২০২৩ সালের জুলাইয়ে ঢাকার বাজারে এক কেজি কাঁচা মরিচের দাম ৭০০ টাকা পর্যন্ত উঠেছিল বলে সে মাসের শেষে প্রথম আলো জানিয়েছিল। কৃষকেরা বলেছিলেন, মে-জুনের খরা আর পরে অতিবৃষ্টিতে ফলন মার খেয়েছে; ভারত থেকে আমদানিও ছিল ধীর ও ব্যয়বহুল। সংকট সামলাতে বিশেষজ্ঞরা যেসব পরামর্শ দিয়েছিলেন, তার একটি ছিল খুব সহজ: বাড়ির আশপাশে আর ছাদে মরিচ চাষ করা।
দ্য এগ্রো নিউজে ২০২৫ সালের মার্চে প্রথম প্রকাশিত এই নির্দেশিকায় সেই কাজটিই ধাপে ধাপে বলা হয়েছে। এখানে থাকছে কোন মৌসুমে কোন জাত, টব, মাটি ও জায়গা বাছাই, চারা থেকে ফসল তোলা পর্যন্ত ধাপ, পানি ও সার, পোকামাকড় ও রোগ এবং পরামর্শ কোথায় মিলবে। তথ্য নেওয়া হয়েছে দেশের গবেষণা ও সম্প্রসারণ প্রতিষ্ঠানের বক্তব্য এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের নির্দেশিকা থেকে।
টবে মরিচ চাষ কেন কাজের
বাংলাদেশে মরিচ ছাড়া রান্না প্রায় হয়ই না। জাতীয় জ্ঞানকোষ বাংলাপিডিয়া বলছে, গ্রামবাংলায় পান্তাভাতের সঙ্গে কাঁচা মরিচ খাওয়ার চল বহু পুরোনো; ভর্তা ও ভাজির অপরিহার্য উপকরণ কাঁচা বা শুকনো মরিচ, নানা তরকারির মসলাও এটি। শুকনো মরিচ গুঁড়া মসলা, সস, চাটনি ও আচারের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। বাংলাপিডিয়ার তথ্যে, মরিচে যথেষ্ট ভিটামিন ও ফসফরাস থাকে।
দেশে মরিচের উৎপাদনও কম নয়। প্রথম আলো ২০২৩ সালের জুলাইয়ে কৃষি তথ্য সার্ভিসের (এআইএস) বরাতে জানায়, ২০২১-২২ অর্থবছরে দেশে কাঁচা মরিচ উৎপাদন হয়েছিল ৫ লাখ ৯২ হাজার টন, আগের বছর ৫ লাখ ৭৬ হাজার টন। তবু আবহাওয়ার সঙ্গে সরবরাহ ওঠানামা করে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই) পত্রিকাটিকে জানায়, শীত ও গ্রীষ্মে কাঁচা মরিচের ব্যাপক চাষ হয়, কিন্তু বর্ষাকালে আবাদ কমে যায়।
২০২৩ সালের সেই সংকটে সরকার ২৫ জুন থেকে কাঁচা মরিচ আমদানির অনুমতি দিতে শুরু করে। ডিএইর তথ্যে, ২৪ জুলাই পর্যন্ত ৬০ হাজার ১২৫ টন আমদানির অনুমতি দেওয়া হলেও এসেছিল মাত্র ২ হাজার ৮৯৩ টন। প্রথম আলোর ওই প্রতিবেদনে বিশেষজ্ঞরা সুষ্ঠু বাজার ব্যবস্থাপনা, বাড়ির আশপাশে বা ছাদে চাষাবাদ এবং বৃষ্টি ও খরা সহনশীল জাত উদ্ভাবনের পরামর্শ দিয়েছিলেন।
শহরের বাগানিরা অবশ্য আগেই এ পথে হাঁটছিলেন। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে প্রথম আলো দুজন শহুরে বাগানির কথা লেখে। ধানমন্ডির এক ব্যাংকারের ছাদে তখন প্রায় ৪৩ প্রজাতির শাকসবজি, তার মধ্যে কাঁচা মরিচ ও ক্যাপসিকামও ছিল। নারায়ণগঞ্জের এক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক ২০১৬ সাল থেকে তাঁর দোতলা বাড়ির পুরো ছাদকে বাগান বানিয়েছেন।
