২০২৫ সালের জুনে শরীয়তপুরের জাজিরা উপজেলার এক তরুণের খবর আসে, যিনি নিজেদের বাড়ির ছাদকে ড্রাগন আর প্যাশন ফলের বাগানে পরিণত করেছেন। জাগো নিউজের শরীয়তপুর জেলা প্রতিনিধির ২৫ জুন ২০২৫ তারিখে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, বড় কান্দি ইউনিয়নের ডুবিসায়বর এলাকার হিমেল মোল্লা (২৬) দুই জাতের ড্রাগন দিয়ে শুরু করেছিলেন; তখন তাঁর ছাদে অন্তত ৬০ জাতের ড্রাগন গাছ ছিল, যার অন্তত ৩০টিতে ফল এসেছে। সঙ্গে চাষ করছিলেন প্যাশন ফল, প্রতিবেদনে যাকে বলা হয়েছে পাহাড়ি ফল। কয়েক বছর ধরে তিলে তিলে গড়ে তোলা এই বাগান থেকে তিনি প্রতি মাসে ৩০ হাজার টাকা আয় করেন বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ক্যাকটাসের কাণ্ডে ধরা লাল, সবুজ আর হলুদ পাকা ড্রাগনগুলো দেখতে যেমন সুন্দর, খেতেও তেমনি মিষ্টি। জেলার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) এক কর্মকর্তা তরুণ এই চাষিকে সাধুবাদ জানান এবং বলেন, তিনি বাণিজ্যিকভাবে চাষ করতে চাইলে কৃষি বিভাগ সব ধরনের পরামর্শ দিয়ে পাশে থাকবে।
করোনাকালে শুরু হওয়া বাগান
হিমেল মোল্লা হায়দার মোল্লা ও হাসিয়া বেগমের ছেলে। উচ্চ মাধ্যমিক শেষ করার পর আর পড়াশোনা করেননি। প্রতিবেদন অনুযায়ী ছোটবেলা থেকেই বাগানের প্রতি তাঁর অগাধ ভালোবাসা, আর করোনার সময়ে তিনি বাগান করার সিদ্ধান্ত নেন। বাড়িতে খালি জায়গা তেমন না থাকায় বেছে নেন ছাদ। প্রথমে বাবা রাজি হননি, পরে ছেলের আগ্রহ দেখে নিজেই গাছের চারা কিনে দেন। ড্রাগন চাষে খরচ, পরিচর্যা আর রোগবালাই কম বলে এই ফলটিই বেছে নেন হিমেল।
জাগো নিউজকে হিমেল মোল্লা বলেন, 'ছোটবেলা থেকেই গাছ লাগানোর প্রতি ঝোঁক ছিল। বিভিন্ন ভিডিও দেখে জানতে পারলাম ড্রাগন চাষে ঝামেলা কম। তাই ২ জাতের ড্রাগন দিয়ে শুরু করি। ধীরে ধীরে আমার বাগানে ৬০ প্রজাতির ড্রাগন চাষে সক্ষম হই। বর্তমানে ৩০ প্রজাতিতে ফল এসেছে। আমি ড্রাগন বিক্রি করে ভালো আয় করি। তাছাড়া বাগানে প্যাশন ফল গাছ আছে। এ গাছের চারাও ভালো দামে বিক্রি করি। ইচ্ছা আছে বাণিজ্যিকভাবে চাষ করার। সরকারি সহযোগিতা পেলে তা করা সম্ভব।'
তাঁর বাবা হায়দার মোল্লা বলেন, 'ছেলে যখন ছাদে গাছ লাগানোর কথা বলে, আমি রাজি হইনি। ভেবেছিলাম ছাদ নষ্ট হবে। একপর্যায়ে ওর কথা রাখতে রাজি হই। এখন দেখি ছাদ বাগান করে খুব সাফল্য পাচ্ছে। ওর বাগানের ড্রাগন ফল আমরা খাই এবং আত্মীয়দের দিই। ও বাজে আড্ডায় বসে না থেকে গাছের পরিচর্যায় সময় কাটায়, এটা দেখে ভীষণ ভালো লাগে। হিমেল নিজের হাতখরচের টাকা উপার্জন করে। মাঝেমধ্যে আমাদেরও সহযোগিতা করে।'
