কৃষি বিষয়ক লেখালেখিতে উৎসাহ দিতে ‘বিএআরএফ মিডিয়া অ্যাওয়ার্ড-২০২৫’ চালু করেছিল কৃষি বিষয়ে প্রতিবেদন করা সাংবাদিকদের সংগঠন বাংলাদেশ এগ্রিকালচার রিপোর্টার্স ফোরাম (বিএআরএফ)। ২০২৫ সালের ৩ ডিসেম্বর প্রকাশিত এক বিজ্ঞপ্তিতে সংগঠনটি দেশের জাতীয় ও স্থানীয় পত্রিকা, অনলাইন নিউজ পোর্টাল এবং টেলিভিশনে কর্মরত সাংবাদিকদের কাছ থেকে কৃষি বিষয়ক প্রতিবেদন আহ্বান করে। মোট পাঁচজন সাংবাদিককে এই পুরস্কার দেওয়ার কথা ছিল। ২০২৪ সালের ১ ডিসেম্বর থেকে ২০২৫ সালের ৩০ নভেম্বরের মধ্যে প্রকাশিত বা প্রচারিত প্রতিবেদন জমা দেওয়া যেত, আর প্রতিবেদন জমার শেষ তারিখ ছিল ২০২৫ সালের ২০ ডিসেম্বর।
সিদ্ধান্তটি নেওয়া হয় সম্প্রতি ঢাকার ফার্মগেটের খামারবাড়ির একটি হলরুমে অনুষ্ঠিত সংগঠনের কার্যনির্বাহী কমিটির সভায়। বিএআরএফ সভাপতি রফিকুল ইসলাম সবুজের সভাপতিত্বে এবং সাধারণ সম্পাদক কাওসার আজমের পরিচালনায় অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে সংগঠনের অন্যান্য নেতারা উপস্থিত ছিলেন। একই দিনে জাগো নিউজ ছাড়াও দৈনিক যুগান্তর ও কালবেলা একই ভাষায় বিজ্ঞপ্তিটি প্রকাশ করে।
এক বছরের কৃষি প্রতিবেদনের জন্য পাঁচটি পুরস্কার
কার্যনির্বাহী কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সেবার পাঁচজনকে ‘বিএআরএফ মিডিয়া অ্যাওয়ার্ড-২০২৫’ দেওয়ার কথা ছিল। বিজ্ঞপ্তিতে বাংলাদেশ থেকে প্রকাশিত জাতীয় ও স্থানীয় পত্রিকা, অনলাইন নিউজ পোর্টাল এবং টেলিভিশনে কর্মরত সাংবাদিকদের প্রতিবেদন পাঠানোর আহ্বান জানানো হয়। ২০২৪ সালের ১ ডিসেম্বর থেকে ২০২৫ সালের ৩০ নভেম্বর, এই বারো মাসে প্রকাশিত বা প্রচারিত কৃষি বিষয়ক প্রতিবেদন জমা দেওয়া যেত, এবং নিরপেক্ষ বিচারকদের মূল্যায়নে সেগুলোর মধ্য থেকে সেরা প্রতিবেদন পুরস্কারের জন্য বিবেচিত হওয়ার কথা ছিল।
বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার হিসেবে নগদ ৩০ হাজার টাকা, ক্রেস্ট ও সম্মাননাপত্র তুলে দেওয়ার কথা ছিল। বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী সরকারের গুরুত্বপূর্ণ এক বা একাধিক উপদেষ্টা, খাত সংশ্লিষ্ট বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ এবং রাজনৈতিক নেতাদের উপস্থিতিতে এই পুরস্কার দেওয়া হবে। তবে বিজ্ঞপ্তিতে পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠানের তারিখ বা স্থান জানানো হয়নি, বিচারকদের নামও উল্লেখ করা হয়নি।
সংগঠনটি এই পুরস্কারকে কৃষি বিষয়ক লেখালেখিতে উৎসাহ দেওয়ার উপায় হিসেবে বর্ণনা করে। ছাপা পত্রিকা, অনলাইন ও টেলিভিশনের জন্য বিজ্ঞপ্তিতে আলাদা কোনো বিভাগ রাখা হয়নি: তিন ধরনের প্রতিবেদনই একই নিয়মে একই পাঁচটি পুরস্কারের জন্য প্রতিযোগিতা করার কথা ছিল।
