২০২৬ সালের জুলাইয়ে কুড়িগ্রামের কৃষকরা বাড়তে থাকা তাপমাত্রা ও কমতে থাকা বৃষ্টিপাতের সঙ্গে মানিয়ে নিতে জৈব ও জলবায়ু-সহনশীল কৃষি পদ্ধতির দিকে ঝুঁকছিলেন। জাগো নিউজ ২৪-এর ১৫ জুলাই ২০২৬ তারিখের প্রতিবেদন অনুযায়ী, রাজারহাট উপজেলার ছিনাই ইউনিয়নের দুই গ্রামে ২০ জন কৃষক রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহার কমিয়ে মালচিং, ট্রাইকো কম্পোস্ট, ফেরোমন ফাঁদ ও রঙিন আঠালো ফাঁদ দিয়ে সবজি চাষ করছিলেন।
বাড়ছে তাপমাত্রা, বদলাচ্ছে চাষ
রাজারহাট আবহাওয়া ও কৃষি পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের তথ্য উদ্ধৃত করে প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৯ সালের জুলাই থেকে ২০২৫ সালের জুলাই পর্যন্ত ছয় বছরে জেলার সর্বোচ্চ তাপমাত্রা বেড়েছে ৫ দশমিক ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে জেলার আবহাওয়ায় যে নতুন বাস্তবতা দেখা দিয়েছে, তার সরাসরি প্রভাব পড়েছে কৃষিতে।
কুড়িগ্রাম দেশের উত্তরাঞ্চলে ভারত সীমান্তঘেঁষা একটি জেলা। এর আয়তন ২,২৪৫.০৪ বর্গকিলোমিটার, ২০২২ সালের জনশুমারিতে জনসংখ্যা ছিল ২৩ লাখ ২৯ হাজার ১৬০। যমুনা (ব্রহ্মপুত্র), ধরলা ও তিস্তা নদী জেলার ভেতর দিয়ে বয়ে গেছে, আর নদীর পলিতে গড়ে উঠেছে অনেক চর। রাজারহাট জেলার নয়টি উপজেলার একটি; তিস্তা ও ধরলা এ উপজেলা দিয়ে প্রবাহিত, আর ছিনাই এর সাতটি ইউনিয়নের একটি।
ছিনাই ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান লুৎফর রহমান জানান, কৃষিনির্ভর এ এলাকায় একসময় অধিকাংশ কৃষক ধান ও পাট চাষ করতেন। আবহাওয়ার পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে এখন অনেকে সবজি চাষে ঝুঁকছেন। তাঁর ভাষ্য, এতে বছরে তিন থেকে চারটি ফসল উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে এবং কৃষকের আয় ও কর্মসংস্থান দুই-ই বেড়েছে।

মহিধর ও খণ্ডক্ষেত্র গ্রামে নিরাপদ সবজি
মহিধর ও খণ্ডক্ষেত্র গ্রামের কৃষক-কৃষাণীরা শিম, করলা, বেগুন, ফুলকপি, বাঁধাকপি, শসাসহ বিভিন্ন সবজিতে পরিবেশবান্ধব পদ্ধতি অনুসরণ করছিলেন। বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা আরডিআরএস বাংলাদেশ ও পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশনের (পিকেএসএফ) সহায়তায় লাভলী বেগম, মোসলেম, আবুল হোসেন, মিনতী রাণীসহ ২০ জন কৃষক প্রায় পাঁচ একর জমিতে নিরাপদ ফসল উৎপাদন করছিলেন। তাঁরা ট্রাইকো কম্পোস্ট, মালচিং পেপার, হলুদ, সাদা ও নীল আঠালো ফাঁদ এবং ফেরোমন ফাঁদ ব্যবহার করে রাসায়নিকের ওপর নির্ভরতা কমিয়েছেন।
আরডিআরএস ১৯৭২ সালে লুথেরান ওয়ার্ল্ড ফেডারেশনের উদ্যোগে মুক্তিযুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সহায়তায় কাজ শুরু করে এবং ১৯৯৭ সালে স্বাধীন জাতীয় সংস্থায় রূপ নেয়; খাদ্য নিরাপত্তা ও পরিবেশ এর অন্যতম কাজের ক্ষেত্র। পিকেএসএফ ১৯৯০ সালে বাংলাদেশ সরকার প্রতিষ্ঠিত একটি প্রতিষ্ঠান, যা মাঠপর্যায়ের বেসরকারি সংস্থার মাধ্যমে গ্রামের মানুষকে আর্থিক ও অ-আর্থিক সেবা দেয়।
কৃষাণী লাভলী বেগম জানান, তিনি ২০ শতক জমিতে মালচিং পদ্ধতিতে করলা চাষ করেছেন। তাঁর ভাষ্য, হলুদ ফাঁদ ও বিষটোপ ব্যবহার করায় রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহার প্রায় বন্ধ করা গেছে; উৎপাদন খরচ কমেছে, ফলনও ভালো হয়েছে, আর বাজারদর ভালো থাকলে লাভ আরও বাড়বে।
কৃষক আবুল হোসেন বলেন, আগে নিয়মিত রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহার করতে হতো। জৈব সার, ফেরোমন ফাঁদ ও রঙিন আঠালো ফাঁদ ব্যবহার করে এখন ভালো ফল পাচ্ছেন; এতে সার ও কীটনাশকের খরচ যেমন কমেছে, তেমনি রোগবালাইয়ের আক্রমণও কমেছে বলে জানান তিনি।

