২০২৬ সালের এপ্রিলের শেষ দিকে ঢাকার পশ্চিমের জেলা মানিকগঞ্জের মিষ্টি কুমড়া চাষিরা জানান, বাজারে দাম তুলনামূলক ভালো থাকলেও ফলন অনেক কমে যাওয়ায় তাঁরা লোকসানের মুখে পড়েছেন। ২০২৬ সালের ২৯ এপ্রিল প্রকাশিত জাগো নিউজের প্রতিবেদনে ঘিওর উপজেলার কৃষকেরা বলেন, যে কুমড়া তাঁরা ঘরে তুলতে পারেননি, বাড়তি দাম দিয়ে সেই ক্ষতি পোষানো যাচ্ছে না। তবে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) জেলা কার্যালয়ের বক্তব্য ছিল ভিন্ন: তাদের দাবি, সার্বিকভাবে জেলায় ফলন ও দাম দুটোই ভালো হওয়ায় সে মৌসুমে মিষ্টি কুমড়া চাষিরা লাভবান হচ্ছেন।
প্রতিবেদনটি দুটি চিত্র পাশাপাশি তুলে ধরে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের হিসাবে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মানিকগঞ্জে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি জমিতে মিষ্টি কুমড়া আবাদ হয়েছে এবং উৎপাদনও লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়েছে। অন্যদিকে ঘিওরের মাঠে কৃষকেরা বলেন, ফলন আগের বছরের প্রায় অর্ধেকে নেমেছে, পরিপক্ব হওয়ার আগেই কুমড়া পচে যাচ্ছে, আর খরচ উঠবে কি না তা নিয়ে তাঁরা দুশ্চিন্তায়। তাঁদের কয়েকজন জানান, একই শীত মৌসুমের শুরুতে আলু চাষেও তাঁরা লোকসান গুনেছেন।
ঘিওরের কৃষকেরা বলছেন, ফলন অর্ধেকে নেমেছে
প্রতিবেদন অনুযায়ী, সিংগাইর উপজেলায় ফলন ভালো হলেও এ বছর ঘিওর উপজেলার চাষিদের অবস্থা খারাপ। লাভের আশায় মিষ্টি কুমড়া আবাদ করে এখন তাঁরা কেবল খরচটুকু তোলার চেষ্টা করছেন। কৃষকদের ভাষ্যে, আগের বছর যে জমিতে বিঘাপ্রতি ৩ থেকে ৪ টন ফলন হয়েছিল, এবার সেখানে হয়েছে ১ থেকে ২ টন, অর্থাৎ আগের বছরের অর্ধেক। সঙ্গে আছে নানা রোগবালাই ও পোকামাকড়ের আক্রমণ। পরিপক্ব হওয়ার আগেই খেতে কুমড়া পচে যাচ্ছে, যা কৃষকদের ভাষায় তাঁদের লোকসান আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
ঘিওর উপজেলার পুরাতন ঘিওরের মো. পাপ্পু মিয়া জাগো নিউজকে বলেন, 'আমরা প্রতি বছর ৫ বিঘা জমিতে মিষ্টি কুমড়া আবাদ করি। গত বছর দাম কম থাকলেও ফলন হয়েছিল বেশ ভালো। তাই কিছু টাকা লাভ হয়েছিল। এ বছর তো কুমড়ার দাম ভালো কিন্তু ফলন একেবারেই নেই বললেই চলে। গত বছর যে জমিতে বিঘাপ্রতি ৩ থেকে ৪ টন কুমড়া হয়েছে, এ বছর ওই জমিতে বিঘাপ্রতি হয়েছে ১ থেকে ২ টন।'
একই এলাকার সাইফুদ্দিন মিয়া জানান, এ বছর বিঘাপ্রতি চাষাবাদে তাঁর খরচ হয়েছে ৩০ হাজার টাকা, এর ওপর আছে শ্রমিকের মজুরি। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, 'যে ফলন হয়েছে, আমাদের খরচ উঠবে কি না সেই চিন্তায় আছি। এর মধ্যে আবার কুমড়া পাকার আগেই পচন ধরছে। এ বছর অনেক টাকার ক্ষতি হয়ে যাবে। আলু চাষ করেও আমাদের অনেক লোকসান গুনতে হয়েছে।'
