২০২৬ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি, রমজানের প্রথম সপ্তাহে, সাতক্ষীরার বাজারে দেশি ও বিদেশি ফলের দাম ছিল সাধারণ ক্রেতার নাগালের বাইরে। জাগো নিউজের সাতক্ষীরা প্রতিনিধির সরেজমিন প্রতিবেদনে দেখা যায়, আগের এক সপ্তাহে ফলের দাম কেজিতে ২০ থেকে ৮০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছিল। নিম্ন ও মধ্যম আয়ের অনেক মানুষ পছন্দের ফল না কিনেই ফিরছিলেন, আর যাঁরা আগে কেজি ধরে কিনতেন, তাঁরা কিনছিলেন গ্রাম হিসাবে।
জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বাংলাদেশে সে বছর রোজা শুরু হয়েছিল ১৯ ফেব্রুয়ারি বৃহস্পতিবার। সারা দিন রোজার পর ইফতারে ফলের চাহিদা থাকে সবচেয়ে বেশি। তথ্য নেওয়া হয়েছিল সাতক্ষীরা শহরের সুলতানপুর বড় বাজার, হাটের মোড়, থানা মোড় ও নিউ মার্কেট মোড়ের ফলের দোকান এবং কয়েকটি উপজেলার বাজার থেকে।
দেশি ফলেও স্বস্তি ছিল না
সাতক্ষীরা ফলের জন্য পরিচিত হলেও স্থানীয় ফলের দামও চড়া ছিল। রোজার আগে ৭০ থেকে ৮০ টাকা কেজির পেয়ারা তখন বিক্রি হচ্ছিল ১০০ থেকে ১৫০ টাকায়। ভালো মানের পেঁপে ৮০ থেকে ১৪০ টাকা আর তরমুজ ৮০ থেকে ৯০ টাকা কেজি। প্রতিটি লেবু ৪ থেকে ১০ টাকা এবং ডাব ১২০ থেকে ১৫০ টাকা। নারকেলি কুল, আপেল কুল ও বাউ কুল বিক্রি হচ্ছিল কেজি ৬০ থেকে ১৫০ টাকায়। সাগর কলা ৫০ থেকে ৬০ টাকা এবং সবরি কলা ৮০ থেকে ১০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছিল।

আমদানি করা ফল ও খেজুর আরও দামি
বাজারে লাল আপেল কেজি ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকা, সবুজ আপেল ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকা, মাল্টা ৩২০ থেকে ৩৬০ টাকা, বেদানা ৪০০ থেকে ৫৫০ টাকা এবং লাল আঙুর ৬০০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছিল। সাধারণ মানের খেজুর ৪০০ টাকা ছাড়িয়েছিল; ভালো মানের খেজুর ৮০০ টাকা এবং উন্নত জাতের খেজুর ১,৫০০ থেকে ২,০০০ টাকা কেজি।
দাম বাড়ার চিত্র কেবল সাতক্ষীরার ছিল না। প্রথম আলো ২১ ফেব্রুয়ারি জানায়, চট্টগ্রামের পাইকারি বাজারেও এক সপ্তাহে আপেল, কমলা ও আঙুরের দাম বেড়েছিল। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশে ৩৮ ধরনের ফল আমদানি হয়, যার প্রায় ৯৫ শতাংশই আপেল, কমলা, মাল্টা, আঙুর ও আনার। ২০২২ সালের জুন-জুলাইয়ে ডলার-সংকটের সময় আমদানি নিরুৎসাহিত করতে শুল্ক-কর বাড়ানো হয় এবং ডলারের বিনিময় হারও বেড়ে যায়, তখন থেকেই বিদেশি ফলের দাম বাড়তে শুরু করে। বাংলাদেশ ফ্রেশ ফ্রুটস ইমপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সিরাজুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ফলে শুল্ক-কর প্রায় ১২৩ শতাংশ।

ক্রেতার আক্ষেপ, ব্যবসায়ীর ব্যাখ্যা
দিনমজুর মাসুদ হোসেন জাগো নিউজকে বলেন, অসুস্থ সন্তানের জন্য চিকিৎসক ফল কিনতে বলেছিলেন, কিন্তু এক কেজি আপেলের টাকায় তাঁর পরিবারের দুই দিনের বাজার হয়ে যায়, তাই খালি হাতে ফিরছিলেন। বেসরকারি চাকরিজীবী বেলাল হোসেন ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেটকে দায়ী করেন; তিনি কেবল এক কেজি কলা ও ৫০০ গ্রাম কুল কিনেছিলেন। গৃহিণী ফাতেমা বেগম বলেন, লেবুর শরবতও তাঁদের জন্য বিলাসিতা হয়ে গেছে।
বিক্রেতারা সিন্ডিকেটের অভিযোগ অস্বীকার করেন। সুলতানপুর বড় বাজারের খুচরা বিক্রেতা শামীম হোসেন জানান, দাম বাড়ায় বিক্রি অনেক কমে গেছে; আগে যাঁরা কেজি ধরে কিনতেন, তাঁরা এখন আধা কেজি বা ২৫০ গ্রাম কিনছেন। দেশি ফলের ব্যবসায়ী ইদ্রিস হোসেন বলেন, গ্রাম থেকে ফল আনতে গাড়িভাড়া ও শ্রমিক খরচ বেড়েছে, মোকামেই (পাইকারি বাজার) দাম চড়া। ভোমরা স্থলবন্দরের ফল আমদানিকারক মো. কবিরুল ইসলাম ডলারের মূল্যবৃদ্ধি, অতিরিক্ত আমদানি শুল্ক এবং ব্যাংকে এলসি খোলার জটিলতাকে কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন। ভোমরা সাতক্ষীরা সদর উপজেলায় ভারতের সঙ্গে আমদানি-রপ্তানির একটি স্থলবন্দর; ভারতের দিকে এর নাম ঘোজাডাঙ্গা।

ভোক্তা অধিদপ্তরের বাজার তদারকি
জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর সাতক্ষীরার সহকারী পরিচালক মো. মেহেদী হাসান তানভীর জাগো নিউজকে জানান, তাঁরা নিয়মিত বাজার তদারকি করছেন এবং অভিযানে ব্যবসায়ীদের ক্রয়-বিক্রয়ের রশিদ যাচাই করছেন। অসাধু সিন্ডিকেট বা অসংগতি পেলে আইন অনুযায়ী জরিমানাসহ ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে এবং ঈদের আগের দিন পর্যন্ত অভিযান চলবে বলে তিনি জানান। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন, ২০০৯-এর অধীনে গঠিত এই অধিদপ্তর পণ্য ও সেবা নিয়ে ভোক্তার অভিযোগ শোনে এবং তদন্তে দোষ পেলে প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা করতে পারে।
ছবি: Yahya / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, প্রথম আলো, উইকিপিডিয়া





মন্তব্য
(০)