১৯৮৯ সালে সাবেদ আলী নামের এক মালী ঢাকার উপকণ্ঠে সাভারের সাদুল্লাপুরে ২০ শতাংশ জমি ইজারা নিয়ে বিক্রির জন্য গোলাপ চাষ শুরু করেন। ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে দ্য ডেইলি স্টার জানায়, ততদিনে সাদুল্লাপুর, শ্যামপুর, মোস্তাপাড়া, বিরুলিয়া, ভাকুর্তা, ভবানীপুর ও বনগ্রামের প্রায় ১ হাজার ৫০০ মানুষ বাণিজ্যিকভাবে গোলাপ চাষ করছেন, আর গ্রামগুলো পরিচিতি পেয়েছে সাভারের গোলাপ গ্রাম নামে।
সাভারের মাঠে হোক বা শহরের ছাদের টবে, বেশি ও ভালো ফুল পাওয়ার নিয়ম একই। কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীন সরকারি সংস্থা কৃষি তথ্য সার্ভিস (এআইএস) তাদের ই-কৃষি পাতায় গোলাপ চাষের নির্দেশিকায় এই নিয়মগুলো তুলে ধরেছে।
২০২৫ সালের ১৬ মে প্রথম প্রকাশিত এই প্রতিবেদনে এআইএসের সেই পরামর্শ ধাপে ধাপে সাজানো হয়েছে: জলবায়ু ও মাটি, জাত, বংশবিস্তার, টব ও জমিতে চাষ, সার, ছাঁটাই, পোকামাকড় ও রোগ এবং ফুল তোলা। সঙ্গে বাংলাপিডিয়া ও সংবাদপত্রের প্রতিবেদন থেকে গোলাপ ও দেশের ফুলের বাজারের পটভূমি।
গোলাপ কেন ফুলের রানী
এআইএসের ভাষায় গোলাপ সৌন্দর্য ও লাবণ্যের প্রতীক; বর্ণ, গন্ধ, কমনীয়তা ও সৌন্দর্যের বিচারে একে ফুলের রানী বলা হয়। স্বভাবে এটি শীতকালীন মৌসুমি ফুল, তবে এখন সারা বছরই প্রায় সব দেশে গোলাপের চাষ হয়।
বাংলাদেশের জাতীয় জ্ঞানকোষ বাংলাপিডিয়া জানায়, গোলাপ সাধারণত কাঁটাযুক্ত কাণ্ডের, আকর্ষণীয় ফুলের গুল্ম; এটি রোজেসি (Rosaceae) পরিবারের রোজা (Rosa) গণের উদ্ভিদ, আর এই গণে প্রজাতির সংখ্যা ১৫০টির বেশি। বাংলাদেশে একটি দেশি প্রজাতি আছে: রোজা ইনভলুক্রাটা (Rosa involucrata), যার আরেক নাম রোজা ক্লিনোফিলা; এটি ময়মনসিংহ, সিলেট ও চট্টগ্রাম জেলার জলাভূমিতে জন্মায়। আধুনিক বাগানের গোলাপের পূর্বপুরুষ রোজা রুগোসা, আর. সেন্টিফোলিয়া, আর. ক্যানিনা, আর. ড্যামাসিনা ও আর. গ্যালিকার মতো প্রজাতি।
বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী, মুঘল সম্রাট বাবর এই উপমহাদেশে বসরা নামের একটি গোলাপ আনেন; তীব্র সুগন্ধি, হালকা গোলাপি রঙের এই জাত এখনো অনেক পুরোনো বাগানে দেখা যায়। ইসলামি সংস্কৃতিতে গোলাপজলের কদর রয়েছে, মিলাদ মাহফিলে পবিত্রতার প্রতীক হিসেবে তা ব্যবহার হয়। গোলাপের তেল বা আতর আবিষ্কারের কৃতিত্ব দেওয়া হয় নূরজাহানকে, যিনি এর নাম দেন আতর-ই-জাহাঙ্গীর।
এআইএস জানায়, এখন গোলাপ প্রধানত কাট ফ্লাওয়ার বা কাটা ফুল হিসেবে ব্যবহৃত হয়; সামাজিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠান, বাগান, লন, কেয়ারি ও বারান্দা সাজাতে এর জুড়ি নেই, আতর ও সুগন্ধি শিল্পেও গোলাপ লাগে।