১৪ বছর ধরে মিষ্টি কুমড়া চাষ করছেন বলে জানান ইসমাইল হোসেন। তাঁর অভিজ্ঞতায় এমন মৌসুম এই প্রথম। তিনি বলেন, 'আমাদের প্রধান কাজ কৃষিকাজ। কিন্তু এ বছর আলু চাষ করেও ধরা খেয়েছি। আবার মিষ্টি কুমড়া চাষ করেও ধরা খেলাম। আমি মিষ্টি কুমড়ার আবাদ করি গত ১৪ বছর ধরে। এমন কখনো হয় নাই। গাছ বড় হয়েছে কিন্তু কুমড়ার ফলন কম। এই বছর আমরা প্রথম দেখলাম।'
কৃষকেরা যে রোগবালাই ও পচনের কথা বলেছেন, তার বাইরে ফলন কমার নির্দিষ্ট কোনো কারণ তাঁরা উল্লেখ করেননি, প্রতিবেদনেও কোনো একক কারণ চিহ্নিত করা হয়নি। ফলনের এই হিসাব কৃষকদের নিজেদের জমির অভিজ্ঞতা; পুরো ঘিওর উপজেলার মাপা ফলনের কোনো হিসাব প্রতিবেদনে ছিল না।
কৃষি বিভাগ যা বলেছে
মানিকগঞ্জ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, জেলার সাতটি উপজেলাতেই কমবেশি মিষ্টি কুমড়ার আবাদ হয়; সবচেয়ে বেশি আবাদ করেন সিংগাইর, মানিকগঞ্জ সদর ও ঘিওর উপজেলার চাষিরা। প্রতিবেদনে উল্লেখিত দপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে জেলায় ৭৩৭ হেক্টর জমিতে মিষ্টি কুমড়ার চাষ হয়েছিল, উৎপাদন হয়েছিল ২১ হাজার ২৮৬ মেট্রিক টন। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে আবাদের লক্ষ্যমাত্রা আবারও ৭৩৭ হেক্টর ধরা হয়েছিল; প্রকৃত আবাদ তা ছাড়িয়ে হয় ৮০৯ হেক্টর। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২১ হাজার ২৮৫ মেট্রিক টন, আর দপ্তরের হিসাবে সে মৌসুমে উৎপাদন হয়েছে ২৩ হাজার ৬৮৪ মেট্রিক টন, যা লক্ষ্যমাত্রার বেশি।
কৃষকদের অভিযোগকে খুব বড় করে দেখেননি মানিকগঞ্জ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক শাহজাহান সিরাজ। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, 'হয়তো এক-দুজন কৃষকের ফসল কম হতে পারে। কিন্তু সার্বিক বিষয় বলতে গেলে, এ বছর ভালো ফলন ও দাম ভালো পাওয়ায় কৃষকেরা লাভবান হচ্ছেন।'
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের এই হিসাব সাতটি উপজেলা মিলিয়ে গোটা জেলার। প্রতিবেদনে যে কৃষকেরা লোকসানের কথা বলেছেন, তাঁরা সবাই ঘিওরের; আর একই প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে, জেলার আরেক প্রধান কুমড়া-এলাকা সিংগাইরে ফলন ভালো হয়েছে।
মানিকগঞ্জের মাঠে যেসব জাত
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তালিকায় মানিকগঞ্জের চাষিদের আবাদ করা মিষ্টি কুমড়ার ১৩টি জাতের নাম রয়েছে। এগুলোর বেশির ভাগই বাণিজ্যিক নামে বিক্রি হওয়া বীজ; এর মধ্যে বারোমাসি জাতটিকে বাংলাদেশের জাতীয় জ্ঞানকোষ বাংলাপিডিয়াও বিক্রমপুরীর সঙ্গে স্থানীয় জাত হিসেবে উল্লেখ করেছে। জেলা কার্যালয়ের দেওয়া জাতগুলো হলো:
- বেঙ্গল ১ ও বেঙ্গল ২
- ব্ল্যাক স্টোন
- সুইটি
- কল্যাণী
- রঙিলা
- থাইল্যান্ড ১ ও থাইল্যান্ড ২
- সুইট লেডি
- সুইট স্পট
- হাজারি
- সুপ্রিয়া
- বারোমাসি
ভালো ফলন বলতে কী বোঝায়, তার একটা ধারণা পাওয়া যায় বাংলাপিডিয়ায়: সেখানে বাংলাদেশে মিষ্টি কুমড়ার গড় ফলন হেক্টরপ্রতি ২০ থেকে ২৫ টন বলা হয়েছে। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বারি) খামারভিত্তিক গবেষণা বিভাগ ২০১৫-২০১৬ সালে রংপুরের মিঠাপুকুরের সালাইপুরে কৃষকের জমিতে একটি পরীক্ষা চালায়, যার ফল ২০১৯ সালে প্রোগ্রেসিভ অ্যাগ্রিকালচার সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়। তাতে কৃষকের প্রচলিত পদ্ধতিতে ফলন হয় হেক্টরপ্রতি ২১.৪৩ টন, আর ফেরোমন ফাঁদ, বিষটোপ ও খেত পরিষ্কার রাখার সমন্বয়ে মাছি পোকা দমন করা জমিতে হয় ২৫.৮৬ টন। স্থানীয় এককে, ২০২৬ সালের মার্চে রংপুর অঞ্চলের কৃষকেরা দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, সেখানে ভালো ফলনে বিঘাপ্রতি ৬০ থেকে ৮০ মণ কুমড়া পাওয়া যায়।
মানিকগঞ্জ, ঘিওর ও সিংগাইর
বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী, মানিকগঞ্জ ঢাকা বিভাগের একটি জেলা, আয়তন ১ হাজার ৩৮৩.৬৬ বর্গকিলোমিটার। এর উত্তরে টাঙ্গাইল, দক্ষিণে ফরিদপুর ও ঢাকা, পূর্বে ঢাকা এবং পশ্চিমে পাবনা, রাজবাড়ী ও সিরাজগঞ্জ জেলা। পদ্মা, যমুনা, ধলেশ্বরী, ইছামতি, কালীগঙ্গা ও গাজীখালী নদী জেলার ভেতর দিয়ে বা সীমানা ঘেঁষে বয়ে গেছে। মানিকগঞ্জ ১৮৪৫ সালে মহকুমা এবং ১৯৮৪ সালে জেলা হয়। ২০১১ সালের আদমশুমারিতে জেলার জনসংখ্যা ছিল ১৩ লাখ ৯২ হাজার ৮৬৭। বাংলাপিডিয়ার শুমারিভিত্তিক হিসাবে জেলার ৫৬.১৫ শতাংশ পরিবারের আয়ের প্রধান উৎস কৃষি, যেখানে ব্যবসা-বাণিজ্যের হার ১৪.০৩ শতাংশ।
প্রতিবেদনের কৃষকেরা যে ঘিওরের বাসিন্দা, সেটি জেলার ছোট উপজেলাগুলোর একটি: আয়তন ১৪৮.৯২ বর্গকিলোমিটার, ইউনিয়ন সাতটি, ২০১১ সালে জনসংখ্যা ছিল ১ লাখ ৪৬ হাজার ২৯২। ধলেশ্বরী, কালীগঙ্গা, ইছামতি ও গাংডুবি নদী উপজেলার ভেতর দিয়ে বয়ে গেছে; বৈরাগীর বিল এখানকার উল্লেখযোগ্য জলাভূমি। বাংলাপিডিয়ায় ঘিওরের প্রধান ফসল হিসেবে ধান, গম, সরিষা, আলু, পেঁয়াজ, রসুন, মরিচ ও শাকসবজির নাম আছে, আর রপ্তানিযোগ্য পণ্য হিসেবে পেঁয়াজ, রসুন, মরিচ ও শাকসবজি। উপজেলায় ২৪টি হাটবাজার রয়েছে, এর মধ্যে ঘিওর হাট সবচেয়ে পরিচিত।