মরিচ গাছকে চেনা
মরিচ হলো ক্যাপসিকাম গণের গাছের ফল। গাছটি সোলানেসি পরিবারের, অর্থাৎ টমেটো, বেগুন ও আলুর আত্মীয়। উদ্ভিদবিজ্ঞানের ভাষায় মরিচ একধরনের বেরি ফল। এর ঝাল আসে ক্যাপসাইসিন ও তার সমগোত্রীয় যৌগ থেকে। বাংলাপিডিয়ার ইংরেজি সংস্করণে দেশের মরিচকে ঝোপালো গাছ ক্যাপসিকাম ফ্রুটেসেন্সের ফল বলা হয়েছে, যার আদি নিবাস মেক্সিকো।
ধারণা করা হয়, ষোড়শ শতকে পর্তুগিজ ও স্প্যানিশ বণিকেরা আমেরিকা থেকে মরিচ আফ্রিকা ও এশিয়ায় নিয়ে আসেন। বাংলায় এই ফসল এত ভালোভাবে জায়গা করে নেয় যে বাংলাপিডিয়ার তথ্যে, বিশ শতকের প্রথম ভাগ পর্যন্ত বাংলা থেকে বিদেশে মরিচ রপ্তানি হতো। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি যেসব মসলার টানে ভারতের পূর্বাঞ্চলে এসেছিল, মরিচ ছিল তার অন্যতম।
মরিচগাছ ছোট, জাতভেদে ২০ থেকে ৬০ সেন্টিমিটার উঁচু হয়; তাই টবে ও অল্প জায়গায় সহজেই মানিয়ে যায়। ঠান্ডা থেকে রক্ষা পেলে গাছ বহু বছর বাঁচে। উষ্ণ, দোআঁশ মাটি এর পছন্দ, যা ভেজা থাকবে কিন্তু পানি জমবে না। মরিচের ফুল নিজে নিজেই পরাগায়িত হতে পারে, তাই একটি টবের একটি গাছেও ফল ধরে।
বাংলাপিডিয়া দেশের বেশ কিছু স্থানীয় জাতের নাম দিয়েছে: বালিজুরী, বোনা, বাইন, সাইটা, সূর্যমুখী, পবা, হালদা, ধানী, শিকারপুরী ও পাটনাই। রবিশস্য হিসেবে অধিকাংশ মরিচ ফলানো হয় কুমিল্লা, নোয়াখালী, চাঁদপুর, ফরিদপুর, বরিশাল, পটুয়াখালী ও বগুড়ায়। জ্ঞানকোষটির হিসাবে কাঁচা মরিচের গড় উৎপাদন হেক্টরপ্রতি ৫ থেকে ৬ মেট্রিক টন।

মরিচের জাত ও মৌসুম
সারা বছরই মরিচ চাষ করা যায়। তবে মূল প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, শীতকাল নাগাদ লাগালে ফলন বেশি ভালো হয়। ২০২৩ সালে প্রথম আলোকে ডিএই যে চিত্র দিয়েছিল, তার সঙ্গেও এটি মেলে: শীত ও গ্রীষ্মে কাঁচা মরিচের ব্যাপক চাষ হয়, বর্ষায় আবাদ অনেক কমে যায়।
উচ্চফলনশীল জাতের মধ্যে শীতকালে বারি মরিচ-৪ ও বারি মরিচ-৩ এবং গ্রীষ্মকালে বারি মরিচ-৩ আবাদ হয় বলে ডিএই জানিয়েছিল। বর্ষাকালে চাষ হয় বারি মরিচ-২, কারণ জাতটি কিছুটা বৃষ্টিসহিষ্ণু। এসব জাত উদ্ভাবন করেছে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি)।
বারির মসলা গবেষণার কেন্দ্র বগুড়ার শিবগঞ্জের রায়নগরে অবস্থিত মসলা গবেষণা কেন্দ্র। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড বাংলা ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে জানায়, ১৯৯৬ সালে ৭০ একর জমির ওপর কেন্দ্রটি গড়ে তোলা হয়; মাগুরা, কুমিল্লা ও গাজীপুরে এর আঞ্চলিক কেন্দ্র রয়েছে। আমার সংবাদ ২০২৩ সালের এপ্রিলে কেন্দ্রের তথ্য উদ্ধৃত করে জানায়, তখন পর্যন্ত উদ্ভাবিত ৫১টি মসলার জাতের মধ্যে মরিচের ৪টি এবং অর্নামেন্টাল বা শোভাবর্ধক মরিচের ২টি জাত ছিল।
