২০২৬ সালের ১৭ জুন, লটকনের ভরা মৌসুমে, বাংলা সংবাদমাধ্যম জাগো নিউজ ২৪-এর লাইফস্টাইল বিভাগে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। তাতে বলা হয়, যাঁরা ওজন কমাতে চান, তাঁদের সঙ্গী হতে পারে লটকন, ইংরেজিতে যার নাম বার্মিজ গ্রেপ। পিনপয়েন্টম্যাক্স নামের একটি ওয়েবসাইটকে তথ্যসূত্র হিসেবে উল্লেখ করা ওই প্রতিবেদনের যুক্তি ছিল, টক-মিষ্টি এই মৌসুমি ফল ওজন নিয়ন্ত্রণের খাদ্যতালিকায় সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে। একই সঙ্গে প্রতিবেদনে স্পষ্ট করে বলা হয়, লটকন সরাসরি 'ম্যাজিক' করে ওজন কমিয়ে দেয়, এমন দাবি সঠিক নয়। এই লেখায় তুলে ধরা হলো প্রতিবেদনটি কী বলেছিল, সে সময় পর্যন্ত প্রকাশিত গবেষণায় ফলটি সম্পর্কে কী পাওয়া গিয়েছিল, বাংলাদেশে লটকন কোথায় চাষ হয়, এবং ওজন, ফল, খাদ্যআঁশ ও ভিটামিন সি নিয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও), যুক্তরাজ্যের জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা সংস্থা এনএইচএস এবং যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল লাইব্রেরি অব মেডিসিনের স্বাস্থ্যতথ্য সেবা মেডলাইনপ্লাস কী পরামর্শ দেয়।
প্রতিবেদনে যা বলা হয়েছিল
প্রতিবেদনটি শুরু হয় একটি চেনা চিত্র দিয়ে। এতে বলা হয়, অতিরিক্ত ওজন এখন একটি সাধারণ স্বাস্থ্য সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে; অনিয়মিত জীবনযাপন, ফাস্টফুড, কম শারীরিক পরিশ্রম ও মানসিক চাপের কারণে অনেকেই বাড়তি ওজন নিয়ে চিন্তায় থাকেন। তাই ওজন নিয়ন্ত্রণে অনেকে স্বাস্থ্যকর খাবারের দিকে ঝুঁকছেন, আর সেই তালিকায় দেশীয় মৌসুমি ফল লটকনও একটি বিকল্প হতে পারে।
প্রতিবেদনের যুক্তি ছিল কয়েকটি বিষয়ের ওপর। এতে বলা হয়, ওজন কমানোর ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো ক্যালরি নিয়ন্ত্রণ, আর লটকনে তুলনামূলক কম ক্যালরি থাকায় যাঁরা ডায়েট মেনে চলছেন, তাঁরা উচ্চ ক্যালরিযুক্ত মিষ্টি বা প্রক্রিয়াজাত খাবারের বদলে এটি বেছে নিতে পারেন। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ফলটিতে খাদ্যআঁশ আছে, যা ধীরে হজম হয় এবং দীর্ঘ সময় পেট ভরা অনুভূতি দেয়, ফলে বারবার খাওয়ার প্রবণতা কমতে পারে; এই আঁশ অন্ত্রের কাজ সচল রাখতেও সাহায্য করে। প্রতিবেদনের মতে, লটকনের প্রাকৃতিক টক-মিষ্টি স্বাদ কৃত্রিম মিষ্টির প্রতি টান কিছুটা কমাতে পারে এবং কোমল পানীয় বা বেশি চিনিযুক্ত খাবারের বিকল্প হতে পারে, আর এর ভিটামিন সি ও খনিজ উপাদান ডায়েটের সময় দুর্বলতা বা ক্লান্তি বোধ করা মানুষকে সতেজ রাখতে সহায়তা করতে পারে।
