সরাসরিবাজারদর
আটা (প্যাকেটজাত)৫৮—আদা - আমদানিকৃত১৬৭—আদা - দেশী১৫৪—আমন চাল - মাঝারি৫৬—আমন চাল - মোটা৪৮—আমন চাল - সরু৭২—আয়োডিনযুক্ত লবণ (প্যাকেটজাত)৩২—কাঁচা মরিচ২১৮—খামারের মুরগী১৬২—খাসী৯০০—চিনি (দেশী)১৩২—ছোলা - গোটা৮৫—ডিম ফার্ম - লাল৪৭—পেঁয়াজ - দেশী৬০—বোরো চাল - মাঝারি৫৫—বোরো চাল - মোটা৪৭—বোরো চাল - সরু৬৬—মাংসঃ– গরু৭২৯—মুগ ডাল১২২—রসুন - আমদানিকৃত১৯২—রসুন - দেশী১৭৩—সয়াবিন তেল১৬৩—
হালনাগাদ ১৬ অক্টোবর ২০২৬
ঢাকা২৮°পরিষ্কার আকাশআর্দ্রতা ৬২%বাতাস ৫ কিমি/ঘ

ঈদুল আজহার পরদিন ঢাকার বাজারে সবজির সরবরাহ কম, দাম চড়া

২০২৬ সালের ২৯ মে, ঈদুল আজহার পরদিন, ঢাকার রামপুরা, মালিবাগ, খিলগাঁও ও বনশ্রীর বাজারে বেশির ভাগ দোকান বন্ধ থাকায় সবজির সরবরাহ ছিল কম; ঈদের আগের তুলনায় অনেক সবজির দাম কেজিতে ১০ থেকে ৩০ টাকা পর্যন্ত বেড়ে যায়।

ঈদুল আজহার পরদিন ঢাকার বাজারে সবজির সরবরাহ কম, দাম চড়া
শাকসবজি

২০২৬ সালের ২৯ মে, শুক্রবার, পবিত্র ঈদুল আজহার পরদিন রাজধানী ঢাকার কাঁচাবাজারগুলোতে সবজির সরবরাহ ছিল একেবারেই কম। রামপুরা, মালিবাগ, খিলগাঁও ও বনশ্রী এলাকার বাজারে বেশির ভাগ ব্যবসায়ী সেদিন দোকান খোলেননি, ফলে বাজারে সবজির পরিমাণও ছিল কম। জাগো নিউজের সেদিনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ঈদের আগের তুলনায় অনেক সবজির দাম কেজিতে ১০ থেকে ৩০ টাকা পর্যন্ত বেড়ে যায়।

মহল্লার ব্যবসায়ীরা সেদিন জানান, পাইকারি আড়তেও সবজির সরবরাহ কম ছিল এবং দাম ছিল বেশি। তাঁদের ভাষ্য, ঢাকায় সপ্তাহের সবচেয়ে বেশি সবজি বিক্রি হয় শুক্রবারে; কিন্তু দিনটি ঈদের ঠিক পরের দিন হওয়ায় আড়তে খুব কম মাল এসেছিল, আড়তের সব ব্যবসায়ীও উপস্থিত ছিলেন না। মাল কম আসায় পাইকারিতে বিভিন্ন সবজির দাম অনেক বেড়ে যায় বলে তাঁরা জানান, আর তার প্রভাব পড়ে খুচরা বাজারে।

ঈদের পরদিন ফাঁকা বাজার


জাগো নিউজের প্রতিবেদক সেদিন সকালে রামপুরা, মালিবাগ, খিলগাঁও ও বনশ্রীর বাজার ঘুরে দেখেন। মালিবাগের হাজীপাড়া বৌবাজারে গিয়ে দেখা যায়, বেশির ভাগ ব্যবসায়ী দোকান খোলেননি; অল্প কয়েকজন বিক্রেতা সবজি নিয়ে বসে ছিলেন। খিলগাঁওয়ের তালতলা বাজারেও একই চিত্র দেখা যায়। যাঁরা দোকান খুলেছিলেন, তাঁরাও সাধারণ শুক্রবারের তুলনায় কম পরিমাণ সবজি এনেছিলেন।