২০২৩ সালের জুলাইয়ে কেন্দ্রের এক ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেছিলেন, বর্ষা মৌসুমের উপযোগী কাঁচা মরিচের জাত উদ্ভাবনে গবেষণা চলছে, গরমসহিষ্ণু জাতের কথাও ভাবা হচ্ছে। বাড়ির বাগানির জন্য কাজের কথা হলো: যে মৌসুমে লাগাবেন, সেই মৌসুমের উপযোগী জাত কোনটি, তা জেনে নেওয়া।
টব, মাটি ও জায়গা বাছাই
যুক্তরাষ্ট্রের ক্লেমসন বিশ্ববিদ্যালয়ের হোম অ্যান্ড গার্ডেন ইনফরমেশন সেন্টারের (এইচজিআইসি) টবে সবজি চাষের নির্দেশিকা বলছে, পাত্রটি পূর্ণবয়স্ক গাছের জন্য যথেষ্ট বড় হতে হবে, মাটি ধরে রাখতে হবে, পানি ভালোভাবে বের হতে হবে এবং আগে কখনো বিষাক্ত কিছু রাখা পাত্র হওয়া চলবে না। মাটি, কাঠ, প্লাস্টিক বা ধাতু, সব ধরনের পাত্রেই চলে। নির্দেশিকা অনুযায়ী, বেশির ভাগ গাছের ঠিকমতো শিকড় ছড়াতে অন্তত ৬ থেকে ৮ ইঞ্চি গভীর পাত্র লাগে।
সবচেয়ে জরুরি হলো পানি নিষ্কাশন। মূল প্রতিবেদনে পরামর্শ ছিল, গাছে যাতে পানি না জমে সে জন্য টবের নিচে ছোট ছিদ্র করে দিতে হবে। ক্লেমসনের বিশেষজ্ঞরাও একই কথা বলেন: পাত্রের তলায় ছিদ্র থাকতেই হবে, যাতে শিকড় পানিতে দাঁড়িয়ে না থাকে।
এরপর আলো। একই নির্দেশিকা অনুযায়ী, যেসব সবজি ফলের জন্য চাষ করা হয়, সেগুলোর দিনে অন্তত পাঁচ ঘণ্টা সরাসরি পূর্ণ রোদ লাগে, আর আট থেকে দশ ঘণ্টা রোদ পেলে আরও ভালো ফল দেয়। মূল প্রতিবেদনের ভাষায়: যেখানে আলো-বাতাস পর্যাপ্ত, সেখানেই মরিচগাছ রাখতে হবে।
মাটির ব্যাপারে মূল প্রতিবেদনে দোআঁশ মাটিকে আদর্শ বলা হয়েছিল; বাংলাপিডিয়াও বলছে, সব ধরনের দোআঁশ মাটিতেই মরিচ জন্মে। ক্লেমসনের মরিচ বিষয়ক নির্দেশিকায় পানি সহজে বেরিয়ে যায় এমন দোআঁশ বা বেলে দোআঁশ মাটির কথা বলা হয়েছে, যার পিএইচ ৬.০ থেকে ৬.৫। টবের জন্য ভারী এঁটেল মাটি ভালো নয়: ভেজা অবস্থায় বেশি পানি ধরে রাখে, শিকড় বাতাস পায় না, আর শুকালে টবের গা থেকে সরে যায়। টবের নির্দেশিকা হালকা, ঝুরঝুরে মিশ্রণ ব্যবহার এবং সম্ভব হলে মাটি পরীক্ষার পরামর্শ দেয়।
দেশের ছাদবাগানিরা প্রায়ই হাতের কাছের উপকরণ ব্যবহার করেন। প্রথম আলোর ২০২৫ সালের জানুয়ারির প্রতিবেদনে নারায়ণগঞ্জের সেই শিক্ষক জানান, তিনি এক ভাগ মাটি, এক ভাগ গোবর সার, এক ভাগ বাগানের পচা পাতা ও এক ভাগ কিচেন কম্পোস্ট মিলিয়ে সবজির টবের মাটি তৈরি করেন। এটি একজন বাগানির নিজস্ব পদ্ধতি, কোনো সরকারি মাপকাঠি নয়।
