সরাসরিবাজারদর
আটা (প্যাকেটজাত)৫৮—আদা - আমদানিকৃত১৬৭—আদা - দেশী১৫৪—আমন চাল - মাঝারি৫৬—আমন চাল - মোটা৪৮—আমন চাল - সরু৭২—আয়োডিনযুক্ত লবণ (প্যাকেটজাত)৩২—কাঁচা মরিচ২১৮—খামারের মুরগী১৬২—খাসী৯০০—চিনি (দেশী)১৩২—ছোলা - গোটা৮৫—ডিম ফার্ম - লাল৪৭—পেঁয়াজ - দেশী৬০—বোরো চাল - মাঝারি৫৫—বোরো চাল - মোটা৪৭—বোরো চাল - সরু৬৬—মাংসঃ– গরু৭২৯—মুগ ডাল১২২—রসুন - আমদানিকৃত১৯২—রসুন - দেশী১৭৩—সয়াবিন তেল১৬৩—
হালনাগাদ ১৬ অক্টোবর ২০২৬
ঢাকা২৬°পরিষ্কার আকাশআর্দ্রতা ৭৩%বাতাস ৩ কিমি/ঘ

মধ্য প্রদেশে গোবর-গোমূত্রে ক্যানসার গবেষণা প্রকল্পের ব্যয় নিয়ে তদন্ত কমিটির প্রশ্ন

ভারতের মধ্য প্রদেশের জবলপুরে গোবর ও গোমূত্র দিয়ে ক্যানসারের চিকিৎসা উদ্ভাবনের সরকারি অর্থায়নের প্রকল্পে বাজারদরের চেয়ে বহুগুণ বেশি ব্যয় এবং অনুমোদনহীন বিমানযাত্রা ও গাড়ি কেনার অভিযোগ এনেছে একটি তদন্ত কমিটি, ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে। নানাজি দেশমুখ ভেটেরিনারি সায়েন্স বিশ্ববিদ্যালয় সব অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

মধ্য প্রদেশে গোবর-গোমূত্রে ক্যানসার গবেষণা প্রকল্পের ব্যয় নিয়ে তদন্ত কমিটির প্রশ্ন
লাইভস্টক

ভারতের মধ্য প্রদেশে গোবর, গোমূত্র ও দুগ্ধজাত পণ্য দিয়ে ক্যানসারের চিকিৎসা উদ্ভাবনের একটি সরকারি অর্থায়নের গবেষণা প্রকল্পে জনগণের টাকা কীভাবে খরচ হয়েছে, তা নিয়ে ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে একটি সরকারি তদন্ত গুরুতর প্রশ্ন তোলে। প্রকল্পটি ২০১১ সালে জবলপুরের নানাজি দেশমুখ ভেটেরিনারি সায়েন্স বিশ্ববিদ্যালয়ে শুরু হয়েছিল। জবলপুর জেলার একজন অতিরিক্ত কালেক্টরের নেতৃত্বে গঠিত কমিটি ২০১১ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত প্রকল্পের হিসাব পরীক্ষা করে। ২০২৬ সালের ৯ ও ১০ জানুয়ারি ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত বিবরণ অনুযায়ী, কমিটির প্রতিবেদনে বাজারদরের চেয়ে অনেক বেশি ব্যয়, অনুমোদিত প্রাক্কলনে না থাকা বিমানযাত্রা ও গাড়ি কেনা এবং প্রকল্পের যে কৃষক প্রশিক্ষণ দেওয়ার কথা ছিল তার স্পষ্ট কোনো নথি না থাকার কথা উঠে আসে। বিশ্ববিদ্যালয় সব অভিযোগ অস্বীকার করে।

জাগো নিউজ২৪ দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের বরাতে ২০২৬ সালের ১০ জানুয়ারি খবরটি প্রকাশ করে। একই দিনে দ্য কুইন্ট ও মাধ্যমমও দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের বরাতে একই তথ্য প্রকাশ করে। এসব প্রতিবেদনে যা বলা হয়েছে, তা তদন্ত কমিটির পর্যবেক্ষণ ও তদন্তকারীদের মত, আর তার বিপরীতে রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের অস্বীকৃতি; খবর প্রকাশের সময় কোনো আদালত বা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত দেয়নি।