প্রতিবেদনে যে সিংগাইরে ফলন ভালো হওয়ার কথা বলা হয়েছে, সেটি জেলার পূর্ব দিকে, ঢাকা জেলার সাভার ও কেরানীগঞ্জ উপজেলার সীমানাঘেঁষা। এর আয়তন ২১৭.৫৫ বর্গকিলোমিটার, ইউনিয়ন ১১টি, ২০১১ সালে জনসংখ্যা ছিল ২ লাখ ৮৭ হাজার ৪৫১। এখানকার নদী ধলেশ্বরী, গাজীখালী ও কালীগঙ্গা। বাংলাপিডিয়ার তালিকায় সিংগাইরের প্রধান ফসলের মধ্যে আছে ধান, গম, পাট, আখ, আলু, ডাল, তেলবীজ ও শাকসবজি; আর অন্য এলাকায় পাঠানো পণ্যের মধ্যে শাকসবজি, আলু, পেঁপে ও পেয়ারা। সিংগাইরে হাটবাজার আছে ৩১টি।

আলুর পর দ্বিতীয় ধাক্কা
প্রতিবেদনে উদ্ধৃত দুজন কৃষক জানান, কুমড়ার এই বিপদ এসেছে আলুর লোকসানের পর। একই উপজেলা থেকে মৌসুমের শুরুতে প্রকাশিত খবরের সঙ্গে তাঁদের কথার মিল আছে। ২০২৬ সালের ১২ মার্চ দৈনিক ইনকিলাবের ঘিওর প্রতিনিধি জানান, আলুর ভালো ফলনের পর স্থানীয় হাটবাজারে দাম নেমে এসেছে কেজিপ্রতি ৯ থেকে ১০ টাকায়, অথচ কৃষকদের হিসাবে কেজিপ্রতি উৎপাদন খরচ গড়ে ১৫ থেকে ২০ টাকা। এক কৃষক পত্রিকাটিকে বলেন, ৪ বিঘা জমিতে আলু চাষে তাঁর খরচ হয়েছে ৪৮ হাজার টাকা, অথচ তখন পর্যন্ত বিক্রি করতে পেরেছেন ১৮ হাজার টাকার আলু। উপজেলা কৃষি অফিসের তথ্য অনুযায়ী, ঘিওরের সাতটি ইউনিয়নে ৫০৬ হেক্টর জমিতে আলুর আবাদ হয়েছিল।
ঘিওরের উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা তাহমিনা খাতুন ইনকিলাবকে বলেন, ঘিওরের আলু সাধারণত অন্য জেলায় যায়, কিন্তু সে মৌসুমে দাম কম থাকায় কৃষকেরা বড় ক্ষতির মুখে পড়েছেন। ভবিষ্যতে ঝুঁকি কমাতে কৃষকদের বিকল্প ফসল চাষের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
আলুর দরপতন শুধু ঘিওরে সীমাবদ্ধ ছিল না, এটি ছিল দেশজুড়ে। ২০২৫ সালের অক্টোবরে দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের বরাতে জানায়, ২০২৪-২৫ মৌসুমে ৪ লাখ ৬৭ হাজার হেক্টরের লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে ৫ লাখ ২৪ হাজার হেক্টর জমিতে প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ টন আলু উৎপাদিত হয়। কৃষি মন্ত্রণালয় ২০২৫ সালের ২৭ আগস্ট হিমাগার ফটকে আলুর ন্যূনতম দাম কেজিপ্রতি ২২ টাকা নির্ধারণ করলেও কৃষকেরা জানান, সেখানে আলু বিক্রি হচ্ছিল ৯ থেকে ১০ টাকায়। কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের হিসাবে এক কেজি আলু উৎপাদনে খরচ ১৪ থেকে ১৭ টাকা। বাংলাদেশ কোল্ড স্টোরেজ অ্যাসোসিয়েশনের হিসাবে দেশে বছরে আলুর চাহিদা ৯০ লাখ টন, আর হিমাগারের ধারণক্ষমতা ৪৫ লাখ টন।
দেশের অন্য এলাকায় কুমড়ার দাম