মূল প্রশ্নে প্রতিবেদনটি ছিল সতর্ক। এতে বলা হয়, শুধু একটি খাবার খেয়ে ওজন কমানো সম্ভব নয়; স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত হাঁটা বা ব্যায়াম, পর্যাপ্ত ঘুম ও ক্যালরি নিয়ন্ত্রণ, সব একসঙ্গে কাজ করে। প্রতিবেদনে লটকনকে সুস্বাদু ও স্বাস্থ্যকর ফল বলা হলেও জানানো হয়, এটি ওজন কমানোর কোনো অলৌকিক উপায় নয়; সঠিক খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত ব্যায়াম ও পরিমিত জীবনযাপনের সঙ্গে যুক্ত হলে ফলটি সেই চেষ্টাকে আরও উপভোগ্য করে তুলতে পারে।
মূল প্রতিবেদনের দুটি অংশ এখানে রাখা হয়নি। প্রতি ১০০ গ্রাম লটকনের যে ক্যালরির হিসাব প্রতিবেদনে দেওয়া হয়েছিল, তা কোনো খাদ্য উপাদান সারণি বা প্রকাশিত গবেষণায় খুঁজে পাওয়া যায়নি; আর প্রতিবেদনে নাম-পরিচয়হীন কিছু অনলাইন আলোচনার কথা বলা হয়েছিল। এর বদলে নিচের অংশগুলোতে প্রকাশিত গবেষণার পরিমাপ এবং নাম উল্লেখ করা স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের পরামর্শের ওপর নির্ভর করা হয়েছে।
লটকন কী ধরনের ফল
লটকন হলো বাক্কাউরিয়া রামিফ্লোরা (Baccaurea ramiflora) নামের একটি ধীরে বাড়া চিরসবুজ গাছের ফল। গাছটি ফাইলান্থেসি (Phyllanthaceae) গোত্রের; পুরোনো কিছু গ্রন্থে একে ইউফরবিয়েসি গোত্রে রাখা হয়েছে। গাছটি ২৫ মিটার পর্যন্ত উঁচু হতে পারে, এর মাথা ছড়ানো এবং বাকল পাতলা। এর আদি বিস্তার বাংলাদেশ, ভারত (আসাম এবং আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জসহ), নেপাল, মিয়ানমার, থাইল্যান্ড, কম্বোডিয়া, লাওস, ভিয়েতনাম, মালয় উপদ্বীপ এবং হাইনানসহ দক্ষিণ চীনে; সেখানে নানা ধরনের মাটিতে চিরসবুজ বনে এটি জন্মায়। প্রকৃতি সংরক্ষণ বিষয়ক আন্তর্জাতিক সংস্থা আইইউসিএনের বিপন্ন প্রজাতির লাল তালিকায় গাছটিকে 'ন্যূনতম উদ্বেগ' শ্রেণিতে রাখা হয়েছে।
ফলটি ডিম্বাকার, ব্যাস ২.৫ থেকে ৩.৫ সেন্টিমিটার, পাকলে হলদেটে থেকে গোলাপি-লাল বা বেগুনি রং ধরে। ভেতরে থাকে দুই থেকে চারটি বড় বীজ, প্রতিটি সাদা নরম রসাল আবরণে মোড়া; এই অংশটিই মানুষ খায়। বার্মিজ গ্রেপ ছাড়াও আসামে ফলটিকে লেতেকু এবং থাইল্যান্ডে মাফাই বলা হয়। লটকন কাঁচা খাওয়া হয়, রান্না করেও খাওয়া হয়, আবার এ থেকে ওয়াইনও তৈরি হয়। তাজা ফল চার থেকে পাঁচ দিন ভালো থাকে, আর এর বিস্তারের কোনো কোনো এলাকায় ফল লবণ দিয়ে সেদ্ধ করে মুখবন্ধ বয়ামে সংরক্ষণ করা হয়। গাছের বাকল, শিকড় ও কাঠ শুকিয়ে, গুঁড়া করে পানিতে ফুটিয়ে প্রচলিত চিকিৎসায় ব্যবহার করা হয়।