২০১১ সালে অর্থায়ন পাওয়া ক্যানসার গবেষণা প্রকল্প


প্রকল্পটি গড়ে উঠেছিল পঞ্চগব্য ঘিরে, যা গরু থেকে পাওয়া কয়েকটি উপাদানের একটি প্রথাগত মিশ্রণ। এর ঘোষিত লক্ষ্য ছিল গোবর, গোমূত্র ও দুগ্ধজাত পণ্যের মিশ্রণ ব্যবহার করে ক্যানসারসহ গুরুতর রোগের চিকিৎসা পদ্ধতি উদ্ভাবন। প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্ববিদ্যালয় এ কাজের জন্য রাজ্য সরকারের কাছে প্রায় ৮ কোটি রুপি চেয়েছিল, আর মধ্য প্রদেশ সরকার অনুমোদন দেয় সাড়ে ৩ কোটি রুপি। ভারতেও বাংলাদেশের মতো লাখ ও কোটি এককে টাকার হিসাব করা হয়।

গবেষণাটি প্রায় এক দশক ধরে চলে। জাগো নিউজ২৪ লিখেছে, এতে রাজ্য সরকারের কোটি কোটি রুপি ব্যয় হলেও গবেষণার বাস্তব ফলাফল এবং অর্থ ব্যবহারের স্বচ্ছতা, দুই বিষয়েই গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। প্রকল্পের অর্থের ব্যাপক অপব্যবহার হয়েছে, এমন একটি অভিযোগ পাওয়ার পর প্রশাসন পদক্ষেপ নেয়।

প্রকল্পটি চালাচ্ছিল একটি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, জনগণের অর্থে, আর বিষয়টি রোগীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ: একটি প্রথাগত মিশ্রণ দিয়ে কি এমন একটি রোগের চিকিৎসা সম্ভব, ভারতের জাতীয় ক্যানসার নিবন্ধন কর্মসূচির হিসাবে যাতে দেশটিতে প্রতিবছর দশ লাখেরও বেশি মানুষ আক্রান্ত হন। সে কারণেই প্রকল্পের হিসাব এবং এর পেছনের দাবি দুটিই ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে ব্যাপক মনোযোগ পায়।

তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে যা এসেছে


তদন্তের নেতৃত্ব দেওয়া অতিরিক্ত কালেক্টর রঘুভর মারাভি জানান, জবলপুরের কালেক্টরের নির্দেশে তদন্ত শুরু হয়। কমিটি ২০১১ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত প্রকল্পের ব্যয়ের নথিপত্র পরীক্ষা করে এবং খবর প্রকাশের কিছুদিন আগে কালেক্টরের কাছে প্রতিবেদন জমা দেয়।

সবচেয়ে বড় পর্যবেক্ষণটি ছিল মৌলিক উপকরণ নিয়ে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, শুধু গোবর, গোমূত্র, কাঁচামাল, সংরক্ষণ পাত্র ও যন্ত্রপাতির পেছনেই প্রায় ১ কোটি ৯২ লাখ রুপি ব্যয় দেখানো হয়েছে। তদন্তকারীদের মতে, তখনকার বাজারদরে এসব সামগ্রীর খরচ ১৫ থেকে ২০ লাখ রুপির বেশি হওয়ার কথা নয়।

গবেষণার নামে গবেষক দলের সদস্যরা দেশের বিভিন্ন শহরে যে ২৩ থেকে ২৪ বার বিমানে ভ্রমণ করেছেন, কমিটি সেগুলোর প্রয়োজনীয়তা নিয়েও প্রশ্ন তোলে। মারাভি বলেন, প্রকল্পের মূল প্রাক্কলনে এ ধরনের ভ্রমণের কোনো উল্লেখ ছিল না।

প্রতিবেদনে বলা হয়, অনুমোদিত প্রাক্কলনে না থাকা সত্ত্বেও প্রায় সাড়ে ৭ লাখ রুপি দামের একটি গাড়ি কেনা হয়। কমিটি আরও উল্লেখ করে, জ্বালানি ও গাড়ি রক্ষণাবেক্ষণে প্রায় সাড়ে ৭ লাখ রুপি, শ্রমিক খাতে প্রায় সাড়ে ৩ লাখ রুপি এবং আসবাবপত্র ও ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতিতে প্রায় ১৫ লাখ রুপি খরচ হয়েছে। কমিটি এসব ব্যয়কে প্রকল্পের গবেষণার লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত বলে বর্ণনা করে।