প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নিয়ম
অংশ নিতে আগ্রহী সাংবাদিকদের জন্য বিজ্ঞপ্তিতে সাতটি নিয়ম দেওয়া হয়:
- মোট পাঁচজনকে পুরস্কার দেওয়া হবে।
- ২০২৪ সালের ১ ডিসেম্বর থেকে ২০২৫ সালের ৩০ নভেম্বরের মধ্যে প্রকাশিত ও প্রচারিত প্রতিবেদন অ্যাওয়ার্ডের জন্য ই-মেইলে জমা দিতে হবে।
- সিরিজ প্রতিবেদন ছাড়া একজন একাধিক প্রতিবেদন জমা দিতে পারবেন না।
- প্রিন্ট ও অনলাইনের ক্ষেত্রে প্রকাশিত প্রতিবেদনের ই-পেপার কপি এবং অনলাইন লিংক জমা দিতে হবে। মেইলের বিষয়ে লিখতে হবে: ‘বিএআরএফ মিডিয়া অ্যাওয়ার্ড-২০২৫’।
- টেলিভিশন প্রতিবেদনের লিংক পাঠানোর ক্ষেত্রে প্রতিবেদনটি অবশ্যই সংশ্লিষ্ট টেলিভিশনের অফিসিয়াল ইউটিউব চ্যানেল বা ফেসবুক পেজের হতে হবে।
- পাসপোর্ট আকারের দুই কপি রঙিন ছবিসহ প্রতিবেদকের সংক্ষিপ্ত জীবনবৃত্তান্ত জমা দিতে হবে।
- যথাযথ নিয়মে জমা দেওয়া প্রতিবেদনগুলো বাংলাদেশ এগ্রিকালচার রিপোর্টার্স ফোরাম (বিএআরএফ) মনোনীত বিচারকমণ্ডলী মূল্যায়ন করবেন এবং এ বিষয়ে তাদের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত বলে বিবেচিত হবে। প্রত্যেক বিচারক পৃথকভাবে প্রতিটি প্রতিবেদন যাচাই করবেন, এরপর সর্বোচ্চ গড় নম্বরের ভিত্তিতে বিচারকমণ্ডলীর সভায় চূড়ান্ত বিজয়ী নির্ধারিত হবে।
অর্থাৎ নিয়ম অনুযায়ী একজন সাংবাদিক একটি প্রতিবেদনই জমা দিতে পারতেন; ব্যতিক্রম ছিল ধারাবাহিক বা সিরিজ প্রতিবেদন। পত্রিকা বা অনলাইনের প্রতিবেদককে একই প্রতিবেদনের ই-পেপার কপি এবং অনলাইন সংস্করণের লিংক, দুটোই দিতে হতো। টেলিভিশনের প্রতিবেদককে সংশ্লিষ্ট চ্যানেলের নিজস্ব অফিসিয়াল ইউটিউব চ্যানেল বা ফেসবুক পেজের লিংক পাঠাতে হতো।
বিচারের পদ্ধতি বলা হয়েছিল শেষ নিয়মে। প্রত্যেক বিচারক আলাদাভাবে প্রতিটি প্রতিবেদন যাচাই করবেন, তারপর বিচারকমণ্ডলীর যৌথ সভায় সর্বোচ্চ গড় নম্বর পাওয়া প্রতিবেদনগুলো বিজয়ী হিসেবে নির্ধারিত হবে। বিচারকমণ্ডলীর সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত বলে গণ্য হওয়ার কথা ছিল।
প্রতিবেদন ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংগঠনের ই-মেইল ঠিকানায় পাঠাতে বলা হয়। যেকোনো তথ্যের জন্য বিজ্ঞপ্তিতে বিএআরএফের সাধারণ সম্পাদক কাওসার আজম এবং দপ্তর সম্পাদক ফারুক আহমাদ আরিফের টেলিফোন নম্বর দেওয়া হয়েছিল।

পুরস্কারের আয়োজক সংগঠন
