২০২৬ সালের জুলাইয়ের শুরুতে দেশের বিভিন্ন এলাকায় তাপপ্রবাহের মধ্যে মানুষের পাশাপাশি কষ্টে পড়ে পোষা প্রাণী ও পথপ্রাণীরাও। বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস) ৪ জুলাই জানায়, বর্ষাকাল হলেও রংপুর বিভাগে মৃদু তাপপ্রবাহ বইছে; সেদিন সৈয়দপুরে ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড হয়। এই প্রেক্ষাপটে ৬ জুলাই জাগো নিউজ ২৪-এ গণ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও সংবাদকর্মী শামিম রেজার প্রতিবেদনে ভেটেরিনারি চিকিৎসক ডা. নাজিম উদ্দিন গরমে পোষা প্রাণীর ঝুঁকি ও যত্নের নিয়ম তুলে ধরেন। তাঁর কথায়, প্রাণীরা নিজেদের অসুবিধা ভাষায় প্রকাশ করতে পারে না, তাই মালিকদেরই লক্ষণ বুঝে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে।
গরমে প্রাণীর প্রধান ঝুঁকি
এই চিকিৎসকের মতে, তীব্র গরমে প্রাণীদের সবচেয়ে বেশি দেখা যায় পানিশূন্যতা, আর সবচেয়ে বিপজ্জনক হিট স্ট্রোক। কুকুর ও বিড়ালের শরীরে মানুষের মতো পর্যাপ্ত ঘামগ্রন্থি নেই, তাই তারা সহজে শরীরের তাপ কমাতে পারে না। যুক্তরাজ্যের প্রাণিকল্যাণ সংস্থা আরএসপিসিএ জানায়, কুকুর মূলত হাঁপিয়ে শরীর ঠান্ডা রাখে; তাতেও তাপ না কমলে হিট স্ট্রোক হয়, যা প্রাণঘাতী হতে পারে।
আরএসপিসিএ ও যুক্তরাষ্ট্রের সংস্থা এএসপিসিএর তথ্যে, ছানা ও বয়স্ক, ঘন লোমের, অতিরিক্ত ওজনের, হৃদ্যন্ত্র বা শ্বাসতন্ত্রের রোগে ভোগা প্রাণী এবং পাগ বা পারস্য বিড়ালের মতো চ্যাপ্টা মুখের জাত বেশি ঝুঁকিতে থাকে। ডা. নাজিম উদ্দিন জানান, গরমে খাবার দ্রুত নষ্ট হওয়ায় বমি ও ডায়রিয়া বাড়ে, ত্বকের সংক্রমণ এবং টিক ও ফ্লির উপদ্রবও বেশি দেখা যায়।

হিট স্ট্রোকের লক্ষণ
ডা. নাজিম উদ্দিনের মতে, কুকুর বা বিড়াল যদি অস্বাভাবিকভাবে মুখ হা করে দ্রুত হাঁপায়, মুখ থেকে বেশি লালা ঝরে, মাড়ি ও জিহ্বা উজ্জ্বল লাল, বেগুনি বা নীলচে হয়ে যায়, তবে তা বিপদের সংকেত। আরএসপিসিএ ও এএসপিসিএও একই ধরনের লক্ষণের কথা বলে:
- অতিরিক্ত হাঁপানো, শ্বাসকষ্ট বা শব্দ করে শ্বাস নেওয়া
- বেশি লালা ঝরা, লাল মাড়ি ও জিহ্বা
- হৃৎস্পন্দন বেড়ে যাওয়া
- দুর্বলতা, ঝিমুনি, দাঁড়াতে বা হাঁটতে কষ্ট, শরীর কাঁপা
- বমি ও ডায়রিয়া, কখনো রক্তমিশ্রিত
- খিঁচুনি, অচেতন হয়ে পড়া বা লুটিয়ে পড়া
- শরীরের তাপমাত্রা ১০৪ ডিগ্রি ফারেনহাইটের বেশি (এএসপিসিএ)
আগে ঠান্ডা, তারপর চিকিৎসকের কাছে
আরএসপিসিএর নির্দেশনা হলো, আগে প্রাণীকে ঠান্ডা করা, তারপর চিকিৎসকের কাছে নেওয়া। প্রথমে প্রাণীর চলাফেরা থামিয়ে তাকে রোদ, গরম গাড়ি বা ঘর থেকে সরিয়ে ছায়ায় ও বাতাস চলাচলের জায়গায় নিতে হবে। এরপর শরীরের চেয়ে ঠান্ডা যেকোনো পানি ঢালতে হবে, বিশেষ করে ঘাড়, পেট ও ঊরুতে; মাথায় পানি ঢালা উচিত নয়, কারণ তখন প্রাণীটি এমনিতেই শ্বাস নিতে কষ্ট পায়। ভেজা শরীরে পাখা বা ফ্যানের বাতাস দিলে তাপ দ্রুত কমে। ভেজা তোয়ালে শরীরের ওপর চাপা দেওয়া যাবে না, এতে তাপ আটকে যায়।
অনেকের ধারণা, ঠান্ডা পানি দিলে প্রাণী শকে চলে যায়। আরএসপিসিএ বলছে, অতিরিক্ত গরম হওয়া কুকুরের ক্ষেত্রে এমনটা কদাচিৎ হয়, বরং দ্রুত ঠান্ডা করাই জরুরি; তবে অচেতন, বয়স্ক বা অসুস্থ প্রাণীকে পানিতে না ডুবিয়ে স্বাভাবিক তাপমাত্রার পানি ছিটাতে হবে। প্রাণী সচেতন থাকলে অল্প অল্প পানি দেওয়া যায়, কিন্তু জোর করে খাওয়ানো উচিত নয়, বলেন ডা. নাজিম উদ্দিন। তাঁর ভাষায়, ‘প্রাথমিক চিকিৎসার পরও অবশ্যই দ্রুত ভেটেরিনারি চিকিৎসকের কাছে নিতে হবে। কারণ হিট স্ট্রোকের কারণে কিডনি, লিভার বা অন্যান্য অভ্যন্তরীণ অঙ্গ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।’ চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কোনো ওষুধ দেওয়া ঠিক নয়; উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরের ভেটেরিনারি সার্জনের সাহায্য নেওয়া যায়।

