২০২৬ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি, যেদিন বাংলা বর্ষপঞ্জির বসন্তের প্রথম দিন পহেলা ফাল্গুন আর বিশ্ব ভালোবাসা দিবস একসঙ্গে পড়েছিল, সেদিন দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মাগুরা শহরের ফুলের দোকানগুলোতে তরুণ-তরুণীদের ভিড় দেখা গিয়েছিল। সকাল থেকেই শহরের চৌরঙ্গীর মোড় ও সড়কের পাশে স্থায়ী ও অস্থায়ী ফুলের দোকানগুলোয় ক্রেতাদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। সেদিন দুপুর ১টা ৪৯ মিনিটে প্রকাশিত প্রতিবেদনে এ খবর জানিয়েছিলেন জাগো নিউজের মাগুরা জেলা প্রতিনিধি।
চৌরঙ্গীর মোড়ে গোলাপ, গাঁদা আর তোড়া
বিক্রেতারা লাল গোলাপ, গাঁদা, জারবেরা, রজনীগন্ধা ও নানা ধরনের তোড়া সাজিয়ে বসেছিলেন। প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশেষ করে লাল গোলাপ এবং হলুদ ও কমলা রঙের ফুলের চাহিদা ছিল বেশি। তরুণ-তরুণীদের পাশাপাশি অনেকে পরিবার নিয়েও ফুল কিনতে বের হয়েছিলেন।
ফুল বিক্রেতারা প্রতিবেদককে জানান, দুই আয়োজন একই দিনে পড়ায় বিক্রি কয়েক গুণ বেড়েছে। তাঁরা আরও জানান, পাইকারি বাজারে দামের ওঠানামার প্রভাব পড়েছে খুচরা বাজারে। সেদিন মাগুরায় মান ও আকারভেদে প্রতি পিস গোলাপ বিক্রি হচ্ছিল ৩০ থেকে ৬০ টাকায়, আর বিভিন্ন নকশার তোড়া বিক্রি হচ্ছিল ৩০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকার মধ্যে।
দিনটি উদযাপন করতে তরুণ-তরুণীরা নানা সাজে ফুলের দোকানে এসে ফুল কিনছিলেন, বন্ধু-বান্ধবীদের সঙ্গে সময় কাটাচ্ছিলেন। তরুণীরা প্রতিবেদককে বলেন, দিনটি সবার জীবনে বয়ে আনুক সুন্দর আগামী, সবাই খুঁজে পাক ভালোবাসার মানুষকে।
দাম নিয়ে ক্রেতাদের মত ছিল দুই রকম। কেউ বলছিলেন, বিশেষ দিন হওয়ায় দাম কিছুটা বেশি মনে হলেও প্রিয়জনের জন্য ফুল কিনতেই হচ্ছে। আবার কেউ কেউ মনে করছিলেন, অন্যান্য বছরের তুলনায় দাম সহনীয় আছে।
বিক্রি নিয়ে সব ব্যবসায়ী অবশ্য একমত ছিলেন না। ব্যবসায়ী সোহেল জাগো নিউজকে বলেন, 'আগের মতো আর পহেলা ফাল্গুন পালন হয় না। তাই ফুলের বেচাবিক্রিও কমে গেছে। তবে বিকেলের পর ভিড় আরও বাড়বে।' প্রতিবেদনে দুই ধরনের বক্তব্যই তুলে ধরা হয় এবং বলা হয়, সব মিলিয়ে মাগুরার ফুলের বাজারে তৈরি হয়েছিল উৎসবের আবহ; দাম নিয়ে মতভেদ থাকলেও বেচাকেনায় ছিল প্রাণচাঞ্চল্য।