বাংলাদেশ এগ্রিকালচার রিপোর্টার্স ফোরাম ঢাকার পত্রিকা, অনলাইন পোর্টাল ও টেলিভিশন চ্যানেলে কৃষি বিষয়ে প্রতিবেদন করা সাংবাদিকদের সংগঠন। বিজ্ঞপ্তির সময় সংগঠনের যে কার্যনির্বাহী কমিটি দায়িত্বে ছিল, সেটি গঠিত হয় ২০২৪ সালের ১০ জুলাই, বুধবার। সেদিন দৈনিক যুগান্তরে প্রকাশিত এক প্রতিবেদন থেকে কমিটি গঠনের এই বিবরণ জানা যায়। ঢাকার সেগুনবাগিচার একটি রেস্টুরেন্টে দৈনিক ইত্তেফাকের একজন জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদকের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় সর্বসম্মতভাবে ১৫ সদস্যের এই কমিটি গঠন করা হয়।
কমিটিতে দৈনিক সময়ের আলোর বিশেষ প্রতিনিধি রফিকুল ইসলাম সবুজকে সভাপতি এবং দৈনিক নয়া দিগন্তের নিজস্ব প্রতিবেদক কাওসার আজমকে সাধারণ সম্পাদক করা হয়। সহসভাপতি, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, অর্থ সম্পাদক, সাংগঠনিক সম্পাদক, দপ্তর সম্পাদক, প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক এবং প্রশিক্ষণ ও গবেষণা সম্পাদকের পদগুলো পান দৈনিক আমাদের সময়, এটিএন নিউজ, আজকের পত্রিকা, জাগো নিউজ, প্রতিদিনের বাংলাদেশ, দৈনিক সংবাদ ও দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের প্রতিবেদকেরা। পুরস্কারের বিজ্ঞপ্তিতে দপ্তর সম্পাদক হিসেবে যাঁর নাম আছে, প্রতিদিনের বাংলাদেশের সেই ফারুক আহমাদ আরিফ কমিটি গঠনের সময় থেকেই এই পদে ছিলেন। কার্যনির্বাহী সদস্যরা ছিলেন দৈনিক ইত্তেফাক, সমকাল, ভোরের কাগজ, কালবেলা, খবরের কাগজ ও যুগান্তরের প্রতিবেদক।
ফলে কমিটির সদস্যরা ছিলেন সেই সব ধরনের গণমাধ্যম থেকে, যাদের সাংবাদিকদের জন্য পুরস্কারটি ঘোষণা করা হয়: জাতীয় দৈনিক, অনলাইন নিউজ পোর্টাল এবং টেলিভিশন চ্যানেল। একই সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের নেতৃত্বে এই কমিটিই ‘বিএআরএফ মিডিয়া অ্যাওয়ার্ড-২০২৫’ চালুর সিদ্ধান্ত নেয়।
২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে কৃষি সচিবের সঙ্গে মতবিনিময়
২০২৪ সালের ৮ সেপ্টেম্বর কৃষি মন্ত্রণালয়ে মন্ত্রণালয়ের সচিবের সঙ্গে বিএআরএফের কার্যনির্বাহী কমিটি মতবিনিময় করে, সেদিন কালবেলা এ খবর প্রকাশ করে। এতে সংগঠনের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক, অর্থ সম্পাদক, দপ্তর সম্পাদক, প্রশিক্ষণ ও গবেষণা সম্পাদক এবং দুজন কার্যনির্বাহী সদস্য অংশ নেন।
ওই সভায় কৃষি সচিব সাংবাদিকদের জানান, দেশে ইউরিয়া ও নন-ইউরিয়া সারের যে মজুত আছে, তা দিয়ে ২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত কোনো সংকট হবে না; তবে সার আমদানির এলসি খোলার ক্ষেত্রে তখনও কিছুটা সমস্যা ছিল, যা সমাধানে কাজ চলছিল। কৃষি মন্ত্রণালয়ের হিসাবে তখন মজুত ছিল ৪ লাখ ৬১ হাজার মেট্রিক টন ইউরিয়া, ৩ লাখ ২২ হাজার মেট্রিক টন টিএসপি, ৩ লাখ ৫৭ হাজার টন ডিএপি এবং ৪ লাখ ৩৭ হাজার টন এমওপি সার।