মারাভি বলেন, প্রকল্পের আওতায় কৃষকদের কিছু প্রশিক্ষণ দেওয়ার কথা ছিল, কিন্তু নথিতে কী প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে তার উল্লেখ নেই। তার ভাষ্য, বিশ্ববিদ্যালয়ের নথিতে যেসব গাড়ি কেনা দেখানো হয়েছে, সেগুলোরও খোঁজ পাওয়া যায়নি।

মধ্য প্রদেশের জবলপুরে নর্মদা নদী; এই শহরেই নানাজি দেশমুখ ভেটেরিনারি সায়েন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের সদর দপ্তর। ছবি: Csheik / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
মধ্য প্রদেশের জবলপুরে নর্মদা নদী; এই শহরেই নানাজি দেশমুখ ভেটেরিনারি সায়েন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের সদর দপ্তর। ছবি: Csheik / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)

বিশ্ববিদ্যালয়ের অস্বীকৃতি


বিশ্ববিদ্যালয় সব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে। রেজিস্ট্রার ড. এস এস তোমর বলেন, যন্ত্রপাতি হোক বা গাড়ি, সব কেনাকাটা হয়েছে উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে এবং সরকারি ক্রয়বিধি ও আর্থিক নিয়ম মেনে। তার দাবি, ২০১২ সাল থেকে প্রকল্পটি স্বচ্ছভাবে পরিচালিত হয়েছে, নিয়মিত নিরীক্ষা হয়েছে এবং প্রয়োজনীয় সব সনদ জমা দেওয়া হয়েছে।

মূল প্রতিবেদন অনুযায়ী, রেজিস্ট্রার বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো দুর্নীতি হয়নি এবং তদন্ত কমিটিকে সব নথি সরবরাহ করা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তারা আরও জানান, বিতর্কের মধ্যেও প্রকল্পের আওতায় তরুণ ও কৃষকদের প্রশিক্ষণ চলছে এবং সব প্রক্রিয়া নিয়ম মেনেই হয়েছে।

পরবর্তী পদক্ষেপ ছিল জেলা প্রশাসনের হাতে। কালেক্টর প্রতিবেদনটি ডিভিশনাল কমিশনারের কাছে পাঠাবেন, আর তিনিই ঠিক করবেন আর কোনো আইনি বা প্রশাসনিক পদক্ষেপ দরকার কি না। ২০২৬ সালের ১০ জানুয়ারি খবর প্রকাশের সময় পর্যন্ত এমন কোনো সিদ্ধান্ত ঘোষণা করা হয়নি।

পঞ্চগব্য কী


পঞ্চগব্য একটি সংস্কৃত নাম, যার অর্থ "গরুর পাঁচটি উপাদান"। এতে গরু থেকে সরাসরি পাওয়া তিনটি উপাদান, অর্থাৎ গোবর, গোমূত্র ও দুধ, এবং দুধ থেকে তৈরি দুটি উপাদান, দই ও ঘি, একসঙ্গে মিশিয়ে গাঁজন করা হয়। হিন্দু ধর্মীয় আচারে এই মিশ্রণের দীর্ঘ ব্যবহার আছে, যেখানে একে শুদ্ধিকরণের উপাদান হিসেবে ব্যবহার করা হয়; আর আয়ুর্বেদ চর্চায় ওষুধ হিসেবে এর ব্যবহারকে কখনো কখনো "কাউপ্যাথি" বলা হয়। কৃষিতে এটি সার ও বালাই দমনের স্প্রে হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে, আর এর সমর্থকেরা গবাদিপশু, হাঁস-মুরগি ও মাছের জন্যও নানা উপকারের দাবি করেন।