চাহিদার রংও মিলে গিয়েছিল দিনটির সঙ্গে। ২০২৪ সালে দিনটি নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে দ্য ডেইলি স্টার বাংলা লিখেছিল, পহেলা ফাল্গুনে দেশের তরুণ-তরুণীরা হলুদ, কমলা ও বাসন্তী রঙের পোশাকে নিজেদের রাঙান, আর শহরের ফুলের দোকানসহ বিপণিবিতানগুলোতে থাকে সাজ সাজ রব। অন্যদিকে লাল গোলাপই ভালোবাসা দিবসের সঙ্গে সবচেয়ে বেশি জড়িয়ে থাকা ফুল।
বসন্ত আর ভালোবাসা দিবস কেন একই দিনে
কয়েক বছর আগেও পহেলা ফাল্গুন আর পশ্চিমা রীতির ভালোবাসা দিবস পালিত হতো পরপর দুই দিনে। পরিবর্তন আসে বাংলাদেশে প্রচলিত বাংলা বর্ষপঞ্জি সংস্কারের মধ্য দিয়ে। দ্য ডেইলি স্টার বাংলার তথ্য অনুযায়ী, রাষ্ট্রের ঐতিহাসিক দিবসগুলোকে গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারের সঙ্গে সমন্বয় করতে খ্রিস্টীয় ২০১৯ সাল, অর্থাৎ ১৪২৬ বঙ্গাব্দ থেকে বাংলা বর্ষপঞ্জি পরিবর্তন করা হয়। এতে ১৯৫২ সালের মতো ২১ ফেব্রুয়ারি পড়ে ৮ ফাল্গুনে, আর ১৯৭১ সালের মতো ১৬ ডিসেম্বর পড়ে পয়লা পৌষে। এর ফলেই পহেলা ফাল্গুন সরে আসে ১৪ ফেব্রুয়ারিতে, এবং ২০২০ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি থেকে দিবস দুটি একই দিনে উদযাপিত হচ্ছে।
বাংলায় বসন্ত বহুকাল ধরেই যৌবন ও নবজীবনের ঋতু হিসেবে পরিচিত। একই প্রতিবেদনে বলা হয়, বসন্তের প্রথম দিনটি পরিচিত 'বাঙালির ভালোবাসার দিন' হিসেবে, এবং সেখানে উদ্ধৃত করা হয় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গান 'এই নব ফাল্গুনের দিনে'। পত্রিকাটি আরও লিখেছিল, ইতিহাস বলছে, ১৫৮৫ সালে সম্রাট আকবর বাংলা বর্ষপঞ্জি হিসেবে আকবরি সন বা ফসলি সনের সঙ্গে প্রতি বছর ১৪টি উৎসব পালনের রীতিও প্রবর্তন করেন, যার অন্যতম ছিল বসন্ত উৎসব।
বাংলাদেশে আজকের বসন্ত উৎসবের সূচনা অনেক পরে। দ্য ডেইলি স্টার বাংলার তথ্য অনুযায়ী, গত শতকের নব্বইয়ের দশকে রাজনীতির এক উত্তাল সময়ে সাংস্কৃতিক আন্দোলনের হাত ধরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের বকুলতলায় ছোট পরিসরে বসন্ত উৎসব শুরু হয়। পরে ১৪০১ বঙ্গাব্দে জাতীয় বসন্ত উৎসব উদযাপন পরিষদের আয়োজনে ঢাকায় আনুষ্ঠানিকভাবে বসন্ত উৎসব পালন শুরু হয়। পত্রিকাটির ভাষায়, বসন্তের প্রথম দিনে নানা বর্ণিল আয়োজনের মধ্য দিয়ে বাঙালিরা ঋতুরাজকে বরণ করে নেন।
দুই উৎসবের এই মিলনের কথাই বলছিলেন মাগুরার বিক্রেতারা, যখন তাঁরা জানান যে দুই দিবস একসঙ্গে পড়ায় বিক্রি কয়েক গুণ বেড়েছে।
ভালোবাসা দিবস যেভাবে বাংলাদেশে এল