চারা থেকে টবে: ধাপে ধাপে
মূল প্রতিবেদনে শুরু করার দুটি পথ বলা হয়েছিল: নার্সারি থেকে ভালো মানের চারা কিনে আনা, অথবা বীজ থেকে চারা করা। বাংলাপিডিয়া জানায়, সাধারণত বীজতলায় চারা উৎপাদন করে তারপর জমিতে রোপণ করা হয়। ক্লেমসনের মরিচ নির্দেশিকা অনুযায়ী, চারা রোপণের ছয় থেকে আট সপ্তাহ আগে বীজ বোনা হয়।
- নার্সারি থেকে সবল, সুস্থ চারা বা নির্ভরযোগ্য উৎস থেকে বীজ বেছে নিন। ক্লেমসনের বিশেষজ্ঞদের মতে, রোগমুক্ত প্রত্যয়িত বীজ ও চারা ব্যবহার করলে অনেক রোগের সমস্যা এড়ানো যায়।
- মূল প্রতিবেদনের পরামর্শমতো শুকনো মরিচের বীজ থেকে চারা করতে চাইলে বীজ প্রায় ৬ ঘণ্টা ভিজিয়ে রাখুন, ভালো করে শুকিয়ে নিয়ে টবের মাটিতে বুনুন। মরিচের বীজ গজায় কেবল উষ্ণ অবস্থায়, প্রায় ২১ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি তাপমাত্রায়।
- পরিষ্কার টবে হালকা ভেজা মাটির মিশ্রণ ভরুন, ওপরে আধা ইঞ্চির মতো জায়গা খালি রাখুন।
- চারা বসিয়ে চারপাশের মাটি আলতো করে চেপে দিন, তারপর সাবধানে পানি দিন যাতে মাটি ধুয়ে না যায়।
- টবে জাতের নাম ও রোপণের তারিখ লিখে একটি লেবেল দিন।
- গাছের খুঁটি লাগলে চারা ছোট থাকতেই দিন, পরে দিলে শিকড়ের ক্ষতি হতে পারে।

পানি, সার ও প্রতিদিনের যত্ন
টবের মাটি দ্রুত শুকিয়ে যায়, বিশেষ করে কড়া রোদে কংক্রিটের ছাদে। ক্লেমসনের টব নির্দেশিকা বলছে, দিনে একবার, এমনকি দুবারও পানি দিতে হতে পারে। দিনে অন্তত একবার, আর গরম, শুকনো বা ঝোড়ো দিনে দুবার আঙুল দিয়ে মাটি ভেজা কি না দেখে নিন। টবের তলার ছিদ্র দিয়ে পানি বেরিয়ে না আসা পর্যন্ত পানি দিন, কিন্তু মাটি যেন কাদা হয়ে না থাকে, ওপরে যেন পানি না জমে। মূল প্রতিবেদনেও একই সতর্কতা ছিল: সময়মতো পানি দিতে হবে, আর পানি দেওয়ার পর টবে যেন কখনো পানি না জমে।
কম পানির মতো বেশি পানিও ক্ষতিকর: ঠান্ডা আবহাওয়ায় টবের মাটি বেশি ভেজা থাকলে শিকড় পচে যেতে পারে। মাটির টব আর ছোট টব তাড়াতাড়ি শুকায়। গরম ছাদে টবগুলো কাছাকাছি রাখলে পাতা মাটিকে ছায়া দেয়, আর কাঠের পাটাতনের ওপর টব রাখলে তপ্ত সিমেন্টের সরাসরি ছোঁয়া এড়ানো যায়।
ফল ধরার ও বড় হওয়ার সময় মাটির আর্দ্রতা সমান রাখা সবচেয়ে জরুরি। ক্লেমসনের মরিচ নির্দেশিকা বলছে, ফলের আগায় কালচে, বসে যাওয়া দাগ বা ব্লসম এন্ড রট হয় পানির জোগান বিঘ্নিত হলে, কারণ তখন ক্যালসিয়াম ফলে পৌঁছাতে পারে না। মাটি সমানভাবে ভেজা রাখলে, কিন্তু কাদা না করলে, এটি ঠেকানো যায়।
