প্রায় দুই দশক একনাগাড়ে বাড়ার পর বাংলাদেশে ইলিশের উৎপাদন টানা তিন বছর ধরে কমেছে, সঙ্গে কমতে শুরু করেছে মাছটির গড় ওজনও। বিবিসি বাংলা ২০২৬ সালের ২২ জুন এক প্রতিবেদনে জানায়, এ নিয়ে গবেষকদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। উৎপাদন বাড়াতে মৎস্য অধিদপ্তর ২০২০ সালে ছয় বছর মেয়াদি যে প্রকল্প নিয়েছিল, সেটি কার্যত ব্যর্থ হয়েছে; ২০২৬ সালের জুনে প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই সরকারি পর্যায়ে নতুন প্রকল্পের প্রস্তুতি চলছিল।
ইলিশ (বৈজ্ঞানিক নাম Tenualosa ilisha) বাংলাদেশের জাতীয় মাছ; ২০১৭ সালে এটি দেশের ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্যের স্বীকৃতি পায়। মাছ বিষয়ক তথ্যভান্ডার ফিশবেইস অনুযায়ী ইলিশ উপকূলের পানিতে ঝাঁক বেঁধে থাকে এবং ডিম ছাড়তে নদীর উজানে ওঠে, সাধারণত ৫০ থেকে ১০০ কিলোমিটার পর্যন্ত।
তিন বছরে উৎপাদন কতটা কমেছে
মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী ২০০২-০৩ সময়ে দেশে ইলিশের উৎপাদন ছিল ১ লাখ ৯৯ হাজার মেট্রিক টন, এরপর গড়ে প্রতিবছরই তা বেড়েছে। কর্মকর্তারা বিবিসি বাংলাকে জানান, ২০২২-২৩ অর্থবছরে উৎপাদন হয়েছিল ৫ লাখ ৭১ হাজার মেট্রিক টন, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৫ লাখ ২৯ হাজার এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৫ লাখ ৪ হাজার মেট্রিক টন। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের আনুষ্ঠানিক হিসাব তখনো পাওয়া যায়নি, তবে কর্মকর্তাদের ধারণা ছিল উৎপাদন ৫ লাখ টনেরও কম হয়েছে।
মৎস্য অধিদপ্তরের ইলিশসম্পদ উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা প্রকল্পের পরিচালক মোল্লা এমদাদুল্যাহ উৎপাদন কমার কথা স্বীকার করেন। তিনি বিবিসি বাংলাকে বলেন, "প্রজনন মৌসুমে ইলিশ ধরা বন্ধ রাখাসহ কিছু পদক্ষেপ কার্যকর করার কারণে উৎপাদন ক্রমাগত বাড়ছিল। কিন্তু সেটি হোঁচট খেতে শুরু করেছে ২০২২-২৩ অর্থবছর থেকে।" তাঁর ভাষ্য, বড় আকারের ইলিশ মাঝে মাঝে পাওয়া গেলেও কম ওজনের ইলিশই বেশি আসছিল।

