২০২৬ সালের জুলাইয়ে জাগো নিউজ ২৪-এ প্রকাশিত এক মতামত নিবন্ধে লেখক যুক্তি দেন, বাংলাদেশের কৃষিতে শুধু উৎপাদন বাড়ানো আর যথেষ্ট নয়; উৎপাদিত পণ্য কত দ্রুত, নিরাপদে ও ন্যায্য দামে ভোক্তার কাছে পৌঁছায়, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। জনসংখ্যা বৃদ্ধি, জলবায়ু পরিবর্তন, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি ও বাজারের অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে তিনি খামার থেকে ভোক্তা পর্যন্ত পুরো মূল্যশৃঙ্খলকে তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর করার, অর্থাৎ একটি ‘ডিজিটাল সাপ্লাই চেইন’ গড়ার প্রস্তাব দেন।
লেখকের প্রস্তাব: তথ্যনির্ভর মূল্যশৃঙ্খল
লেখকের বর্ণনায় ডিজিটাল সাপ্লাই চেইন কেবল অনলাইনে কৃষিপণ্য কেনাবেচার প্ল্যাটফর্ম নয়; এটি উৎপাদন, সংগ্রহ, সংরক্ষণ, পরিবহন, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বিপণনের প্রতিটি ধাপকে স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও দক্ষ করার একটি সমন্বিত ব্যবস্থা। এ জন্য তিনি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ইন্টারনেট অব থিংস, বিগ ডেটা, ব্লকচেইন, রিমোট সেন্সিং ও ডিজিটাল পেমেন্টের মতো প্রযুক্তির সমন্বয়ের কথা বলেন। নিবন্ধে তিনি যেসব সুফলের কথা তুলে ধরেন:
- স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা: প্রতিটি ধাপের ডিজিটাল রেকর্ড থাকলে কে, কখন, কোথায় কী করেছে তা যাচাই করা যায়।
- ন্যায্য দাম ও বাজার সংযোগ: বিভিন্ন বাজারের দাম, চাহিদা ও সরবরাহের তাৎক্ষণিক তথ্য পেলে কৃষক সচেতনভাবে বিক্রির সিদ্ধান্ত নিতে পারেন এবং পাইকার, প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠান, সুপারশপ বা রপ্তানিকারকের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হতে পারেন।
- ডিজিটাল লেনদেন: মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস, ব্যাংকিং ও ডিজিটাল ওয়ালেটে নগদ টাকা বহনের ঝুঁকি কমে এবং লেনদেনের পূর্ণ রেকর্ড থাকে।
- চাহিদার পূর্বাভাস ও চুক্তিভিত্তিক চাষ: বাজারের তথ্য বিশ্লেষণে উৎপাদন পরিকল্পনা বাস্তবসম্মত হয়; ডিজিটাল চুক্তিতে মান, দাম, সরবরাহের সময়সূচি ও অর্থপ্রদান লিপিবদ্ধ থাকলে বিরোধ কমে।
- উপকরণের দক্ষ ব্যবহার: তথ্যভিত্তিক ব্যবস্থাপনায় সার, পানি ও কীটনাশকের অপচয় কমে।

ট্রেসেবিলিটি কী এবং রপ্তানিতে কেন জরুরি
নিবন্ধে উদাহরণ হিসেবে বলা হয়, আম বা সবজির গায়ে থাকা কিউআর কোড স্ক্যান করে জানা যেতে পারে কোন জেলার কোন কৃষক পণ্যটি উৎপাদন করেছেন, কখন সংগ্রহ করা হয়েছে, কী উপকরণ ব্যবহৃত হয়েছে এবং কীভাবে পরিবহন করা হয়েছে। লেখকের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে এই ট্রেসেবিলিটি এখন রপ্তানির একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত।
বিশ্বব্যাংক গোষ্ঠীর আইএফসির প্রকাশিত ‘দ্য বেসিকস অব ফুড ট্রেসেবিলিটি’ নির্দেশিকায় কোডেক্স অ্যালিমেন্টারিয়াস কমিশনের সংজ্ঞা তুলে ধরা হয়েছে: উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বিতরণের নির্দিষ্ট ধাপে কোনো খাদ্যের চলাচল অনুসরণ করার সক্ষমতাই ট্রেসেবিলিটি। নির্দেশিকা অনুযায়ী, ইউরোপীয় ইউনিয়নে এর মূল আইন রেগুলেশন (ইসি) নং ১৭৮/২০০২; এর ১৮ অনুচ্ছেদ খাদ্য ব্যবসায়ীদের ‘এক ধাপ পেছনে, এক ধাপ সামনে’ নীতি মানতে বাধ্য করে, অর্থাৎ কার কাছ থেকে পণ্য এসেছে এবং কার কাছে গেছে, দুটোই শনাক্ত করতে পারতে হবে। নির্দেশিকাটি এটাও মনে করিয়ে দেয় যে ট্রেসেবিলিটি নিজে খাদ্যকে নিরাপদ করে না; সমস্যা দেখা দিলে দ্রুত উৎস খুঁজে পণ্য প্রত্যাহারের হাতিয়ার হিসেবে কাজ করে।