বাগান পরিচর্যায় পরিবারের বড়দের পাশাপাশি ছোটরাও সাহায্য করে। প্রতিবেদনে বলা হয়, তাঁর বাগান দেখে আশপাশের অনেকেই ছাদ বাগান করতে আগ্রহী হয়েছেন। স্থানীয় তরুণ রাকিব হাসান বলেন, 'হিমেলের ধ্যান, জ্ঞান, ভালোবাসা সব এই ছাদ বাগানকে ঘিরে। ও বাজে আড্ডায় সময় নষ্ট না করে ছাদ বাগানে সফল হয়েছে। আমারও ইচ্ছা আছে ওর মতো ছাদ বাগান করার।'
শরীয়তপুর ও জাজিরা
বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটির জাতীয় জ্ঞানকোষ বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী, শরীয়তপুর ঢাকা বিভাগের একটি জেলা, আয়তন ১১৭৪.০৫ বর্গকিলোমিটার। এর উত্তরে মুন্সিগঞ্জ, দক্ষিণে বরিশাল, পূর্বে চাঁদপুর আর পশ্চিমে মাদারীপুর জেলা। ১৯৮৪ সালের ১ মার্চ এটি জেলা হয়; উপজেলা ছয়টি। প্রধান নদী পদ্মা, মেঘনা, পালং ও জয়ন্তী। ২০১১ সালের আদমশুমারিতে জেলার জনসংখ্যা ছিল ১১ লাখ ৫৫ হাজার ৮২৪, আর বাংলাপিডিয়ার হিসাবে ৬১.৬৬ শতাংশ মানুষের আয়ের প্রধান উৎস কৃষি।
বাংলাপিডিয়ায় জাজিরার বানান 'Zanjira'। উপজেলাটি পদ্মার তীরে; এর উত্তরে মুন্সিগঞ্জের লৌহজং ও টঙ্গিবাড়ী, দক্ষিণে শরীয়তপুর সদর ও নড়িয়া উপজেলা। আয়তন ২৪৬.২১ বর্গকিলোমিটার; একটি পৌরসভা আর ১২টি ইউনিয়ন, যার একটি বড় কান্দি। ২০১১ সালের শুমারিতে এখানকার জনসংখ্যা ছিল ১ লাখ ৯৪ হাজার ১৯। উপজেলার ৭১.৩২ শতাংশ মানুষের আয়ের প্রধান উৎস কৃষি। জ্ঞানকোষটি এখানকার প্রধান ফসল হিসেবে ধান, পাট, গম, সরিষা, পেঁয়াজ, রসুন, কালিজিরা ও শাকসবজির কথা বলেছে, আর প্রধান ফল আম, জাম, কাঁঠাল, কলা ও বেল। ২০০৭ সালের মাঠ প্রতিবেদন আর ২০১১ সালের শুমারির ভিত্তিতে তৈরি এই তালিকায় ড্রাগন বা প্যাশন ফলের নাম নেই।
বাংলাপিডিয়া আরও জানায়, পদ্মা বহুমুখী সেতু মাওয়া-জাজিরা পয়েন্ট দিয়ে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলকে মধ্যাঞ্চলের সঙ্গে যুক্ত করেছে। সেতুর ভৌত কাজ যে পাঁচটি প্যাকেজে ভাগ করা হয়েছিল, তার মধ্যে ছিল জাজিরা সংযোগ সড়ক এবং মাওয়া ও জাজিরা সার্ভিস এরিয়া।

এক ছাদে ৬০ জাতের ড্রাগন
হিমেল একটি একটি করে জাত সংগ্রহ করে চারা লাগিয়েছেন, এভাবে সংখ্যাটা দাঁড়িয়েছে ৬০-এ। যেসব জাতে ফল ধরেছে, প্রতিবেদনে তার মধ্যে পার্পেল হার্জ, বিগ পিংক, পিংক রোজ, ব্রুনি বারি-১, ফিজিক্যাল গ্রাফিতি, ভিয়েতনামিজ রেড, রেড সেল্ফ, হলুদ, বিগ হোয়াইট, থাই রেড, কনি মায়ের, বোল্ডার, রেড ভেলভেট, তাইওয়ান রেড, অজি গোল্ড, আসুন্তা-৩ ও ব্লাকিস রেডের নাম আছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী প্রতিটির স্বাদ আলাদা, আর ফলগুলো ভীষণ রসালো। জাতের নামগুলো প্রতিবেদনের বানানেই দেওয়া হলো।