গোমূত্র চিকিৎসার সমর্থকেরা দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছেন, এটি কয়েক ধরনের ক্যানসারসহ নানা রোগ সারাতে পারে। প্রমাণ পর্যালোচনা করা তথ্যসূত্রগুলো বলছে, এসব দাবির কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই, আর গোমূত্রের মতো আলাদা উপাদান নিয়ে করা গবেষণায়ও স্বাস্থ্যগত উপকার দেখা যায়নি।

তবু ভারতের সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো এ বিষয়ে কাজে অর্থ দিয়েছে। ২০১৭ সালে ভারতের লোকসভায়, অর্থাৎ পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষে, দেওয়া এক লিখিত জবাব অনুযায়ী, দেশটির বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিভাগ সেই বছর "সায়েন্টিফিক ভ্যালিডেশন অ্যান্ড রিসার্চ অন পঞ্চগব্য" (এসভিএআরওপি বা স্বরূপ) নামে একটি জাতীয় কর্মসূচি শুরুর জন্য একটি জাতীয় স্টিয়ারিং কমিটি গঠন করে। একই জবাবে বলা হয়, স্বায়ত্তশাসিত গবেষণা সংস্থা সেন্ট্রাল কাউন্সিল ফর রিসার্চ ইন আয়ুর্বেদিক সায়েন্সেস "পঞ্চগব্য ঘৃত" নামের একটি মিশ্রণের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতায় প্রভাব এবং এর নিরাপত্তা ও বিষাক্ততা নিয়ে গবেষণা করছে, আর ২০১৪ সালে পঞ্চগব্য চিকিৎসা নিয়ে একটি জাতীয় সেমিনার আয়োজন করেছিল।

স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ ও বিজ্ঞানীরা যা বলেন


ক্যানসার বিষয়ক কর্তৃপক্ষগুলো পরিপূরক চিকিৎসা, যা প্রচলিত চিকিৎসার পাশাপাশি নেওয়া হয়, আর বিকল্প চিকিৎসা, যা প্রচলিত চিকিৎসার বদলে নেওয়া হয়, এই দুইয়ের মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য করে। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ক্যানসার ইনস্টিটিউট ২০২৪ সালের অক্টোবরে সর্বশেষ হালনাগাদ করা নির্দেশনায় বলেছে, কোনো বিশেষ খাদ্যাভ্যাস, খাবার, সম্পূরক বা ভেষজ ক্যানসার সারায়, এর বৃদ্ধি ধীর করে বা ফিরে আসা ঠেকায়, এমন প্রমাণ মেলেনি; বরং কিছু পণ্য ক্যানসারের চিকিৎসার কার্যকারিতা বদলে দিতে পারে। সংস্থাটি রোগীদের পরামর্শ দেয়, ভিটামিন ও সম্পূরকসহ এমন যেকোনো পণ্য বা পদ্ধতি ব্যবহার করলে তা চিকিৎসক দলকে জানাতে। প্রতিষ্ঠানটি আরও জানায়, আকুপাংচার, যোগব্যায়াম ও ধ্যানের মতো কিছু পরিপূরক পদ্ধতি নিয়ে গবেষণা হয়েছে এবং কিছু ক্ষেত্রে সেগুলো সাধারণভাবে নিরাপদ ও কার্যকর পাওয়া গেছে; কিন্তু ভেষজ ও খাদ্য সম্পূরক বাজারে বিক্রির আগে যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসনের অনুমোদন নিতে হয় না।

ক্যানসার রিসার্চ ইউকে ২০২২ সালের এপ্রিলে পর্যালোচিত নির্দেশনায় পরিপূরক ও বিকল্প চিকিৎসার মধ্যে একই পার্থক্য টানে। সংস্থাটি সতর্ক করে, কিছু পদ্ধতি ক্ষতিকর হতে পারে বা রোগী যে অন্য চিকিৎসা নিচ্ছেন তার সঙ্গে প্রতিক্রিয়া করতে পারে, তাই যেকোনো পরিপূরক বা বিকল্প চিকিৎসা শুরুর আগে চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলা উচিত। সংস্থাটি এটাও উল্লেখ করে যে এই দুটি শব্দ প্রায়ই একই অর্থে ব্যবহার করা হয়, যদিও এদের মানে আলাদা।

