বাড়ির সামনে নদীর পাড়ের পতিত জমিতে বরই বাগান গড়ে স্বাবলম্বী হয়েছেন পটুয়াখালী সদর উপজেলার মরিচবুনিয়া ইউনিয়নের গুয়াবাড়িয়া গ্রামের এক নারী। ২০২৬ সালের ১৫ জানুয়ারি অনলাইন সংবাদমাধ্যম জাগো নিউজ এই খবর দেয়। প্রতিবেদনে তার নাম তাসলিমা বেগম। পাশের গ্রামের একটি বাগানে বরই (কুল) কিনতে গিয়েই তিনি নিজে বাগান করার অনুপ্রেরণা পান। প্রতিবেদন প্রকাশের সময় তার বাগানে তৃতীয় মৌসুমের ফল চলছিল, গাছে গাছে থোকায় থোকায় বরই ঝুলছিল। উপজেলা কৃষি অফিস জানায়, এক বছরে উপজেলায় বরই চাষের জমি ৩৬ হেক্টর থেকে বেড়ে ৪০ হেক্টরে দাঁড়িয়েছে।
ফল কিনতে গিয়ে বাগানের স্বপ্ন
প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রায় তিন বছর আগে তাসলিমা বেগম পাশের পেয়ারপুর গ্রামের একটি বরই বাগানে ফল কিনতে যান। বাগানের সৌন্দর্য আর ফলন দেখে তিনি মুগ্ধ হন। পরে স্বামীকে নিয়ে আবার সেই বাগান ঘুরে দেখেন এবং নিজেও বরই চাষে আগ্রহী হয়ে ওঠেন। বাড়ির সামনে নদীর পাড়ে তার নিজের একখণ্ড জমি অনাবাদি পড়ে ছিল। সেই জমি কাজে লাগানোর সিদ্ধান্ত নিয়ে তিনি ২০ শতাংশ পতিত জমিতে বাগান করেন।
যশোর থেকে থাই আপেল কুল, কাশ্মীরি আপেল কুল, বলসুন্দরীসহ বিভিন্ন জাতের প্রায় ২০০টি বরইয়ের কলম এনে তিনি রোপণ করেন। প্রতিবেদন বলছে, নিয়মিত পরিচর্যায় এক বছরের মধ্যেই বাগানে ফল আসতে শুরু করে। প্রথম বছরে খরচ উঠতে কিছুটা সময় লাগে, তবে দ্বিতীয় বছর থেকেই তিনি লাভের মুখ দেখেন। প্রতিবেদন প্রকাশের সময় চলছিল তৃতীয় মৌসুম; তার আশা ছিল, বাগানের সব ফল বিক্রি হলে পুরো টাকাটাই লাভ থাকবে।
জাগো নিউজের প্রতিনিধি সরেজমিনে দেখেন, সারিবদ্ধ মাঝারি আকারের গাছে থোকায় থোকায় ঝুলছে বিভিন্ন জাতের বরই। রাস্তার পাশে হওয়ায় বাগানটি পথচারীদের নজর কাড়ে। পাখি ও অন্য প্রাণী যাতে ফলের ক্ষতি করতে না পারে, সে জন্য বাগানের চারপাশ বাঁশ ও জাল দিয়ে ঘেরা।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, তাসলিমা বেগমের স্বামী ঢাকায় চাকরি করেন, আর ছেলে সৌদি আরবে প্রবাসী। আগে তিনিও কাজের সূত্রে ঢাকায় থাকতেন; এখন গ্রামে থেকে নিজেই বাগান দেখাশোনা করেন। তার সাফল্য দেখে আশপাশের অনেকেই বরই চাষে আগ্রহী হয়ে উঠেছেন বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়।
খরচ আর আয়ের হিসাব, তার নিজের কথায়