পানি, খাবার ও যে ভুলগুলো এড়াতে হবে
গরমে প্রাণীর জন্য সব সময় পরিষ্কার পানি ও ছায়া রাখতে হবে এবং অতিরিক্ত ব্যায়াম করানো যাবে না (এএসপিসিএ)। ডা. নাজিম উদ্দিন ভারী ও চর্বিযুক্ত খাবারের বদলে সহজপাচ্য, তাজা খাবার সকাল বা সন্ধ্যায় দিতে বলেন, আর খাবার দীর্ঘক্ষণ পাত্রে ফেলে না রেখে অল্প অল্প করে বারবার দেওয়া ভালো।
সবচেয়ে বড় ভুল হলো রোদে রাখা গাড়ির ভেতরে প্রাণীকে রেখে যাওয়া; এএসপিসিএর মতে এতে প্রাণঘাতী হিট স্ট্রোক হতে পারে। দুপুরের কড়া রোদে বা তপ্ত পিচঢালা রাস্তায় হাঁটানোও ঝুঁকিপূর্ণ, কারণ থাবার নরম তলা পুড়ে যেতে পারে। বাতাস চলাচলহীন ঘরে আটকে রাখাও ক্ষতিকর। লোম পুরো কামিয়ে ফেলা নিয়েও সতর্ক করেন চিকিৎসক; এএসপিসিএও বলে, কুকুরের লম্বা লোম ছাঁটা যায়, কিন্তু পুরো কামানো উচিত নয়, কারণ লোমের স্তর অতিরিক্ত গরম ও রোদে পোড়া থেকে রক্ষা করে।
পথপ্রাণীর জন্য ছোট উদ্যোগ
গরমে সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়ে পথপ্রাণীরা। ডা. নাজিম উদ্দিনের পরামর্শ, বাড়ির সামনে, দোকানের পাশে বা ছায়ায় এক পাত্র পানি রাখলে কুকুর, বিড়াল ও পাখিরা পান করতে পারে। ছায়ায় আশ্রয় নেওয়া প্রাণীকে তাড়িয়ে না দিয়ে সম্ভব হলে কিছু খাবার দেওয়া যায়, আর কোনো প্রাণী গুরুতর অসুস্থ হলে স্থানীয় প্রাণী উদ্ধারকারী সংগঠন বা ভেটেরিনারি চিকিৎসকের সাহায্য নিতে হবে।

ছবি: IketaniDaisei / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪ (৬ জুলাই ২০২৬), বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (৪ জুলাই ২০২৬), আরএসপিসিএ (কুকুরের হিট স্ট্রোক নির্দেশিকা), এএসপিসিএ (গরমে নিরাপত্তার পরামর্শ)




মন্তব্য
(০)