ফসল-পরবর্তী ক্ষতির প্রেক্ষাপট
লেখক লেখেন, ফল, সবজি, দুধ, মাছ ও ফুলের মতো দ্রুত পচনশীল পণ্যের ক্ষেত্রে ডিজিটাল পর্যবেক্ষণে পরিবহন ও শীতল সংরক্ষণ দক্ষ হলে ফসল-পরবর্তী ক্ষতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে। বৈশ্বিক হিসাবে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) ২০১৯ সালের ‘দ্য স্টেট অব ফুড অ্যান্ড এগ্রিকালচার’ প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্বের প্রায় ১৪ শতাংশ খাদ্য ফসল তোলার পর খুচরা বাজারে পৌঁছানোর আগেই নষ্ট হয়, যার মূল্য বছরে প্রায় ৪০০ বিলিয়ন ডলার।
বাংলাদেশের চিত্র উঠে আসে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে ঢাকায় সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি), ডেনমার্ক দূতাবাস ও বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির (ডব্লিউএফপি) যৌথ সংলাপে। দ্য ডেইলি স্টারের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ফরিদা আখতার বলেন, দেশে বছরে প্রায় ২ কোটি ১০ লাখ টন খাদ্য ফসল-পরবর্তী পর্যায়ে নষ্ট হয়। এফএওর ডেপুটি প্রতিনিধি দিয়া সানু সংস্থাটির একটি সাম্প্রতিক গবেষণার ফল তুলে ধরেন: ধানে ১৭.৮ শতাংশ, গমে ১৭.৬ শতাংশ এবং ফল ও সবজিতে ১৭ থেকে ৩২ শতাংশ ক্ষতি, যার মধ্যে আমে সর্বোচ্চ ৩১.৭ শতাংশ। ডব্লিউএফপির ডেপুটি কান্ট্রি ডিরেক্টর জেসি উড জানান, সংস্থাটি কক্সবাজারে ৬২টি ও কুড়িগ্রামে ৪টি সংগ্রহকেন্দ্র গড়েছে এবং ক্ষতি কমাতে বায়ুরোধী সংরক্ষণ, যন্ত্রচালিত শুকানো ও ডিজিটাল ট্রেসেবিলিটি সরঞ্জাম চালু করছে।

বাধা এবং জাতীয় প্ল্যাটফর্মের সুপারিশ
লেখক স্বীকার করেন, এ রূপান্তরের পথে গ্রামে উচ্চগতির ইন্টারনেট, ডিজিটাল অবকাঠামো, কৃষকের প্রযুক্তিজ্ঞান, তথ্যের নিরাপত্তা, মানসম্মত ডেটা ব্যবস্থাপনা ও প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয় নিশ্চিত করা জরুরি; সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব, দক্ষ জনবল ও প্রযুক্তিতে বিনিয়োগও দরকার। তাঁর সুপারিশ একটি সমন্বিত জাতীয় ডিজিটাল কৃষি সাপ্লাই চেইন ইকোসিস্টেম, যেখানে কৃষক, কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগ, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, প্রযুক্তি কোম্পানি, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, লজিস্টিকস সেবাদাতা, প্রক্রিয়াজাতকারী, রপ্তানিকারক ও ভোক্তা একই ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে যুক্ত থাকবেন। লেখকের মতে, ভবিষ্যতের কৃষি কেবল বেশি উৎপাদনের প্রতিযোগিতা নয়; নিরাপদ খাদ্য, ন্যায্য দাম, দক্ষ সরবরাহ ব্যবস্থা ও টেকসই উন্নয়নেরও প্রতিযোগিতা।
ছবি: Jubair1985 / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, দ্য ডেইলি স্টার, জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও), আইএফসি (বিশ্বব্যাংক গোষ্ঠী)





মন্তব্য
(০)