বাগানের খরচ ও আয়ের হিসাব তাসলিমা বেগমের নিজের দেওয়া, যা তিনি জাগো নিউজকে জানান। তিনি বলেন, 'প্রথমে এক বিঘার সমপরিমাণ চারা এনে রোপণ করি। সার, ওষুধ ও পরিচর্যার মাধ্যমে কয়েক মাসেই গাছগুলো বড় হয়ে যায়। প্রথম বছরে লাভ কম হলেও দ্বিতীয় বছরে প্রায় এক লাখ টাকার মতো লাভ হয়েছিল। আশা করছি এ বছর প্রায় দেড় লাখ টাকার বরই বিক্রি হবে। এ মৌসুমে খরচ হয়েছে মাত্র ২০ হাজার টাকা, বাকিটা সবই লাভ হবে।'
কেন এই ফসল তার কাছে লাভজনক মনে হয়েছে, তা-ও তিনি ব্যাখ্যা করেন: 'বরই চাষে প্রথম বছর একটু খরচ বেশি হলেও পরে তেমন খরচ নেই। একবার চারা লাগানোর পর নতুন করে আর লাগাতে হয় না। এক গাছ থেকেই বারবার ফলন পাওয়া যায়। বর্তমানে প্রতি কেজি বরই ২০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। প্রতিটি গাছ থেকে গড়ে ২০ থেকে ২৫ কেজি ফল পাওয়ার আশা করছি।'
প্রতিবেশী নাসরিন বেগম জাগো নিউজকে বলেন, শুরু থেকেই তিনি বাগানটি দেখছেন: 'দুই বছর আগে যখন গাছগুলো লাগানো হয়, তখন থেকেই দেখছি তিনি খুব যত্ন করেন। তার বাগানের বরই খুবই মিষ্টি। আমরা নিজের চোখে বাগান দেখে তারপর ফল কিনি। এখন তার দেখাদেখি আমাদের এলাকায় অনেকেই বরই চাষ শুরু করেছেন।'
প্রথম বছরে বেশি খরচ আর পরে কম খরচের যে কথা তিনি বলেছেন, উদ্যানতত্ত্বের তথ্যসূত্রেও তার মিল পাওয়া যায়। জাতীয় জ্ঞানকোষ বাংলাপিডিয়ার বরই বিষয়ক নিবন্ধে বলা হয়েছে, উন্নত জাতের গাছ কুঁড়ি সংযোজন ও কলমের মাধ্যমে তৈরি করা হয়, আর প্রতিবছর নতুন করে গাছ লাগাতে হয় না, ছাঁটাইয়ের মাধ্যমেই ফল ধরার ডাল নতুন হয়: বরই ধরে নতুন গজানো ডালে, তাই ফল তোলার পর গাছ ছেঁটে দেওয়া হয় এবং পরের মৌসুমের জন্য নতুন ডাল গজায়।
পটুয়াখালী সদরে বরই চাষ: কৃষি অফিসের হিসাব
পটুয়াখালী সদর উপজেলা কৃষি অফিস জাগো নিউজকে জানায়, পটুয়াখালী জেলা ধান ও মুগ ডালের জন্য খ্যাত। তবে ধানের পাশাপাশি এ উপজেলায় তরমুজ, বরই, মুগ ডালসহ বিভিন্ন অর্থকরী ফসলের চাষ ক্রমেই জনপ্রিয় হচ্ছে। আগের অর্থবছরে পটুয়াখালী সদর উপজেলায় বরই চাষের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩৬ হেক্টর জমি; ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে চলমান অর্থবছরে তা ৪ হেক্টর বেড়ে ৪০ হেক্টরে দাঁড়ায়। অফিসের হিসাবে প্রতি হেক্টরে গড়ে ১১ দশমিক ৩৩ মেট্রিক টনেরও বেশি বরই উৎপাদন হয়েছে, ফলে পুরো উপজেলায় মোট উৎপাদন দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪৫৩ মেট্রিক টন।