সচিব সেদিন উজান থেকে নেমে আসা ঢল ও টানা ভারী বর্ষণে ২০২৪ সালের ১৬ থেকে ৩০ আগস্টের বন্যার হিসাবও দেন। ওই সময়ে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের সংখ্যা ছিল ১৪ লাখ ১৪ হাজার ৮৯ জন। ধান, সবজি, ফলমূলসহ প্রায় ১০ লাখ মেট্রিক টন ফসল নষ্ট হয়, যার আর্থিক মূল্য ৩ হাজার ৩৪৬ কোটি টাকা, এবং মোট ৩ লাখ ৭২ হাজার ৭৩৩ হেক্টর জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ক্ষতিগ্রস্ত ২৩টি জেলার মধ্যে মূলত ১১টি জেলায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল। কৃষি পুনর্বাসনে তখন পর্যন্ত ১৯৩ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল, যা কয়েকটি ধাপে ব্যবহার করার কথা ছিল।
পুনর্বাসন কর্মসূচির আওতায় ৯টি জেলার ৮০ হাজার ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষককে এক বিঘা জমি চাষের জন্য বিনামূল্যে রোপা আমনের উফশী জাতের বীজ, ১০ কেজি সার এবং মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে এক হাজার টাকা করে দেওয়ার কথা জানান সচিব। বসতবাড়িতে আগাম শীতকালীন সবজি চাষের জন্য ২২টি জেলায় দেড় লাখ কৃষককে বিভিন্ন জাতের সবজির বীজ ও এক হাজার টাকা করে দেওয়ার কথাও তিনি বলেন। বন্যার কারণে খাদ্য ঘাটতি হবে কি না, এমন প্রশ্নে সচিব বলেন, আগামী বোরো মৌসুমে উৎপাদনে সমস্যা না হলে খাদ্য নিরাপত্তা নিয়ে কোনো সংকট হবে না।
যেখানে সিদ্ধান্ত হয়: খামারবাড়ি
যে খামারবাড়িতে কার্যনির্বাহী কমিটির সভা হয়, সেটি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) প্রধান কার্যালয়ের প্রচলিত নাম। এর অবস্থান ঢাকার ফার্মগেটে, যা রাজধানীর অন্যতম ব্যস্ত বাণিজ্যিক এলাকা ও যাতায়াতের কেন্দ্র; ব্রিটিশ আমলে এখানে একটি খামারের প্রধান ফটক ছিল বলে এলাকাটির নাম হয় ফার্মগেট। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীন সরকারি দপ্তর, যার দায়িত্ব কৃষি সম্প্রসারণ, অর্থাৎ নতুন ফসলের জাত ও চাষের পদ্ধতি কৃষকের কাছে পৌঁছে দেওয়া।
অধিদপ্তরটি গঠিত হয় ১৯৮২ সালে, কৃষি অধিদপ্তর (সম্প্রসারণ ও ব্যবস্থাপনা), পাট অধিদপ্তর, উদ্ভিদ সংরক্ষণ অধিদপ্তর, হর্টিকালচার বোর্ড, তামাক উন্নয়ন বোর্ড এবং কেন্দ্রীয় সম্প্রসারণ সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউট (সিইআরডিআই) একীভূত করে। ১৯৯০ সাল পর্যন্ত অধিদপ্তরটি কৃষকদের প্রশিক্ষণে ‘ট্রেনিং অ্যান্ড ভিজিট’ পদ্ধতি অনুসরণ করে, পরে দলভিত্তিক প্রশিক্ষণে যায়। ১৯৯৬ সালে সরকার অধিদপ্তরের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য নতুন কৃষি সম্প্রসারণ নীতি গ্রহণ করে।