যে এলাকাগুলোর বাজারের কথা প্রতিবেদনে এসেছে, সেগুলো ঢাকার পূর্বাংশের ঘনবসতিপূর্ণ আবাসিক এলাকা। রামপুরা থানা ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের অধীন; ২০০৯ সালে গঠিত এই থানার আয়তন প্রায় ২ দশমিক ৮ বর্গকিলোমিটার, এর মধ্যে বনশ্রী আবাসিক এলাকার একাংশ এবং উত্তর সিটির ২২ ও ২৩ নম্বর ওয়ার্ড পড়েছে। ২০২২ সালের জনশুমারি অনুযায়ী রামপুরা থানার জনসংখ্যা ছিল ১ লাখ ৬০ হাজার ৮১২ জন। পাশের খিলগাঁও থানা ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের অধীন; ১৯৮৮ সালে গঠিত এই থানার আয়তন ১৪ দশমিক ৮৩ বর্গকিলোমিটার এবং ২০২২ সালের জনশুমারিতে এর জনসংখ্যা ছিল ৩ লাখ ৮০ হাজার ৭৪০ জন।

এসব মহল্লার খুচরা বিক্রেতারা সাধারণত রাজধানীর বড় পাইকারি বাজার ও আড়ত থেকে সবজি কিনে আনেন। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় কারওয়ান বাজার, যা তেজগাঁও থানায় ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের এলাকায় অবস্থিত এবং দেশের অন্যতম বড় পণ্য বাজার হিসেবে পরিচিত। ২০২৪ সালের হিসাবে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন সেখানে প্রায় ২৪ বিঘা জমিতে চারটি মার্কেট পরিচালনা করে, যেখানে ১ হাজার ৭৮৯টি স্থায়ী ও ১৮০টি অস্থায়ী দোকান রয়েছে। গ্রাম থেকে আসা সবজির ট্রাক এসব আড়তে নামে, সেখান থেকে ভ্যান ও ছোট গাড়িতে করে সবজি যায় মহল্লার বাজারে। ঈদের ছুটিতে এই শৃঙ্খলের প্রতিটি ধাপে লোকবল ও যানবাহন কমে যায়, যার প্রভাব সেদিনের বাজারে দেখা গেছে।

ঢাকার মিরপুর ১ নম্বরে রাস্তার ধারের একটি সবজির বাজার। ছবি: Hopeoflight / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
ঢাকার মিরপুর ১ নম্বরে রাস্তার ধারের একটি সবজির বাজার। ছবি: Hopeoflight / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)

কোন সবজির দাম কত ছিল


২৯ মে বাজারে প্রতি কেজি পাকা টমেটো বিক্রি হচ্ছিল ১০০ থেকে ১৩০ টাকায়, যা ঈদের আগে ছিল ৮০ থেকে ৯০ টাকা। বেগুন বিক্রি হচ্ছিল ৮০ থেকে ৯০ টাকা কেজি, ঈদের আগে যার দাম ছিল ৬০ থেকে ৭০ টাকা। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা ঈদের আগের ও পরের দাম নিচে দেওয়া হলো:

  • পাকা টমেটো: ঈদের আগে কেজি ৮০ থেকে ৯০ টাকা, ২৯ মে ১০০ থেকে ১৩০ টাকা
  • বেগুন: ঈদের আগে কেজি ৬০ থেকে ৭০ টাকা, ২৯ মে ৮০ থেকে ৯০ টাকা
  • করলা: ঈদের আগে কেজি ৫০ থেকে ৬০ টাকা, ২৯ মে ৮০ থেকে ৯০ টাকা
  • কাঁকরোল: ঈদের আগে কেজি ৬০ টাকার মধ্যে, ২৯ মে ৭০ থেকে ৯০ টাকা
  • ঢ্যাঁড়স: ঈদের আগে কেজি ৫০ থেকে ৬০ টাকা, ২৯ মে ৭০ থেকে ৮০ টাকা
  • কাঁচা মরিচ: ঈদের আগে পোয়া (২৫০ গ্রাম) ২০ টাকা, ২৯ মে পোয়া ৩০ থেকে ৪০ টাকা
  • শসা: ঈদের আগে কেজি ৩০ থেকে ৪০ টাকা, ২৯ মে ৬০ থেকে ৭০ টাকা; কোনো কোনো জায়গায় ১০০ টাকা পর্যন্ত