মানিকগঞ্জের প্রতিবেদনের আগে প্রকাশিত খবরগুলো দেখায়, মৌসুম ও জেলাভেদে মিষ্টি কুমড়ার দাম কতটা ওঠানামা করে। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে, অর্থাৎ যে মৌসুমে মানিকগঞ্জে দাম কম ছিল বলে পাপ্পু মিয়া জানিয়েছেন, দ্য ডেইলি স্টার চাঁদপুর থেকে জানায়, হাজীগঞ্জসহ কয়েকটি উপজেলায় আগের বছরের প্রায় দ্বিগুণ জমিতে কুমড়ার আবাদ হয়েছে। অন্য অঞ্চল থেকে পাইকার কম আসায় কোনো কোনো কৃষক গোখাদ্য হিসেবে কেজিপ্রতি ৮ টাকায় কুমড়া বিক্রি করছিলেন। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ কার্যালয়ের হিসাবে চাঁদপুরে কুমড়ার আবাদ হয়েছিল ১ হাজার ১৩৫ হেক্টরে, উৎপাদন ২৪ হাজার ৯৭১ টন।
এক বছর পর চিত্র ছিল মিশ্র। ২০২৬ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা বাসস নেত্রকোণার হাওর উপজেলাগুলো থেকে জানায়, রংপুর ও কিশোরগঞ্জের পাইকারেরা খেত থেকেই কেজিপ্রতি ২২ থেকে ২৫ টাকায় কুমড়া কিনছেন, আর খালিয়াজুরির এক কৃষক বলেন, দাম আগের বছরের চেয়ে বেশি। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের হিসাবে ২০২৪-২৫ মৌসুমে নেত্রকোণায় কুমড়ার আবাদ ছিল ৭২৯ হেক্টরে, ২০২৫-২৬ মৌসুমে ৭৩৬ হেক্টরে, যার ৩৭০ হেক্টর হাওর এলাকায়। দপ্তরটি জানায়, তারা কৃষকদের বীজ দিয়েছে, ফেরোমন ও হলুদ ফাঁদের প্রদর্শনী করেছে এবং নিয়মিত কারিগরি পরামর্শ দিয়েছে।
বিপরীতে রংপুর অঞ্চলের চরে দাম পড়ে যাওয়ার খবর দেয় দ্য ডেইলি স্টার, ২০২৬ সালের ৭ মার্চ। লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, নীলফামারী, রংপুর ও গাইবান্ধায় প্রায় ১১ হাজার হেক্টর জমিতে মিষ্টি কুমড়ার আবাদ হয়, যার ৯২ শতাংশই চরে; উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২ লাখ ৪০ হাজার টন। কৃষকেরা জানান, আগের বছর যে কুমড়া মণপ্রতি ৫০০ থেকে ৭০০ টাকায় বিক্রি হয়েছিল, তা তখন বিক্রি হচ্ছিল ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকায়; বিঘাপ্রতি চাষের খরচ ১৬ থেকে ২০ হাজার টাকা। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের রংপুর আঞ্চলিক কার্যালয়ের অতিরিক্ত পরিচালক সিরাজুল ইসলাম বলেন, উৎপাদন বাড়ায় বাজারে সরবরাহ বেড়েছে, আর আলুর দাম কম থাকাও কুমড়ার দাম কমার একটি কারণ।
ভালো বছরে এই ফসল লাভও দেয়। ২০২৪ সালের মার্চে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম ফরিদপুর সদরের পদ্মার চর থেকে জানায়, সেখানে প্রায় ৮৫০ হেক্টর চরের জমিতে কুমড়ার আবাদ হয়েছে এবং খেত থেকেই কেজিপ্রতি ১৫ থেকে ২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। সেখানকার এক কৃষক জানান, বিঘাপ্রতি (প্রতিবেদনের হিসাবে ৩৩ শতাংশ) তাঁর খরচ ১২ থেকে ১৫ হাজার টাকা, আর বিক্রি ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা। দেশের নানা প্রান্ত থেকে পাইকারেরা এসে খেত থেকেই কুমড়া কিনে নেন বলে জানান তিনি।

মিষ্টি কুমড়া কী, কীভাবে হয়