সাভার থেকে গদখালী: দেশের গোলাপের বাজার
বাংলাপিডিয়ার পুষ্পোদ্যান বিষয়ক নিবন্ধ জানায়, স্বাধীনতার পর ঢাকা ও অন্যান্য শহরের চাহিদা মেটাতে কৃষকেরা বাণিজ্যিকভাবে ফুল চাষ শুরু করেন। কাটা ফুলের মধ্যে প্রধান ছিল গোলাপ, রজনীগন্ধা, অর্কিড ও গ্লাডিওলাস, আর সীমিত পরিমাণ গোলাপ ও রজনীগন্ধা মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপে রপ্তানি হতো। বাণিজ্যিক ফুল চাষ এগিয়ে নিতে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি) একটি পুষ্প গবেষণা কেন্দ্র চালু করে।
দেশের সবচেয়ে বড় ফুলের এলাকা যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলা। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে ইউনাইটেড নিউজ অব বাংলাদেশ (ইউএনবি) জানায়, উপজেলার প্রায় ১ হাজার ২০০ হেক্টর জমিতে ফুল চাষ হচ্ছে, যুক্ত প্রায় ৬ হাজার কৃষক পরিবার। তাঁরা গোলাপ, রজনীগন্ধা, গ্লাডিওলাস, জারবেরা, গাঁদা ও চন্দ্রমল্লিকাসহ ১১ রকমের ফুল চাষ করেন। ইউএনবির তথ্যে, গদখালী এলাকা দেশের ফুলের চাহিদার প্রায় ৭০ শতাংশ জোগান দেয়, আর চাষিরা ডিসেম্বর থেকে এপ্রিলের মৌসুমে ১০০ কোটি টাকার ফুল বিক্রির আশা করছিলেন। তখন প্রতিটি গোলাপ বিক্রি হচ্ছিল ৬ থেকে ৭ টাকায়।

দাম সব সময় একই থাকে না। ২০২৫ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি ভালোবাসা দিবসে দ্য ডেইলি স্টার গদখালীর পাইকারি বাজারে দেখতে পায়, চাষিরা প্রতিটি গোলাপ ৭ থেকে ৮ টাকায় বিক্রি করছেন, যা আগের বছরের প্রায় অর্ধেক; মানভেদে দাম ছিল সাড়ে ৩ থেকে ১৪ টাকা। চাষিরা জানান, ৩৩ শতাংশ জমিতে গোলাপ চাষে খরচ প্রায় দেড় লাখ টাকা, আর শ্রমিক, সার ও কীটনাশকে মাসে লাগে ৩ থেকে ৪ হাজার টাকা। চাহিদা কম থাকার কারণ হিসেবে তাঁরা রাজনৈতিক অস্থিরতা, প্রতিকূল আবহাওয়া এবং ভালোবাসা দিবস ও শবে বরাত একই দিনে পড়ার কথা বলেন।
সাভারের চাষিরাও করোনা মহামারির সময় চাহিদা কমে যাওয়া, প্লাস্টিকের ফুলের প্রতিযোগিতা ও উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ার সমস্যায় পড়েছিলেন বলে ২০২১ সালে দ্য ডেইলি স্টারের প্রতিবেদনে উঠে আসে।
জলবায়ু, মাটি ও জাত
এআইএস জানায়, গোলাপ শীত ও নাতিশীতোষ্ণ মণ্ডলের ফুল; বেশি গরম ও আর্দ্রতায় গোলাপ ভালো হয় না। ২২ থেকে ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা, ৮৫ শতাংশ আপেক্ষিক আর্দ্রতা এবং ১০০ থেকে ১২৫ সেন্টিমিটার গড় বার্ষিক বৃষ্টিপাত গোলাপ চাষের উপযোগী। সবচেয়ে ভালো মাটি হলো ৬.০ থেকে ৬.৫ পিএইচ মানের সুনিষ্কাশিত, উর্বর দোআঁশ মাটি। এঁটেল মাটি গোলাপের জন্য ভালো নয়।