ভালোবাসা দিবস, যার আরেক নাম সেন্ট ভ্যালেন্টাইনস ডে বা সেন্ট ভ্যালেন্টাইনের পর্ব, প্রতি বছর ১৪ ফেব্রুয়ারি পালিত হয়। ভ্যালেন্টাইন নামের এক শহীদের স্মরণে খ্রিস্টীয় পর্ব হিসেবে এর শুরু; অষ্টম শতকের গেলাসিয়ান স্যাক্রামেন্টারিতে ওই তারিখে পর্বটির উল্লেখ আছে। চতুর্দশ ও পঞ্চদশ শতকে দিনটি রোমান্টিক ভালোবাসার সঙ্গে যুক্ত হয়, আর অষ্টাদশ শতকের ইংল্যান্ডে এটি হয়ে ওঠে যুগলদের ফুল, মিষ্টি ও শুভেচ্ছা কার্ড দিয়ে ভালোবাসা প্রকাশের উপলক্ষ। ফুল উপহার দেওয়ার সেই রীতির ধারাতেই প্রতি ফেব্রুয়ারিতে গোলাপের বেচাকেনা তুঙ্গে ওঠে।
বাংলাদেশে দিনটি পালিত হচ্ছে গত শতকের নব্বইয়ের দশক থেকে, বাংলায় যার নাম 'ভালোবাসা দিবস'। ২০১৬ সালে প্রকাশিত এক পরিচিতিমূলক প্রতিবেদনে দ্য ডেইলি স্টার লিখেছিল, সাংবাদিক শফিক রেহমানকে ব্যাপকভাবে দেশে ভালোবাসা দিবসের প্রবর্তক হিসেবে কৃতিত্ব দেওয়া হয়। তিনি ১৯৮৪ সালে সাপ্তাহিক যায়যায়দিন প্রতিষ্ঠা করেন, টেলিভিশনে 'লাল গোলাপ' নামের টক শোসহ নানা অনুষ্ঠান উপস্থাপন করেন, এবং তাঁর অনুরোধে ঢাকার তেজগাঁওয়ে পত্রিকাটির কার্যালয়ের সামনের সড়কের নাম রাখা হয় 'লাভ রোড'।
দিবসটি মূলত শহরাঞ্চলেই পালিত হয়, তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে গ্রামীণ সমাজেও এর কিছুটা প্রভাব পড়েছে; দিনটিতে কোনো সরকারি ছুটি থাকে না। প্রেমিক-প্রেমিকা, বন্ধু, দম্পতি, মা-বাবা ও সন্তান, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা দিনটিতে একে অপরকে কার্ড, ফুল, চকলেট ও নানা উপহার দেন। সমাজের রক্ষণশীল একটি অংশ দিনটিকে পশ্চিমা সংস্কৃতির আমদানি হিসেবে দেখেন, অন্যদিকে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো দিনটি ঘিরে বিশেষ ছাড়ের আয়োজন করে থাকে। মাগুরায় তরুণ-তরুণী ও পরিবারের সদস্যদের গোলাপ কেনার যে ছবি প্রতিবেদনে উঠে এসেছিল, তাতে দেখা যায় রাজধানীর মতো জেলা শহরেও দিনটি পালিত হচ্ছিল।
মাগুরা: জেলা ও শহর
জাতীয় জ্ঞানকোষ বাংলাপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, মাগুরা খুলনা বিভাগের একটি জেলা, আয়তন ১০৩৯.১০ বর্গকিলোমিটার। জেলাটির উত্তরে রাজবাড়ী, দক্ষিণে যশোর ও নড়াইল, পূর্বে ফরিদপুর এবং পশ্চিমে ঝিনাইদহ জেলা। প্রধান নদী গড়াই-মধুমতী, নবগঙ্গা ও কুমার। মাগুরা ১৯৪৫ সালে মহকুমা হয় এবং ১৯৮৪ সালের ১ মার্চ জেলায় উন্নীত হয়।
জেলায় উপজেলা চারটি: মাগুরা সদর, মহম্মদপুর, শালিখা ও শ্রীপুর। ইউনিয়ন ৩৬টি, মৌজা ৫১৩টি, গ্রাম ৭১১টি, আর পৌরসভা একটি, মাগুরা সদরে। ২০১১ সালের আদমশুমারিতে জেলার জনসংখ্যা ছিল ৯ লাখ ১৮ হাজার ৪১৯। বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী, আয়ের প্রধান উৎস কৃষি, ৬৬.৩ শতাংশ; এরপর ব্যবসা ১২.৩৪ শতাংশ, চাকরি ৭.৮৫ শতাংশ এবং পরিবহন ও যোগাযোগ ৩.৫৯ শতাংশ।