২০১৭ সালে ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল অব নিউট্রিশন অ্যান্ড ফুড সায়েন্সেসে 'নিউট্রিশনাল ভ্যালু অ্যান্ড মেডিসিনাল ইউজেস অব মাইনর ফ্রুটস: বার্মিজ গ্রেপ' শিরোনামে প্রকাশিত একটি পর্যালোচনায় ফলটিকে কম ব্যবহৃত একটি অপ্রধান ফল বলা হয়, যা প্রধানত বাংলাদেশ, নেপাল, থাইল্যান্ড, মিয়ানমার, ইন্দোনেশিয়া, ভারত ও মালয়েশিয়ায় জন্মে। পর্যালোচনায় বলা হয়, এর শাঁসে প্রচুর ভিটামিন ও খনিজ রয়েছে এবং এটি পেকটিনের সমৃদ্ধ উৎস; ফলটি দিয়ে জ্যাম, জেলি ও ওয়াইন তৈরি হয়। একই বছর ভারতের আসাম থেকে লেখা এবং অ্যানালস অব প্ল্যান্ট সায়েন্সেসে প্রকাশিত আরেকটি পর্যালোচনায় বলা হয়, গবেষণায় ফলটিতে খনিজ ও ভিটামিন সি সমৃদ্ধ মাত্রায় পাওয়ার কথা জানা গেছে; তবে গাছটি এখনো কম ব্যবহৃত এবং এর অর্থনৈতিক সম্ভাবনা এখনো কাজে লাগানো হয়নি।
২০২৪ সালের অক্টোবরে ফুড কেমিস্ট্রি: এক্স সাময়িকীতে প্রকাশিত চীনের একটি গবেষণায় বলা হয়, গাছটির ডাল ও শাখা থেকে প্রচুর ফলের থোকা ঝুলে থাকে। গবেষণায় একেকটি ফলের ওজন প্রায় ১৪.৭২ থেকে ১৫.৭১ গ্রাম এবং একটি পূর্ণবয়স্ক গাছ থেকে মোটামুটি ১০০ থেকে ১৫০ কেজি শাঁস পাওয়া যায় বলে উল্লেখ করা হয়। তাজা খাওয়ার পাশাপাশি এ থেকে জুস, শুকনো ফল, জ্যাম ও ফলের ওয়াইন তৈরির কথাও গবেষণায় বলা হয়।

বাংলাদেশে লটকন কোথায় জন্মে
বাংলাদেশে লটকনের জন্য সবচেয়ে পরিচিত জেলা ঢাকার উত্তর-পূর্বের নরসিংদী। দ্য ডেইলি স্টার ২০১৪ সালের জুলাইয়ে জানায়, নব্বইয়ের দশকের শুরু থেকে জেলায় লটকনের চাষ বেড়েছে এবং শিবপুর, রায়পুরা, পলাশ ও বেলাব উপজেলার প্রান্তিক কৃষকেরা লালচে জমিতে এই ফল চাষ করে আয় বাড়িয়েছেন। পত্রিকাটির তথ্যমতে, চারার জন্য আট থেকে দশ ফুট জায়গা লাগে, তিন-চার বছরের মধ্যে গাছে ফল ধরে, আর এক বিঘায় প্রায় ২০০টি চারা লাগানো যায়। নরসিংদীর লটকন তখন প্রধানত সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরবে রপ্তানি হচ্ছিল।
২০১৬ সালের ২৭ জুন নরসিংদী থেকে দ্য ডেইলি স্টারের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রায় দুই দশক আগে শিবপুর ও বেলাবের ঝোপঝাড় ও জঙ্গলে লটকন বুনো অবস্থায় জন্মাত, আর তখন বাণিজ্যিক বাগান কয়েক শ একর জুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) হিসাবে, বসতবাড়ির আঙিনা ও পতিত জমি বাদ দিয়ে জেলায় আগের বছর ৫৮১ হেক্টর এবং সে বছর ৬২৫ হেক্টর জমিতে লটকন চাষ হয়। ডিএইর নরসিংদীর উপপরিচালকের হিসাবে উৎপাদন ছিল আগের বছর ৯ হাজার ৬৬৩ টন এবং সে বছর ১২ হাজার টন। ডিএইর ভাষ্য অনুযায়ী, শিবপুর, বেলাব ও রায়পুরার লাল মাটি ক্যালসিয়ামসহ নানা খনিজে সমৃদ্ধ এবং লটকনের জন্য উপযোগী। মরজাল ও শিবপুর বাজারের পাইকারি হাটে প্রতিদিন অন্য জেলা থেকে ক্রেতারা আসতেন, আর ফলটি ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে পাঠানো হতো।