খামারবাড়িতে আছে কৃষি তথ্য সার্ভিসও (এআইএস), যা কৃষি মন্ত্রণালয়ের যোগাযোগ বিভাগ; এর কার্যক্রম শুরু হয় ১৯৬১ সালে। বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী এআইএস মাঠকর্মী ও কৃষকদের জন্য তথ্য ও প্রশিক্ষণ উপকরণ তৈরি করে, বাংলায় মাসিক পত্রিকা ‘কৃষিকথা’ ও সম্প্রসারণ বার্তা প্রকাশ করে এবং ‘মাটি ও মানুষ’-এর মতো কৃষি সম্প্রচার অনুষ্ঠানে যুক্ত থাকে। মাঠকর্মীদের তথ্য উপকরণ ব্যবহারে প্রশিক্ষণ দেওয়া এবং গ্রামের মানুষকে চাষি ক্লাব ও জেলে ক্লাব গঠনে উদ্বুদ্ধ করাও এর ঘোষিত লক্ষ্যের মধ্যে আছে। ১৯৮৫ সালে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের এক সিদ্ধান্তে সংস্থাটি বিভক্ত হয় এবং এর জনবল ও যন্ত্রপাতির এক-তৃতীয়াংশ প্রাণিসম্পদ ও মৎস্য বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে স্থানান্তর করা হয়। মন্ত্রণালয়ের অধীন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকেও এআইএস সেবা দেয়, যার মধ্যে আছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো, কৃষি বিপণন অধিদপ্তর, মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউট এবং বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন।

২০২৫ সালে কৃষি সাংবাদিকতার অন্যান্য পুরস্কার
২০২৫ সালে দেশে কৃষি সাংবাদিকতাকে স্বীকৃতি দেওয়া আরও কয়েকটি পুরস্কারের পাশে যুক্ত হয় বিএআরএফের এই উদ্যোগ। প্রথম আলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের মে মাসে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক ও টেলিভিশন চ্যানেল চ্যানেল আই রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে এক সংবাদ সম্মেলনে তাদের যৌথ উদ্যোগের দশম ‘কৃষি অ্যাওয়ার্ড ২০২৫’ ঘোষণা করে। দেশের কৃষি ও খাদ্যনিরাপত্তায় ভূমিকা রাখা ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে সম্মানিত করতে সেবার মোট ১৩টি শ্রেণিতে পুরস্কার দেওয়ার কথা ছিল, যার একটি ছিল সেরা সাংবাদিক (কৃষি)। ব্যক্তিপর্যায়ের অন্য শ্রেণিগুলো ছিল আজীবন সম্মাননা, সেরা নারী কৃষক, সেরা পুরুষ কৃষক, পরিবর্তনের নায়ক, জুরি স্পেশাল বা বিচারকমণ্ডলীর বিশেষ সম্মাননা, সেরা মেধাবী সংগ্রামী কৃষক (পুরুষ ও নারী) এবং জলবায়ু অভিযোজনভিত্তিক শ্রেষ্ঠ কৃষক; প্রতিষ্ঠান পর্যায়ে পুরস্কার ছিল কৃষি গবেষণা ও উদ্ভাবনে, কৃষি সহায়তা ও বাস্তবায়নে শ্রেষ্ঠ প্রতিষ্ঠান এবং বছরের শ্রেষ্ঠ কৃষিপণ্য রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানের জন্য। সে বছর নতুন শ্রেণি হিসেবে যুক্ত হয় ‘ছাদকৃষি’। ২০২৫ সালের ২৫ মে থেকে ১৫ জুলাই পর্যন্ত মনোনয়ন নেওয়ার কথা ছিল; ১৬ থেকে ২০ জুলাইয়ের মধ্যে প্রতিটি শ্রেণিতে সর্বোচ্চ তিনজন প্রার্থী বাছাই করে মাঠপর্যায়ে যাচাই ও বিচারকদের পর্যালোচনার পর বিজয়ী চূড়ান্ত করার কথা জানানো হয়।