মাগুরা শহর নবগঙ্গা নদীর তীরে অবস্থিত। চুয়াডাঙ্গার কাছে উৎপন্ন এই নদীর সঙ্গে মাগুরায় এসে মিলেছে কুমার নদ। শহরটি মাগুরা সদর উপজেলা ও জেলা, দুয়েরই সদর দপ্তর। মাগুরা পৌরসভা গঠিত হয় ১৯৭২ সালে; ৪৪.৩৬ বর্গকিলোমিটার এলাকার পৌরসভাটি ৯টি ওয়ার্ড ও ৬১টি মহল্লায় বিভক্ত। ২০২২ সালের জনশুমারি অনুযায়ী পৌরসভায় খানা ছিল ২৮ হাজার ৭৩৩টি, জনসংখ্যা ১ লাখ ১৪ হাজার ২৪৯।
এশিয়ান হাইওয়ে-১ এর ওপর অবস্থিত মাগুরা এ অঞ্চলের সড়ক যোগাযোগের কেন্দ্র। শহরের ভায়না মোড় গোলচত্বর থেকে ছয় দিকে সড়ক গেছে; এর মধ্যে পূর্বে ফরিদপুর হয়ে ঢাকা, পশ্চিমে ঝিনাইদহ হয়ে কুষ্টিয়া ও চুয়াডাঙ্গা, আর দক্ষিণে যশোর হয়ে খুলনা ও বেনাপোল। মাগুরায় রেলপথ নেই; নিকটতম রেলস্টেশন পাশের জেলা যশোরে, আর বাসে ঢাকা যেতে সময় লাগে প্রায় তিন ঘণ্টা। দক্ষিণে যশোরমুখী এই সড়কটি ফুলের ব্যবসার জন্য গুরুত্বপূর্ণ, কারণ দেশের সবচেয়ে পরিচিত ফুল উৎপাদন এলাকা জেলার দক্ষিণ সীমানার ঠিক ওপারেই।
ফুল আসে কোথা থেকে: যশোরের গদখালী
দেশের কাটা ফুলের বাজারের বড় অংশের জোগান আসে যশোর জেলার ঝিকরগাছা উপজেলা থেকে, যার কেন্দ্র যশোর-বেনাপোল সড়কের পাশের গদখালী পাইকারি ফুলের বাজার। ঝিকরগাছা একটি পৌরসভা ও ১১টি ইউনিয়নে বিভক্ত; এর মধ্যে গদখালী, পানিসারা, নাভারণ ও নির্বাসখোলা ইউনিয়নের মাঠ ফুল চাষের জন্য পরিচিত।
২০২৪ সালের ডিসেম্বরে বার্তা সংস্থা ইউএনবি জানায়, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) তথ্য অনুযায়ী সে বছর ঝিকরগাছায় প্রায় ১ হাজার ২০০ হেক্টর জমিতে ফুল চাষ হয়েছিল, যার সঙ্গে যুক্ত ছিল প্রায় ৬ হাজার পরিবার। সেখানকার কৃষকেরা গোলাপ, রজনীগন্ধা, গ্লাডিওলাস, জারবেরা, গাঁদা ও চন্দ্রমল্লিকাসহ ১১ জাতের ফুল চাষ করেছিলেন। ইউএনবির বর্ণনায়, এ অঞ্চল থেকে দেশের ফুলের চাহিদার প্রায় ৭০ শতাংশ পূরণ হয়, আর ফুলের মূল মৌসুম ডিসেম্বর থেকে এপ্রিল, যা আবর্তিত হয় বিজয় দিবস, ইংরেজি নববর্ষ, পহেলা ফাল্গুন, ভালোবাসা দিবস, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ও স্বাধীনতা দিবস ঘিরে।