দাম বাড়ার এই তালিকায় সবচেয়ে চোখে পড়ার মতো ছিল শসা ও কাঁচা মরিচ। কাঁচা মরিচ ঢাকার মহল্লার বাজারে সাধারণত পোয়া হিসেবে বিক্রি হয়, তাই প্রতিবেদনে এর দামও পোয়ায় দেওয়া হয়েছে। এসব দাম রামপুরা, মালিবাগ, খিলগাঁও ও বনশ্রীর খুচরা বাজারে প্রতিবেদকের দেখা দাম; ঢাকার অন্য বাজারে বা পাইকারিতে দাম ভিন্ন থাকতে পারে।

ঢাকার মগবাজারের চারুলতা মার্কেটের কাঁচাবাজারে বিক্রির জন্য রাখা বেগুন; ২০১৮ সালের ছবি। ছবি: Salim_Khandoker / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)
ঢাকার মগবাজারের চারুলতা মার্কেটের কাঁচাবাজারে বিক্রির জন্য রাখা বেগুন; ২০১৮ সালের ছবি। ছবি: Salim_Khandoker / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)

বিক্রেতারা যা বলেছেন


রামপুরার সবজি বিক্রেতা কায়সার জাগো নিউজকে বলেন, ঈদের কারণে অনেক আড়ত বন্ধ ছিল এবং গ্রাম থেকে সবজিবাহী ট্রাকও অনেক কম এসেছিল। এ কারণে সবজির সরবরাহ কমে যায়, আড়তে অল্প সবজি আসে, তাই দামও একটু বেশি। তাঁর ধারণা ছিল, দু-এক দিন পর পরিস্থিতি আবার স্বাভাবিক হবে। তিনি জানান, বৃহস্পতিবার ঈদ গেছে; শুক্রবার না হলে তিনিও দোকান খুলতেন না। ঢাকার বেশির ভাগ মানুষ শুক্রবার বাজার করেন, তাই ঈদের পরের দিন হলেও কিছু বিক্রি হবে, এই আশায় তিনি সবজি নিয়ে এসেছিলেন।

ভ্যানে সবজি বিক্রি করা টিটু মিয়া বলেন, আড়তে সবকিছুর দাম বেড়ে গিয়েছিল, তাই খুচরাতেও সেদিন সবজির দাম একটু বেশি ছিল। তাঁর হিসাবে, ঈদের আগের তুলনায় প্রায় সব সবজির দাম কেজিতে ২০ টাকার মতো বেড়েছিল। তিনি জানান, সাত বছর ধরে তিনি ঢাকায় ব্যবসা করছেন এবং কোরবানির ঈদের পর কয়েক দিন সবজি বিক্রি খুব কম হয়। শুক্রবার বলে কিছু বিক্রির আশায় তিনি অল্প কিছু মাল এনেছিলেন; আড়তেও মাল কম এসেছিল বলে জানান তিনি।

আরেক সবজি বিক্রেতা মো. বকুল বলেন, ঈদের পর সবজির দাম একটু বেশি থাকবে, এটাই স্বাভাবিক। তাঁর দাবি, এর আগে কয়েক দিন টানা বৃষ্টি হয়েছিল এবং তাতে সবজিখেতের ক্ষতি হয়েছিল; সেই হিসেবে ঈদের পরদিন সবজির দাম তুলনামূলক কম বেড়েছে বলে তিনি মনে করেন। বকুলের মতে, সেদিন সবজির চাহিদা তুলনামূলক কম ছিল, কারণ ঈদের জন্য ঢাকার বেশির ভাগ মানুষ গ্রামে ছিলেন এবং যাঁরা ঢাকায় ছিলেন, তাঁদের বাসায় মাংস ছিল। আরও কয়েক দিন চাহিদা কম থাকবে এবং চাহিদা বাড়লে দাম আরও বাড়তে পারে বলে তিনি ধারণা দেন। খেতের ক্ষতির বিষয়টি বিক্রেতার নিজের বক্তব্য; প্রতিবেদনে এর কোনো সরকারি হিসাব দেওয়া হয়নি।

ক্রেতাদের অভিজ্ঞতা


রামপুরা বাজারে সবজি কিনতে আসা বেসরকারি চাকরিজীবী নাজমুল হোসেন বলেন, ঈদের পর বাজারে এসে তিনি দেখেন সবকিছুর দাম বাড়তি। তাঁর কথায়, কোরবানির পরও সংসার চালাতে হয়, শুধু মাংস দিয়ে ভাত খাওয়া যায় না, তাই তিনি কিছু সবজি কিনতে এসেছিলেন।