দেশের নিজস্ব জাতও আছে। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি) উদ্ভাবন করেছে বারি ড্রাগন ফল-১। ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে বাংলা ট্রিবিউন এর বর্ণনা দেয় এভাবে: ফল বড়, পাকলে খোসা লাল হয়, শাঁস গাঢ় গোলাপি ও রসালো, বীজ ছোট, কালো ও নরম; একেকটি ফলের ওজন ১৫০ থেকে ৬০০ গ্রাম।
পাশাপাশি অনেক জাত লাগানোর একটা ব্যবহারিক দিকও আছে। যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ফ্লোরিডার সম্প্রসারণ নির্দেশিকা (সেখানে ফলটির নাম পিটায়া) বলছে, ড্রাগনের কিছু জাত স্ব-অসংগত, অর্থাৎ নিজের ফুলের পরাগে ভালো ফল ধরে না; তাই দুই-তিনটি ভিন্ন জিনগত ধরনের গাছ লাগালে পরপরাগায়নে ফল ধরা ও ফলের আকার ভালো হয়। ফুল ফোটে রাতে, তাই স্বাভাবিক পরাগায়নকারী মথ ও বাদুড়; এরা কম থাকলে রাতে বা ভোরে এক ফুলের পরাগ নিয়ে আরেক ফুলের গর্ভমুণ্ডে লাগিয়ে হাতে পরাগায়ন করা যায় বলে নির্দেশিকায় বলা হয়েছে।

দাম, কাটিং ও চারা
প্রতিবেদনে বলা হয়, তাঁর বাগানের ড্রাগন অর্গানিক হওয়ায় বাজারে এর ব্যাপক চাহিদা। হিমেল প্রতি কেজি ফল ৫০০ টাকায় বিক্রি করতেন, তবু চাহিদামতো জোগান দিতে পারতেন না। গাছের কাটিংও বিক্রি করতেন, এতে বছরে আয় হতো কয়েক লাখ টাকা। ড্রাগনের পাশাপাশি ছাদে ছিল ৬ জাতের প্যাশন ফল, মালবেরি আর কয়েক জাতের আঙুর; এসব গাছের চারা বিক্রি করেও তিনি ভালো আয় করতেন। ফলের কোনো অর্গানিক সনদ ছিল কি না, প্রতিবেদনে তা বলা হয়নি।
তুলনার জন্য আগের মাসগুলোতে অন্যত্র প্রকাশিত দামের হিসাব দেখা যেতে পারে। ২০২৩ সালের জুনে দ্য ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসের এক নিবন্ধে দেশি ড্রাগনের প্রস্তাবিত খুচরা দাম আকার ও মৌসুমভেদে কেজিপ্রতি ৩৫০ থেকে ৬০০ টাকা, আর আমদানি করা ফলের ৫০০ থেকে ৮০০ টাকা বলা হয়। ২০২৩ সালের অক্টোবরে দ্য ডেইলি স্টার ঝিনাইদহের মহেশপুর উপজেলার গৌরীনাথপুর ড্রাগন হাটে পাইকারি দাম পায় ১৮০ থেকে ২০০ টাকা। ঢাকা ট্রিবিউন ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে জানায়, ১৫০ থেকে ৬০০ গ্রাম ওজনের দেশি ফল বিক্রি হচ্ছিল ১৫০ থেকে ৪০০ টাকায়, আমদানি করা ফল ৫০০ থেকে ৮০০ টাকায়; লাল জাতের চাহিদা বেশি।
