২০২৬ সালের জুনে জাগো নিউজ ২৪-এর এক বিশেষ প্রতিবেদনে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) তথ্য তুলে ধরে জানানো হয়, বাংলাদেশে তখন প্রায় ৩৪ প্রজাতির বিদেশি ফল বিভিন্ন অঞ্চলে চাষ হচ্ছিল। এর মধ্যে ডজনখানেক ফল চাষে বাণিজ্যিক সাফল্য এসেছিল, আর সবচেয়ে এগিয়ে ছিল ড্রাগন ও মাল্টা। দেশে উৎপাদিত ড্রাগন ফল ইউরোপের দেশ সুইডেনে রপ্তানিও হয়েছিল।
কোন কোন বিদেশি ফল চাষ হচ্ছে
কৃষি তথ্য সার্ভিস ও ডিএইর হর্টিকালচার উইংয়ের তথ্য অনুযায়ী এই হিসাব ছিল প্রায় ৩৪ প্রজাতির। মাঠ পর্যায়ে নিয়মিত চাষ হওয়া প্রধান বিদেশি ফলের মধ্যে ছিল ড্রাগন, মাল্টা, নাশপাতি, কমলা, অ্যাভোকাডো, রাম্বুটান, স্ট্রবেরি, সৌদি খেজুর, কিউই, লংগান, ল্যাংসাট, জাবাটিকাবা, শান্তল, পিচফল, আলুবোখারা, পার্সিমন, এগফ্রুট, সাওয়ার সপ, প্যাশন ফ্রুট ও ডুরিয়ান।
ডিএই এর মধ্যে ডজনখানেক ফলকে দেশের আবহাওয়া ও মাটির জন্য সম্ভাবনাময় হিসেবে চিহ্নিত করে। অধিদপ্তরের হিসাবে, এসব ফল দিয়ে দেশের বাজারে আমদানি করা ফলের ১৫ থেকে ২০ শতাংশ চাহিদা পূরণ করা সম্ভব। ড্রাগন, মাল্টা ও স্ট্রবেরি ছাড়াও অ্যাভোকাডো, রাম্বুটান ও বারোমাসি আঠাবিহীন কাঁঠাল মাঠপর্যায়ে ভালো সাফল্য পেয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীন ডিএই ১৯৮২ সালে কয়েকটি সরকারি সংস্থা একীভূত করে গঠিত হয়।