ফাঁদ, কম্পোস্ট ও মালচিং যেভাবে কাজ করে
ফেরোমন ফাঁদে পোকার যৌন আকর্ষক গন্ধ (সেক্স ফেরোমন) দিয়ে পোকাকে টেনে এনে আটকে ফেলা হয়। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি) কৃষকদের ব্যবহৃত এই ফাঁদ উদ্ভাবন করেছে; বারির নকশায় কিউলিওর ও সাবান-পানি ব্যবহার করা হয়। মিষ্টিকুমড়া, শসা, করলা, পটল, লাউ, তরমুজ, শিম, বেগুন, ফুলকপি, বাঁধাকপিসহ নানা সবজিতে এ ফাঁদ ব্যবহৃত হয়।
ট্রাইকো কম্পোস্ট হলো উপকারী ছত্রাক ট্রাইকোডার্মা মিশিয়ে তৈরি কম্পোস্ট সার। মালচিং মানে গাছের গোড়ার মাটি খড় বা পলিথিনের মতো আবরণে ঢেকে রাখা; এতে মাটির আর্দ্রতা সংরক্ষিত থাকে, মাটির তাপমাত্রা স্থিতিশীল থাকে এবং আগাছা কম জন্মায়। পলিথিনের মালচে ফসল জন্মায় পাতলা আবরণের ছিদ্র বা চেরা দিয়ে।

কৃষি বিভাগের পরামর্শ
রাজারহাট উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মোছা. সাইফুন্নাহার সাথী বলেন, জমিতে জৈব সার ও কম্পোস্ট ব্যবহার করলে মাটির পানি ধারণক্ষমতা বাড়ে, আর মালচিং পদ্ধতিতে মাটির আর্দ্রতা দীর্ঘ সময় ধরে রাখা যায়। তাপপ্রবাহের সময় তিনি যা জরুরি বলেছেন:
- নতুন করে চারা রোপণ না করা;
- প্রয়োজন ছাড়া অতিরিক্ত সার ও কীটনাশক ব্যবহার থেকে বিরত থাকা;
- রোগবালাই দমনে নিয়মিত মাঠ পর্যবেক্ষণ করা।
কুড়িগ্রাম কৃষি সম্প্রসারণ কার্যালয়ের উপপরিচালক আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, অতিরিক্ত তাপমাত্রার মধ্যে কৃষিতে টিকে থাকতে আগাম পরিকল্পনা, মাটির আর্দ্রতা সংরক্ষণ, জৈব সার ব্যবহার এবং সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা অনুসরণ করতে হবে। তিনি জানান, জেলা ও উপজেলা কৃষি বিভাগ কৃষক প্রশিক্ষণ, কৃষক মাঠ স্কুল, প্রদর্শনী প্লট, জৈব সার ব্যবস্থাপনা, ফেরোমন ফাঁদ ব্যবহার ও সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনায় কারিগরি সহায়তা দেয়।
তাঁর পরামর্শ, কৃষকরা স্থানীয় কৃষি অফিস থেকে মাটির স্বাস্থ্য, ফসলভিত্তিক ব্যবস্থাপনা ও পরিবেশবান্ধব বালাই দমনের বিষয়ে পরামর্শ নিতে পারেন; মাঠপর্যায়ে উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তারাও নিয়মিত পরামর্শ ও কারিগরি সহায়তা দেন।
ছবি: Tanvir Rahat / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, দ্য ইনডিপেনডেন্ট, লুথেরান ওয়ার্ল্ড ফেডারেশন, উইকিপিডিয়া (কুড়িগ্রাম জেলা, রাজারহাট উপজেলা, পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশন, মালচ)





মন্তব্য
(০)