এই প্রতিবেদনের জন্য যেসব স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা পড়া হয়েছে, তাদের কেউই ক্যানসারের চিকিৎসা হিসেবে গোমূত্র, গোবর বা পঞ্চগব্যের সুপারিশ করে না, আর জবলপুর প্রকল্প নিয়ে প্রকাশিত কোনো প্রতিবেদনেও এ থেকে প্রমাণিত কোনো চিকিৎসা বেরিয়ে আসার কথা বলা হয়নি। কারও ক্যানসার হলে বা দুশ্চিন্তার কোনো উপসর্গ থাকলে যোগ্য চিকিৎসকের কাছে পরীক্ষা ও চিকিৎসা নিতে হবে; সেই চিকিৎসার বদলে কোনো ঘরোয়া বা প্রথাগত টোটকা ব্যবহার করা উচিত নয়।

নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে ভারতের পশুচিকিৎসা বিজ্ঞানের ভেতর থেকেও। ২০২৩ সালের এপ্রিলে বেরেলির আইসিএআর-ইন্ডিয়ান ভেটেরিনারি রিসার্চ ইনস্টিটিউট (আইভিআরআই), যা ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অব অ্যাগ্রিকালচারাল রিসার্চের অধীন একটি জাতীয় প্রতিষ্ঠান, গরু, মহিষ ও মানুষের প্রস্রাব নিয়ে একটি গবেষণার ফল জানায়। প্রতিষ্ঠানটির এপিডেমিওলজি বিভাগের প্রধান ভোজ রাজ সিং তিনজন পিএইচডি শিক্ষার্থীকে নিয়ে ২০২২ সালের জুন থেকে নভেম্বর পর্যন্ত গবেষণাটি পরিচালনা করেন।

গবেষক দল ৭৩টি প্রস্রাবের নমুনা বিশ্লেষণ করে। গরুর নমুনা নেওয়া হয় স্থানীয় দুগ্ধখামার থেকে, তিনটি জাতের গরু থেকে: সাহিওয়াল, থারপারকার এবং সংকর জাত বৃন্দাবনী। গবেষকেরা জানান, গাভি ও ষাঁড়ের প্রস্রাবে অন্তত ১৪ ধরনের ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া পাওয়া গেছে, যার মধ্যে আছে পেটের অসুখের সঙ্গে সাধারণত যুক্ত এশেরিকিয়া কোলাই বা ই. কোলাই। তাদের উপসংহার ছিল, গোমূত্র মানুষের সরাসরি পানের উপযোগী নয়।

গবেষণায় আরও দেখা যায়, কিছু ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে মহিষের প্রস্রাবের ব্যাকটেরিয়ারোধী ক্ষমতা গোমূত্রের চেয়ে বেশি। ভোজ রাজ সিং দ্য টাইমস অব ইন্ডিয়াকে বলেন, গোমূত্র ব্যাকটেরিয়ারোধী, এই প্রচলিত ধারণাকে সবক্ষেত্রে সত্য বলে ধরে নেওয়া যায় না; আপাতদৃষ্টিতে সুস্থ মানুষের প্রস্রাবের নমুনার একটি বড় অংশেও সম্ভাব্য রোগসৃষ্টিকারী ব্যাকটেরিয়া পাওয়া গেছে। গবেষণার ফলাফল অনলাইন গবেষণা প্ল্যাটফর্ম রিসার্চগেটে প্রকাশ করা হয়। দ্য কুইন্ট গবেষণাটির খবর প্রকাশের সময় উল্লেখ করে, এর ফলাফল ছিল তাজা গোমূত্র নিয়ে।

একটি সাহিওয়াল গাভি; ২০২২ সালে আইভিআরআইয়ের গবেষণায় এই ভারতীয় জাতের গরুর প্রস্রাবের নমুনা নেওয়া হয়েছিল। ছবিটি ভারতে তোলা। ছবি: Pavanaja / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)
একটি সাহিওয়াল গাভি; ২০২২ সালে আইভিআরআইয়ের গবেষণায় এই ভারতীয় জাতের গরুর প্রস্রাবের নমুনা নেওয়া হয়েছিল। ছবিটি ভারতে তোলা। ছবি: Pavanaja / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)

