ২০২০ সাল পর্যন্ত বাড়ানো হয়। এতে রপ্তানি আয় ২০১৩-১৪ সালের ২৯.৪৮ মিলিয়ন ডলার থেকে ২০১৯-২০ সালে ১.৯০ মিলিয়ন ডলারে নেমে আসে। ইইউর শর্ত পূরণের প্রমাণ দেওয়ার পর ২০২১ সালের ১৫ মে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার হয়; এরপর ঢাকার শ্যামপুরে ডিএইর কেন্দ্রীয় প্যাকিং হাউস থেকে প্রায় এক টনের প্রথম চালান যায়, আর প্রতিটি চালানের জন্য আন্তর্জাতিক মানের পরীক্ষাগারের স্বাস্থ্য সনদ বাধ্যতামূলক করা হয়।
ছবি: Reaid Hossain / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, বাংলাপিডিয়া, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (বামিস ফসল-পাতা), দ্য অ্যাগ্রিকালচারিস্টস (শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা, ২০২০), বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস), দ্য ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস, দেশ রূপান্তর, দৈনিক ইত্তেফাক, প্রতিদিনের বাংলাদেশ, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম, বাংলাদেশ পোস্ট, দ্য ডেইলি স্টার




মন্তব্য
(০)