কেন কমছে উৎপাদন ও ওজন
কর্মকর্তা ও বিশেষজ্ঞদের মতে, অক্টোবরে ডিম ছাড়ার পর ইলিশ ৬ থেকে ৭ মাস নদীতে থাকে, তারপর এপ্রিলের শেষে বা মে মাসের প্রথম সপ্তাহে সাগরে চলে যায়। প্রধান বিচরণ এলাকা চাঁদপুর সদর ও হাইমচর, মুন্সিগঞ্জের লৌহজং থেকে জাজিরা পর্যন্ত পদ্মা, মেহেন্দীগঞ্জের গজারিয়া নদী, বরিশাল ও বরগুনার কিছু নদী এবং ভোলার তেতুলিয়া। মোল্লা এমদাদুল্যাহর ধারণা, সাগর মোহনায় ধরা পড়ে যাওয়ায় নদী থেকে সাগরে যাওয়ার প্রবণতা কমেছে।
বিশেষজ্ঞরা বিবিসি বাংলাকে বলেন, নদীতে কারেন্ট জাল দিয়ে ছোট ইলিশ ধরা হচ্ছে, আর সাগরে বাণিজ্যিক ট্রলারের বিরুদ্ধে ৪০ মিটারের কম গভীরতায় এসে ছোট ইলিশ ধরার অভিযোগ রয়েছে। মোল্লা এমদাদুল্যাহ বলেন, "নদীর নাব্যতার সংকট ও দূষণের কারণেই প্রধানত ইলিশের উৎপাদন কমেছে।" তাঁর মতে, চর পড়ে অভিপ্রয়াণের পথ, প্রজনন ক্ষেত্র ও নার্সারি এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
জাটকা নিধন ও অবৈধ মাছ ধরায় ইলিশ সংকটে পড়ার প্রেক্ষাপটে ২০০০ সালের দিক থেকে কর্তৃপক্ষ নানা পদক্ষেপ নেয়। ২০১৫ সাল থেকে প্রতিবছর ২০ মে থেকে ২৩ জুলাই বঙ্গোপসাগরে মাছ ধরা নিষিদ্ধ ছিল; ২০২৫ সাল থেকে নতুন সময়সীমা হয় ১৫ এপ্রিল থেকে ১১ জুন। দেশে ইলিশের অভয়াশ্রম পাঁচটি: পদ্মা ও মেঘনায় দুটি, তেতুলিয়া, গজারিয়া ও কালাবদর নদীতে একটি করে। কলাপাড়ার আন্ধারমানিক নদীর অভয়াশ্রমটি আর কার্যকর নেই।
ইলিশ গবেষক ও মৎস্য বিজ্ঞান ইন্সটিটিউটের সাবেক পরিচালক ডঃ আনিসুর রহমান বলেন, "বড় ইলিশ আসতে শুরু করেছিল। সেখানে কেন হুট করে উৎপাদন ও ওজন কমতে শুরু করলো সেটি চিহ্নিত করা জরুরি।" তাঁর মতে, জাটকা বড় হওয়ার সুযোগ না পেলে বড় মাছ পাওয়া যাবে না; মিঠা পানির দিকে লবণাক্ত পানি ঢুকে পড়া এবং পানিপ্রবাহের ঘাটতিও উৎপাদন কমাতে পারে।

দাম, গুরুত্ব ও সামনের পরিকল্পনা
উৎপাদন কমার প্রভাবে দুই বছর ধরে ইলিশের দাম বাড়তির দিকে ছিল। প্রতিবেদন প্রকাশের আগের সপ্তাহে একজন ক্রেতা চাঁদপুরের আড়তে ৯০০ থেকে ৯৫০ গ্রাম ওজনের ইলিশ কেজিপ্রতি প্রায় সাড়ে তিন হাজার টাকায় কেনার কথা জানান। ঢাকার কারওয়ান বাজারে ৮০০ থেকে ৯০০ গ্রামের ইলিশের দাম চাওয়া হচ্ছিল গড়ে কেজিপ্রতি দুই হাজার টাকার বেশি।
বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইন্সটিটিউটের তথ্যানুযায়ী দেশের মোট মৎস্য উৎপাদনের প্রায় ১২ শতাংশ আসে ইলিশ থেকে। বিশ্বের মোট ইলিশে বাংলাদেশের অংশ নিয়ে হিসাব ভিন্ন: ইন্সটিটিউটের তথ্যে প্রায় ৬০ ভাগ, আর মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের দাবি প্রায় ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ। ২০১৮ সালে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীরা ইলিশের পূর্ণাঙ্গ জীবনরহস্য উন্মোচন করার পর সংরক্ষণ ও উৎপাদনে বড় অগ্রগতির আশা করা হয়েছিল।

সাগরে ট্রলারের অবাধে ছোট ইলিশ ধরার অভিযোগের প্রেক্ষাপটে সাগরকেন্দ্রিক নতুন প্রকল্পের চিন্তা চলছিল বলে জানান মোল্লা এমদাদুল্যাহ। তিনি বলেন, সংকট কাটাতে কয়েক বছর লাগতে পারে, তবে সাগরে অতিরিক্ত ট্রলার নিয়ন্ত্রণ করে মজুত বাড়ানোর পদক্ষেপ নিতেই হবে। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় তখন বাংলাদেশ, মিয়ানমার ও ভারত উপকূলের ইলিশ নিয়ে গবেষণা করছিল, যেখানে ডঃ আনিসুর রহমান গবেষক হিসেবে যুক্ত। দুজনেই বলেন, ইলিশ রক্ষায় নদী ও সাগরে নজরদারি আরও বাড়ানো জরুরি।
ছবি: Rezowan / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: বিবিসি বাংলা, ফিশবেইস, উইকিপিডিয়া





মন্তব্য
(০)