একই প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৪ সালের শুরুর দিকে অসময়ের ভারী বৃষ্টি ও উচ্চ তাপমাত্রায় যশোরে ফুলের খেত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল এবং কৃষকেরা লোকসানে পড়েছিলেন। যশোর ফুল উৎপাদক ও বিপণন সমবায় সমিতি লিমিটেডের সভাপতি আব্দুর রহিম ইউএনবিকে বলেছিলেন, সবকিছু ঠিক থাকলে সেই মৌসুমে কৃষকেরা ১০০ কোটি টাকার ফুল বিক্রি করতে পারবেন। ঝিকরগাছা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা জাহাঙ্গীর আলম বলেছিলেন, আবহাওয়া স্থিতিশীল ও বাজার পরিস্থিতি অনুকূল থাকলে ওই পরিমাণ বিক্রি সম্ভব।
মাগুরার প্রতিবেদনের এক বছর আগে, ২০২৫ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি ইউএনবি পহেলা ফাল্গুন, ভালোবাসা দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস সামনে রেখে গদখালীর কৃষকদের প্রস্তুতির খবর দেয়। সেই প্রতিবেদনে গদখালী, নাভারণ ও পানিসারা ইউনিয়নে ফুল চাষের জমি প্রায় ৬০০ হেক্টর এবং যুক্ত কৃষক প্রায় ৬ হাজার বলে উল্লেখ করা হয়; ভিন্ন এলাকা ও ভিন্ন সূত্র ধরায় প্রতিবেদনগুলোর হিসাব আলাদা। এক গোলাপচাষি জানান, দুই দিন আগে যে গোলাপ ৫ টাকায় বিক্রি হয়েছিল, তা তখন প্রতিটি ৮ থেকে ১০ টাকায় বিক্রি হচ্ছিল। জারবেরা তখন প্রতিটি ৮ থেকে ১০ টাকা, রজনীগন্ধা প্রতি স্টিক ৮ থেকে ১০ টাকা, আর গাঁদা প্রতি হাজার ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা। গদখালী ফুলচাষি ও ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক আবু জাফর ইউএনবিকে বলেছিলেন, তিন দিনের উৎসবে ১০০ কোটি টাকার ফুল বিক্রির আশা করছেন ব্যবসায়ীরা।
ফেব্রুয়ারির এই চাঙা বাজারের ইতিহাস পুরোনো। ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে, কোভিড-১৯ এর বিধিনিষেধের দুই বছর পর, ইউএনবি জানায় যে ভালোবাসা দিবস ও পহেলা ফাল্গুন সামনে রেখে গদখালীর বাজার আবার জমে উঠেছে। এক চাষি জানান, মানভেদে প্রতিটি গোলাপ বিক্রি হচ্ছিল ১৫ থেকে ২০ টাকায়, যা এক মাস আগে ছিল ১ থেকে ৩ টাকা। বাংলাদেশ ফ্লাওয়ার সোসাইটির তথ্য অনুযায়ী, যশোরে তখন ৬ হাজার ফুলচাষি ১ হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে ফুল চাষ করতেন; সংগঠনটির সভাপতি আব্দুর রহিম জানান, তিন দিনে অন্তত ২০ কোটি টাকার ফুল বিক্রির আশা করা হচ্ছে। একই প্রতিবেদনে বলা হয়, পানিসারার এক চাষি ওই এলাকায় প্রথমবারের মতো শীতপ্রধান দেশের ফুল টিউলিপ চাষ শুরু করেছিলেন।

মাগুরার দোকানে যে ফুলগুলো ছিল