২০২৪ সালের জানুয়ারিতে রাজশাহী থেকে প্রথম আলো জানায়, গোদাগাড়ীর এক চাষি ১৬০ কেজি ড্রাগন ঢাকায় কেজিপ্রতি ২৬০ টাকায় বিক্রি করেছেন; আগের মৌসুমের শুরুতে তিনি পেয়েছিলেন ৬০০ টাকা, আর বছরের শেষে অমৌসুমি ফলের দাম ১ হাজার ২০০ টাকা। গোদাগাড়ীর আরেক চাষি বলেন, আগের বছরের ৬০০ থেকে ১ হাজার ২০০ টাকার পাইকারি দাম নেমে এসেছে ২৮০ টাকায়।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক (উদ্যান) মোহাম্মদ রিয়াজুর রহমান জাগো নিউজকে বলেন, 'হিমেল নামের এই তরুণকে আমরা সাধুবাদ জানাই। তিনি এমন এক উদ্যোক্তা; যিনি ৬০ প্রজাতির ড্রাগন নিয়ে এসেছেন। তিনি যদি বাণিজ্যিকভাবে চাষ করতে চান; সে ক্ষেত্রে কৃষি বিভাগ সব ধরনের পরামর্শ দিয়ে পাশে থাকবে।'
ড্রাগন ফল কী
ড্রাগন ফল লতানো ক্যাকটাসের ফল; প্রধান প্রজাতি Hylocereus undatus, সঙ্গে আছে আরও কয়েকটি প্রজাতি ও সংকর, সবই ক্যাকটেসি পরিবারের। ইউনিভার্সিটি অব ফ্লোরিডার নির্দেশিকা অনুযায়ী এর আদি নিবাস ক্রান্তীয় আমেরিকা: দক্ষিণ মেক্সিকো থেকে মধ্য আমেরিকা হয়ে ভেনেজুয়েলা, কলম্বিয়া, ইকুয়েডর, ব্রাজিল ও উরুগুয়ে। ইংরেজিতে একে স্ট্রবেরি পিয়ার ও নাইট-ব্লুমিং সিরিয়াস নামেও ডাকা হয়। নির্দেশিকাটি জানায়, ফলটি ভিয়েতনামের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানি ফলে পরিণত হয়েছে।
গাছটি দ্রুত বাড়ে, বহুবর্ষজীবী, লতার মতো ক্যাকটাস। কাণ্ড সবুজ, রসালো ও গিঁটযুক্ত, সাধারণত তিনটি চ্যাপ্টা ঢেউখেলানো শিরা থাকে। কাণ্ড থেকে বাতাসে শিকড় বের হয়, যা দিয়ে গাছ অবলম্বন আঁকড়ে ধরে ওপরে ওঠে; কাণ্ড প্রায় ৬.১ মিটার পর্যন্ত লম্বা হতে পারে। সাদা, খুব সুগন্ধি, ঘণ্টার মতো ফুল ফোটে রাতে, লম্বায় ৩৬ সেন্টিমিটার পর্যন্ত হতে পারে। ফলটি রসালো বেরি, প্রায় ১১ সেন্টিমিটার পুরু, খোসা লাল বা হলুদ ও আঁশযুক্ত; প্রজাতিভেদে শাঁস সাদা, লাল বা ম্যাজেন্টা, তাতে অসংখ্য ছোট কালো বীজ।
২০১৮ সালের এপ্রিলে দ্য ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসে উদ্ধৃত বারির এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে ড্রাগনকে ফল ও রসের জন্য চাষ করা উচ্চমূল্যের ক্যাকটাস বলা হয়, যার উৎপত্তি মেক্সিকো ও দক্ষিণ আমেরিকায়, এবং যা অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট এবং ভিটামিন এ, সি ও ই-তে সমৃদ্ধ।
ড্রাগনের বংশবিস্তারের প্রচলিত উপায় কাণ্ডের কাটিং; প্রতিবেদনে কাটিং বিক্রির যে কথা আছে, তার কারণও এটি। ফ্লোরিডার নির্দেশিকা অনুযায়ী ১২ থেকে ৩৮ সেন্টিমিটারের পুরো কাণ্ডখণ্ড কাটিং হিসেবে ব্যবহার করা হয়, আর অনেক কাটিংয়ে লাগানোর ৬ থেকে ৯ মাসের মধ্যে ফল আসে; বীজ থেকে করা গাছে ফল আসতে ৭ বছর পর্যন্ত লাগতে পারে এবং মাতৃগাছের গুণ বজায় থাকে না। ফ্লোরিডায় তিন-চার বছরের একটি গাছ বছরে প্রায় ১০০ কেজি ফল দিতে পারে, আর একটি বাগান প্রায় ২০ বছর টেকে বলে ধরা হয়।