পরিসংখ্যানে ভারতের ক্যানসার পরিস্থিতি


সস্তা নিরাময়ের দাবি কেন এত মনোযোগ পায়, তা বোঝা যায় ভারতে ক্যানসারের ব্যাপকতা দেখলে। জাতীয় ক্যানসার নিবন্ধন কর্মসূচির তথ্য নিয়ে বেঙ্গালুরুর আইসিএমআর-ন্যাশনাল সেন্টার ফর ডিজিজ ইনফরমেটিকস অ্যান্ড রিসার্চের একটি গবেষণাপত্র ২০২৩ সালের মার্চে ইন্ডিয়ান জার্নাল অব মেডিক্যাল রিসার্চে প্রকাশিত হয়। এতে হিসাব করা হয়, ২০২২ সালে ভারতে ক্যানসারে নতুন আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ১৪ লাখ ৬১ হাজার ৪২৭: পুরুষ ৭ লাখ ১২ হাজার ১৭৬ এবং নারী ৭ লাখ ৪৯ হাজার ২৫১ জন। গবেষণাপত্রের প্রক্ষেপণ অনুযায়ী, এই সংখ্যা ২০২২ সালের ১৪ লাখ ৬০ হাজার থেকে ২০২৫ সালে ১৫ লাখ ৭০ হাজারে পৌঁছাতে পারে।

একই গবেষণাপত্রের হিসাবে, ভারতে প্রতি নয়জনে একজনের ৭৪ বছর বয়সের মধ্যে ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি আছে। পুরুষদের মধ্যে শীর্ষে ছিল ফুসফুসের ক্যানসার, মোট ক্যানসারের ১০ দশমিক ৬ শতাংশ, এরপর মুখগহ্বরের ক্যানসার, ৮ দশমিক ৪ শতাংশ। নারীদের মধ্যে স্তন ক্যানসার ছিল ২৮ দশমিক ৮ শতাংশ এবং জরায়ুমুখের ক্যানসার ১০ দশমিক ৬ শতাংশ। ১৪ বছর পর্যন্ত বয়সী শিশুদের মধ্যে ছেলে ও মেয়ে উভয়ের ক্ষেত্রে শীর্ষে ছিল লিম্ফয়েড লিউকেমিয়া।

বিশ্বজুড়ে পরিস্থিতি নিয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ক্যানসার গবেষণা সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল এজেন্সি ফর রিসার্চ অন ক্যানসার ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে জানায়, ২০২২ সালে বিশ্বে আনুমানিক ২ কোটি মানুষ নতুন করে ক্যানসারে আক্রান্ত হন এবং ৯৭ লাখ মানুষ মারা যান; জীবদ্দশায় প্রতি পাঁচজনে প্রায় একজন ক্যানসারে আক্রান্ত হন। সংস্থাটির হিসাবে, ক্যানসার শনাক্ত হওয়ার পর পাঁচ বছরের মধ্যে আছেন, বিশ্বে এমন জীবিত মানুষের সংখ্যা প্রায় ৫ কোটি ৩৫ লাখ।

গরুজাত পণ্যের দাবি নিয়ে আগের বিতর্ক


ভারতে গরুজাত পণ্য নিয়ে করা দাবি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ার ঘটনা জবলপুর প্রকল্পই প্রথম নয়। ২০২০ সালের অক্টোবরে গবাদিপশু সুরক্ষা ও উন্নয়নের জাতীয় সরকারি সংস্থা রাষ্ট্রীয় কামধেনু আয়োগের চেয়ারম্যান দাবি করেন, গোবরের তৈরি একটি "চিপ" মোবাইল ফোনের গায়ে রাখলে ফোনের বিকিরণ কমে, আর ঘরে গোবরের ঘুঁটে রাখলেও বিকিরণ কমে।

এর জবাবে ছয় শতাধিক বিজ্ঞানী ও বিজ্ঞান শিক্ষক ইন্ডিয়া মার্চ ফর সায়েন্সের মুম্বাই শাখার উদ্যোগে একটি বিবৃতি দিয়ে প্রমাণ চান। তারা জানতে চান, পরীক্ষাগুলো কোথায় ও কখন হয়েছে, প্রধান গবেষক কারা, ফলাফল কোথায় প্রকাশিত হয়েছে এবং পরীক্ষার তথ্য ও বিস্তারিত বিবরণ প্রকাশ করা যাবে কি না।