বাংলাপিডিয়ায় বাংলাদেশে বাণিজ্যিকভাবে চাষ হওয়া ফুলের তালিকায় আছে গোলাপ, গ্লাডিওলাস, হলুদ, লাল ও কমলা রঙের গাঁদা, চন্দ্রমল্লিকা, সিঙ্গেল ও ডাবল ধরনের রজনীগন্ধা এবং সাম্প্রতিক সময়ে পদ্ম। এর মধ্যে তিনটি, সঙ্গে জারবেরা, ২০২৬ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি মাগুরার দোকানে বিক্রি হওয়া ফুল হিসেবে প্রতিবেদনে উল্লেখ ছিল।
গোলাপ রোজেসি পরিবারের রোজা গণের উদ্ভিদ; এই গণে প্রজাতি ১৫০টিরও বেশি। বাংলাদেশে দেশি প্রজাতি একটি, Rosa involucrata, যা ময়মনসিংহ, সিলেট ও চট্টগ্রামের জলাভূমিতে জন্মানো তেমন আকর্ষণীয় নয় এমন এক কাঁটাঝোপ। বাংলাপিডিয়া জানায়, মোগল সম্রাট বাবর উপমহাদেশে 'বসরা' নামের তীব্র সুগন্ধি হালকা গোলাপি একটি জাত নিয়ে আসেন, আর দেশে 'ফাতেমা সাত্তার', 'শিবলী', 'ভাসানী' ও 'শেরেবাংলা'র মতো স্থানীয় জাতও রয়েছে। বাণিজ্যিক চাষিরা মূলত কুঁড়ি সংযোজন (বাডিং) পদ্ধতিতে গোলাপের চারা তৈরি করেন; এভাবে দেশে চাষ হওয়া পরিচিত জাতের মধ্যে আছে পাপা মেইল্যান্ড, ডাবল ডিলাইট, ডাচ গোল্ড, কুইন এলিজাবেথ ও মন্টেজুমা। মুসলিম সংস্কৃতিতে গোলাপজলের কদর আছে, মিলাদ মাহফিলে তা ব্যবহৃত হয়।
বাংলার মালার গাঁদা মূলত Tagetes erecta, সঙ্গে ছোট আকারের Tagetes patula। 'আফ্রিকান গাঁদা' নামে পরিচিত হলেও Tagetes erecta-র আদি নিবাস মেক্সিকো ও মধ্য আমেরিকা, যেখানে অ্যাজটেকরা আনুষ্ঠানিক, ঔষধি ও সাজসজ্জার কাজে এর চাষ করত। এটি ৩০ থেকে ১১০ সেন্টিমিটার উঁচু বীরুৎ জাতীয় গাছ, ফুল হলুদ থেকে কমলা রঙের, আর বীজ থেকে সহজেই বংশবিস্তার করে। পাইকারি বাজারে গাঁদা বিক্রি হয় পিস হিসেবে নয়, হাজার হিসেবে।
জারবেরা সূর্যমুখী পরিবারের (অ্যাস্টারেসি) একটি গণ, আদি নিবাস আফ্রিকার উষ্ণমণ্ডল। বৈজ্ঞানিকভাবে প্রথম বর্ণিত প্রজাতি Gerbera jamesonii, দক্ষিণ-পূর্ব আফ্রিকার বারবারটন বা ট্রান্সভাল ডেইজি, যার বর্ণনা দেন জে. ডি. হুকার, ১৮৮৯ সালে। কাটা ফুল হিসেবে যে জারবেরা বিক্রি হয়, তার বেশির ভাগই Gerbera jamesonii ও Gerbera viridifolia-র সংকর, Gerbera x hybrida নামে পরিচিত; সাদা, হলুদ, কমলা, লাল ও গোলাপি রঙের হাজারো জাত আছে এর। গোলাপ, কার্নেশন, চন্দ্রমল্লিকা ও টিউলিপের পর জারবেরা বিশ্বে পঞ্চম সর্বাধিক ব্যবহৃত কাটা ফুল; টিস্যু কালচার ও বীজ থেকে এর বংশবিস্তার করা হয়।
রজনীগন্ধা (Polianthes tuberosa) অ্যাসপারাগেসি পরিবারের বহুবর্ষজীবী উদ্ভিদ, আদি নিবাস মধ্য ও দক্ষিণ মেক্সিকো। মাটির নিচের কন্দ থেকে গাছ জন্মায়, আর প্রায় এক মিটার উঁচু দণ্ডে ফোটে ধবধবে সাদা, মোমের মতো, তীব্র সুগন্ধি ফুল; ডাবল ফুলের জাত 'দ্য পার্ল'-এর দণ্ড তুলনামূলক খাটো। সপ্তদশ শতকে ফুলটি প্রথম ইউরোপে নেওয়ার পর থেকে সুগন্ধি তৈরিতে এর নির্যাস ব্যবহৃত হয়ে আসছে।