খিলগাঁও তালতলা বাজার থেকে টমেটোসহ কিছু সবজি কেনেন কামাল মোশাররফ। তিনি জানান, ঈদের আগে তিনি এক কেজি পাকা টমেটো কিনেছিলেন ৮০ টাকায়, আর সেদিন একই টমেটোর দাম রাখা হয় ১২০ টাকা। ঈদের আগে ঢ্যাঁড়স কিনেছিলেন ৬০ টাকা কেজি দরে, সেদিন কিনতে হয় ৮০ টাকা কেজিতে। তিনি বলেন, তাঁরা কোরবানি দিয়েছেন এবং বাসায় মাংসের কয়েকটি পদ রান্না হয়েছে, কিন্তু শুধু মাংস দিয়ে কতবার খাওয়া যায়; একটু সবজি না খেলে অসুস্থ হয়ে পড়বেন, তাই সবজি কিনে নিয়ে যাচ্ছিলেন।

দুই ক্রেতার কথায় একটি বিষয় স্পষ্ট: কোরবানির পর ঘরে মাংস থাকলেও সংসারের রান্নায় সবজির চাহিদা থেকেই যায়। বিক্রেতারা চাহিদা কম বলছিলেন, আবার ক্রেতারা বাড়তি দামের কথা বলছিলেন; সরবরাহ কমে যাওয়াই সেদিনের দামের প্রধান কারণ বলে বিক্রেতারা উল্লেখ করেন।

ঈদের ছুটি, ফাঁকা ঢাকা ও কোরবানির পশু


২০২৬ সালের ১৮ মে সন্ধ্যায় জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের সভাকক্ষে জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটির সভায় জানানো হয়, দেশের আকাশে জিলহজ মাসের চাঁদ দেখা গেছে এবং ২৮ মে বৃহস্পতিবার সারা দেশে ঈদুল আজহা উদযাপিত হবে। বাংলা ট্রিবিউন সেদিন এ খবর প্রকাশ করে।

সরকারি কর্মচারীদের জন্য ঈদুল আজহা উপলক্ষে ২৫ মে থেকে ৩১ মে পর্যন্ত টানা সাত দিনের ছুটি ঘোষণা করা হয়। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী ২৩ মে শনিবার সরকারি অফিস খোলা রাখা হয় এবং ছুটি শেষে অফিস খোলার কথা ছিল ১ জুন। ফলে সবজির বাজারের প্রতিবেদনটি যেদিনের, সেই ২৯ মে ছিল সাত দিনের ছুটির পঞ্চম দিন। লম্বা ছুটিতে রাজধানীর বিপুলসংখ্যক মানুষ গ্রামের বাড়িতে চলে যান, যে কারণে মহল্লার বাজারে ক্রেতাও কম ছিল।

ঈদের আগে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের দেওয়া হিসাবও ক্রেতাদের ঘরে মাংস থাকার কথার পটভূমি বোঝায়। বাংলা ট্রিবিউনের ২২ মে ২০২৬ তারিখের প্রতিবেদন অনুযায়ী, অধিদপ্তরের হিসাবে সে বছর কোরবানির পশুর চাহিদা ছিল ১ কোটি ১ লাখ ৬ হাজার ৩৩৪টি, আর প্রস্তুত ছিল ১ কোটি ২৩ লাখ ৩৩ হাজার ৮৪০টি পশু; উদ্বৃত্ত ছিল প্রায় ২২ লাখ। প্রস্তুত পশুর মধ্যে গরু ও মহিষ ছিল ৫৬ লাখ ৯৫ হাজার ৮৭৮টি এবং ছাগল ও ভেড়া ৬৬ লাখ ৩২ হাজার ৩০৭টি। একই প্রতিবেদনে বলা হয়, সবচেয়ে বড় বাজার ঢাকা বিভাগে প্রায় ৭ লাখ ১৫ হাজার পশুর ঘাটতি ছিল, আর রাজশাহী বিভাগে উদ্বৃত্ত ছিল প্রায় ১৯ লাখ।