২০১৮ সালের এপ্রিলে দ্য ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস জানায়, বাংলাদেশে ড্রাগনে সাধারণত এপ্রিলে ফুল আসে এবং নভেম্বর পর্যন্ত ফুল-ফল ধরে। সে সময় চট্টগ্রামের খুলশীর পাহাড়তলীতে এক কর্মশালায় বারি কৃত্রিম আলো ও তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ মিলিয়ে সারা বছর ড্রাগন উৎপাদনের সাফল্য তুলে ধরে। একই পত্রিকার ২০২৩ সালের জুনের এক নিবন্ধে বারির গবেষণার বরাতে বলা হয়, ১০০ ওয়াটের ইনক্যানডেসেন্ট বাল্ব ও ২০ ওয়াটের ওয়ার্ম এলইডিতে প্রতি খুঁটিতে সবচেয়ে বেশি কুঁড়ি ও ফল এবং সবচেয়ে বড় ফল পাওয়া গেছে। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে প্রথম আলো জানায়, রাজশাহীতে মাত্র ৭ হেক্টরে আলো-পদ্ধতি ব্যবহার হচ্ছিল, মূলত ডিসেম্বর থেকে মার্চে; সেখানকার চাষিদের ভাষ্যে মৌসুমের ফল পাকতে লাগে ২৫ থেকে ২৮ দিন, অমৌসুমি ফলে ৩৮ থেকে ৪২ দিন।
বাংলাদেশে ড্রাগনের বিস্তার
২০১৩ সালের মে মাসে দ্য ডেইলি স্টার জানায়, ময়মনসিংহে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) জার্মপ্লাজম সেন্টার চারটি বিদেশি ফলের জাত চাষিদের জন্য অবমুক্ত করেছে, তার একটি ভিয়েতনামের ড্রাগন; ২০০৭ সাল থেকে কেন্দ্রটি চারা উৎপাদন শুরু করে। প্রতিবেদনে বলা হয়, ফলটি মে থেকে নভেম্বরে তোলা হয়, যখন দেশি ফলের সরবরাহ কম থাকে, আর লবণাক্ত মাটিতেও ভালো জন্মে।
উৎপাদন বেড়েছে দ্রুত। ২০২২ সালের ডিসেম্বরে দ্য ডেইলি স্টার জানায়, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে উৎপাদন ছিল ৮৫১ টন, পরে তা বেড়ে হয় ১৩ হাজার ৮৭২ টন; এর প্রায় এক-পঞ্চমাংশ আসে খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি ও বান্দরবান থেকে। প্রতিবেদনে নাটোরের এক চাষির কথা আছে, যিনি ২০১২ সাল থেকে ড্রাগন চাষ করছেন। ডিএইর হিসাবে একজন চাষি একরপ্রতি ৪ থেকে ৫ লাখ টাকা আয় করতে পারেন; উচ্চঘনত্বে রোপণ পদ্ধতি চালু করছিল সংস্থাটি, যাতে একই জমিতে আয় ১০ লাখ টাকায় উঠতে পারে বলে তাদের দাবি।
২০২৩ সালের জুনে দ্য ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসে প্রকাশিত এক নিবন্ধে ডিএইর হর্টিকালচার উইংয়ের তথ্য উদ্ধৃত করে বলা হয়, ২০১৫-১৬ সালে ড্রাগনের আবাদ ছিল ৩৮ হেক্টরে, ২০২১-২২ সালে ১ হাজার ১১৫ হেক্টরে; বার্ষিক উৎপাদন ওই দুই বছরে যথাক্রমে ২৭৭ টন ও ১৩ হাজার ৮৭২ টন।