সার নিয়ে মূল প্রতিবেদনের একটি তথ্য সংশোধন দরকার। সেখানে গোবর সার ও ইউরিয়া সারকে জৈব সার বলা হয়েছিল। গোবর জৈব সার ঠিকই, কিন্তু ইউরিয়া কারখানায় তৈরি রাসায়নিক সার। বাংলাপিডিয়া একে দেশে ব্যবহৃত প্রধান নাইট্রোজেন সার হিসেবে বর্ণনা করেছে, যা বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের সরকারি কারখানায় তৈরি হয়। দেশে ব্যবহৃত জৈব সারের মধ্যে রয়েছে প্রাণীর মল বা গোবর, কম্পোস্ট ও সবুজ সার।
মূল প্রতিবেদন বাড়ির টবে মরিচ চাষ জৈব উপায়ে করার পক্ষে ছিল: রাসায়নিক সারের বদলে রান্নাঘরের সবজির খোসা পচিয়ে সার, আর পানি দেওয়া থেকে আগাছা তোলা পর্যন্ত সব কাজ নিজের হাতে, যত্ন নিয়ে। প্রথম আলোর প্রতিবেদনে নারায়ণগঞ্জের বাগানিও এমন পদ্ধতির কথা বলেন: আলাদা পাত্রে সবজির খোসা, ফলের খোসা ও সরিষার খৈল পচিয়ে রাখেন, গাছের প্রয়োজন বুঝে ৭ থেকে ১০ দিনের মধ্যে প্রয়োগ করেন।
টবে মাটি কম, তাই ভুলের ধাক্কা সামলানোর সুযোগও কম। ক্লেমসনের টব নির্দেশিকা বলছে, সার মেশানো মিশ্রণ গাছকে আট থেকে দশ সপ্তাহ খাবার জোগায়; আর কোনো সারই নির্ধারিত মাত্রার বেশি দেওয়া যাবে না, কারণ টবের গাছকে অতিরিক্ত সারের পোড়া থেকে বাঁচানোর মতো বেশি মাটি থাকে না। গাছে প্রচুর পাতা কিন্তু ফুল-ফল কম হলে বুঝতে হবে নাইট্রোজেন বেশি হয়ে গেছে। এই নির্দেশিকায় টবের জন্য রাসায়নিক সারের কোনো মাত্রা দেওয়া হলো না; কোন রাসায়নিক সার কতটা দেবেন, তা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার কাছ থেকে জেনে নিন।
ফুল, ফল ও মরিচ তোলা
তাপমাত্রা ফল ধরায় বড় ভূমিকা রাখে। অতিরিক্ত গরমে, ৩০ থেকে ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসে, মরিচের পরাগরেণু কার্যক্ষমতা হারায় এবং ফুলে ফল ধরার সম্ভাবনা অনেক কমে যায়। বৃদ্ধির জন্য আদর্শ তাপমাত্রা মোটামুটি ২১ থেকে ২৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস, আর গাছ ১২ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত ঠান্ডা সহ্য করতে পারে।
ক্লেমসনের মরিচ নির্দেশিকা অনুযায়ী, চারা রোপণের মোটামুটি ৭০ থেকে ৮৫ দিন পর, আর বীজ থেকে শুরু করলে ১০০ থেকে ১২০ দিনে মরিচ তোলার উপযোগী হয়। ঝাল মরিচ কাঁচা অবস্থায় তোলা যায়, আবার গাছে রেখে রং বদলাতেও দেওয়া যায়। মরিচগাছের ডাল ভঙ্গুর, তাই টেনে না ছিঁড়ে কেটে নিন, তাতে ডাল ভাঙবে না।
কখন তুলছেন, তাতেও ফলনের হেরফের হয়। কাঁচা অবস্থায় মরিচ তুলে নিলে গাছে আরও ফুল আসে, ফলে মরিচও বেশি হয়। আর গাছে রেখে দিলে মরিচ বেশি ঝাল হয় ও পাকা রং পায়, তবে মোট ফলন কমে। পানির টানে থাকা গাছের মরিচ সাধারণত বেশি ঝাল হয়।