২০২৫ সালে নরসিংদীর লটকন সরকারি স্বীকৃতি পায়। দ্য ডেইলি স্টার ২০২৫ সালের ২২ জুন জানায়, সে বছরের ২৫ এপ্রিল নরসিংদী লটকনের জন্য ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) স্বীকৃতি পেয়েছে। নরসিংদীর ডিএই সূত্রের বরাতে পত্রিকাটি জানায়, জেলায় তখন প্রায় ১ হাজার ৮০০ হেক্টর জমিতে লটকন চাষ হচ্ছিল এবং সে বছরের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩২ হাজার ৪০০ টন। তবে একই প্রতিবেদনে একটি খারাপ মৌসুমের কথা উঠে আসে: চাষিরা জানান, প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে ফলন আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৫০ শতাংশ কমেছে; যে গাছে সাধারণত তিন-চার মণ ফল ধরে, সেখানে ধরেছে মাত্র ১৫ থেকে ২০ কেজি। নরসিংদী ডিএইর একজন প্রশিক্ষণ কর্মকর্তা বলেন, ফুল আসার সময় অতিরিক্ত গরম ও খরার কারণে মুকুল আগেভাগে ঝরে গেছে, আর অনেক বাগানের গাছ বুড়িয়ে যাচ্ছে। স্থানীয় বাজারে খুচরা দাম তখন আকার ও মান অনুযায়ী কেজিপ্রতি ৮০ থেকে ১৩০ টাকা। শিবপুর উপজেলার একজন চাষি পত্রিকাটিকে বলেন, মাঘ-ফাল্গুনের দিকে গাছে ফুল আসে এবং জ্যৈষ্ঠের শেষ নাগাদ ফল পাকে।
নরসিংদীর বাইরেও লটকনের চাষ হয়। দ্য ডেইলি স্টার ২০১৬ সালের জুনে জানায়, লালমনিরহাটের পাঁচ উপজেলায় কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের হিসাবে প্রায় ২০ হাজার লটকনগাছ ছিল এবং অন্তত ১২০ জন বাণিজ্যিকভাবে লটকন চাষ করছিলেন। সেখানকার একজন উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা বলেন, গাছটি ছায়া পছন্দ করে এবং প্রায়ই বসতবাড়ির পাশে লাগানো হয়; একজন চাষির হিসাবে সেখানে জুনের প্রথম সপ্তাহ থেকে জুলাইয়ের মাঝামাঝি পর্যন্ত ফল তোলা হয়। পাবনায় দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস ২০১৮ সালের জুলাইয়ে জানায়, ভালো ফলনে চাষিরা খুশি; খুচরা বাজারে লটকন বিক্রি হচ্ছিল কেজিপ্রতি ৮০ থেকে ৯০ টাকায় এবং পাইকারিতে ৭০ থেকে ৭৫ টাকায়।

গবেষণাগারের বিশ্লেষণে ফলটিতে যা মিলেছে
লটকন যত জনপ্রিয়, এর পুষ্টি উপাদানের প্রকাশিত পরিমাপ তার তুলনায় কম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টি ও খাদ্যবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ২০১৩ সালে 'ফুড কম্পোজিশন টেবিল ফর বাংলাদেশ' নামে যে খাদ্য উপাদান সারণি তৈরি করে, এবং যা জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) মাধ্যমে প্রকাশিত, তাতে তালিকাভুক্ত প্রতিটি খাবারের প্রতি ১০০ গ্রাম খাওয়ার উপযোগী অংশের মান দেওয়া আছে; কিন্তু লটকন বা বার্মিজ গ্রেপের কোনো অন্তর্ভুক্তি সেখানে নেই। যে পরিমাপগুলো পাওয়া যায়, সেগুলো এসেছে আলাদা আলাদা গবেষণা থেকে।
২০০৯ সালে বাংলাদেশ জার্নাল অব সায়েন্টিফিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল রিসার্চে দেশে বিক্রি হওয়া আটটি ফলের একটি বিশ্লেষণ প্রকাশিত হয়: পাঁচটি অপ্রধান ও তিনটি প্রধান ফল, অর্থাৎ বাঙ্গি, পেয়ারা, পেঁপে, করমচা, লটকন (বার্মিজ গ্রেপ), বিলাতি গাব, উড অ্যাপল ও জাম্বুরা। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি আয়রন, প্রতি ১০০ গ্রামে ৫.৩৪ মিলিগ্রাম, পাওয়া যায় লটকনে। লটকনের নমুনায় কোনো আর্সেনিক পাওয়া যায়নি। আটটি ফলের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ভিটামিন সি, প্রতি ১০০ গ্রামে ৮০ মিলিগ্রাম, পাওয়া যায় পেয়ারায়, লটকনে নয়।
