সকালে পুকুর পাড়ে গিয়ে যদি দেখা যায় মাছ পানির ওপরে ভেসে মুখ হাঁ করে আছে, তবে বিপদ ঘটেছে আগের রাতেই। জাগো নিউজ ২৪-এ ২০২৬ সালের ১ জুলাই প্রকাশিত এক লেখায় মাছচাষিদের এই সতর্কবার্তা দেওয়া হয়। কারণটা প্রায়ই একই: পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেন কমে যাওয়া, শ্যাওলা বা প্ল্যাঙ্কটনের আধিক্য কিংবা তলায় পচা জৈব পদার্থ। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) মাছচাষিদের জন্য পুকুর ব্যবস্থাপনার যে প্রশিক্ষণ নির্দেশিকা প্রকাশ করেছে, তাতেও পানির এই আচরণ চেনার সহজ উপায় দেওয়া আছে।
রাতে আর ভোরে কেন অক্সিজেন কমে
এফএওর নির্দেশিকা বলছে, পুকুরের পানিতে অক্সিজেন আসে দুই পথে: বাতাস থেকে আর সালোকসংশ্লেষণ থেকে। বাতাসের অক্সিজেন পানিতে মেশে খুব ধীরে, তাই প্রধান উৎস হলো শ্যাওলা ও প্ল্যাঙ্কটনের সালোকসংশ্লেষণ। দিনে আলো থাকলে এরা অক্সিজেন তৈরি করে, কিন্তু রাতে তা পুরোপুরি থেমে যায়। তখন মাছ, প্ল্যাঙ্কটন ও পচনশীল জৈব পদার্থ শুধু অক্সিজেন খরচ করে। প্ল্যাঙ্কটন যত বেশি, রাতে অক্সিজেন তত দ্রুত কমে। তাই সূর্য ওঠার ঠিক পরেই অক্সিজেন থাকে সবচেয়ে কম।
মেঘলা দিনে সালোকসংশ্লেষণ কমে যায়। টানা কয়েক দিন মেঘ বা বৃষ্টি থাকলে, খুব গরমে পানির তাপমাত্রা বাড়লে, পুকুরে মাছ বেশি থাকলে কিংবা অতিরিক্ত খাবার তলায় পচলে অক্সিজেন হঠাৎ কমে যেতে পারে। এফএওর হিসাবে কমন কার্পের জন্য প্রতি লিটারে অন্তত ৩ মিলিগ্রাম অক্সিজেন দরকার, ভালো থাকে ৫ মিলিগ্রামে; তেলাপিয়ার জন্য ন্যূনতম ২ মিলিগ্রাম, ভালো থাকে ৪ মিলিগ্রামে।

অক্সিজেন সংকটের লক্ষণ
অক্সিজেন মাপার যন্ত্র বা কিট না থাকলেও কিছু লক্ষণ দেখে সংকট বোঝা যায়। এফএওর নির্দেশিকায় যেগুলোর কথা আছে:
- ব্যাঙাচি পুকুরের কিনারে জড়ো হয়;
- শামুক পানির ওপরে জেগে থাকা গাছ বেয়ে উঠে আসে;
- পানি থেকে পচা ডিমের মতো গন্ধ ওঠে;
- মাছ ঠিকমতো খাবার খায় না বা খাওয়া বন্ধ করে দেয়;
- মাছ পানির একেবারে ওপরের স্তর থেকে শ্বাস নিতে ভেসে ওঠে।
হাত আর সেকি ডিস্কে পানির স্বচ্ছতা মাপা
সবুজ পানির ঘোলাত্ব আসে প্ল্যাঙ্কটন থেকে। এফএওর পরামর্শ, পুকুরের অগভীর অংশে আস্তে নেমে একটি হাত সোজা পানিতে ডোবাতে থাকুন, যতক্ষণ না হাতের তালু আর দেখা যায়। পানির রেখা কনুইয়ের অনেক নিচে থাকলে প্ল্যাঙ্কটন খুব বেশি, কনুই বরাবর থাকলে বেশি, আর কনুইয়ের অনেক ওপরে থাকলে কম।
আরও ভালো মাপের জন্য সেকি ডিস্ক বানানো যায়: প্রায় ২৫ সেন্টিমিটার ব্যাসের একটি গোল চাকতি, চার ভাগে কালো-সাদা রং করা, ১০ সেন্টিমিটার পরপর দাগ দেওয়া দড়িতে বাঁধা। চাকতিটি যে গভীরতায় চোখের আড়ালে যায়, সেটাই স্বচ্ছতা। মাপতে হয় সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৩টার মধ্যে, শান্ত ও রোদেলা দিনে। এফএওর হিসাবে স্বচ্ছতা ৪০ সেন্টিমিটারের কম হলে প্ল্যাঙ্কটন বেশি এবং রাতে মাছ বিপদে পড়তে পারে; ৪০ থেকে ৬০ সেন্টিমিটারে উৎপাদন সবচেয়ে ভালো; ৬০ সেন্টিমিটারের বেশি হলে প্রাকৃতিক খাবার কম। স্বচ্ছতা ২৫ সেন্টিমিটারের কম হলে, বিশেষ করে টানা দুই-তিন দিন ঘন মেঘ বা সকালে ঘন কুয়াশা থাকলে, অক্সিজেন ফুরিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি বেশি।

সেন্সর ও বায়ুসঞ্চালনে নজরদারি
যন্ত্র থাকলে এফএও অক্সিজেন মাপতে বলে সূর্য ওঠার ঠিক পরে, যখন তা সবচেয়ে কম, এবং তার কয়েক ঘণ্টা পরে আরেকবার। পানির পিএইচ সূর্যোদয়ের সময় ৬.৫ থেকে ৮.৫-এর মধ্যে থাকলে তা সাধারণত মাছচাষের জন্য উপযুক্ত। এখন ছোট সেন্সর দিয়ে এসব মাপ স্বয়ংক্রিয় করার চেষ্টা চলছে। ২০২৪ সালে মেথডসএক্স সাময়িকীতে প্রকাশিত ভারতের এক গবেষণায় আরডুইনো বোর্ডে লাগানো সেন্সর দিয়ে পানির তাপমাত্রা, পিএইচ ও দ্রবীভূত অক্সিজেন সারাক্ষণ মাপা হয়; তথ্য ক্লাউডে জমা হয় এবং চাষি মোবাইল অ্যাপে তা দেখতে ও সতর্কবার্তা পেতে পারেন। গবেষকেরা যন্ত্রের মাপ চাষিদের হাতে নেওয়া মাপের সঙ্গে মিলিয়েও দেখেছেন।
অক্সিজেন বাড়ানোর সাধারণ উপায় হিসেবে এফএও বলেছে, পুকুরে ঢোকা পানি যত উঁচু থেকে, যত ছড়িয়ে ও ছিটিয়ে পড়ে, বাতাসের অক্সিজেন তত বেশি মেশে; বড় খামারে যান্ত্রিক এয়ারেটরও ব্যবহার করা হয়। মাছ মরার পর কারণ খোঁজার চেয়ে নিয়মিত পানির আচরণ লক্ষ করাই ক্ষতি এড়ানোর সহজ পথ।

ছবি: iMahesh / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও): মিঠাপানির মাছচাষ ব্যবস্থাপনা, পুকুর ও পানি (প্রশিক্ষণ নির্দেশিকা), মেথডসএক্স (শেটে ও অন্যান্য, ২০২৪)





মন্তব্য
(০)