জাগো নিউজ২৪-এর মূল প্রতিবেদনে একই ধরনের দাবি নিয়ে পত্রিকাটির আগের কয়েকটি প্রতিবেদনের লিংক দেওয়া ছিল, যার মধ্যে আছে মোবাইলের বিকিরণ ঠেকাতে গোবরের চিপ এবং গোমূত্র ও গোবরে করোনাভাইরাস সারবে, এমন একটি দাবি।

খামারে গোবর ও পঞ্চগব্য


খামারে গোবর ও গোমূত্রের প্রতিষ্ঠিত ব্যবহার আছে, জৈব সার, জ্বালানি ও জৈব মিশ্রণের উপাদান হিসেবে; সেই ব্যবহার রোগ সারানোর দাবি থেকে সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়।

ভারতের তামিলনাড়ু কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (টিএনএইউ) তাদের কৃষি তথ্য পোর্টালে পঞ্চগব্যকে জৈব চাষের একটি উপকরণ হিসেবে বর্ণনা করেছে। তাদের প্রস্তুত প্রণালিতে উপাদান হিসেবে আছে গোবর, গাওয়া ঘি, গোমূত্র, পানি, গরুর দুধ, দই, ডাবের পানি, গুড় ও পাকা কলা। এগুলো ছায়ায় রাখা খোলা পাত্রে প্রায় এক মাস ধরে গাঁজানো হয়, দিনে দুবার নাড়তে হয় এবং মাছি ঠেকাতে জাল দিয়ে ঢেকে রাখতে হয়। বিশ্ববিদ্যালয়টি এর ব্যবহার হিসেবে পাতায় স্প্রে, সেচের পানিতে মেশানো, বীজ ও চারা শোধন এবং পশুখাদ্য বা পানির সঙ্গে মেশানোর কথা উল্লেখ করেছে।

ফলন বৃদ্ধি নিয়ে টিএনএইউর দেওয়া পরিসংখ্যান তাদের নিজস্ব কাজ থেকে নেওয়া; এগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ের দাবি, স্বাধীন পরীক্ষায় নিশ্চিত হওয়া ফল নয়। বাংলাদেশের কোনো কৃষক কোনো ফসলে এ ধরনের জৈব উপকরণ ব্যবহার করতে চাইলে কীভাবে ও কখন প্রয়োগ করবেন, তা আগে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার কাছে জেনে নেওয়া উচিত।

২০১০ সালে বাংলাদেশে শুকাতে দেওয়া গোবরের ঘুঁটে; খড় বা ফসলের অবশিষ্টাংশ মিশিয়ে গোবর শুকিয়ে রান্নার জ্বালানি করা হয়। ছবি: Melanie Ko / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY 2.0)
২০১০ সালে বাংলাদেশে শুকাতে দেওয়া গোবরের ঘুঁটে; খড় বা ফসলের অবশিষ্টাংশ মিশিয়ে গোবর শুকিয়ে রান্নার জ্বালানি করা হয়। ছবি: Melanie Ko / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY 2.0)

জবলপুর ও সেখানকার ভেটেরিনারি বিশ্ববিদ্যালয়


জবলপুর মধ্য ভারতের মধ্য প্রদেশ রাজ্যে নর্মদা নদীর তীরের একটি শহর; সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে এর উচ্চতা প্রায় ৪১২ মিটার। শহরটি জবলপুর জেলা ও জবলপুর বিভাগের সদর দপ্তর। শহরের চারপাশে নর্মদা অববাহিকার পলিমাটিতে গম, ধান, জোয়ার ও বিভিন্ন মিলেটের পাশাপাশি ডাল, তেলবীজ, তুলা ও আখের চাষ হয়। শহরটিতে মধ্য প্রদেশ হাইকোর্ট রয়েছে, আর রয়েছে রানি দুর্গাবতী বিশ্ববিদ্যালয় ও মধ্য প্রদেশ মেডিক্যাল সায়েন্স বিশ্ববিদ্যালয়। এ ছাড়া শহরটিতে দুটি জাতীয় গবেষণাকেন্দ্র আছে: আইসিএমআর-ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব রিসার্চ ইন ট্রাইবাল হেলথ এবং ট্রপিক্যাল ফরেস্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউট।