পটুয়াখালী সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. নাজমুল ইসলাম মজুমদার জাগো নিউজকে বলেন, 'গত বছর উপজেলায় ৩৬ হেক্টর জমিতে বরই চাষ হলেও এ বছর তা বেড়ে ৪০ হেক্টরে দাঁড়িয়েছে। আপেল কুল, বাউকুল, বলসুন্দরীসহ নানা উন্নত জাতের বরই চাষ হচ্ছে। কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করার মাধ্যমে বরই চাষকে আরও সম্প্রসারণে আমরা পরিকল্পনা হাতে নিয়েছি।'
কৃষি অফিসের দেওয়া ফলনের হিসাব জ্ঞানকোষে দেওয়া সীমার ওপরের দিকে। এম এ রহিমের লেখা বাংলাপিডিয়ার বরই নিবন্ধে হেক্টরপ্রতি ফলন ধরা হয়েছে ৮ থেকে ১২ টন। পুরোনো বরই অঞ্চলের তুলনায় পটুয়াখালী সদরের ৩৬ থেকে ৪০ হেক্টরে ওঠা ছিল ছোট পরিসরের বৃদ্ধি: ২০১৯ সালে সাতক্ষীরার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই) জানিয়েছিল, জেলার সাত উপজেলায় প্রায় ৬২০ হেক্টর জমিতে বরই চাষ হয়; আর ২০২১ সালে রাঙামাটির ডিএই জেলার বরই চাষের জমি ৭৬০ হেক্টর বলে জানায়।
পটুয়াখালী সদর ও মরিচবুনিয়া
পটুয়াখালী সদর বরিশাল বিভাগের উপকূলীয় জেলা পটুয়াখালীর সদর উপজেলা। বাংলাপিডিয়ার তথ্যে উপজেলার আয়তন ৩৬২.৪৬ বর্গকিলোমিটার। এর উত্তরে দুমকি উপজেলা; দক্ষিণে গলাচিপা, আমতলী ও বরগুনা সদর উপজেলা; পূর্বে বাউফল ও গলাচিপা এবং পশ্চিমে মির্জাগঞ্জ উপজেলা। প্রধান নদী বুড়িশ্বর, গলাচিপা, রাজগঞ্জ ও পটুয়াখালী। পটুয়াখালী থানা গঠিত হয় ১৮৭১ সালে, উপজেলা হয় ১৯৮৩ সালে। উপজেলায় একটি পৌরসভা ও ১২টি ইউনিয়ন রয়েছে; এর একটি মরিচবুনিয়া, যে ইউনিয়নে গুয়াবাড়িয়া গ্রাম অবস্থিত।
কৃষিই এ উপজেলার মানুষের প্রধান জীবিকা। আদমশুমারির তথ্যের ভিত্তিতে বাংলাপিডিয়া জানায়, উপজেলার ৪৫.৪৪ শতাংশ খানার আয়ের প্রধান উৎস কৃষি, ব্যবসা ১৬ শতাংশ এবং চাকরি ১৩.৫৫ শতাংশ। প্রধান ফসলের তালিকায় আছে ধান, বিভিন্ন ডাল ও শাকসবজি; প্রধান ফল নারকেল ও তাল। সেই পুরোনো তালিকায় বরইয়ের নাম নেই, তাই উপজেলাজুড়ে এ ফলের চাষ ছড়িয়ে পড়ার যে বিবরণ কৃষি অফিস দিয়েছে, সেটিই ছিল খবর। পুরো জেলায় বাংলাপিডিয়ার হিসাবে ৫৭.০৫ শতাংশ খানার আয়ের প্রধান উৎস কৃষি।