সমকালের ১৮ নভেম্বর ২০২৫ তারিখের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের নভেম্বরে প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ দেশের কৃষি ও কৃষি প্রক্রিয়াজাত খাত নিয়ে কাজ করা সাংবাদিকদের সম্মাননা জানাতে বাংলাদেশ এগ্রো-ইন্ডাস্ট্রি মিডিয়া অ্যাওয়ার্ড চালু করে। প্রিন্ট, অনলাইন ও টেলিভিশন, এই তিন ক্যাটেগরিতে সেরা প্রতিবেদনের জন্য সে বছর সাতজন সাংবাদিককে পুরস্কার দেওয়ার কথা ছিল। প্রতিবেদন জমা দিতে হতো অনলাইনে, ওয়েবসাইটের মাধ্যমে; কোনো হার্ড কপি বা সরাসরি জমার প্রয়োজন ছিল না। কোনো প্রতিবেদন অনলাইন ও প্রিন্ট দুই মাধ্যমেই প্রকাশিত হলে যেকোনো একটি ক্যাটেগরিতে জমা দিতে হতো।
এগুলোর তুলনায় বিএআরএফের পুরস্কারটির আয়োজক ছিলেন সাংবাদিকেরা নিজেরাই, কোনো ব্যাংক, সম্প্রচারমাধ্যম বা কোম্পানি নয়। নিয়মেও পার্থক্য ছিল: এতে গণমাধ্যমভিত্তিক আলাদা কোনো ক্যাটেগরি ছিল না, প্রতিবেদন নেওয়া হতো ই-মেইলে ই-পেপার কপি ও অনলাইন লিংকসহ, আর জমার একটিই শেষ তারিখ ছিল, ২০২৫ সালের ২০ ডিসেম্বর।
কৃষি সাংবাদিকতার দীর্ঘ ধারা
বাংলাদেশে কৃষি সাংবাদিকতার ইতিহাস দীর্ঘ। সাংবাদিক ও কৃষি উন্নয়নকর্মী শাইখ সিরাজ ১৯৮২ সাল থেকে বাংলাদেশ টেলিভিশনে ‘মাটি ও মানুষ’ অনুষ্ঠানের সহ-উপস্থাপক ছিলেন। অনুষ্ঠানটিতে অনুসন্ধানী প্রামাণ্যচিত্র ও গভীর প্রতিবেদন প্রচার করা হতো এবং কৃষকেরা যেসব সমস্যায় পড়েন, তার সমাধানের পথ দেখানো হতো। ২০০৪ সালে আগের অনুষ্ঠানের আদলে তিনি চ্যানেল আইয়ে ‘হৃদয়ে মাটি ও মানুষ’ অনুষ্ঠান শুরু করেন। তিনি ১৯৯৫ সালে একুশে পদক এবং ২০১৮ সালে বাংলাদেশ সরকারের স্বাধীনতা পুরস্কার পান, আর ২০০৯ সালে পান জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) এ এইচ বোরমা অ্যাওয়ার্ড।
আন্তর্জাতিক পরিসরে কৃষি সাংবাদিকতার স্বীকৃতির একটি দৃষ্টান্ত এই এ এইচ বোরমা অ্যাওয়ার্ড। ১৯৭৫ সালের নভেম্বরে এফএওর সম্মেলন সংস্থার সাবেক মহাপরিচালক অ্যাডেকে এইচ বোরমার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে একটি প্রস্তাব গ্রহণ করে। এরপর ১৯৭৭ সালের জুনে এফএও কাউন্সিল দুই বছর পরপর এমন একজন সাংবাদিক বা ব্যক্তিকে পুরস্কার দেওয়ার প্রস্তাব অনুমোদন করে, উন্নয়ন বিষয়ে যাঁর লেখা বিশ্বের খাদ্য সমস্যার দিকে, বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশের কৃষি ও গ্রামীণ উন্নয়নের দিকে জনসাধারণের দৃষ্টি আকর্ষণে ভূমিকা রেখেছে। কাউন্সিল ১০ হাজার মার্কিন ডলারের