নানাজি দেশমুখ ভেটেরিনারি সায়েন্স বিশ্ববিদ্যালয়, যার আগের নাম মধ্য প্রদেশ পশু চিকিৎসা বিজ্ঞান বিশ্ববিদ্যালয়, রাজ্যটির পশুচিকিৎসা বিজ্ঞান ও মৎস্য বিষয়ক বিশ্ববিদ্যালয়। ২০০৯ সালে একই বছরের একটি রাজ্য আইনের অধীনে এটি প্রতিষ্ঠিত হয়। এর অধীনে জবলপুর, মৌ ও রেওয়ায় তিনটি ভেটেরিনারি কলেজ রয়েছে; জবলপুরে আছে একটি ফিশারি কলেজ, বন্যপ্রাণী ফরেনসিক ও স্বাস্থ্য বিষয়ক একটি স্কুল এবং একটি প্রাণী জৈবপ্রযুক্তি কেন্দ্র; আর রয়েছে পশুপালনে দুই বছর মেয়াদি ডিপ্লোমা দেওয়া পাঁচটি পলিটেকনিক কলেজ।

ছবি: Harvinder Chandigarh / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)

সূত্র: জাগো নিউজ২৪, দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, দ্য কুইন্ট, মাধ্যমম, যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ক্যানসার ইনস্টিটিউট, ক্যানসার রিসার্চ ইউকে, ইন্ডিয়ান জার্নাল অব মেডিক্যাল রিসার্চ (আইসিএমআর-এনসিডিআইআর), ইন্টারন্যাশনাল এজেন্সি ফর রিসার্চ অন ক্যানসার, বিজনেস টুডে, দ্য কুইন্ট ফিট, মেডিক্যাল ডায়ালগস, দ্য উইক (পিটিআই), তামিলনাড়ু কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, উইকিপিডিয়া

অনলাইন ডেস্কদা এগ্রো নিউজ

লাইভস্টক

সম্পর্কিত খবর

লাইভস্টক

সৌরপ্যানেলের নিচে ভেড়া চরালে বাড়ে মৌমাছি, তবে সংখ্যা রাখতে হবে কম

কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণায় দেখা গেছে, সৌরখামারে হেক্টরপ্রতি দুটি ভেড়া চরালে ঘাস কাটার তুলনায় উপকারী পোকা ৩৮ শতাংশ বাড়ে। খামারিদের জন্য ভেড়ার পাল পরিকল্পনার একটি সহায়ক টুলও তৈরি করেছেন গবেষকেরা।

Farms.com১৬ অক্টোবর ২০২৬২ মিনিটের পড়া
লাইভস্টক

প্রোটিনের চাহিদায় বদলে গেল কানাডার দুধের বাজার, মাখনের উদ্বৃত্ত শেষ

দুগ্ধজাত প্রোটিনের চাহিদা বাড়ায় পাঁচ বছরের মধ্যে কানাডার দুধের বাজারে মাখনচর্বির কাঠামোগত উদ্বৃত্ত মিটে গেছে, দুধের দাম নির্ধারণেও এসেছে পরিবর্তন।

Manitoba Co-operator১৬ অক্টোবর ২০২৬১ মিনিটের পড়া
লাইভস্টক

সিকি হেক্টরে ওটের বীজ চাষ, ইথিওপিয়ার এক কৃষকের পারিবারিক ব্যবসা

ইথিওপিয়ার এক ক্ষুদ্র কৃষক মাত্র শূন্য দশমিক ২৫ হেক্টর জমিতে বীজের জন্য ওট চাষ করে প্রথম ফসল ৪৫ হাজার বির্রে বিক্রি করেন এবং পরের বছর চাষ বাড়ান। আইএলআরআইয়ের পশুখাদ্যের বীজকে ব্যবসায় রূপ দেওয়ার উদ্যোগের অংশ এটি।

ILRI১৬ অক্টোবর ২০২৬২ মিনিটের পড়া

মন্তব্য

(০)