জেলাটির আয়তন ৩ হাজার ২২১.৩১ বর্গকিলোমিটার। এর উত্তরে বরিশাল জেলা, দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর, পূর্বে ভোলা এবং পশ্চিমে বরগুনা জেলা। বাংলাপিডিয়া বলছে, জেলার ভূমি মেঘনা অববাহিকার পলিমাটি ও কয়েকটি ছোট চরভূমি নিয়ে গঠিত। একসময় বাকেরগঞ্জ জেলার মহকুমা পটুয়াখালী ১৯৬৯ সালে জেলায় উন্নীত হয়। ২০০১ সালে প্রতিষ্ঠিত পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এই জেলায় অবস্থিত, আর কলাপাড়া উপজেলার দক্ষিণ প্রান্তে রয়েছে কুয়াকাটা সমুদ্রসৈকত।

বরই কী ধরনের ফল
বাংলাদেশে যে বরই চাষ হয়, তার বৈজ্ঞানিক নাম Ziziphus mauritiana; ইংরেজিতে একে ইন্ডিয়ান জুজুব বা ইন্ডিয়ান প্লাম বলা হয়, বাংলায় বরই বা কুল। এটি রামনেসি (Rhamnaceae) পরিবারের গাছ। বাংলাপিডিয়া জানায়, জিজিফাস গণে প্রায় ৪০টি প্রজাতি আছে, যার দুটি চাষ করা হয়: Z. mauritiana বা ভারতীয় বরই এবং Z. jujuba বা চীনা বরই। ভারতীয় প্রজাতিটি গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ও উপগ্রীষ্মমণ্ডলীয় জলবায়ুর উপযোগী, আর চীনা প্রজাতিটি নাতিশীতোষ্ণ জলবায়ু পছন্দ করে।
বাংলাপিডিয়ার মতে, বরইয়ের আদি নিবাস ভারতের উত্তরাঞ্চল, চীনের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল ও মালয়েশিয়ার মধ্যাঞ্চল; আফ্রিকা ও আমেরিকার শুষ্ক অঞ্চলেও এর চাষ হয়। বরই সহনশীল গাছ, নানা পরিবেশে জন্মায়, খরা সইতে পারে এবং সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১ হাজার মিটার উচ্চতা পর্যন্ত চাষ হয়। শুষ্ক ও গরম আবহাওয়া এর জন্য ভালো; প্রায় যেকোনো মাটিতে জন্মালেও ভারী ও সামান্য ক্ষারীয় মাটি সবচেয়ে উপযোগী। উদ্ভিদবিজ্ঞানের তথ্যসূত্র আরও জানায়, গাছটির প্রধান মূল দ্রুত গভীরে যায়, যা খরা সহ্য করার একটি অভিযোজন; বেশ শুষ্ক ও জলাবদ্ধ, দুই অবস্থাই এটি সইতে পারে, আর গভীর বেলে দোআঁশ থেকে দোআঁশ, নিরপেক্ষ বা সামান্য ক্ষারীয় মাটিতে এর বৃদ্ধি সবচেয়ে ভালো হয়।
বরইয়ের ফুল খুব ছোট, হলদেটে, পাঁচ পাপড়ির; পাতার কক্ষে ফোটে। মৌমাছি, বোলতা ও মাছির মতো পতঙ্গ এর পরপরাগায়ন ঘটায়। ফুলের পুরুষ অংশ আগে পরিপক্ব হয় বলে একটি গাছ নিজের ফুলে নির্ভরযোগ্যভাবে পরাগায়ন ঘটাতে পারে না। ফলটি একটি শক্ত বিচিযুক্ত আঁটিফল। কাঁচা অবস্থায় খোসা হালকা সবুজ, শাঁস সাদা ও কচকচে; পাকতে থাকলে খোসা হলুদ, পরে লালচে বাদামি হয়। বাংলাপিডিয়া জানায়, হলুদ হয়ে আসাই পাকার লক্ষণ।

বাগানের জাতগুলো