চীনের ২০২৪ সালের গবেষণায় সেখানে পরীক্ষা করা ফলে দ্রবণীয় কঠিন পদার্থ ১৩.৬৭ থেকে ১৪.৩৭ শতাংশ, টাইট্রেশনযোগ্য অম্ল ১.২৫ থেকে ১.৩৯ শতাংশ এবং ভিটামিন সি প্রতি ১০০ গ্রামে ৩.৬৫ থেকে ৩.৯৩ মিলিগ্রাম পাওয়ার কথা জানানো হয়। এই পরিমাপ দক্ষিণ চীনে জন্মানো ফলের, বাংলাদেশের ফলের সঙ্গে তা না-ও মিলতে পারে; গাছটি নিয়ে গবেষকেরা উল্লেখ করেছেন, গাছের অংশ, জাত, জলবায়ু ও এলাকাভেদে উপাদানের মাত্রা বদলায়। তবু এসব পরিমাপ দেখায়, জনপ্রিয় লেখায় লটকনকে যে 'ভিটামিন সি সমৃদ্ধ' বলা হয়, সেই দাবির পক্ষে প্রমাণ সমান নয়।
একই গবেষক দল ফুল ফোটা থেকে ফল পাকা পর্যন্ত লটকনের পরিবর্তন অনুসরণ করে। পূর্ণ প্রস্ফুটনের প্রায় ৭৩ দিন পর ফল পাকতে শুরু করে এবং প্রায় ৯৩ দিনের মধ্যে পাকার মাপকাঠিতে পৌঁছায়। এই সময়ে ফলের প্রধান জৈব অম্ল সাইট্রিক অ্যাসিড উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়, অথচ প্রধান শর্করাগুলোর (এল-সরবোজ, ডি-গ্লুকোজ ও সুক্রোজ) মাত্রায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হয়নি; শর্করা-অম্ল অনুপাত ৩.০২ থেকে বেড়ে ৩.৬৬ হয়। চীনের হানশান নর্মাল ইউনিভার্সিটি ও গুয়াংডং ওশান ইউনিভার্সিটির গবেষকদের আরেকটি গবেষণা ২০২৫ সালের ৩ ডিসেম্বর ফ্রন্টিয়ার্স ইন প্ল্যান্ট সায়েন্সে প্রকাশিত হয়। তাতে মিষ্টি ও টক স্বাদের দুই ধরনের লটকন তুলনা করা হয়। গবেষণায় স্বাদের পেছনের প্রধান উপাদান হিসেবে গ্লুকোজ ও সাইট্রিক অ্যাসিড চিহ্নিত হয়, মিষ্টি ধরনটিতে শর্করা-অম্ল অনুপাত বেশি পাওয়া যায়, আর শাঁসে কোনো ফ্রুক্টোজ শনাক্ত হয়নি।

খোসা, বীজ ও পেকটিন
প্রতিটি লটকনের একটি অংশই কেবল খাওয়া হয়। দিনাজপুরের হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবং গাজীপুরের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের একটি গবেষণা ২০২৪ সালের ১৯ ডিসেম্বর ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল অব ফুড সায়েন্সে প্রকাশিত হয়। তাতে বলা হয়, ফলের অখাদ্য খোসা ও বীজ মিলে প্রায় ৫৫.৫ শতাংশ, যা সাধারণত ফেলে দেওয়া হয়। গবেষকেরা আগস্ট ও সেপ্টেম্বরে গাজীপুর ও নরসিংদীর বাজার ও বাগান থেকে তাজা, পরিপক্ব ফল কিনে খোসা থেকে পেকটিন আহরণের কাজ করেন।
