২০২৫ সালের ডিসেম্বরের শুরুতে শীত নামতেই চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলার গ্রামগুলোতে খেজুরের রস সংগ্রহে ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন গাছিরা। জাগো নিউজ ২৪-এ ১০ ডিসেম্বর প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে খেজুর গাছে নল বসিয়ে রস সংগ্রহ চলছিল। ভোরে মাটির হাঁড়িতে জমা রস নামিয়ে আনা গ্রামবাংলার শীতের পুরোনো ঐতিহ্য। তবে গাছি, স্থানীয় বাসিন্দা ও কৃষি কর্মকর্তা সবাই জানিয়েছিলেন, খেজুর গাছ আর রস দুটোই আগের চেয়ে কমে গেছে।
অগ্রহায়ণ থেকে মাঘ: এক গাছির দিনরাত
মতলব উত্তরের দেওয়ানজীকান্দি গ্রামের মো. গোলাম হোসেন প্রধান দীর্ঘদিন ধরে গ্রামের অভিজ্ঞ গাছি হিসেবে রস সংগ্রহ করছেন। তিনি বলেন, ‘আগের মতো খেজুর গাছ আর দেখা যায় না। তবুও যে গাছগুলো আছে; সেগুলোর সর্বোচ্চ ব্যবহার করতে চেষ্টা করছি। অগ্রহায়ণ থেকে মাঘ পর্যন্ত রস সংগ্রহ চলে। দুপুরের পর থেকে গাছ প্রস্তুত করে নল বসাই। রাতভর ফোঁটা ফোঁটা রস এসে হাঁড়ি ভরে যায়। ভোরে গিয়ে রস সংগ্রহ করে বাজারে বিক্রি করি। তবে আগের মতো রস পাওয়া যায় না।’

ভুল পদ্ধতিতে গাছ কাটায় কমছে গাছ ও রস
স্থানীয় বাসিন্দা জহির উদ্দিন ও আবুল কালাম বলেন, ‘অনভিজ্ঞ গাছিদের ভুল পদ্ধতিতে গাছ কাটার কারণে অনেক গাছ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। ফলে খেজুরের রসের উৎপাদনও কমে এসেছে। একসময় শীত এলে গাছিদের ঘরে শিশু থেকে বৃদ্ধ সবার ভিড় লেগে থাকতো। এখন সেই দৃশ্য বিরল হলেও গ্রামের মানুষের আগ্রহ এখনো কমেনি।’
মতলব উত্তর উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ২৭৭.৫০ বর্গকিলোমিটার আয়তনের উপজেলায় তখন প্রায় ২ হাজার ১৭৭টি খেজুর গাছ ছিল, যার অধিকাংশেই রস সংগ্রহের কাজ চলছিল।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ফয়সাল মোহাম্মদ আলী বলেন, ‘খেজুর রস সংগ্রহ গ্রামীণ জীবনের ঐতিহ্যমণ্ডিত পেশা। তবে অনভিজ্ঞ গাছিদের ভুল পদ্ধতিতে গাছ কাটার কারণে অনেক গাছ ঝরে যাচ্ছে, যা উদ্বেগের বিষয়। নতুন গাছি ও কৃষকদের প্রশিক্ষণ দিলে এবং সরকারি উদ্যোগে ব্যাপকভাবে খেজুর গাছ রোপণ শুরু হলে ঐতিহ্য শুধু টিকেই থাকবে না বরং আয় ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।’
বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী, মতলব উত্তর উপজেলার প্রধান নদী মেঘনা, গুমতি ও ধনাগোদা। ২০০০ সালের ৩০ এপ্রিল পুরোনো মতলব উপজেলা ভাগ হয়ে মতলব উত্তর ও মতলব দক্ষিণ উপজেলা হয়। এখানকার প্রধান ফসল ধান, গম, আলু, পাট, আখ ও সরিষা।

রস থেকে গুড় আর শীতের পিঠা-পায়েস
রস সংগ্রহের পর মতলব উত্তরের গ্রামবাসী ক্ষীর, পায়েস, পিঠা, নাড়ুসহ শীতের ঐতিহ্যবাহী খাবার তৈরি করেন। আত্মীয়স্বজনকে আপ্যায়নে এসব খাবার এখনো শীতের বড় আনন্দ।
বাংলাদেশে যে খেজুর গাছ থেকে রস নামানো হয়, তার বৈজ্ঞানিক নাম ফিনিক্স সিলভেস্ট্রিস (Phoenix sylvestris)। গাছটি বাংলাদেশ, ভারতের বেশির ভাগ অঞ্চল, নেপাল, ভুটান, মিয়ানমার ও পাকিস্তানের দক্ষিণাঞ্চলের স্থানীয় গাছ। বাংলাদেশ ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গে টাটকা রস জ্বাল দিয়ে গুড় তৈরি করা হয়।

কাঁচা রস খাবেন না: নিপাহ ভাইরাসের ঝুঁকি
খেজুরের কাঁচা রস খাওয়া স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে নিপাহ ভাইরাস প্রথম শনাক্ত হয় ২০০১ সালে এবং এরপর প্রায় প্রতিবছর দেশটিতে এর প্রাদুর্ভাব হয়েছে। সংক্রমিত বাদুড়ের লালা বা প্রস্রাবে দূষিত কাঁচা খেজুরের রস বা ফল খাওয়াকে সংক্রমণের সবচেয়ে সম্ভাব্য উৎস বলে উল্লেখ করেছে সংস্থাটি।
২০২৫ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত ডব্লিউএইচওর প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশে নিপাহর মৌসুমি প্রাদুর্ভাব হয় ডিসেম্বর থেকে মে মাসে, খেজুরের রস সংগ্রহের সময়ে। ২০২৫ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২৯ আগস্টের মধ্যে চারজন রোগী শনাক্ত হন এবং চারজনই মারা যান; প্রথম তিনজনের কাঁচা রস খাওয়ার ইতিহাস ছিল। নজরদারি ব্যবস্থায় তখন পর্যন্ত দেশে ৩৪৭ জন রোগী শনাক্ত হয়েছিলেন, মৃত্যুহার ৭১.৭ শতাংশ।
- খেজুরের কাঁচা রস খাবেন না; টাটকা রস জ্বাল দিয়ে খান (ডব্লিউএইচও)।
- বাঁশের তৈরি আবরণ দিয়ে রসের হাঁড়ি ও গাছের কাটা অংশ ঢেকে বাদুড় দূরে রাখুন।
- বাদুড়ে খাওয়া বা কামড়ের দাগ থাকা ফল ফেলে দিন; অন্য ফল ভালো করে ধুয়ে, খোসা ছাড়িয়ে খান।
- রস খাওয়ার পর অসুস্থ বোধ করলে দেরি না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
ছবি: Azaman666 / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (নিপাহ ভাইরাস ফ্যাক্টশিট ও ডিজিজ আউটব্রেক নিউজ), বাংলাপিডিয়া, উইকিপিডিয়া (Phoenix sylvestris)





মন্তব্য
(০)