গ্রামের মেঠো পথে গরুর গাড়ি বা ঘোড়ার গাড়ি দেখা নতুন কিছু নয়। কিন্তু লালমনিরহাটের আদিতমারী উপজেলার দুর্গাপুর দিঘলটারী এলাকায় এলাকাবাসী দেখেছেন ছাগলে টানা গাড়ি। জাগো নিউজ ২৪-এর ২০২৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির প্রতিবেদন অনুযায়ী, এলাকার তরুণ খোরশেদ আলম নিজের দুটি পোষা ছাগল দিয়ে টানা একটি ছোট গাড়ি বানিয়েছেন, যাতে চড়ে তাঁর সন্তানেরা ঘুরে বেড়ায়। ১২ ফেব্রুয়ারি ভোটের দিনে রাস্তায় গাড়িটি দেখে অনেকে থমকে দাঁড়ান, আর বাহনটি এলাকায় আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে।
সন্তান আর পোষা ছাগল, দুটিকেই সঙ্গে নেওয়ার ভাবনা
খোরশেদ আলম কাজের ফাঁকে সন্তানদের সময় দিতে ভালোবাসেন। বাড়িতে তিনি দুটি ছাগল পোষেন, আদর করেন নিজের সন্তানের মতোই। সন্তানদের নিয়ে বেড়াতে বের হলে ছাগল দুটিকেও সঙ্গে নিতে ইচ্ছা করত, কিন্তু সেটা দেখতে বেমানান লাগত। তাই তিনি ভাবলেন, এমন কিছু বানানো যায় কি না, যাতে সন্তান আর ছাগল দুটিকেই একসঙ্গে নিয়ে ঘোরা যায়। সেই ভাবনা থেকেই নিজের বুদ্ধি খাটিয়ে তিনি গাড়িটি তৈরি করেন, যেখানে ইঞ্জিনের জায়গায় টানার কাজ করে তাঁর পোষা ছাগল।
আদিতমারী রংপুর বিভাগের লালমনিরহাট জেলার সবচেয়ে ছোট উপজেলা, আয়তন ১৯৫.০৩ বর্গকিলোমিটার। উপজেলার আটটি ইউনিয়নের একটি দুর্গাপুর।
গাড়িটি যেভাবে তৈরি ও চলে
গাড়িটি একটি হালকা কাঠামোর ওপর তৈরি, তাতে আছে দুটি ছোট যাত্রী আসন। সামনে ছাগল দুটিকে নিয়ন্ত্রণের জন্য রাখা হয়েছে আলাদা ব্যবস্থা। খোরশেদ আলম লাগাম ধরে থাকেন, আর পেছনের আসনে বসে তাঁর ছোট সন্তান ঘোড়ার গাড়ির মতো একটি ছোট লাঠি হাতে ছাগলদের নির্দেশনা দেয়।
খোরশেদ আলম জাগো নিউজকে বলেন, ‘গাড়িটি এমনভাবে বানিয়েছি যেন ছাগলের কোনো শারীরিক কষ্ট না হয় বা কোথাও আঘাত না লাগে। ওদের ওপর যেন হালকা চাপ পড়ে সেভাবেই ব্যালেন্স করা হয়েছে। তাছাড়া ছাগলগুলোকে নিয়মিত রুটিন মেনে পুষ্টিকর খাবার খাওয়ানো হয়, যাতে ওদের শক্তি অটুট থাকে।’

ভোটের দিনে রাস্তায় কৌতূহলী মানুষ
১২ ফেব্রুয়ারি দেশজুড়ে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোটগ্রহণ হয়, সকাল সাড়ে ৭টা থেকে বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত। সেদিন দুর্গাপুর দিঘলটারীর রাস্তায় লোকজনের ভিড় ছিল স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি, আর ছাগলের গাড়ি দেখে অনেকেই দাঁড়িয়ে যান। স্থানীয় বাসিন্দা আলম বলেন, ‘বাংলাদেশে গরু বা মহিষ দিয়ে গাড়ি চালানো দেখেছি, কিন্তু ছাগল দিয়ে গাড়ি চালানো বা যাত্রী টানা, এটা আমার কাছে একেবারেই নতুন।’
প্রতিবেশী আল আমিন বলেন, ‘আজকে প্রথম এমন দৃশ্য দেখলাম। গাড়িটি যিনি বানিয়েছেন, তার চিন্তাধারা অন্যরকম।’ তাঁর মতে, এমন উদ্ভাবনী মানুষের কদর করা উচিত, যাতে তিনি ভবিষ্যতে আরও নতুন কিছু বানাতে পারেন।
রাস্তায় বের হলে মানুষ অবাক হয়ে তাকায়, কেউ ছবি তোলে, কেউ ভিডিও করে। তবে খোরশেদ আলমের কাছে বড় পাওয়া সন্তানদের আনন্দ। তিনি বলেন, ‘মানুষ দেখে অবাক হয়, তবে আমার ভালো লাগে। বাসায় বসে না থেকে বাচ্চাদের নিয়ে ঘুরতে পারি, ওরা আনন্দ পায়, এটাই আমার সার্থকতা।’

গ্রামের ঘরে ঘরে ছাগল, টানার কাজে ছোট প্রাণী
বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী, বাংলাদেশের ৯০ শতাংশের বেশি ছাগল পালন করেন গ্রামের মানুষ, আর বেশির ভাগ ছাগলের দেখাশোনা করেন নারী ও শিশুরা। দেশের মোট ছাগলের ৯০ শতাংশের বেশি ব্ল্যাক বেঙ্গল জাতের। আকারে ছোট এই ছাগল পালিত হয় মূলত মাংস ও চামড়ার জন্য; মাঠের আল, রাস্তার ধার আর বাঁধের ঘাস, ঝোপ ও গাছের পাতা খেয়েই বেশির ভাগ ছাগল বড় হয়।
বাংলাদেশে ছাগল সাধারণত গাড়ি টানার কাজে ব্যবহার হয় না। তবে গাড়ি টানায় ঘোড়া, গাধা, খচ্চর ও গরুর পাশাপাশি ছাগল ও বড় কুকুরের মতো ছোট প্রাণীও ব্যবহৃত হয়েছে। বিশ শতকের শুরুর দিকে যুক্তরাষ্ট্রে শিশুদের চড়ার জন্য ছাগলে টানা ছোট গাড়ির ছবিও পাওয়া যায়।

ছবি: freeparking / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY 2.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, ঢাকা ট্রিবিউন, বাংলাপিডিয়া, উইকিপিডিয়া




মন্তব্য
(০)