পেকটিন হলো সেই জমাট-সৃষ্টিকারী উপাদান, যা জ্যাম ও মারমালেডকে জেলির মতো ঘনত্ব দেয়, এবং একে দ্রবণীয় খাদ্যআঁশ হিসেবে গণ্য করা হয়। গবেষক দলের পাওয়া সর্বোত্তম শর্তে, অর্থাৎ পিএইচ ২.৪০-এ ৫৬ মিনিট ধরে ৭৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় আহরণে, পরীক্ষায় খোসার গুঁড়া থেকে ১০.৫৬ শতাংশ পেকটিন পাওয়া যায়। এই পেকটিনের এস্টারিফিকেশনের মাত্রা ছিল ৬৫.৭৯ শতাংশ, ফলে এটি উচ্চ-মেথক্সিল পেকটিনের শ্রেণিতে পড়ে। গবেষকেরা বলেন, এর জমাট বাঁধানো, ঘন করা ও স্থিতিশীল রাখার ক্ষমতা চমৎকার এবং এটি শিল্পে বিকল্প উৎস হতে পারে; তবে কাজটি গবেষণাগার পর্যায়ে হয়েছে এবং বড় পরিসরে উৎপাদনের জন্য আরও গবেষণা দরকার।
ফলটির আঁশ নিয়ে কথা বলার ক্ষেত্রে এই তথ্য গুরুত্বপূর্ণ। ২০১৭ সালের পর্যালোচনায় শাঁসকে পেকটিনের সমৃদ্ধ উৎস বলা হয়েছিল, আর ২০২৪ সালের গবেষণায় পেকটিন মাপা হয়েছে খোসায়, যে অংশটি সাধারণত ফেলে দেওয়া হয়। কোনো গবেষণাতেই খাওয়ার উপযোগী শাঁসে প্রতি ১০০ গ্রামে কত গ্রাম খাদ্যআঁশ আছে, তা দেওয়া হয়নি, এবং কোনোটিতেই লটকন খেলে ক্ষুধা বা শরীরের ওজনে কোনো প্রভাব পড়ে কি না, তা পরীক্ষা করা হয়নি।
গবেষণাগারের পরীক্ষা ওজন কমানোর প্রমাণ নয়
বাক্কাউরিয়া রামিফ্লোরা নিয়ে স্বাস্থ্যবিষয়ক বেশির ভাগ গবেষণা হয়েছে টেস্টটিউবে বা গবেষণাগারের প্রাণীর ওপর, গাছের নির্যাস দিয়ে। থাইল্যান্ডের ব্যাংককের ফ্রানাখন রাজাভাত বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি গবেষণা ২০২৫ সালের ১৬ জুন সায়েন্টিফিকা সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়। নাখন নায়োক প্রদেশ থেকে সংগ্রহ করা গাছের পাতা, কাণ্ড, কাণ্ডের বাকল, খোসা এবং বীজসহ শাঁস থেকে ইথানল নির্যাস তৈরি করে গবেষকেরা সেগুলো আলফা-অ্যামাইলেজ ও আলফা-গ্লুকোসাইডেজ নামের দুটি হজম-এনজাইমের ওপর পরীক্ষা করেন; ডায়াবেটিসের ওষুধ অ্যাকারবোজও এই দুই এনজাইমকে লক্ষ্য করে কাজ করে। আলফা-অ্যামাইলেজের বিরুদ্ধে বীজসহ শাঁসের নির্যাসের আইসি৫০ ছিল প্রতি মিলিলিটারে ০.৫০ মিলিগ্রাম, যেখানে অ্যাকারবোজের ছিল ০.১৯, এবং দুই এনজাইমের ক্ষেত্রেই প্রতিটি নির্যাস ওষুধটির চেয়ে কম কার্যকর ছিল। গবেষকেরা বলেন, নির্যাসগুলো কার্যকরী খাদ্যে কাজে লাগতে পারে, তবে তাঁরা কোনো প্রাণী বা মানুষের ওপর তা পরীক্ষা করেননি।
বাংলাদেশের গবেষকেরা ইঁদুরের ওপর ফলটির নির্যাস পরীক্ষা করেছেন। অতীশ দীপঙ্কর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, স্টেট ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ ও নর্দান ইউনিভার্সিটির একটি দল ২০১৮ সালের জানুয়ারিতে বিএমসি কমপ্লিমেন্টারি অ্যান্ড অল্টারনেটিভ মেডিসিনে জানায়, তারা শাঁস ও বীজের মিথানল নির্যাস প্রতি কেজি ওজনে ২০০ মিলিগ্রাম মাত্রায় ইঁদুরকে দিয়ে ব্যথানাশক, প্রদাহরোধী, ঘুমপাড়ানি ও ডায়রিয়ারোধী প্রভাব পেয়েছে। ২০১৬ সালে ইন্ডিয়ান জার্নাল অব এক্সপেরিমেন্টাল বায়োলজিতে