বাংলাদেশে বরইয়ের নিজস্ব উন্নত জাত আছে, পাশাপাশি চাষিরা ভারত থেকে আনা জাতও লাগান। বাংলাপিডিয়ায় জনপ্রিয় জাত হিসেবে বাউকুল ১ ও ২, বারি কুল ১ ও ২, নারকেলি, সবজি ও আপেল কুলের নাম আছে। নারকেলি কুলের ফল লম্বাটে, টাকুর মতো; বিচি ছোট, শাঁস মিষ্টি ও সুস্বাদু; প্রধানত সাতক্ষীরা ও রাজশাহী অঞ্চলে এর চাষ হয়। কুমিল্লার কচুয়া, বরুড়া ও চান্দিনা এলাকায় চাষ হওয়া কুমিল্লা কুল দেখতে ডাবের মতো বলে স্থানীয়ভাবে একে ডাব কুল বলা হয়।
বাউকুল ১ উদ্ভাবন করেছে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের জার্মপ্লাজম সেন্টার (বাউ-জিপিসি)। বাংলাপিডিয়ার মতে এটিই সবচেয়ে জনপ্রিয় জাত। সারা দেশে এর চাষ হয়, বিশেষ করে বাগেরহাট ও সাতক্ষীরার মতো লবণাক্ত এলাকা, সেন্ট মার্টিন, সোনাদিয়া দ্বীপ ও কক্সবাজারের মতো বালুময় এলাকা এবং খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটির মতো পাহাড়ি এলাকায়। এর একেকটি ফলের ওজন ৯০ থেকে ২৫০ গ্রাম, মিষ্টতা মোট দ্রবণীয় কঠিন পদার্থের (টিএসএস) মাপে ১৮ থেকে ২১, আর খাওয়ার অংশের মাত্র ৩ থেকে ৪ শতাংশ জায়গা নেয় বিচি। গাছ কাঁটাহীন ও দ্রুত বাড়ে, রোপণের চার থেকে পাঁচ মাসের মধ্যেই ফল ধরে। বাউ জার্মপ্লাজম সেন্টারের আরেকটি জাত বাউকুল ২ বা শাহ কুল খাটো জাতের গাছ; ফলের ওজন ১০০ থেকে ২০০ গ্রাম, মিষ্টতা ১৯ থেকে ২৫ টিএসএস। বাংলাপিডিয়া জানায়, আপেল কুলের ফল দেখতে আপেলের মতো আকর্ষণীয়, কচকচে ও মিষ্টি; গাছ দ্রুত বাড়ে এবং ফল কম ঝরে।
তাসলিমা বেগমের লাগানো দুটি জাত তুলনামূলক সাম্প্রতিক সময়ে ভারত থেকে দেশে এসেছে। ২০১৯ সালে ফরিদপুর সদরের এক কৃষক প্রথম কাশ্মীরি আপেল কুল চাষ করলে ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে দ্য ডেইলি স্টার জানায়, এই জাতের ফলের হালকা হলুদ বা সবুজ খোসার ওপর লালচে আভা থাকে। ফরিদপুরের ডিএইর উপপরিচালক পত্রিকাটিকে বলেন, দেশে পাওয়া অন্য বড় জাত, যেমন বাউকুল ও থাই কুলের চেয়ে এটি আকারে বড় ও স্বাদে ভালো। ওই কৃষক ভারত থেকে চারা এনেছিলেন এবং অন্য কৃষকদের চাহিদা দেখে কুঁড়ি সংযোজন পদ্ধতিতে চারা তৈরি শুরু করেন। তার বাগানের তৃতীয় জাত বলসুন্দরী তত দিনে কয়েকটি জেলায় চাষ হচ্ছিল: ২০২১ সালে দ্য ডেইলি স্টার রাঙামাটিতে চাষ হওয়া জাতের তালিকায় এর নাম দেয়, আর ২০২৬ সালের ১৩ জানুয়ারি, পটুয়াখালীর প্রতিবেদনের দুই দিন আগে, বার্তা সংস্থা ইউএনবি কুমিল্লার বরুড়া উপজেলার শিকারপুর গ্রামকে বলসুন্দরী, বারি সুন্দরী ও কাশ্মীরি বরই চাষের কেন্দ্র হিসেবে বর্ণনা করে।