ঈদের আগের সপ্তাহে বাজার কেমন ছিল


ঈদের আগেও ঢাকার বাজারে সবজির দাম কম ছিল না। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড ২০২৬ সালের ২৩ মে প্রথম প্রহরে কারওয়ান বাজার, নিউমার্কেট ও লালবাগের বাজার নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। তাতে বলা হয়, সরবরাহ পর্যাপ্ত থাকলেও খুচরা দাম আগের সপ্তাহগুলোর চেয়ে বেশি ছিল। ওই প্রতিবেদন অনুযায়ী, টমেটো বিক্রি হচ্ছিল কেজি ১০০ টাকায়, যা সপ্তাহের শুরুতে ছিল ৮০ টাকা; গাজর ১২০ টাকা, আগে ছিল ১০০ টাকা; লাউ প্রতিটি প্রায় ১০০ টাকা, আগের সপ্তাহে ছিল ৭০ থেকে ৮০ টাকা। লম্বা বেগুনের দাম কেজিতে ২০ টাকা কমে ১০০ টাকায় নেমেছিল, ঢ্যাঁড়স ছিল ৬০ টাকা, করলা ১০০ টাকা এবং চিচিঙ্গা ও পটল ৮০ টাকা কেজি।

নিউমার্কেটের সবজি বিক্রেতা তারেক সে সময় দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, মৌসুম শেষ হয়ে আসায় সরবরাহ কমেছে, তাই দাম বেড়েছে। লক্ষণীয় যে, এসব দাম কারওয়ান বাজার, নিউমার্কেট ও লালবাগের, আর জাগো নিউজের প্রতিবেদনের ঈদের আগের দাম রামপুরা-খিলগাঁও এলাকার বিক্রেতা ও ক্রেতাদের দেওয়া; বাজারভেদে দামের পার্থক্য থাকে।

মে মাসের শুরুতেও বাজারের চিত্র প্রায় একই রকম ছিল। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম ২০২৬ সালের ৯ মে শনির আখড়া, যাত্রাবাড়ী, কাপ্তান বাজার ও সেগুনবাগিচার বাজার নিয়ে যে প্রতিবেদন প্রকাশ করে, তাতে টমেটোর কেজি ৪০ থেকে ৫০ টাকা, করলা ৪০ থেকে ৬০ টাকা, ঢ্যাঁড়স ৪০ থেকে ৬০ টাকা, কাঁকরোল ১০০ টাকা, কাঁচা মরিচ ৬০ থেকে ৭০ টাকা, দেশি শসা ১০০ টাকা ও হাইব্রিড শসা ৭০ টাকা বলে উল্লেখ করা হয়েছিল। দুই প্রতিবেদন পাশাপাশি রাখলে দেখা যায়, মাসের শুরু থেকে ঈদের আগের সপ্তাহের মধ্যে টমেটোসহ কয়েকটি সবজির দাম বেড়েছিল, যদিও বাজারগুলো আলাদা।

করলা (Momordica charantia), গ্রীষ্মের একটি প্রধান সবজি। ছবি: Mamun2a / উইকিমিডিয়া কমন্স (পাবলিক ডোমেইন)
করলা (Momordica charantia), গ্রীষ্মের একটি প্রধান সবজি। ছবি: Mamun2a / উইকিমিডিয়া কমন্স (পাবলিক ডোমেইন)

টানা বৃষ্টি ও আবহাওয়ার পূর্বাভাস


বিক্রেতা বকুল টানা বৃষ্টির যে কথা বলেছিলেন, ঈদের আগের দিনগুলোতে দেশজুড়ে বৃষ্টি হচ্ছিল, আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্যেও তা দেখা যায়। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের ২৭ মে ২০২৬ তারিখের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২৬ মে মঙ্গলবার সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় দেশে সর্বোচ্চ ৯০ মিলিমিটার বৃষ্টি হয় মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে, আর ঢাকায় বৃষ্টি হয় ৬৮ মিলিমিটার। আবহাওয়াবিদ তরিফুল নেওয়াজ কবির তখন জানান, ঈদের দিন রাজশাহী, খুলনা, ঢাকা, ময়মনসিংহ ও সিলেট বিভাগের অনেক জায়গায় বৃষ্টি বা বজ্রবৃষ্টি হতে পারে এবং ময়মনসিংহ, সিলেট, ঢাকা ও রাজশাহী বিভাগে কোথাও কোথাও ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টি হতে পারে।