খেত থেকে শহরের দোকান পর্যন্ত
মাগুরার বিক্রেতারা খুচরা দামের সঙ্গে পাইকারি বাজারের ওঠানামাকে যুক্ত করেছিলেন। আগের মৌসুমগুলোতে গদখালী থেকে যে দাম জানা গেছে, তা উৎপাদন এলাকার পাইকারি বাজারে খোলা ফুলের দাম। আর মাগুরার দাম ছিল একটি জেলা শহরে বছরের সবচেয়ে ব্যস্ত দিনে একক গোলাপ ও সাজানো তোড়ার খুচরা দাম।
বাংলাপিডিয়া জানায়, বাংলাদেশে কাটা ফুলের ব্যবসার শুরু মাজার ও উপাসনালয়ের আশপাশে, যেখানে ভক্তরা ফুল কিনতেন। স্বাধীনতার পর সাধারণ মানুষের মধ্যে কাটা ফুলের জনপ্রিয়তা বাড়ে; স্থানীয়ভাবে সংগ্রহ করা ফুল ও আমদানি করা চাষের ফুল দিয়ে বাণিজ্যিক বেচাকেনা শুরু হয়, আর ধীরে ধীরে কৃষকেরা রাজধানী ও অন্যান্য শহরে জোগান দিতে বাণিজ্যিকভাবে ফুল চাষ শুরু করেন। জ্ঞানকোষটির মতে, শৌখিন ও বাণিজ্যিক দুই ধরনের ফুলচাষই এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে; পাতাবাহার, কাটা ফুল (মূলত গোলাপ, রজনীগন্ধা, অর্কিড ও গ্লাডিওলাস) এবং মৌসুমি ফুলের বীজের চাহিদা ধীরে ধীরে বাড়ছে, আর সেই চাহিদা মেটাতে গড়ে উঠছে বেসরকারি নার্সারি।
বাংলাপিডিয়া আরও জানায়, ফুল নিয়ে বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও প্রশিক্ষণ প্রায় ছিলই না; তবে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি) ফুল নিয়ে একটি শাখা এবং বাণিজ্যিক চাষ প্রসারে একটি ফুল গবেষণা কেন্দ্র চালু করেছে। সীমিত পরিমাণ গোলাপ ও রজনীগন্ধা মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপে রপ্তানি হয়।
ফসল তোলার পরের ধাপেও নজর দিয়েছে সরকারি সম্প্রসারণ কার্যক্রম। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে ইউএনবি জানায়, ডিএই যশোরের চাষিদের জন্য ফুল থেকে সুগন্ধি ও এসেনশিয়াল অয়েল তৈরির প্রশিক্ষণ ও কর্মশালার আয়োজন করছিল, এবং চাষিদের আয় বাড়াতে ফুল পরিবহন ও সংরক্ষণ ব্যবস্থা উন্নত করার উদ্যোগও চলছিল। মাগুরার মতো জেলা শহরে, যেখানে উৎপাদন এলাকা থেকে ফুল এনে কয়েক দিনের মধ্যেই বিক্রি করতে হয়, খেত থেকে দোকান পর্যন্ত এই পথই ১৪ ফেব্রুয়ারির মতো দিনে ফুলের সতেজতা ও দাম, দুটিই ঠিক করে দেয়।

ছবি: Kanok Wohab / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, ইউএনবি, দ্য ডেইলি স্টার, দ্য ডেইলি স্টার বাংলা, বাংলাপিডিয়া, উইকিপিডিয়া





মন্তব্য
(০)