যেখান থেকে তার কলম এসেছে, সেই যশোরেও বরই চাষের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। ২০১৭ সালে দ্য ডেইলি স্টার জানায়, ভারত সীমান্তঘেঁষা যশোরের শার্শা উপজেলায় বরই চাষ বাড়ছে; উপজেলা কৃষি অফিসের হিসাবে সেখানে প্রায় ৫০০ জন বাগানমালিক এবং প্রায় ১২০ হেক্টর জমিতে বিভিন্ন জাতের বরই ছিল, আর সেখান থেকে ট্রাকে ট্রাকে বরই যেত সাতক্ষীরা, বরিশাল ও ঢাকার পাইকারি বাজারে।

চাষ ও সুরক্ষার পদ্ধতি
বাংলাপিডিয়ার নিবন্ধে বাংলাদেশে বরই চাষের প্রধান ধাপগুলো তুলে ধরা হয়েছে। বীজ থেকেও বরইয়ের চারা হয়, তবে বীজের শক্ত খোসার কারণে প্রায় দুই মাস গরম বালুতে রেখে দিতে হয়, তারপর চার থেকে আট সপ্তাহে বীজ গজায়। এখন কুঁড়ি সংযোজন ও কলমই বেশি প্রচলিত, এর মধ্যে ফাটল কলম সবচেয়ে জনপ্রিয়। তাসলিমা বেগম এ ধরনের কলমের চারাই কিনেছিলেন।
- রোপণ: বছরের যেকোনো সময় বরই লাগানো যায়, তবে মার্চ থেকে মে সবচেয়ে ভালো সময়। গভীর দোআঁশ বা উর্বর মাটি সবচেয়ে উপযোগী। প্রতিটি চারা লাগানো হয় ৭৫ থেকে ১০০ সেন্টিমিটার চওড়া ও গভীর গর্তে, যা আগে থেকে পচা গোবর, খৈল ও সার দিয়ে তৈরি করে রাখা হয়। নির্দিষ্ট জমির জন্য সারের পরিমাণ উপজেলা কৃষি অফিস থেকে জেনে নেওয়াই ভালো।
- সেচ: সার দেওয়ার পর সেচ দিতে হয়; বর্ষায় বাগান থেকে পানি বের হওয়ার ব্যবস্থা রাখতে হয়, আর খরায় হালকা সেচ লাগে।
- ছাঁটাই: বরই ধরে নতুন গজানো ডালে, তাই ছাঁটাই অপরিহার্য। কলমের জোড়ার নিচ থেকে গজানো ডাল কেটে ফেলতে হয়। ফল তোলা শেষ হলে, সাধারণত মার্চের শেষে, ডালপালা ৩ থেকে ৫ ফুট উচ্চতা রেখে কেটে দেওয়া হয় এবং কাটা জায়গায় আলকাতরা লাগানো হয়।
- পরিচ্ছন্নতা: বাগানের আশপাশে বুনো বরইগাছ রাখা যাবে না, কারণ এগুলো পাউডারি মিলডিউ ও ফলের মাছির মতো রোগ ও পোকার আশ্রয় হয়।
- সাথি ফসল: গাছের ফাঁকে আলু, মিষ্টি আলু, মরিচ, শাক, রসুন, আদা ও হলুদ চাষ করা যায়।
- ফল তোলা: ফল হলুদ হয়ে এলে বোঝা যায় পেকেছে; কয়েক দফায় ফল তুলতে হয়, যাতে প্রতিটি ফল ঠিক সময়ে তোলা যায়।