ঝিনাইদহ জেলা ডিএইর বরাতে ২০২৩ সালের অক্টোবরে দ্য ডেইলি স্টার জানায়, সেখানে আবাদ ২০২১ সালে ১৫১ হেক্টর ও ২০২২ সালে ২০৩ হেক্টর থেকে বেড়ে ২০২৩ সালে ছয় উপজেলা মিলিয়ে ৮৪২ হেক্টরে পৌঁছায়; ২০২৩ সালের জুলাইয়ে মহেশপুরের গৌরীনাথপুরে ড্রাগনের পাইকারি হাট চালু হয়, যেখানে দিনে প্রায় ১ কোটি টাকার ফল বিক্রি হয় বলে ব্যবসায়ীদের দাবি। রাজশাহীতে প্রায় ২২৪ হেক্টরে ড্রাগন চাষ হচ্ছিল, উৎপাদনের লক্ষ্য ৪ হাজার ৬২০ টন, স্থানীয় ডিএইর বরাতে ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে প্রথম আলো এ তথ্য দেয়।
২০২৩ সালের ডিসেম্বরে ঢাকা ট্রিবিউন ঢাকা, ময়মনসিংহ, গাজীপুর, টাঙ্গাইল, পাবনা, বগুড়া, রাজশাহী, নাটোর, নীলফামারী, নরসিংদী, চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামে বাণিজ্যিক ড্রাগন বাগানের কথা উল্লেখ করে। সেই তালিকায় শরীয়তপুর ছিল না, আর হিমেলের ছাদ বাগানটিও বাণিজ্যিক বাগান নয়, পারিবারিক পরিসরের চাষ।
বড় ফল নিয়ে ২০২৩ সালের বিতর্ক
ফলটির দ্রুত বিস্তারের পর বাজারের কিছু ফলের আকার নিয়ে বিতর্ক ওঠে। ২০২৩ সালের ডিসেম্বরের আগে থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কিছু ভিডিওতে দাবি করা হচ্ছিল, বড় ড্রাগন ক্ষতিকর 'টনিক' দিয়ে বড় করা হচ্ছে। ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে ঢাকা ট্রিবিউন ও বাংলা ট্রিবিউন জানায়, অনেক বাণিজ্যিক খামারে লাল ড্রাগনের আকার বাড়াতে উদ্ভিদ বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রক ব্যবহার করা হয়, যার মধ্যে সবচেয়ে প্রচলিত জিবারেলিক অ্যাসিড।
ডিএইর বছরব্যাপী ফল উৎপাদন প্রকল্পের পরিচালক ড. মো. মেহেদী মাসুদ পত্রিকা দুটিকে বলেন, ড্রাগন ফল নিয়ে যে অপপ্রচার চলছে তা মোটেও ঠিক নয় এবং এসব ফাইটোহরমোন ব্যবহারে কোনো স্বাস্থ্যঝুঁকি নেই; তিনি ২০১৪ সালের মালয়েশিয়ার এক গবেষণার কথা উল্লেখ করেন। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, সে বছরের জুলাইয়ে বারির ল্যাবরেটরিতে ড্রাগনে কীটনাশকের পরীক্ষা করে ক্ষতিকর কিছু পাওয়া যায়নি।
ভিন্নমতও ছিল। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে প্রথম আলো রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিজ্ঞানের সাবেক অধ্যাপক এম মনজুর হোসেনের বক্তব্য প্রকাশ করে; তাঁর মতে, ড্রাগন বড় করতে যে হরমোন ব্যবহার করা হয় তা মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর, তাই স্বাভাবিক আকারের ফল খাওয়া উচিত। রাজশাহী ডিএইর উপপরিচালক মোজদার হোসেন দাম পড়ে যাওয়ার জন্য কিছু ইউটিউবারের অপপ্রচারকে দায়ী করেন এবং বলেন, ফল বড় হলেই টনিক ব্যবহার হয়েছে ধরে নেওয়ার কারণ নেই। পত্রিকাটির সঙ্গে কথা বলা চাষিরা কোনো হরমোন ব্যবহারের কথা অস্বীকার করেন; তাঁদের ভাষ্যে প্রাকৃতিকভাবে বেড়ে ওঠা ফল সমানভাবে লাল আর খোসা পাতলা হয়।
