২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে, অর্থাৎ জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত, দেশের ব্যাংকগুলোর কৃষিঋণ বিতরণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য উদ্ধৃত করে ২০২৬ সালের ২৭ জানুয়ারি জাগো নিউজ জানায়, এই সময়ে কৃষি খাতে মোট ২১ হাজার কোটি টাকার ঋণ বিতরণ হয়েছে, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ৪ হাজার ৭৪৯ কোটি টাকা বা ২৯ শতাংশ বেশি।

ছয় মাসে লক্ষ্যমাত্রার ৫৩.৮৭ শতাংশ অর্জন
২০২৫-২৬ অর্থবছরের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক ৩৯ হাজার কোটি টাকার কৃষি ও পল্লী ঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করেছিল। জাগো নিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ছয় মাসেই এই লক্ষ্যমাত্রার ৫৩ দশমিক ৮৭ শতাংশ অর্জিত হয়েছে।
দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড ও বাংলাদেশ পোস্ট ২০২৫ সালের ১২ আগস্ট জানায়, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সদর দপ্তরে সংবাদ সম্মেলনে নতুন কৃষি ও পল্লী ঋণ নীতিমালা ঘোষণা করা হয়। আগের ২০২৪-২৫ অর্থবছরের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩৮ হাজার কোটি টাকা; নতুন লক্ষ্যমাত্রা তার চেয়ে ২ দশমিক ৬৩ শতাংশ বেশি। নিউ এজের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ব্যাংকগুলো মোট ৩৭ হাজার ৩২৬ কোটি টাকার কৃষিঋণ বিতরণ করেছিল।
অর্থবছরের শুরু থেকেই বিতরণে গতি দেখা যাচ্ছিল। ২০২৫ সালের ৬ ডিসেম্বর নিউ এজ জানায়, জুলাই-অক্টোবর এই চার মাসে ব্যাংকগুলো ১১ হাজার ৯২৮ কোটি টাকার কৃষিঋণ দেয়, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ৯ হাজার ৩৯১ কোটি টাকা; বৃদ্ধির হার ২৭ শতাংশ। পত্রিকাটির ভাষ্য, পরিস্থিতি স্থিতিশীল হতে থাকায় এবং খাদ্য উৎপাদনে সহায়তার চাপ থাকায় বিতরণ আবার বেড়েছে।

ঋণ আদায় ও ঋণস্থিতিও বেড়েছে
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বিতরণের পাশাপাশি কৃষিঋণ আদায়ও বেড়েছে। প্রথম ছয় মাসে কৃষি খাত থেকে ২১ হাজার ৭৭৪ কোটি টাকার ঋণ আদায় হয়েছে, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ২ হাজার ৬৫৭ কোটি টাকা বা ১৩ দশমিক ৯০ শতাংশ বেশি। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে কৃষি খাতে মোট ঋণস্থিতি দাঁড়ায় ৬২ হাজার ৭২৩ কোটি টাকা। নিউ এজের হিসাবে, অক্টোবর শেষে এই স্থিতি ছিল ৫৯ হাজার ৮৮০ কোটি টাকা।
আড়াই শতাংশের লক্ষ্য বাড়ানোর বিবেচনা
বর্তমানে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ব্যাংকগুলোর নিট ঋণ বিতরণের অন্তত ২ দশমিক ৫ শতাংশ কৃষি খাতে দেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করে রেখেছে। জাগো নিউজ জানায়, এই লক্ষ্য বাড়ানোর বিষয়টি বিবেচনা করছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
সম্প্রতি ব্যাংকগুলোর ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের (এমডি) সঙ্গে এক বৈঠকে উপস্থাপিত কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশের জিডিপিতে কৃষি খাতের অবদান ১০ দশমিক ৯৪ শতাংশ এবং মোট শ্রমশক্তির প্রায় ৪৬ শতাংশ এই খাতে নিয়োজিত। অথচ প্রতি বছর গড়ে ৫ শতাংশ হারে ঋণ বাড়লেও কৃষি খাত কাঙ্ক্ষিত গুরুত্ব পাচ্ছে না।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, নিট ঋণের মাত্র আড়াই শতাংশ কৃষিতে দেওয়ার লক্ষ্য বর্তমান বাস্তবতায় অপর্যাপ্ত। উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, জলবায়ু ঝুঁকি, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মতো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কৃষিতে পর্যাপ্ত অর্থায়ন জরুরি। প্রতিবেদনের মূল্যায়ন, ঋণ সীমিত থাকায় উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, যান্ত্রিকীকরণ, উন্নত বীজ-সার ও সেচ ব্যবস্থাপনা এবং জলবায়ু সহনশীল কৃষির জন্য প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, যা খাদ্য নিরাপত্তা ও গ্রামীণ দারিদ্র্য হ্রাসে ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।

কৃষিঋণ বাড়াতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উদ্যোগ
বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন কর্মকর্তা জাগো নিউজকে জানান, খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করে কৃষক ও কৃষি খাতের সার্বিক উন্নয়নে কেন্দ্রীয় ব্যাংক নানামুখী উদ্যোগ নিচ্ছে। ঋণ বিতরণে স্বচ্ছতা ও সচেতনতা বাড়াতে প্রকাশ্য ও দলগত ঋণ কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। ব্যাংক শাখার বাইরেও এজেন্ট ব্যাংকিং, উপশাখা, চুক্তিভিত্তিক চাষ (কন্ট্রাক্ট ফার্মিং), এরিয়া অ্যাপ্রোচ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানের (এমএফআই) সঙ্গে সংযোগের মাধ্যমে কৃষিঋণ বিতরণ বাড়ানোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
২০২৫-২৬ অর্থবছরের ঋণ নীতিমালায় যেসব বিষয় যুক্ত হয়েছিল, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড ও বাংলাদেশ পোস্টের প্রতিবেদনে তার উল্লেখ রয়েছে:
- প্রাণিসম্পদ খাতে বরাদ্দ বাড়িয়ে ২০ শতাংশ করা
- সেচ ও কৃষি যন্ত্রপাতির জন্য ২ শতাংশ বরাদ্দ
- আড়াই লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণে সিআইবি সার্ভিস চার্জ মওকুফ
- চুক্তিভিত্তিক চাষ ও এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের আওতা বাড়ানো
- শসা, কচুর লতি, বিটরুট, কালোজিরা, আদা, রসুন, হলুদ ও খেজুরের গুড় নীতিমালায় যুক্ত করা
- উৎপাদন সম্ভাবনা অনুযায়ী অঞ্চলভিত্তিক ঋণ বিতরণ নির্দেশিকা
এ ছাড়া ডাল, তেলবীজ, মসলা ও ভুট্টা চাষে ব্যাংকগুলোকে ৪ শতাংশ ভর্তুকি সুদে ঋণ দেওয়ার নির্দেশনা দিয়েছিল বাংলাদেশ ব্যাংক, জানায় নিউ এজ।

ছবি: বলরাম মহলদার / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, বাংলাদেশ পোস্ট, নিউ এজ




মন্তব্য
(০)