একই নিবন্ধে বরইয়ের রোগ ও পোকার কথাও আছে। ফলের মাছি পাকা ফল নষ্ট করে, ফল ছিদ্রকারী পোকা শাঁস, কখনো বিচিও খেয়ে ফেলে। লাক্ষা পোকা কচি পাতা খায়, সাদা মাছিও কখনো বড় সমস্যা হয়ে ওঠে। পাউডারি মিলডিউ ও ফল পচা রোগ ফসলের ক্ষতি করে; আর শুটি মোল্ড বা ঝুলমাটি রোগ পাতা কালো করে সালোকসংশ্লেষণে বাধা দেয়, যা বরই বাগানে বড় সমস্যা হয়ে উঠেছে বলে নিবন্ধে উল্লেখ আছে। দমনের উপায় ও মাত্রা ওষুধ এবং ফসলের অবস্থাভেদে আলাদা, তাই চাষিদের উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার পরামর্শ মেনে চলা উচিত।
তাসলিমা বেগমের বাঁশ ও জালের বেড়া আরেকটি বিপদ ঠেকায়: পাকার সময় পাখি ও প্রাণী ফল খেয়ে ফেলে। অন্য এলাকার চাষিরা আরেক ক্ষতির কথাও বলেছেন। ২০১৭ সালে দ্য ডেইলি স্টার জানায়, যশোরের শার্শার বাগানমালিকদের ভাষ্য, অনেক বরই আগেভাগে গাছ থেকে ঝরে নষ্ট হয়, আর তা ঠেকানোর ভালো পরামর্শ তারা পাননি।
পুষ্টিগুণ ও ব্যবহার
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টি ও খাদ্যবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ন্যাশনাল ফুড পলিসি ক্যাপাসিটি স্ট্রেংদেনিং প্রোগ্রামের সহায়তায় ২০১৩ সালে বাংলাদেশের খাদ্য উপাদান সারণি (ফুড কম্পোজিশন টেবিল ফর বাংলাদেশ) প্রকাশ করে। এতে কাঁচা বরইয়ের প্রতি ১০০ গ্রাম খাওয়ার উপযোগী অংশে যা আছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে:
- শক্তি: ৬০ কিলোক্যালরি
- পানি: ৮৪.৩ গ্রাম
- আমিষ: ১.৯ গ্রাম
- চর্বি: ০.২ গ্রাম
- শর্করা: ১২.৬ গ্রাম
- পটাশিয়াম: ৩৫৪ মিলিগ্রাম
- ক্যালসিয়াম: ১৪ মিলিগ্রাম
- লৌহ: ০.৮ মিলিগ্রাম
- ভিটামিন সি: ৬৬.১ মিলিগ্রাম
একই সারণিতে বরইয়ের খাওয়ার উপযোগী অংশের সহগ ধরা হয়েছে ০.৮৫, অর্থাৎ কেনা বরইয়ের ওজনের ৮৫ শতাংশ খাওয়া যায়, বাকিটা বিচি। বাংলাপিডিয়া জানায়, বরই টাটকা খাওয়া হয়, আবার জ্যাম, জেলি, চাটনি, আচার ও জুসও তৈরি হয়; বরইগাছে লাক্ষা পোকার মাধ্যমে লাক্ষাও উৎপাদিত হয়।
বাংলাপিডিয়া জানায়, সাধারণত মার্চের শেষ নাগাদ বরই তোলা শেষ হয়, এরপর পরের মৌসুমের জন্য গাছ ছাঁটা হয়। ২০২৬ সালের জানুয়ারির মাঝামাঝি তাসলিমা বেগম জানান, তার বাগানের বরই কেজিপ্রতি ২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছিল, যা আগের বছরগুলোতে অন্য জেলার চাষিদের জানানো দামের চেয়ে অনেক বেশি।
অন্য জেলার বরই চাষের আগের খবর
বছরের পর বছর ধরে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়া একটি ফসলে পটুয়াখালী ছিল নতুন সংযোজন। পটুয়াখালীর খবরের আগে অন্য জেলা থেকে প্রকাশিত প্রতিবেদনেও একই চিত্র দেখা যায়: ছোট জমি, দ্রুত আয়, আর প্রথম চাষির দেখাদেখি প্রতিবেশীদের এগিয়ে আসা।