ফুলের গুণগত মান অনেকটাই নির্ভর করে সূর্যের আলোর ওপর, আর বিকেলের চেয়ে সকালের রোদ বেশি কার্যকর।
বাংলাদেশে চাষ হওয়া গোলাপের মধ্যে এআইএস মিরান্ডি, পাপা মেলান্ড, ডাবল ডিলাইট, তাজমহল, প্যারাডাইস, ব্লু মুন, মন্টেজুমা, টাটা সেন্টার ও সিটি অব বেলফাস্ট জাতের নাম দিয়েছে। বাংলাপিডিয়া জানায়, পাপা মেলান্ড, ডাবল ডিলাইট, ডাচ গোল্ড, কুইন এলিজাবেথ ও মন্টেজুমার মতো বিশ্বখ্যাত গোলাপ বাংলাদেশে চোখ কলমের মাধ্যমে উৎপাদন করা হয়।
দেশে নিজস্ব গোলাপের জাতও তৈরি হয়েছে। বাংলাপিডিয়ায় 'ফাতেমা সাত্তার', 'শিবলী', 'রাহেলা হামিদ', 'পিয়ারী', 'ভাসানী', 'শেরে বাংলা', '১৯৫২' ও 'জয়ন্তী' নামের স্থানীয় জাতের উল্লেখ আছে।

এআইএসের তথ্যে, বাংলাদেশে জমিতে গোলাপের চারা রোপণের উপযুক্ত সময় অক্টোবর থেকে ফেব্রুয়ারি।
নতুন চারা কীভাবে হয়, চারা কেনার নিয়ম
গোলাপের বংশবিস্তার হয় বীজ, কাটিং, গুটি কলম ও চোখ কলমের মাধ্যমে। বাংলাপিডিয়া ব্যাখ্যা করে, পিঁপড়া, মৌমাছি ও প্রজাপতির মতো পোকা গোলাপে পরপরাগায়ন ঘটায়, তাই বীজের চারা মাতৃগাছের মতো হয় না; এ কারণে বীজ ব্যবহার হয় কেবল প্রজনন বা জাত উন্নয়নের কাজে। তাজমহল ও পাপা মেলান্ডের মতো কিছু জাত সহজেই কাটিং থেকে বাড়ানো যায়।
নতুন গাছ তৈরির প্রধান পদ্ধতি, যা দিয়ে বাণিজ্যিকভাবে কাটা ফুল উৎপাদন হয়, তা হলো বাডিং বা চোখ কলম। যে জাতের বংশবৃদ্ধি করা হবে তার চোখ বসানো হয় উপযুক্ত একটি আদিজোড় বা রুটস্টকের ওপর, যা গাছকে শিকড় দেয়। এআইএস বলছে, গাছের সজীবতা, উৎপাদনশীলতা, ফুলের গুণাগুণ, ঝোপের স্থায়িত্ব, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা এবং মাটি ও আবহাওয়ার সঙ্গে খাপ খাওয়াতে আদিজোড়ের ভূমিকা বড়।
- গ্রীষ্মের শেষে পেনসিলের মতো মোটা আদিজোড়ের কাটিং তৈরি করা হয়।
- নার্সারিতে সারি করে ২৫ থেকে ৩০ সেন্টিমিটার দূরত্বে সেগুলো লাগানো হয়।
- প্রায় ৬ মাস পর কাটিংগুলোতে চোখ কলমের উপযোগী আকারের কাণ্ড তৈরি হয়।
- গোলাপে প্রধানত টি-বাডিং করা হয়।
চারা কেনার সময় এআইএস বিশ্বস্ত ও পরিচিত নার্সারি থেকে সুস্থ, সুন্দর চারা বেছে নিতে এবং গোড়ার মাটির বলটি অক্ষত আছে কি না দেখে নিতে বলে। মাটির বলের বাইরে শিকড় বেরিয়ে থাকা চারা না নেওয়াই ভালো; প্রয়োজনে অভিজ্ঞ কারও পরামর্শ নেওয়া যায়।
টবে গোলাপ চাষ: ধাপে ধাপে
টবের জন্য এআইএস খোলামেলা, আলো-বাতাসপূর্ণ জায়গা বেছে নিতে বলে, যেখানে সকালের রোদ পড়ে এবং দিনে অন্তত ৬ থেকে ৮ ঘণ্টা রোদ থাকে। বিকেলের রোদ, বিশেষ করে গ্রীষ্মকালে, না লাগানোই ভালো, কারণ এতে ফুলের রং ফ্যাকাসে হয়ে যায়। মাঝে মাঝে টব ঘুরিয়ে দিতে হয়, যাতে চারদিক থেকে আলো পড়ে; নইলে গাছ শুধু আলোর দিকেই বাড়ে।