ঢাকা ট্রিবিউনের ২৭ মে রাতের প্রতিবেদনে আবহাওয়া অধিদপ্তরের বরাতে বলা হয়, পূর্ব-মধ্য বঙ্গোপসাগরে একটি লঘুচাপ তৈরি হচ্ছিল, যার প্রভাবে ঈদের পর আরও দুই থেকে তিন দিন বৃষ্টি চলতে পারে। অর্থাৎ ঈদের পরদিন বাজারে যখন সরবরাহ কম, তখনো বৃষ্টির মৌসুমি প্রভাব শেষ হয়নি।

বৃষ্টির সঙ্গে গ্রীষ্মের সবজির সম্পর্ক বোঝাতে বাংলাপিডিয়া জানায়, বাংলাদেশে গ্রীষ্মকালীন সবজির চাষ প্রতিকূল আবহাওয়া ও পোকামাকড়ের আক্রমণে বাধাগ্রস্ত হয়। কুমড়াজাতীয় সবজিতে ফলের মাছি (মেলন ফ্রুট ফ্লাই) ও কুমড়ার বিটল, ঢ্যাঁড়সে ডগা ও ফল ছিদ্রকারী পোকা এবং টমেটোতে ফল ছিদ্রকারী পোকা প্রধান শত্রু হিসেবে পরিচিত। মাঠে কিংবা পরিবহনের সময় টমেটোর ফল পচন রোগও হতে পারে বলে বাংলাপিডিয়ায় উল্লেখ আছে।

গ্রীষ্মের সবজি: মৌসুম ও চাষ


২৯ মে যেসব সবজির দাম বেড়েছিল, তার বেশির ভাগই এ সময়ের সবজি, তবে সবগুলোর মৌসুম এক নয়। বাংলাপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রায় ১০০ ধরনের দেশি ও বিদেশি সবজি চাষ হয়। প্রধান শীতকালীন সবজির মধ্যে আছে বাঁধাকপি, ফুলকপি, টমেটো, বেগুন, মুলা, শিম ও লাউ; আর প্রধান গ্রীষ্মকালীন সবজির মধ্যে আছে মিষ্টিকুমড়া, করলা, কাঁকরোল, ঝিঙা, চালকুমড়া, ঢ্যাঁড়স, বরবটি ও পুঁইশাক। বেগুন, মিষ্টিকুমড়া, ঢ্যাঁড়স ও লালশাক দুই মৌসুমেই জন্মে।

টমেটো মূলত শীতের ফসল। বাংলাপিডিয়া জানায়, ২৫ থেকে ৩০ দিনের চারা সাধারণত নভেম্বর-ডিসেম্বরে রোপণ করা হয় এবং ৮০ থেকে ৯০ দিনে ফসল তোলার উপযোগী হয়। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বারি) উদ্ভাবিত কয়েকটি জাত, যেমন বারি টমেটো-৪, বারি টমেটো-৫, চৈতী, লালিমা ও হাইব্রিড অনুপমা, গরমের মৌসুমেও চাষ করা যায়। এ কারণেই মে মাসের শেষে বাজারে পাকা টমেটোর সরবরাহ কম থাকে এবং দাম শীতের তুলনায় বেশি থাকে। বাণিজ্যিক টমেটো চাষের কেন্দ্র হিসেবে যশোর ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাম বাংলাপিডিয়ায় এসেছে।

বেগুন রোপণের সময় অক্টোবর-নভেম্বর এবং ৯০ থেকে ১০০ দিনে তা তোলা যায়, তবে এটি দুই মৌসুমেই জন্মায়। করলা প্রধানত গ্রীষ্মের সবজি; বীজ সরাসরি জমিতে বোনা হয়, কখনো ১৫ থেকে ২০ দিনের চারা মার্চ থেকে মে মাসে মূল জমিতে লাগানো হয়। ছোট আকারের করলাকে উচ্ছে বলা হয়, আর বড়গুলোর একটি স্থানীয় জাত গজ করলা।