- যশোর, মার্চ ২০১৭: দ্য ডেইলি স্টার জানায়, শার্শা উপজেলায় বরই বাগান বাড়ছে; বাগান করার চার মাসের মধ্যেই প্রথম ফল তোলা যায়। এক বাগানমালিক বলেন, তখন কেজিপ্রতি দাম ছিল প্রায় ৫০ টাকা, আর বিঘাপ্রতি চাষের খরচ প্রায় ৩০ হাজার টাকা।
- সাতক্ষীরা, ফেব্রুয়ারি ২০১৯: প্রথম আলো জানায়, জেলার ডিএইর হিসাবে সাত উপজেলায় প্রায় ৬২০ হেক্টর জমিতে বরই চাষ হয়, জনপ্রিয় জাতের মধ্যে বাউকুল, আপেল কুল ও নারকেল কুল; জেলা শহরে কেজিপ্রতি দাম ছিল ১০০ থেকে ১৫০ টাকা, আর ডিএই কর্মকর্তারা জানান, ডেনমার্ক ও মধ্যপ্রাচ্যে বরই রপ্তানির জন্য রপ্তানিকারকদের সঙ্গে আলোচনা চলছে।
- ফরিদপুর, ফেব্রুয়ারি ২০২০: দ্য ডেইলি স্টার জানায়, ফরিদপুর সদরের হাট গোবিন্দপুর গ্রামে সাত বিঘা জমিতে এক কৃষকের কাশ্মীরি আপেল কুলের প্রথম ফলন বাগান থেকেই ক্রেতাদের কাছে কেজিপ্রতি ৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছিল।
- রাঙামাটি, ফেব্রুয়ারি ২০২১: দ্য ডেইলি স্টার জানায়, স্থানীয় বাজারে কেজিপ্রতি বরই বিক্রি হচ্ছিল ১২০ থেকে ১৫০ টাকায়, আর ডিএই জেলায় ৭৬০ হেক্টর জমিতে বরই চাষ করেছে, উৎপাদনের লক্ষ্য ৭ হাজার ৬০০ টন।
- কুমিল্লা, জানুয়ারি ২০২৬: ইউএনবি জানায়, বরুড়া উপজেলার শিকারপুর গ্রামে চার বছর আগে একজন অগ্রণী চাষির হাত ধরে বরই চাষ শুরু হয়; ডিএইর এক উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা বলেন, তখন গ্রামে ২০ একর জমিতে বরই চাষ হচ্ছিল এবং তা আশপাশের গ্রামে ছড়িয়ে পড়ছিল।
শিকারপুরে প্রথম চাষির সাফল্য দেখে যেমন অন্য কৃষকেরা এগিয়ে এসেছিলেন বলে ডিএই কর্মকর্তা জানান, পটুয়াখালীর প্রতিবেদনেও তেমনি তাসলিমা বেগমের বাগান দেখে প্রতিবেশীদের বরই লাগানোর কথা এসেছে; আর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা জানিয়েছেন, কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করে বরই চাষ আরও সম্প্রসারণের পরিকল্পনা নিয়েছে কৃষি অফিস।

ছবি: তানভীর রাহাত / উইকিমিডিয়া কমন্স (সিসি বাই-এসএ ৪.০)
সূত্র: জাগো নিউজ, বাংলাপিডিয়া (বরই; পটুয়াখালী জেলা; পটুয়াখালী সদর উপজেলা), বাংলাদেশের খাদ্য উপাদান সারণি (পুষ্টি ও খাদ্যবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ২০১৩), দ্য ডেইলি স্টার, প্রথম আলো, ইউএনবি





মন্তব্য
(০)