- মাটির মিশ্রণ: ১ ভাগ দোআঁশ মাটি, ৩ ভাগ গোবর সার বা কম্পোস্ট, ১ ভাগ পাতা পচা সার ও আধা ভাগ বালি (নদীর সাদা বালি হলে ভালো), সঙ্গে এক মুঠো সরিষার খৈল ও এক চামচ চুন। মিশ্রণটি টবে এক মাস রেখে দিতে হয়, এ সময় পানি দিয়ে মাটি উল্টেপাল্টে দিলে ভালো মিশে যায়। অনেকে ব্যবহৃত চা-পাতা মিশিয়েও ভালো ফল পেয়েছেন।
- পানি নিকাশ: টবের তলায় কয়েক সেন্টিমিটার জুড়ে ইট বা মাটির হাঁড়ি-পাতিলের ভাঙা টুকরা বিছিয়ে তার ওপর মাটি দিতে হয়, এতে বাড়তি পানি বেরিয়ে যায়।
- টবের আকার: ছোট জাতের জন্য ২০ সেন্টিমিটার (৮ ইঞ্চি) টব, বড় জাতের জন্য ৩০ সেন্টিমিটার (১২ ইঞ্চি) বা আরও বড় টব। দ্বিতীয় বছরে গাছ বড় টবে সরালে বড় আকারের বেশি ফুল পাওয়া যায়।
- সময়: বছরের যেকোনো সময় টবে চারা বসানো যায়, তবে সেপ্টেম্বর-অক্টোবর ও জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি সবচেয়ে ভালো। এ সময় লাগালে বেশি দিন ধরে ফুল পাওয়া যায়, পরিচর্যা সহজ হয়, রোগ-পোকার আক্রমণও কম থাকে।
- চারা বসানো: পুরো মাটির বলসহ চারা তুলে অপ্রয়োজনীয় পুরোনো বা মরা ডাল হালকা ছেঁটে টবের মাঝখানে সোজা করে বসাতে হয়, ওপরে কিছু কম্পোস্ট দিয়ে গোড়ার মাটি হালকা চেপে দিতে হয়। কুঁড়ি বের হওয়ার গিঁট বা পর্বটি মাটির ওপরে থাকবে।
- সেচ: বসানোর পর অন্তত ২ থেকে ৩ বার পানি দিতে হয়। প্রথমে ৩ থেকে ৪ ঘণ্টা রোদ, পরে ধীরে ধীরে বাড়িয়ে ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা রোদের ব্যবস্থা করতে হয়। গোড়ায় পানি জমতে দেওয়া যাবে না; কচি পাতা ও কুঁড়ি ছাড়ার সময় সকাল-সন্ধ্যা পানি দিতে হয়।
গাছ টবে লেগে যাওয়ার এক মাস পর থেকে ১৫ দিন বা এক মাস পরপর সার দিতে হয়। এআইএসের পরামর্শ, মার্চের শেষে বা এপ্রিলের শুরুতে টবের ওপরের ৮ থেকে ১০ সেন্টিমিটার মাটি তুলে পচা গোবর সার ও নতুন ঝুরঝুরে মাটি দিয়ে ভরে খড় বা পাতা দিয়ে ঢেকে দিতে হবে, যাতে গ্রীষ্মের রোদে শিকড় রক্ষা পায়। শীতকালে ছাঁটাইয়ের পর প্রতি টবে ৩ মুঠো গুঁড়া গোবর সার ও ১ মুঠো স্টিমড হাড়ের গুঁড়া দিতে হয়, তারপর পুরো শীতকাল প্রতি মাসে এক মুঠো করে হাড়ের গুঁড়া।