পাহাড়ি ফল প্যাশন
প্যাশন ফল দক্ষিণ আমেরিকার একটি লতানো গাছের ফল। ২০১২ সালের এপ্রিলে পঞ্চগড়ের এক বাগান নিয়ে দ্য ডেইলি স্টারের প্রতিবেদনে সেখানকার জাতটিকে Passiflora edulis var. flavicarpa বলে শনাক্ত করা হয়, যার আদি নিবাস ব্রাজিল, প্যারাগুয়ে ও উত্তর আর্জেন্টিনা। এর হলদে রস দোকানে বিক্রি হওয়া এক গুঁড়া পানীয়ের মতো দেখায় বলে স্থানীয়ভাবে একে 'ট্যাং ফল' বলা হয়। প্রতিবেদন অনুযায়ী চট্টগ্রামের পাহাড়ি এলাকায় কয়েক বছর ধরে এর চাষ হচ্ছিল এবং বারি ২০০৩ সালে স্থানীয় জাত বারি প্যাশন ফল-১ উদ্ভাবন করে; জাগো নিউজের প্রতিবেদনে একে পাহাড়ি ফল বলার সঙ্গে এ তথ্য মেলে।
২০১২ সালের ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, লতাটি গাছ বা বাঁশের মাচার অবলম্বন চায় এবং কয়েক বছর ধরে ফল দিতে পারে। পঞ্চগড়ের গাছে প্রায় দুই বছর বয়সে ফুল আসে, সারা বছর ফল ধরে, তবে প্রধান মৌসুম জুন-জুলাই। গোল থেকে ডিম্বাকার ফল সবুজ, তিন-চার মাসে হলদেটে হয়, ওজন প্রায় ১৫০ থেকে ২০০ গ্রাম। একে ভিটামিন এ ও সি-র চমৎকার উৎস বলা হয়; তাজা খাওয়া হয়, রস ও মিষ্টান্নও তৈরি হয়। এক স্থানীয় কৃষি কর্মকর্তা পত্রিকাটিকে বলেন, এ চাষে জায়গা ও শ্রম কম লাগে।
হিমেলের ছাদে ছিল ৬ জাতের প্যাশন ফল, আর জাগো নিউজকে তিনি জানান, এসব গাছের চারা তিনি ভালো দামে বিক্রি করেন।

ছাদে ফল চাষ: সরকারি পরামর্শ
ছাদ নষ্ট হবে, হিমেলের বাবার প্রথম এই দুশ্চিন্তার কথা সরকারি পরামর্শেও আছে। কৃষি তথ্য সার্ভিসের (এআইএস) মাসিক কৃষিকথার আষাঢ় ১৪২৫ সংখ্যায় (২০১৮ সালের মাঝামাঝি) ডিএইর সাবেক মহাপরিচালক এম এনামুল হক ছাদ বাগানের উপযোগী ফলগাছের তালিকায় ড্রাগনের নাম রাখেন। তিনি লেখেন, ড্রাগন বেশি রোদ পছন্দ করে এবং বেশি পানি গ্রহণ করে এমন গাছগুলোর একটি।
তাঁর লেখায় যেসব পরামর্শ ছিল:
- শুরুতেই ঠিক করা, ছাদের আকার অনুযায়ী কোথায় কী কী এবং কতগুলো গাছ লাগানো যাবে; রোদ, বাতাস আর আশপাশের ভবন ও গাছের উচ্চতা বিবেচনায় রাখা;
- অতি উঁচু ছাদে ঝড়-বাতাসের প্রভাব বেশি বলে লম্বা গাছ না লাগানো, আর ফলগাছ ছেঁটে ওপরের বদলে পাশে বাড়তে দেওয়া;
- ছাদের কিনার ঘেঁষে ২ থেকে ৩ ফুট চওড়া ও ২ থেকে ৩ ফুট উঁচু বক্স তৈরি করা, অথবা নিচে ৮ থেকে ১২ ইঞ্চি ফাঁক রেখে বক্স বানানো, যাতে শিকড় ছড়াতে পারে অথচ ছাদের ক্ষতি না হয়;
- পানি নিষ্কাশনের জন্য বক্সের তলায় স্তরে স্তরে ইটের খোয়া, কাঠকয়লা, নারকেলের ছোবড়া ও মোটা বালু দিয়ে তার ওপর ২ থেকে আড়াই ফুট ভালো মানের পটিং মিডিয়া ভরা;