মূল প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, ঠিকঠাক যত্ন নিলে একটি মরিচগাছ দুই দফায় কমপক্ষে ৫০ থেকে ৮০টি মরিচ দিতে পারে। এটি প্রতিবেদনের নিজস্ব হিসাব; আসল সংখ্যা জাত, মৌসুম ও যত্নের ওপর নির্ভর করে।
পোকামাকড় ও রোগে নজর
মূল প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, মাঠে বড় পরিসরে মরিচ চাষ করলে মূল পচা, পাতা পচা, পাতা কুঁকড়ে যাওয়া ও ব্যাকটেরিয়াজনিত নানা রোগ দেখা দেয়, টবে সেগুলোর প্রকোপ তুলনামূলক কম। ক্লেমসনও বলছে, টবে চাষ করে মাটিবাহিত রোগ, কৃমি ও খারাপ মাটির সমস্যা কাটানো যায়। তবে টবের গাছও রোগমুক্ত নয়, তাই নিয়মিত পরীক্ষা করতে হবে।
দক্ষিণ এশিয়ার মরিচচাষিদের সবচেয়ে চেনা সমস্যা পাতা কোঁকড়ানো। এর একটি বড় কারণ চিলি লিফ কার্ল ভাইরাস, যা বেগোমোভাইরাস গোত্রের এবং সাদা মাছি (বেমিসিয়া টাবাসি) দিয়ে ছড়ায়। প্রধান লক্ষণ পাতা ওপরের দিকে কুঁকড়ে যাওয়া, কুঁচকে যাওয়া ও গুচ্ছ বেঁধে যাওয়া; পাতাও ছোট হয়ে আসে। বেশি আক্রান্ত গাছে মরিচ কম ধরে, সেগুলো ছোট ও বিকৃত হয়। সাধারণত ২০ থেকে ৫০ শতাংশ ফলন কমে, থ্রিপস বা মাকড়ের আক্রমণ একসঙ্গে হলে ক্ষতি আরও অনেক বেশি হতে পারে। আক্রান্ত গাছ তুলে ফেলা ও প্রতিরোধী জাত চাষ এর দমনের উপায়গুলোর অন্যতম।

রস চুষে খাওয়া পোকাই মরিচের আরেক বড় শত্রু: জাব পোকা, লাল মাকড় ও সাদা মাছি গাছের রস খায়। ক্লেমসন এর সঙ্গে থ্রিপস ও শুঁয়োপোকার কথা বলেছে; ছোট বাগানে শুঁয়োপোকা হাতে ধরে সরানো যায়। আমার সংবাদের ২০২৩ সালের এপ্রিলের প্রতিবেদনে উদ্ধৃত তালিকা অনুযায়ী, বারির মসলা গবেষণা কেন্দ্র মরিচের চুষি পোকা ও মাকড়ের সমন্বিত দমন পদ্ধতি, মরিচের ফলছিদ্রকারী পোকার সমন্বিত দমন পদ্ধতি এবং মরিচের চোয়ানিফোরা রোগ দমনের প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছে।
জাব পোকাও পাতা কোঁকড়াতে পারে। ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়ার স্টেটওয়াইড ইন্টিগ্রেটেড পেস্ট ম্যানেজমেন্ট (আইপিএম) প্রোগ্রাম বলছে, কিছু প্রজাতির জাব পোকা গাছে বিষ ঢুকিয়ে দেয়, তাতে পাতা কুঁকড়ে যায়। গাছ দ্রুত বাড়ার সময় সপ্তাহে অন্তত দুবার পরীক্ষা করা, জোরালো পানির ধারায় জাব পোকা ঝরিয়ে ফেলা এবং সংখ্যা বেশি থাকলে কীটনাশক সাবান বা তেল ব্যবহারের পরামর্শ দেয় প্রোগ্রামটি, কারণ এগুলো জাব পোকাখেকো উপকারী পোকার কম ক্ষতি করে। পানির টানে থাকা গাছে বা ৯০ ডিগ্রি ফারেনহাইটের বেশি তাপমাত্রায় এগুলো ব্যবহার করা যাবে না।