অণুখাদ্যের জন্য এআইএস একটি পাতায় স্প্রের মিশ্রণও দিয়েছে: ম্যাগনেশিয়াম সালফেট ২০ গ্রাম, ম্যাঙ্গানিজ সালফেট ১৫ গ্রাম, ফেরাস সালফেট ১০ গ্রাম ও বোরাক্স ৫ গ্রাম একসঙ্গে মিশিয়ে, প্রতি লিটার পানিতে সেই মিশ্রণের ২ গ্রাম গুলে স্প্রে করতে হয়। শীতকালে রোদেলা দিনে সকাল ৮টার মধ্যে পাতার দুই পিঠ ভিজিয়ে স্প্রে করতে হয়। দুর্বল গাছে প্রতি লিটার পানিতে ২ গ্রাম ইউরিয়া মিশিয়ে সকাল-বিকেল পাতায় স্প্রে করলে গাছ সতেজ হয়। সঠিক মাত্রা না জেনে রাসায়নিক সার ব্যবহার না করার পরামর্শও দিয়েছে এআইএস; বিকল্প হিসেবে গোবর ও সরিষার খৈল ৪ থেকে ৫ দিন পানিতে পচিয়ে সপ্তাহে দুই দিন দেওয়া যায়।
প্রতি ৩ মাস পরপর চুন-পানি দিতে হয়: প্রতি লিটার পরিষ্কার পানিতে ১ চামচ গুঁড়া চুন গুলে পাতলা কাপড়ে ছেঁকে দিতে হয়, এরপর ১৫ দিন অন্য কোনো সার না দিয়ে শুধু পানি দিতে হয়।
জমিতে গোলাপ বাগান
বড় বাগানের জন্য এআইএস বর্ষার ঠিক আগে মে-জুন মাসে বেড তৈরির পরামর্শ দেয়, যাতে খৈল ও অন্যান্য উপাদান ভালোভাবে পচে অক্টোবরে চারা লাগানোর উপযোগী হয়; ছোট বাগানের জন্য রোপণের অন্তত ৩ সপ্তাহ আগে বেড তৈরি করলেই চলে। জমি গভীরভাবে কুপিয়ে বা চাষ দিয়ে আগাছা ও ইটের টুকরা সরাতে হয় এবং বেডের চারপাশে পানি নিকাশের ব্যবস্থা রাখতে হয়।
জাতভেদে চারার দূরত্ব:
- ডোয়ার্ফ পলিয়েন্থা: ০.৫ মিটার
- ফ্লোরিবান্ডা ও চায়না: ০.৬৫ মিটার
- হাইব্রিড টি: ১ মিটার
- হাইব্রিড পারপেচুয়াল, মস, দামাস্ক ও টি: ১.৫ মিটার
- নয়সেট: ২ মিটার
- লতা গোলাপ: ২.৫ মিটার
গর্ত হবে গোলাকার, ১ মিটার গভীর ও ০.৬৫ মিটার ব্যাসের। ওপরের ২০ থেকে ২২ সেন্টিমিটার মাটি আলাদা রেখে বাকি মাটির সঙ্গে তার এক-তৃতীয়াংশ পরিমাণ পচা গোবর ও আধা কেজি গুঁড়া খৈল মিশিয়ে গর্ত ভরাট করতে হয়। তারপর আলাদা রাখা মাটির সঙ্গে কম্পোস্ট বা সবুজ সার মিশিয়ে ওপরে দিতে হয়, যাতে গর্তের জায়গা পাশের জমির চেয়ে একটু উঁচু থাকে।

রোপণের সময় পলিথিনের ব্যাগ ছিঁড়ে ফেলে চারা আগে যতটা গভীরে ছিল ঠিক ততটা গভীরে বসাতে হয়, গোড়ার মাটি চেপে পানি দিতে হয় এবং প্রথম দিকের রোদ থেকে ছায়া দিতে হয়। বেলে মাটিতে ঘন ঘন, আর এঁটেল বা ভারী মাটিতে ২ থেকে ৩ দিন পরপর পানি দিতে হয়, তবে কোনোভাবেই জলাবদ্ধতা হতে দেওয়া যাবে না।
জমির গোলাপে সার দিতে হয় অক্টোবরে ছাঁটাইয়ের সময় একবার এবং শীতের শেষে মার্চে আরেকবার; এআইএস বলছে, ছাঁটাইয়ের দিনে না দিয়ে ১০ থেকে ১২ দিন পরে সার দিলে ভালো ফল মেলে। ছাঁটাইয়ের আগে ২ থেকে ৩ কেজি শুকনো গোবর সার, ৫০ গ্রাম টিএসপি ও ৫০ গ্রাম পটাশ দেওয়ার কথা বলেছে সংস্থাটি। হাঁস-মুরগি বা কবুতরের বিষ্ঠা গোলাপের উত্তম সার। তরল সার দিতে হয় শুধু ভেজা মাটিতে।
ছাঁটাই: বেশি ফুলের মূল কৌশল