কাঁকরোল (Momordica dioica) গ্রীষ্মের সবজি এবং সম্ভবত এই উপমহাদেশেরই আদি ফসল। বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী, মার্চ-এপ্রিলে কন্দমূল থেকে এর চাষ করা হয় এবং ৯০ থেকে ১০০ দিনে ফসল তোলা যায়; মণিপুরী, আমলি, সবুজ টাম্পু ও বর্ণ টাম্পু এর কয়েকটি স্থানীয় জাত। দেশের বাজারের পাশাপাশি রপ্তানির জন্যও কাঁকরোলের চাহিদা আছে। কাঁচা মরিচ শীত ও গ্রীষ্ম দুই মৌসুমেই চাষ হয়, আর শসা কুমড়াজাতীয় পরিবারের সবজি। পটলের জন্য বগুড়া অঞ্চলের কথাও বাংলাপিডিয়ায় এসেছে।

কাঁকরোল (Momordica dioica): গোটা, লম্বালম্বি ও আড়াআড়ি কাটা। ছবি: AntanO / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
কাঁকরোল (Momordica dioica): গোটা, লম্বালম্বি ও আড়াআড়ি কাটা। ছবি: AntanO / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)

উৎপাদন, মূল্যস্ফীতি ও আগের ঈদের অভিজ্ঞতা


সবজি উৎপাদনে বাংলাদেশের অবস্থান শক্ত। দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসের ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৫ তারিখের প্রতিবেদনে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) পরিসংখ্যান বই ২০২৫-এর বরাতে বলা হয়, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশে সবজির মোট উৎপাদন ছিল আনুমানিক ১৭ দশমিক ০৯ মিলিয়ন টন, যা পাঁচ বছর আগের তুলনায় ১৫ দশমিক ২৯ শতাংশ বেশি। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) হিসাবে সবজি উৎপাদনে চীন ও ভারতের পরেই বাংলাদেশের অবস্থান তৃতীয়। কৃষকেরা প্রায় ১০ লাখ হেক্টর জমিতে প্রায় ১০০ ধরনের সবজি চাষ করেন, যদিও দেশের ৮৫ লাখ হেক্টর আবাদি জমির ৭৫ শতাংশের বেশি এখনো ধান ও অন্যান্য দানাশস্যের দখলে। ওই প্রতিবেদনে বিশেষজ্ঞরা বলেন, উৎপাদন বাড়লেও মধ্যস্বত্বভোগীদের মুনাফা ও পরিবহন খরচের মতো বিপণন সমস্যার কারণে নিম্ন আয়ের পরিবারের জন্য সবজির দাম চাপ হয়ে আছে।

ঈদের আগে মূল্যস্ফীতির হিসাবও এই চাপের পটভূমি দেয়। বিবিএস ২০২৬ সালের ৬ মে যে হিসাব প্রকাশ করে, তাতে এপ্রিলে সাধারণ (পয়েন্ট টু পয়েন্ট) মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ০৪ শতাংশ, যা মার্চে ছিল ৮ দশমিক ৭১ শতাংশ। এপ্রিলে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৩৯ শতাংশ, মার্চে ৮ দশমিক ২৪ শতাংশ। শহরাঞ্চলে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৮১ শতাংশ। বিবিএস ৬৪ জেলার ১৫৪টি বাজারের তথ্য নিয়ে এ হিসাব করে।

ঈদের পর সবজির বাজারের এমন ওঠানামা নতুন নয়। ২০২৫ সালের ঈদুল ফিতরের পর ৫ এপ্রিল কারওয়ান বাজার, নিউমার্কেট ও শান্তিনগর বাজার নিয়ে দৈনিক ইত্তেফাকের প্রতিবেদনে সবজি বিক্রেতা বেলায়েত বলেছিলেন, ঈদের পর বাজারে ক্রেতার উপস্থিতি কম, কিন্তু একই সঙ্গে সবজির সরবরাহও কমেছে। ২০২৫ সালের ঈদুল আজহার পর ১৪ জুন দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস জানায়, ঈদের দিন থেকে ঢাকার অনেক মুদি দোকান বন্ধ ছিল এবং কয়েক দিন ধরে ক্রেতাও ছিল অনেক কম; সে সময় ঢাকায় বেশ কিছু সবজির দাম আগের সপ্তাহের চেয়ে কেজিতে ২০ টাকা কমেছিল, যদিও টমেটো বিক্রি হচ্ছিল কেজি ১২০ থেকে ১৪০ টাকায়।