ড্রাগন: আমদানির ফল থেকে রপ্তানির স্বপ্ন
ড্রাগন ফল ক্যাকটাস গোত্রের সেলেনিসেরিয়াস (Selenicereus) গণের কয়েকটি প্রজাতির ফল। এর আদি নিবাস দক্ষিণ মেক্সিকো এবং গুয়াতেমালা, কোস্টারিকা ও এল সালভাদরের প্রশান্ত মহাসাগরীয় উপকূল। ডিএইর তথ্যমতে, বাংলাদেশে এ ফলের যাত্রা শুরু হয় ২০০৭ সালে, যখন থাইল্যান্ড, ফ্লোরিডা ও ভিয়েতনাম থেকে বিভিন্ন জাত দেশে আনা হয়। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে দ্য ডেইলি স্টার লিখেছিল, একসময়ের বিদেশি এই ফল বাংলাদেশে গ্রীষ্মের নিয়মিত ফলে পরিণত হয়েছে ।
ডিএইর হিসাবে, ড্রাগনের বাণিজ্যিক প্রসার ঘটে ২০২০ সালের পরে। ২০২১-২২ অর্থবছরে ১ হাজার ১১৫ হেক্টর জমিতে উৎপাদন হয় ১৩ হাজার ৮৭২ টন। ২০২২-২৩ অর্থবছরে ২ হাজার ৫৮৮ হেক্টর জমিতে উৎপাদন দাঁড়ায় ৫১ হাজার ২৮৭ টনে, আর ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তা বেড়ে হয় ৬৮ হাজার ৮১৩ টন। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের উৎপাদন এক লাখ টনের কাছাকাছি হবে বলে তখন ধারণা করা হচ্ছিল।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, এর বছর পাঁচেক আগেও ড্রাগনকে উচ্চবিত্তের ফল মনে করা হতো, যা থাকত অভিজাত সুপারশপের কাচঘেরা তাকে। ২০২৬ সালে সেই ফল ভ্রাম্যমাণ ভ্যানেও বিক্রি হচ্ছিল এবং দাম কমে সাধারণ মানুষের খাদ্যতালিকায় জায়গা করে নিয়েছিল। ডিএই জানায়, আগের বছর প্রথমবারের মতো সুইডেনে ড্রাগন ফল রপ্তানি করা হয়।
প্রতিবেদন প্রকাশের কয়েক দিন আগে জাতীয় ফল মেলা উদ্বোধনের সময় কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ সাংবাদিকদের বলেন, 'কয়েক বছর আগে ড্রাগন ফল আমদানি করতে হতো। এখন আমরা স্বপ্ন দেখছি ড্রাগন ফল রপ্তানির। আমাদের দেশের আবহাওয়ার কারণে আমরা এ সাহস পাচ্ছি। কারণ, বাইরের দেশের ড্রাগন এত সুস্বাদু হয় না।'
পাহাড়ে মাল্টা, উচ্চমূল্যের ফসল স্ট্রবেরি
ড্রাগনের মতো মাল্টার উৎপাদনও দ্রুত বাড়ছিল। প্রতিবেদনে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে দেশে মাল্টার উৎপাদন ছিল ১৭ হাজার টন, যা ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৮৪ হাজার টন ছাড়িয়ে যায়। একই সময়ে মাল্টার বাগান ২ হাজার ৪৩৩ হেক্টর থেকে বেড়ে প্রায় আট হাজার হেক্টরে পৌঁছায়।
পার্বত্য তিন জেলা বান্দরবান, রাঙ্গামাটি ও খাগড়াছড়ির কৃষক ও উদ্যোক্তারা মাল্টা চাষে ঝুঁকছিলেন। চট্টগ্রাম বিভাগের এই তিন জেলা নিয়ে গঠিত পার্বত্য চট্টগ্রাম দেশের দক্ষিণ-পূর্বে ভারত ও মিয়ানমার সীমান্তঘেঁষা পাহাড়ি অঞ্চল। কম খরচে বেশি লাভ হওয়ায় সমতলের নতুন প্রজন্মের কৃষকদের কাছেও ফলটি জনপ্রিয় হয়ে উঠছিল। ডিএইর উদ্যানতত্ত্ববিদ মো. মইনুল হক জাগো নিউজকে বলেন, 'এসব বিদেশি ফল চাষের কারণে পার্বত্য চট্টগ্রামের মতো দুর্গম এলাকাও এখন বাণিজ্যিক ফল চাষের আওতায় এসেছে।'
শীতপ্রধান দেশের ফল স্ট্রবেরির বাণিজ্যিক চাষ বাংলাদেশে শুরু হয় ২০০৭ সালে। নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে ফলটি দেশে উচ্চমূল্যের ফসল হিসেবে জায়গা করে নেয়।

তরুণ উদ্যোক্তা ও কমছে আমদানিনির্ভরতা
মো. মইনুল হক বলেন, 'বিদেশি ফলের একটি বাড়তি চাহিদা আগে থেকেই ছিল। যে কারণে এসব ফলের বাণিজ্যিক মূল্য বেশি, চাষাবাদে আগ্রহ বাড়ছে। কিছু ফল বাংলাদেশের আবহাওয়া ও ভূপ্রকৃতির জন্য উপযোগীও। সেসব ফলে সফলতা আসছে।'
কৃষি অর্থনীতিবিদ জাহাঙ্গীর আলম খান বলেন, 'এ খাতের সবচেয়ে ইতিবাচক দিক হলো, আনুষ্ঠানিক শিক্ষায় শিক্ষিত তরুণরা এখন ফলের বাণিজ্যিক চাষে ক্যারিয়ার গড়ছেন।'
প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশি ও দেশে উৎপাদিত বিদেশি ফলের সরবরাহ বাড়ায় বাজারে ফলের দাম স্থিতিশীল থাকছিল এবং আমদানিনির্ভরতা কমছিল। বাংলাদেশ ফ্রেশ ফ্রুটস ইমপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সিরাজুল ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, 'ডলারের বাড়তি রেট ও শুল্কায়নের কারণে আমদানি করা আপেল বা আঙুরের খরচ অনেক বেড়েছে। তবে দেশে বিদেশি ফলের প্রচুর উৎপাদন থাকায় ক্রেতারা এসব ফলের দিকেই বেশি ঝুঁকছেন।'

ছবি: Abu Sayeed / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, দ্য ডেইলি স্টার, উইকিপিডিয়া





মন্তব্য
(০)