গোলাপের পুরোনো ডালে বেশি দিন ভালো ফুল আসে না; ছাঁটাই করলে নতুন ডাল ঠিকমতো বাড়ে, মরা ডাল বাদ যায় এবং গাছে রোদ পৌঁছায়। এআইএস বলছে, নিয়মিত ছাঁটাই করলে বেশি ও বড় আকারের ফুল পাওয়া যায়। বর্ষার পর অক্টোবর-নভেম্বর ছাঁটাইয়ের ভালো সময়, আর ফুল দেওয়া শেষ হলেই ডাল ছেঁটে দিতে হয়।
- হালকা ছাঁটাই: লম্বা ডালের এক-তৃতীয়াংশ কাটা, অথবা শুধু মরা ও অসুস্থ ডাল কেটে ফেলা।
- মাঝারি ছাঁটাই: মাটির ওপরে ৩০ থেকে ৩৫ সেন্টিমিটার রেখে কাটা। ফুল খুব বড় হয় না, তবে সংখ্যায় বেশি হয়।
- কঠোর ছাঁটাই: মাটির ওপরে ১৪ থেকে ২০ সেন্টিমিটার রেখে কাটা। ভালো মাটিতে প্রদর্শনীর বড় ফুলের জন্য উপযোগী; বেলে মাটিতে বারবার কঠোর ছাঁটাই করলে গাছ মারা যেতে পারে।
টবের গোলাপে এআইএস সাধারণত ২০ থেকে ২৫ সেন্টিমিটার (৮ থেকে ১০ ইঞ্চি) রেখে ডাল ছাঁটার কথা বলে। সাদা, হলুদ, হালকা হলুদ ও দুই রঙা জাতে খুব হালকা ছাঁটাই, আর লাল জাতে শক্ত ছাঁটাই দিতে হয়। ধারালো ছুরি বা সিকেটিয়ার দিয়ে এমনভাবে কাটতে হবে যাতে ডাল থেঁতলে বা ছিঁড়ে না যায়, কারণ থেঁতলানো কাটা জায়গা দিয়ে ছত্রাক ঢোকে।
কাটা মাথায় প্রুনিং পেইন্ট লাগালে পোকা ও তার পরে ছত্রাকের আক্রমণ ঠেকানো যায়; দেশি গোলাপে কাটা জায়গায় গোবর লাগানোই উত্তম বলে জানিয়েছে এআইএস। ছাঁটাইয়ের পর ডাইব্যাক রোগ হতে পারে, তাই ছাঁটাইয়ের আগে ও পরে কীটনাশক ও ছত্রাকনাশক দুটোই প্রয়োগ করা দরকার।
পোকামাকড় ও রোগ দমন
এআইএসের মতে, গোলাপের সবচেয়ে মারাত্মক সমস্যা লাল মাকড় ও ডাইব্যাক রোগ। নিচের দমন ব্যবস্থা এআইএসের দেওয়া; সঠিক ওষুধ ও মাত্রার জন্য উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার পরামর্শ নিন এবং লেবেলের নির্দেশ মানুন।
- উইপোকা: নতুন কাটিংয়ের শিকড় নষ্ট করে। সন্দেহ থাকলে পাইরিফস বা উপযুক্ত কীটনাশক দিয়ে মাটি শোধন করতে হয়।
- লাল মাকড়: পাতার নিচের পিঠ থেকে রস চুষে খায়, পাতার ওপরে পিন ফোটানোর মতো দাগ ও সূক্ষ্ম জাল দেখা যায়, পাতা ফ্যাকাসে হয়ে কুঁকড়ে যায়। সংখ্যায় কম থাকতেই থিওভিট-৮০ বা ইথিওন-৪৬.৫ ইসির মতো মাকড়নাশক পাতার উল্টো পিঠে স্প্রে করে, অথবা শুধু ঠান্ডা পানি জোরে স্প্রে করেও দমন করা যায়।
- শ্যাফার বিটল: বর্ষায় রাতে পাতা ও পাপড়ি খায়, এর কীড়া শিকড় খায়। পাইরিফস বা পাইরিবান দিয়ে মাটি শোধন, অথবা রাতে হাতে ধরে মেরে দমন করা যায়।
- শুঁয়োপোকা: পাতা খায়। বড়গুলো ধরে মেরে ফেলা যায়; ছোট ও বেশি হলে এআইএস প্রতি লিটার পানিতে ১.১ মিলি রিপকর্ড ১০ ইসি স্প্রের কথা বলেছে।
- ডিগার বোলতা: ছাঁটাই করা ডালের কাটা মুখ দিয়ে সুড়ঙ্গ করে বাসা বাঁধে, সেই ক্ষত দিয়ে ছত্রাক ঢুকে ডাইব্যাক হয়। কাটা মুখে প্রুনিং পেইন্ট দিলে প্রতিরোধ হয়।