একই দিনে ঢাকা ট্রিবিউন খুলনার বাজার নিয়ে জানায়, ২০২৫ সালের ঈদুল আজহার পর সেখানে সবজির দাম ঈদের এক সপ্তাহ আগের তুলনায় কেজিতে প্রায় ২০ টাকা বেড়েছিল। খুলনার বিক্রেতা জাহিদুল তখন বলেছিলেন, কৃষক থেকে পাইকার পর্যন্ত অনেকে ঈদে বাড়ি গেছেন; খেতে ফসল থাকলেও তোলার কাজ ধীর হয়ে যাওয়ায় সরবরাহ কমেছে। বর্ষার বৃষ্টি ও শ্রমিক সংকটও তখন ফসল তোলায় বাধা দিয়েছিল বলে ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। অর্থাৎ ঈদের ছুটিতে সরবরাহ কমে যাওয়া, ক্রেতা কমে যাওয়া এবং বৃষ্টির প্রভাব, এই তিনটি বিষয় আগের বছরগুলোতেও বাজারের দামে ভিন্ন ভিন্নভাবে প্রভাব ফেলেছে; ২০২৬ সালের ঈদুল আজহার পরদিন ঢাকার পূর্বাংশের বাজারে সরবরাহ সংকটই বড় হয়ে দেখা দেয়।

ছবি: NahidSultan / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)

সূত্র: জাগো নিউজ ২৪ (২৯ মে ২০২৬), বাংলা ট্রিবিউন (১৮, ২২ ও ২৫ মে ২০২৬), দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড (২৩ মে ২০২৬), বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম (৯ ও ২৭ মে ২০২৬), ঢাকা ট্রিবিউন (২৭ মে ২০২৬ ও ১৪ জুন ২০২৫), ইউএনবি (৬ মে ২০২৬), দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস (১৪ জুন ২০২৫ ও ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৫), দৈনিক ইত্তেফাক (৫ এপ্রিল ২০২৫), বাংলাপিডিয়া, উইকিপিডিয়া

অনলাইন ডেস্কদা এগ্রো নিউজ

শাকসবজি

সম্পর্কিত খবর

শাকসবজি

কুয়াশায় শিকড় খাওয়ানোর প্রযুক্তিতে রোগমুক্ত আলুবীজ উৎপাদনের পরীক্ষা ইংল্যান্ডে

স্টার্টআপ এয়ারপনিক্স ও ডাইসন ফার্মিং ডেফরার অর্থায়নে দুই বছরের এক পরীক্ষা শুরু করেছে: কুয়াশাভিত্তিক পদ্ধতিতে বর্তমান খরচের অর্ধেকেরও কমে ইংল্যান্ডে রোগমুক্ত প্রথম প্রজন্মের আলুবীজ উৎপাদন সম্ভব কি না।

AgNavigator১৬ অক্টোবর ২০২৬২ মিনিটের পড়া
এগ্রোটেক

মাশরুমের গাঁজন প্রযুক্তিতে টফুর বর্জ্য হলো প্রোটিনসমৃদ্ধ সুস্বাদু উপাদান

সিঙ্গাপুরের নানইয়াং টেকনোলজিক্যাল ইউনিভার্সিটির বিজ্ঞানীরা সয়া দুধ ও টফুর অবশিষ্ট ওকারা ঝিনুক মাশরুমের মাইসেলিয়াম দিয়ে গাঁজন করে এর প্রোটিন প্রায় ২৮ থেকে ৩০ শতাংশে তুলেছেন, বাড়িয়েছেন উমামি স্বাদ।

Green Queen১৬ অক্টোবর ২০২৬২ মিনিটের পড়া
শাকসবজি

মাদারগঞ্জে ৬০ হেক্টরে আগাম শসা, দুই হাজার টন উৎপাদনের আশা

জামালপুরের মাদারগঞ্জে এবার প্রায় ৬০ হেক্টরে আগাম শসার আবাদ হয়েছে, উৎপাদন হতে পারে প্রায় দুই হাজার টন; পাইকারি বাজারে কেজি ৩০-৪০ টাকা, বিঘায় খরচ ১৫-২০ হাজার আর বিক্রি ৩০-৪০ হাজার টাকা।

ডেইলি বাংলাদেশ১৫ অক্টোবর ২০২৬১ মিনিটের পড়া

মন্তব্য

(০)