প্রকাশিত একটি গবেষণায় ফলের রসে শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট সক্রিয়তা পাওয়া যায় এবং পরীক্ষায় ইঁদুরের কোষে কোনো বিষাক্ত প্রভাব দেখা যায়নি; আর ২০২০ সালে ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল অব বায়োসায়েন্সেসে প্রকাশিত একটি নিবন্ধে খোসার নির্যাসে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট সক্রিয়তার কথা জানানো হয়।
এসব গবেষণা দেখায়, গবেষণাগারের পরিবেশে ঘন নির্যাস কী করে। এগুলোর কোনোটিতেই পরীক্ষা করা হয়নি যে ফল হিসেবে লটকন খেলে মানুষের ওজন বদলায় কি না, আর সে উদ্দেশ্যে গবেষণাগুলো সাজানোও হয়নি। তাই এসব ফলকে এমন প্রমাণ হিসেবে পড়া যায় না যে ফলটি খেলে ওজন কমে, রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে থাকে বা কোনো রোগ সারে।
ওজন, ফল ও খাদ্যআঁশ নিয়ে স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের পরামর্শ
প্রতিবেদনের মূল নীতিটি স্বাস্থ্যসেবা সংস্থার পরামর্শের সঙ্গে মেলে। এনএইচএস ব্যাখ্যা করে, খাবার ও পানীয়ের শক্তি মাপা হয় ক্যালরিতে, যা প্রায়ই কিলোক্যালরি (কিক্যাল) হিসেবে লেখা থাকে। মোটামুটি হিসাবে একজন গড়পড়তা পুরুষের দিনে ২ হাজার ৫০০ কিক্যাল এবং একজন গড়পড়তা নারীর ২ হাজার কিক্যাল দরকার হয়, যদিও বয়স, শরীরের আকার ও শারীরিক পরিশ্রম অনুযায়ী এই হিসাব বদলায়। শরীর যত শক্তি খরচ করে, তার চেয়ে বেশি খেলে বাড়তি শক্তি চর্বি হিসেবে জমে ওজন বাড়ে; আর কম খেলে শরীর সেই জমানো চর্বি থেকে শক্তি নেয়, ফলে ওজন কমে।
ওজন কমানোর পরামর্শে এনএইচএস বলে, প্রতিদিন পাঁচ ভাগ ফল ও সবজি খাওয়ার লক্ষ্য রাখতে হবে, যেখানে ৮০ গ্রাম তাজা, টিনজাত বা হিমায়িত ফল বা সবজি এক ভাগ হিসেবে গণ্য; সপ্তাহে ১৫০ মিনিট সক্রিয় থাকতে হবে, যা ছোট ছোট ভাগে ভাগ করে নেওয়া যায়; চিনিযুক্ত পানীয়ের বদলে পানি পান করতে হবে; চিনি ও চর্বি বেশি এমন খাবার কমাতে হবে; আর অস্বাস্থ্যকর খাবার ঘরে মজুত না রেখে স্বাস্থ্যকর বিকল্প রাখতে হবে, যার মধ্যে ফলের কথাও বলা হয়েছে। আলাদা এক নির্দেশনায় এনএইচএস জানায়, সুষম খাদ্যের অংশ হিসেবে প্রাপ্তবয়স্কদের খাদ্যআঁশ গ্রহণ দিনে ৩০ গ্রামে বাড়ানো উচিত, এবং প্রচুর আঁশযুক্ত খাবার খাওয়ার সঙ্গে হৃদ্রোগ, স্ট্রোক, টাইপ ২ ডায়াবেটিস ও অন্ত্রের ক্যানসারের ঝুঁকি কম থাকার সম্পর্ক রয়েছে।
স্বাস্থ্যকর খাদ্য নিয়ে ডব্লিউএইচওর ২০২৬ সালের ২৬ জানুয়ারি তারিখের তথ্যপত্রে বলা হয়, ১০ বছরের বেশি বয়সী সবার দিনে অন্তত ৪০০ গ্রাম ফল ও সবজি এবং অন্তত ২৫ গ্রাম প্রাকৃতিক খাদ্যআঁশ খাওয়ার লক্ষ্য রাখা উচিত। সংস্থাটি মোট দৈনিক শক্তি গ্রহণের ১০ শতাংশের কম পর্যন্ত মুক্ত শর্করা সীমিত রাখার পরামর্শ দেয়; স্বাস্থ্যকর ওজনের এবং দিনে প্রায় ২ হাজার ক্যালরি খাওয়া একজন মানুষের ক্ষেত্রে এর পরিমাণ প্রায় ৫০ গ্রাম, বা ১২ সমান চা-চামচ। তথ্যপত্রে আরও বলা হয়, প্রাপ্তবয়স্কদের মোট চর্বি দৈনিক শক্তির ৩০ শতাংশ বা তার কম রাখলে অস্বাস্থ্যকর ওজন বৃদ্ধি ঠেকাতে সাহায্য হতে পারে, আর লবণ দিনে ৫ গ্রামের কম রাখা উচিত।