- স্কেল পোকা: পুরোনো ডালের ছালে বাদামি আঁশ তৈরি করে রস চুষে খায়। চৈত্রে এবং ছাঁটাইয়ের পর কীটনাশক স্প্রে, অথবা মেথিলেটেড স্পিরিটে ব্রাশ ডুবিয়ে ঘষে তুলে ফেলা যায়।
- থ্রিপস: মার্চ-এপ্রিলের গরম ও শুকনো আবহাওয়ায় কুঁড়ি ও কচি ডগার রস চুষে খায়। আক্রান্ত অংশ কেটে পুড়িয়ে প্রতি লিটার পানিতে ২ গ্রাম মিপসিন ৭৫ ডব্লিউপি সপ্তাহে একবার করে ২ থেকে ৩ বার, পরে দুই সপ্তাহ পরপর স্প্রে করতে হয়।
- জাব পোকা: জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারিতে পাতা, কচি ডগা ও ফুলের রস চুষে খায়। এআইএস প্রতি লিটার পানিতে ২ মিলি ম্যালাথিয়ন মিশিয়ে ৭ থেকে ১০ দিন পরপর স্প্রের কথা বলেছে।
ডাইব্যাক রোগে ডাল মাথা থেকে কালো হয়ে মরতে শুরু করে, ধীরে ধীরে তা শিকড় পর্যন্ত পৌঁছে পুরো গাছ মেরে ফেলতে পারে। আক্রান্ত অংশের বেশ নিচ পর্যন্ত কেটে কাটা মাথায় প্রুনিং পেইন্ট লাগাতে হয়, কাটা অংশ পুড়িয়ে ফেলতে হয় এবং অন্য গাছ কাটার আগে সিকেটিয়ার বা ছুরি স্পিরিট দিয়ে মুছে নিতে হয়।
পাউডারি মিলডিউ রোগে শীতের শেষ দিকে পাতায় সাদা পাউডারের মতো আবরণ দেখা যায়; বেশি হলে কচি পাতা ও ডগা ঢেকে যায়, কুঁড়ি ফোটে না। আক্রান্ত ডগা ও পাতা তুলে পুড়িয়ে হেক্সাকোনাজল ৫ ইসি, ডাইথেন এম-৪৫ বা ইন্ডোফিল এম-৪৫ স্প্রে করতে হয়।

ফুল তোলা, ফলন ও কোথায় পরামর্শ মিলবে
সঙ্গে সঙ্গে ব্যবহারের জন্য আধফোটা গোলাপ কাটতে হয়, কয়েক দিন পরে ব্যবহারের জন্য কাটতে হয় কুঁড়ি অবস্থায়। কয়েকটি পাতাসহ লম্বা পুষ্পদণ্ড ধারালো ছুরি দিয়ে খুব সকালে বা শেষ বিকেলে কাটা উচিত। এআইএস জানায়, ফুলদানির পানিতে ৩ শতাংশ চিনি ও ৬০০ পিপিএম ৮-এইচকিউসি দ্রবণে ফুল রাখলে তা বেশি দিন সতেজ থাকে।
গোলাপের ফলন প্রধানত আবহাওয়া ও জাতের ওপর নির্ভর করে। এআইএসের তথ্যে, আদর্শ পরিবেশে লম্বা কাণ্ডের জাতে বছরে গাছপ্রতি প্রায় ১৫ থেকে ৩০টি ফুল হয়।
সঠিক জাতের চারা এবং স্থানীয় মাটির জন্য সার ও বালাইনাশকের মাত্রা জানতে চাষিরা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) উপজেলা কৃষি অফিস অথবা বারির উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্রের ফুল বিভাগে যোগাযোগ করতে পারেন।
ছবি: Md Shaifuzzaman Ayon / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: দ্য এগ্রো নিউজ (নিজস্ব প্রতিবেদক), কৃষি তথ্য সার্ভিস (এআইএস, ই-কৃষি গোলাপ চাষ নির্দেশিকা), বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (কৃষি প্রযুক্তি হাতবই), বাংলাপিডিয়া (গোলাপ; পুষ্পোদ্যান), দ্য ডেইলি স্টার, ইউনাইটেড নিউজ অব বাংলাদেশ (ইউএনবি)





মন্তব্য
(০)