- টব সরাসরি ছাদে না রেখে এক সারি ইটের ওপর বসানো, যাতে বাড়তি পানি সহজে বেরিয়ে যায়;
- ছাদে রোদের তাপ বেশি হলে ৭ থেকে ৮ ফুট ওপরে ৫০ থেকে ৭০ শতাংশ রোদ ঠেকানো ঘন নেট লাগানো;
- গাছের গোড়া শুকালেই কেবল পানি দেওয়া, সম্ভব হলে সকালে।
পরে কৃষিকথার আষাঢ় ১৪২৮ সংখ্যায় (২০২১ সালের মাঝামাঝি) নগর কৃষি উৎপাদন সহায়ক (পাইলট) প্রকল্পের মনিটরিং অফিসার মো. শামীম সেখ লেখেন, ছাদ বাগান শুরুর আগে দেখে নিতে হবে ছাদ গাছপালার ওজন বহনের মতো মজবুত কি না এবং পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা ভালো কি না। তিনি খর্বাকার, অগভীর শিকড়ের এবং সারা বছর ফল দেয় এমন জাত বেছে নেওয়ার পরামর্শ দেন, ছাদের উপযোগী জাতের তালিকায় একটি ড্রাগন জাতও রাখেন, ছাদ বাগানের জন্য ড্রিপ বা বিন্দু সেচকে খুব উপযোগী বলেন, এবং যেকোনো প্রয়োজনে স্থানীয় কৃষি অফিসে যোগাযোগ করতে বলেন। সার ও বালাইনাশক ব্যবহারের আগে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা অথবা সরকারের কৃষি কল সেন্টারের (১৬১২৩) পরামর্শ নেওয়া ভালো।
শহরগুলোতে ছাদ কৃষি তত দিনে নীতিগত মনোযোগও পেয়েছে। ২০২২ সালের ডিসেম্বরে নেদারল্যান্ডসের অর্থায়নে চলা ঢাকা ফুড সিস্টেম প্রকল্পের আওতায় ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের কাউন্সিলরদের এক কর্মশালায় জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) জানায়, দেশের শহরে টেকসই খাদ্যের জন্য ছাদ কৃষি দরকার। ঢাকা ট্রিবিউনের প্রতিবেদনে বলা হয়, এআইএসের হিসাবে ঢাকা শহরে প্রায় সাড়ে চার লাখ ছাদের ৪ হাজার ৫০০ হেক্টর জায়গা অব্যবহৃত, আর সিটি করপোরেশনের ড্রোন জরিপে তাদের এলাকার মাত্র ২ শতাংশ ছাদে বাগান পাওয়া গেছে।
২০২৩ সালের ১৪ জুন দ্য ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস জানায়, স্থানীয় সরকারমন্ত্রী ছাদ বাগান করা ভবনমালিকদের হোল্ডিং করে ১০ শতাংশ ছাড়ের ঘোষণা দিয়েছেন, যা দেশের সব সিটি করপোরেশন ও পৌর এলাকায় প্রযোজ্য হবে। বারিও ২০২১-২২ গবেষণা বছরে ছাদ বাগানের মাটি ও গ্রোয়িং মিডিয়া এবং ড্রাগনের কাণ্ড ছাঁটাই নিয়ে গবেষণা করেছে বলে ২০২৩ সালের জুনে দ্য ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসের ড্রাগনবিষয়ক নিবন্ধে উল্লেখ করা হয়।

ছবি: Abu Sayeed / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: জাগো নিউজ, বাংলাপিডিয়া, দ্য ডেইলি স্টার, দ্য ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস, ঢাকা ট্রিবিউন, বাংলা ট্রিবিউন, প্রথম আলো, কৃষি তথ্য সার্ভিস (কৃষিকথা), ইউনিভার্সিটি অব ফ্লোরিডা আইএফএএস এক্সটেনশন





মন্তব্য
(০)