পুরস্কারের সুপারিশ করে, যা একজনকে দেওয়া যাবে বা কয়েকজন বিজয়ীর মধ্যে ভাগ করা যাবে। কাউন্সিল আরও বলে, পুরস্কারটি শুধু লিখিত কাজে সীমাবদ্ধ না থেকে টেলিভিশন ও রেডিওর কাজেও প্রসারিত হতে পারে। মনোনয়নের ভিত্তি ছিল পুরস্কারের বছরের ৩১ মার্চে শেষ হওয়া চার বছরে প্রকাশিত বা উপস্থাপিত কাজ। মনোনয়নগুলো পর্যালোচনার পর এফএওর মহাপরিচালক বিজয়ী বাছাই করতেন, আর এফএও সম্মেলনের অধিবেশন চলাকালে বিশেষ এক অনুষ্ঠানে পুরস্কারটি তুলে দেওয়া হতো।
এফএওর পুরস্কারের মতো বিএআরএফের পুরস্কারও ছাপা, অনলাইন ও সম্প্রচার, সব মাধ্যমের কাজের জন্য উন্মুক্ত ছিল এবং নির্দিষ্ট একটি সময়ে প্রকাশিত প্রতিবেদন বিচার করার কথা ছিল; এ ক্ষেত্রে সময়টি ছিল ২০২৫ সালের ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত বারো মাস।
প্রতিবেদকেরা যে কৃষি খাত নিয়ে লেখেন
কৃষি বিটের গুরুত্ব বোঝা যায় খাতটির আকার থেকে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) শ্রমশক্তি জরিপ ২০২৩-এর চূড়ান্ত প্রতিবেদনে দেখা যায়, দেশের শ্রমশক্তির ৪৪ দশমিক ৪২ শতাংশ কৃষি খাতে নিয়োজিত, যা সব খাতের মধ্যে সর্বোচ্চ। ২০২২ সালে এই হার ছিল ৪৫ দশমিক ৪ শতাংশ, অর্থাৎ সামান্য কমেছে।
২০২৩ সালের এপ্রিলে দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডে ২০২২ সালের জরিপ নিয়ে এক বিশ্লেষণে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হুসেইন লেখেন, মোট কর্মসংস্থানে কৃষির অংশ ২০১৭ সালের ৪০ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০২২ সালে ৪৫ দশমিক ৪ শতাংশ হয়েছে, অথচ মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) কৃষির অংশ ২০১৬-১৭ অর্থবছরের ১৩ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে কমে ২০২১-২২ অর্থবছরে ১১ দশমিক ৭ শতাংশে নেমেছে। তাঁর বিশ্লেষণে কৃষিতে শ্রমের জোগান বৃদ্ধির বড় অংশ এসেছে নারীদের কাছ থেকে।
ফলে উৎপাদনে অংশ কমলেও কৃষি তখনও দেশের সবচেয়ে বড় কর্মসংস্থানের খাত ছিল, আর সংগঠনের সদস্যরা যে সারের জোগান, বন্যা, ফসলহানি ও পুনর্বাসন নিয়ে প্রতিবেদন করেন, তা দেশের বিপুলসংখ্যক মানুষের জীবনের সঙ্গে জড়িত। পুরস্কারের বিজ্ঞপ্তিতে ২০২৫ সালের নভেম্বর পর্যন্ত এক বছরে এই খাত নিয়ে করা সেরা কাজটি জমা দিতে সেই প্রতিবেদকদের আহ্বান জানানো হয়।

ছবি: Wasiul Bahar / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, যুগান্তর, কালবেলা, প্রথম আলো, সমকাল, দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, বাংলাপিডিয়া, জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও), উইকিপিডিয়া



মন্তব্য
(০)