মিষ্টি কুমড়া লাউ-কুমড়া গোত্রের (কিউকারবিটেসি) সবজি; এই গোত্রে লাউ, চালকুমড়া, করলা, চিচিঙ্গা ও ধুন্দুলও রয়েছে। বাংলাপিডিয়ার বর্ণনায়, এর আদি নিবাস আমেরিকা মহাদেশ, আর বাংলাদেশে এটি গ্রীষ্ম ও বর্ষার জনপ্রিয় সবজি। সরাসরি বীজ বোনা যায়, আবার দুই সপ্তাহ বয়সী চারাও রোপণ করা যায়; বীজ বোনার প্রায় ৯০ দিন পর পুরোপুরি পাকা ফল তোলা হয়। ২০২৪ সালে ফরিদপুরের এক কৃষক বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, তিন থেকে সাড়ে তিন মাসেই কুমড়া বিক্রির উপযোগী হয়। বাংলাপিডিয়ার হিসাবে দেশে প্রায় ১৪ হাজার হেক্টর জমিতে এর চাষ হয়। পাতা, ডগা, ফুল ও ফল সবই খাওয়া হয়; ফল দিয়ে তরকারি ও মিষ্টান্ন তৈরি হয়, আর আস্ত পাকা কুমড়া শুকনো জায়গায় কয়েক মাস রেখে দেওয়া যায়। জ্ঞানকোষটির ভাষায়, মিষ্টি কুমড়া শর্করা, ভিটামিন এ ও সি এবং খনিজের ভালো উৎস।
কুমড়াগাছের একই গাছে পুরুষ ও স্ত্রী ফুল আলাদা আলাদা ফোটে, তাই পোকামাকড় এক ফুলের পরাগ অন্য ফুলে বয়ে নিলে তবেই ফল ধরে। উদ্ভিদবিজ্ঞানের তথ্যসূত্রে বলা হয়েছে, স্ত্রী ফুলের গর্ভমুণ্ডে যত বেশি পরাগ পৌঁছায়, তত বেশি বীজ হয়, ফল তত বড় হয় এবং ফল পরিপক্ব হওয়ার সম্ভাবনাও তত বাড়ে। গ্রীষ্মমণ্ডলের অনেক কুমড়া যে প্রজাতির অন্তর্ভুক্ত, সেই কিউকারবিটা মসকাটা সাধারণত অন্যান্য চাষযোগ্য স্কোয়াশের চেয়ে গরম ও আর্দ্র আবহাওয়া বেশি সহ্য করতে পারে।
এই ফসলের শত্রুও অনেক। কুমড়াসহ লাউ-কুমড়া গোত্রের ফসল ব্যাকটেরিয়াজনিত ঢলে পড়া, অ্যানথ্রাকনোজ, ফিউজেরিয়াম উইল্ট, ফাইটোফথোরা ব্লাইট ও পাউডারি মিলডিউ রোগে আক্রান্ত হয়; কিউকাম্বার মোজাইক ও স্কোয়াশ মোজাইকের মতো ভাইরাসও সাধারণ। ক্ষতিকর পোকার মধ্যে আছে জাবপোকা, মাকড়, সাদা মাছি ও লাল কুমড়া পোকা (রেড পাম্পকিন বিটল)।

মাছি পোকা এবং পাকার আগেই নষ্ট হওয়া ফল
কুমড়াসহ লাউ-কুমড়া গোত্রের কচি ফলের ভেতরে ক্ষতির একটি সুপরিচিত কারণ মেলন ফ্লাই বা কুমড়ার মাছি পোকা (Bactrocera বা Zeugodacus cucurbitae)। ভারতীয় উপমহাদেশের স্থানীয় এই মাছি অন্তত ১২৫ ধরনের পোষক উদ্ভিদে আক্রমণ করে, যার মধ্যে কুমড়া ও স্কোয়াশও রয়েছে। স্ত্রী মাছি ধারালো ডিম্বাধার দিয়ে কচি ফল ফুটো করে ২ থেকে ৪ মিলিমিটার গভীরে ডিম পাড়ে, আর কীড়া ফলের ভেতরে খেয়ে বড় হয়। ডিম থেকে পূর্ণাঙ্গ মাছি হতে লাগে ১২ থেকে ২৮ দিন, ফলে বছরে ৮ থেকে ১০টি প্রজন্ম হতে পারে; কীড়া মাটিতে গিয়ে পিউপায় পরিণত হয়। তবে ঘিওরে পচনের পেছনে কোন রোগ বা পোকা দায়ী, তা প্রতিবেদনে বলা হয়নি।