মূল প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছিল, টবের মরিচগাছে প্রায়ই পিঁপড়ে হানা দেয়, আর গাছে অল্প সাবানের গুঁড়ো ছিটিয়ে দেওয়ার পরামর্শ ছিল। ক্যালিফোর্নিয়ার আইপিএম বিশেষজ্ঞদের ব্যাখ্যা একটু ভিন্ন: গাছে পিঁপড়ে সাধারণত আসে জাব পোকা, স্কেল পোকা, মিলিবাগ বা সাদা মাছির নিঃসৃত মিষ্টি রসের (হানিডিউ) টানে, আর পিঁপড়েরা এসব পোকাকে তাদের প্রাকৃতিক শত্রুর হাত থেকে রক্ষা করে। তাই আসল কাজ জাব পোকা দমন। টবের গাছে পিঁপড়ে বাসা বাঁধলে প্রোগ্রামটি প্রতি কোয়ার্ট পানিতে ১ থেকে ২ টেবিল চামচ কীটনাশক সাবানের দ্রবণে টবটি অন্তত ২০ মিনিট এমনভাবে ডুবিয়ে রাখার পরামর্শ দেয়, যাতে মাটির ওপরের স্তর ঠিক ঢেকে যায়। এই পরামর্শ কীটনাশক হিসেবে বিক্রি হওয়া সাবানের জন্য, ঘরের কাপড় কাচার সাবানের গুঁড়োর জন্য নয়।
রোগের মধ্যে বাড়ির বাগানে ব্যাকটেরিয়াজনিত ঢলে পড়া ও ব্যাকটেরিয়াজনিত পাতায় দাগ রোগকে সবচেয়ে ঝামেলার বলেছে ক্লেমসন, সঙ্গে অ্যানথ্রাকনোজ ফল পচার মতো রোগও আছে। মরিচগাছের কাছে তামাকজাত পণ্য ব্যবহার না করারও পরামর্শ দিয়েছে তারা, কারণ তামাক থেকে টোব্যাকো মোজাইক ভাইরাস সহজে ছড়ায়।
পরামর্শ কোথায় মিলবে
সাধারণ ব্যবস্থায় যে পোকা বা রোগ সারে না, কিংবা কোনো রাসায়নিক ব্যবহারের আগে, প্রথমে যোগাযোগ করুন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপজেলা কৃষি অফিসে। সেখানকার কর্মকর্তারা সমস্যা শনাক্ত করে ঠিক ওষুধ ও মাত্রা বলে দিতে পারেন। রাসায়নিক বালাইনাশক ব্যবহার করতে হবে কেবল লেবেলের নির্দেশনা মেনে।
জাত ও মসলা চাষের প্রযুক্তির জন্য দেশের বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান বগুড়ায় বারির মসলা গবেষণা কেন্দ্র ও এর আঞ্চলিক কেন্দ্রগুলো। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে কেন্দ্রের কর্মকর্তারা দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে জানিয়েছিলেন, শিক্ষিত মানুষেরা ক্রমেই কৃষির সঙ্গে যুক্ত হচ্ছেন এবং অনেকেই নিয়মিত পরামর্শ নিতে কেন্দ্রে আসছেন।
ছবি: নেথা হুসাইন / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: দ্য এগ্রো নিউজ, প্রথম আলো, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড বাংলা, আমার সংবাদ, বাংলাপিডিয়া, ক্লেমসন ইউনিভার্সিটি কো-অপারেটিভ এক্সটেনশন হোম অ্যান্ড গার্ডেন ইনফরমেশন সেন্টার, ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া স্টেটওয়াইড আইপিএম প্রোগ্রাম, উইকিপিডিয়া





মন্তব্য
(০)