ভিটামিন সি সম্পর্কে মেডলাইনপ্লাস বলে, শরীরের সব অংশের টিস্যুর বৃদ্ধি ও মেরামতের জন্য এই ভিটামিন দরকার, যার মধ্যে রয়েছে কোলাজেন তৈরি, ক্ষত সারানো এবং আয়রন শোষণ; আর সব ফল ও সবজিতেই কিছু পরিমাণ ভিটামিন সি থাকে। সংস্থাটির হিসাবে ১৯ বছর ও তার বেশি বয়সী পুরুষের দিনে ৯০ মিলিগ্রাম এবং নারীর ৭৫ মিলিগ্রাম ভিটামিন সি গ্রহণ করা উচিত। মেডলাইনপ্লাস আরও জানায়, ভিটামিন সি সাপ্লিমেন্ট বা ভিটামিন সি সমৃদ্ধ খাবার সাধারণ সর্দি-কাশিতে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি কমায় না।
এই পরামর্শের আলোকে দেখলে, লটকন সেই অনেক ফলের একটি, যা দিনের ফল ও সবজির হিসাবে যোগ হতে পারে এবং চিনিযুক্ত নাশতা ও পানীয়ের বিকল্প হতে পারে। কোনো স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ লটকন বা অন্য কোনো একক ফলকে ওজন কমানোর উপায় হিসেবে উল্লেখ করেনি। যাঁরা ওজন কমাতে চান, কিংবা ডায়াবেটিস বা অন্য কোনো দীর্ঘমেয়াদি রোগে ভুগছেন, খাদ্যাভ্যাস বদলানোর আগে তাঁদের চিকিৎসক বা নিবন্ধিত পুষ্টিবিদের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
ছবি: Faruk raz / উইকিমিডিয়া কমন্স (সিসি বাই-এসএ ৪.০)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪ (১৭ জুন ২০২৬), দ্য ডেইলি স্টার (১৬ জুলাই ২০১৪, ৯ জুন ২০১৬, ২৭ জুন ২০১৬, ২২ জুন ২০২৫), দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস (১৬ জুলাই ২০১৮), বাংলাদেশ জার্নাল অব সায়েন্টিফিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল রিসার্চ (২০০৯), ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল অব নিউট্রিশন অ্যান্ড ফুড সায়েন্সেস (২০১৭), অ্যানালস অব প্ল্যান্ট সায়েন্সেস (২০১৭), ইন্ডিয়ান জার্নাল অব এক্সপেরিমেন্টাল বায়োলজি (২০১৬), বিএমসি কমপ্লিমেন্টারি অ্যান্ড অল্টারনেটিভ মেডিসিন (২০১৮), ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল অব বায়োসায়েন্সেস (২০২০), ফুড কেমিস্ট্রি: এক্স (২০২৪), ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল অব ফুড সায়েন্স (২০২৪), সায়েন্টিফিকা (২০২৫), ফ্রন্টিয়ার্স ইন প্ল্যান্ট সায়েন্স (২০২৫), ফুড কম্পোজিশন টেবিল ফর বাংলাদেশ (পুষ্টি ও খাদ্যবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ২০১৩), বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, এনএইচএস, মেডলাইনপ্লাস, উইকিপিডিয়া।





মন্তব্য
(০)