কলা বাংলাদেশের অতি পরিচিত ফল, দেশের প্রায় সব জায়গায় সারা বছর এর চাষ হয়। ২০২৫ সালের মে মাসের শেষে জাগো নিউজে প্রকাশিত কৃষি ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ সমীরণ বিশ্বাসের এক লেখায় মনে করিয়ে দেওয়া হয়, রোপণের শুরুর দিনগুলোতে সঠিক সার ও সেচই পরে গাছের শিকড়, বৃদ্ধি ও ফলন ঠিক করে দেয়। সরকারের কৃষি তথ্য সার্ভিস (এআইএস) কলা চাষের যে নির্দেশনা দিয়েছে, তাতেও সারের বড় অংশ গর্তে ও রোপণের প্রথম কয়েক মাসে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
জমি, জাত ও রোপণের সময়
এআইএসের নির্দেশনা অনুযায়ী উর্বর দোআঁশ মাটি এবং পানি জমে না এমন উঁচু জমি কলা চাষের জন্য ভালো। জমি গভীর করে চাষ দিয়ে দুই মিটার দূরে দূরে দুই ফুট গভীর গর্ত করতে হয়। বছরে তিন মৌসুমে কলা রোপণ করা যায়: আশ্বিন-কার্তিক, মাঘ-ফাল্গুন এবং চৈত্র-বৈশাখ। চারা হিসেবে অসি তেউড়, অর্থাৎ সরু ও সুচালো পাতার তেউড় সবচেয়ে ভালো। প্রচলিত জাতের মধ্যে অমৃত সাগর, চাম্পা, চিনি চাম্পা, সবরি, বারি কলা-১ ও বারি কলা-৪ উল্লেখযোগ্য।
বাংলাপিডিয়া জানায়, দেশে কলার প্রধান এলাকা রাঙামাটি, বরিশাল, রংপুর, দিনাজপুর, নোয়াখালী, ফরিদপুর ও খুলনা। কলাগাছ একবার ফল দিয়েই মরে যায় বা কেটে ফেলা হয়; তখন গোড়ার কন্দ থেকে বের হওয়া তেউড় থেকে নতুন গাছ হয়।

গর্তে ও উপরি প্রয়োগে সারের হিসাব
এআইএসের নির্দেশনায় প্রতি গর্তের জন্য মোট সারের পরিমাণ এবং তা কয়েক কিস্তিতে দেওয়ার নিয়ম এভাবে বলা হয়েছে:
- মোট সার (প্রতি গর্তে): গোবর ২০ কেজি, টিএসপি ৪০০ গ্রাম, এমওপি ৩০০ গ্রাম এবং ইউরিয়া ৬৫০ গ্রাম।
- গোবরের অর্ধেক জমি তৈরির সময় এবং বাকি অর্ধেক গর্তে দিতে হয়; এ সময় টিএসপির অর্ধেকও গর্তে দিতে হয়।
- রোপণের দেড় থেকে দুই মাস পর ইউরিয়ার ২৫ ভাগ, এমওপির ৫০ ভাগ এবং বাকি টিএসপি জমিতে ছিটিয়ে ভালোভাবে কুপিয়ে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিতে হয়।
- এর দুই থেকে আড়াই মাস পর গাছপ্রতি ইউরিয়ার আরও ৫০ ভাগ এবং এমওপির বাকি ৫০ ভাগ দিতে হয়।
- ফুল আসার সময় বাকি ২৫ ভাগ ইউরিয়া জমিতে ছিটিয়ে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিতে হয়।
অর্থাৎ এই নির্দেশনায় রোপণের সময় কোনো ইউরিয়া নেই; প্রথম ইউরিয়া যায় দেড় থেকে দুই মাস পর। ভারতের তামিলনাড়ু কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্দেশিকাও নাইট্রোজেন ও পটাশ কয়েক ভাগে ভাগ করে দেওয়ার কথা বলে এবং প্রতিবার সার দেওয়ার পর জমিতে ভালোভাবে সেচ দিতে বলে।

সেচ, নিষ্কাশন ও পরিচর্যা
তামিলনাড়ু কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্দেশিকায় চারা রোপণের পরপরই প্রথম সেচ দিতে বলা হয়েছে। এআইএস বলছে, রোপণের পর মাটিতে পর্যাপ্ত রস না থাকলে এবং শুকনো মৌসুমে ১৫ থেকে ২০ দিন পরপর সেচ দিতে হবে। গাছ যত বড় হয়, পানির চাহিদাও তত বাড়ে: বিশ্ববিদ্যালয়টির ড্রিপ সেচের সূচিতে রোপণের পর প্রথম চার সপ্তাহে গাছপ্রতি দিনে ৪ লিটার, আর মোচা বের হওয়া ও কাঁদি বাড়ার সময় দিনে ২০ লিটার বা তার বেশি পানি ধরা হয়েছে।
কলাগাছ জলাবদ্ধতা সহ্য করতে পারে না, তাই পানি নিষ্কাশন ভালো এমন দোআঁশ মাটি বেছে নিতে হয় এবং বর্ষায় বাগানে যেন পানি না দাঁড়ায় সেদিকে নজর রাখতে হয়। এআইএসের পরামর্শ অনুযায়ী গাছের গোড়া ও নালার আগাছা সব সময় পরিষ্কার রাখতে হবে এবং মোচা আসার আগ পর্যন্ত গাছের গোড়ায় কোনো তেউড় রাখা যাবে না।

রোগ ও ফল তোলার সময়
বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী দেশে কলার সবচেয়ে ক্ষতিকর রোগগুলোর একটি পানামা রোগ, যা মাটিবাহিত একটি ছত্রাকের কারণে হয়। এআইএস বলছে, এ রোগে প্রথমে বয়স্ক পাতার কিনারা হলুদ হয়, পরে পাতা বোঁটার কাছে ভেঙে ঝুলে পড়ে; আক্রান্ত গাছ গোড়াসহ তুলে ফেলতে হবে এবং তার তেউড় চারা হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না। এআইএসের হিসাবে চারা রোপণের ১১ থেকে ১৫ মাসের মধ্যে কলা সংগ্রহের উপযোগী হয়।
ছবি: The Roving Rokibul / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, কৃষি তথ্য সার্ভিস (এআইএস), বাংলাপিডিয়া, তামিলনাড়ু কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (টিএনএইউ অ্যাগ্রিটেক পোর্টাল)





মন্তব্য
(০)