ভারী কীটনাশক ছাড়াই এই মাছি দমনের উপায় নিয়ে বাংলাদেশে গবেষণা হয়েছে। রংপুরের মিঠাপুকুরে বারির পরীক্ষাটি ২০১৫-২০১৬ সালে ছয় কৃষকের মোট ৭ হাজার ২০০ বর্গমিটার জমিতে চালানো হয়। সেখানে সেক্স ফেরোমন ফাঁদ, বিষটোপ ও খেত পরিচ্ছন্নতার সমন্বয়ে সর্বোচ্চ ফলন হয় হেক্টরপ্রতি ২৫.৮৬ টন, কৃষকের প্রচলিত পদ্ধতিতে ২১.৪৩ টন; হেক্টরপ্রতি মোট মুনাফা দাঁড়ায় ৯৬ হাজার ৩৭৫ টাকা, আয়-ব্যয়ের অনুপাত ৩.৯২। গবেষকেরা সিদ্ধান্তে পৌঁছান, এই পদ্ধতি নিরাপদে ও লাভজনকভাবে পোকা দমনে কৃষককে সাহায্য করতে পারে। মেলন ফ্লাই দমনের প্রচলিত উপায়ের মধ্যে আরও আছে বাড়ন্ত ফল ঢেকে রাখা, আক্রান্ত ফল নষ্ট করে ফেলা এবং ফসল তোলার পর খেতের অবশিষ্টাংশ সরিয়ে ফেলা।
২০২৬ সালে নেত্রকোণার কুমড়াচাষিদের যে সহায়তা দেওয়ার কথা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জানিয়েছে, তার মধ্যে ফেরোমন ও হলুদ ফাঁদও ছিল। খেতে ফল পচা বা অন্য কোনো রোগ দেখা দিলে কৃষকের উচিত উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা বা উপজেলা কৃষি অফিসের পরামর্শ নেওয়া, যাঁরা কারণ শনাক্ত করে প্রতিকার বাতলে দিতে পারেন।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর
প্রতিবেদনে জেলার হিসাব দিয়েছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মানিকগঞ্জ কার্যালয়। অধিদপ্তরটি বাংলাদেশে কৃষি সম্প্রসারণের দায়িত্বপ্রাপ্ত সরকারি সংস্থা, কাজ করে কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীনে। ১৯৮২ সালে কৃষি পরিদপ্তর (সম্প্রসারণ ও ব্যবস্থাপনা), পাট পরিদপ্তর, উদ্ভিদ সংরক্ষণ পরিদপ্তর, হর্টিকালচার বোর্ড, তামাক উন্নয়ন বোর্ড এবং কেন্দ্রীয় সম্প্রসারণ সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউট একীভূত করে এটি গঠিত হয়। ১৯৯০ সাল পর্যন্ত অধিদপ্তর 'ট্রেনিং অ্যান্ড ভিজিট' পদ্ধতিতে কৃষকদের প্রশিক্ষণ দিত, পরে দলভিত্তিক প্রশিক্ষণে যায়; ১৯৯৬ সাল থেকে নতুন কৃষি সম্প্রসারণ নীতি এর কাজের দিকনির্দেশনা দিচ্ছে। প্রতিবেদনের সময় মানিকগঞ্জ কার্যালয়ের প্রধান ছিলেন উপপরিচালক শাহজাহান সিরাজ, আর এই কার্যালয়ের লক্ষ্যমাত্রা, আবাদ ও উৎপাদনের হিসাবই ছিল ২০২৫-২৬ মৌসুমে কুমড়া চাষিদের লাভবান হওয়ার দাবির ভিত্তি।
ছবি: Hamimnrafi / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, দৈনিক ইনকিলাব, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, দ্য ডেইলি স্টার, বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস), বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম, বাংলাপিডিয়া, প্রোগ্রেসিভ অ্যাগ্রিকালচার (বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের গবেষণা), উইকিপিডিয়া





মন্তব্য
(০)