বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি) উদ্ভাবিত আরও তিনটি ধানের জাত ২০২৫ সালের ১৮ জুন, বুধবার, জাতীয় বীজ বোর্ডের (এনএসবি) সভায় অনুমোদন পায়। নতুন জাতগুলোর একটি লবণাক্ততা সহনশীল আমন ধান (ব্রি ধান১১২), একটি উচ্চ ফলনশীল বোরো ধান (ব্রি ধান১১৩) এবং অন্যটি ব্লাস্ট রোগ প্রতিরোধী বোরো ধান (ব্রি ধান১১৪)। কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. মোহাম্মদ এমদাদ উল্লাহ মিয়ানের সভাপতিত্বে সভায় ব্রির মহাপরিচালক ড. মোহাম্মদ খালেকুজ্জামানসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
এই তিনটি নিয়ে ব্রি তখন পর্যন্ত মোট ১২১টি ধানের জাত উদ্ভাবন করেছে, যার ৮টি হাইব্রিড। ১৯৭০ সালের ১ অক্টোবর প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানটির প্রধান কার্যালয় গাজীপুরের জয়দেবপুরে; বিভিন্ন কৃষি-পরিবেশ অঞ্চলে এর ১৭টি আঞ্চলিক কার্যালয় আছে। ব্রির মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও উদ্ভিদ প্রজনন বিভাগের প্রধান খোন্দকার মো. ইফতেখারুদ্দৌলা প্রথম আলোকে বলেন, নতুন জাতগুলোর বৈশিষ্ট্য ভিন্ন হলেও সবগুলোই বেশি ফলন দেবে এবং এগুলো চাষ করে কৃষকেরা লাভবান হতে পারবেন।
ব্রি ধান১১২: উপকূলের লবণাক্ত জমির আমন
ব্রি ধান১১২ লবণাক্ততা সহনশীল, মাঝারি জীবনকালের রোপা আমন জাত। এর ডিগপাতা (গাছের সবচেয়ে ওপরের পাতা) প্রচলিত ব্রি ধান৭৩ এর চেয়ে খাড়া। লবণাক্ততার মাত্রাভেদে জাতটি হেক্টরে ৪ দশমিক ১৪ থেকে ৬ দশমিক ১২ টন ফলন দিতে পারে, যা এর মাতৃসারি ব্রি ধান৭৩ এর চেয়ে হেক্টরে এক থেকে দেড় টন বেশি। জীবনকাল ১২০ থেকে ১২৫ দিন, গাছের উচ্চতা ১০৩ থেকে ১০৫ সেন্টিমিটার; কাণ্ড মজবুত, সহজে ঢলে পড়ে না।
প্রতিটি শীষে গড়ে ২১০টি পুষ্ট দানা থাকে, যা ব্রি ধান৭৩ এর চেয়ে ৮০ থেকে ৯০টি বেশি। ব্রির তথ্যমতে, জাতটিতে জিএন১এ (Gn1a) জিন থাকায় শীষে দানার সংখ্যা বাড়ে। ২০০৫ সালে সায়েন্স সাময়িকীতে প্রকাশিত জাপানের নাগোয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় দেখা যায়, এই জিন সাইটোকাইনিন অক্সিডেজ নামের একটি এনজাইম তৈরি করে, যা উদ্ভিদ হরমোন সাইটোকাইনিন ভেঙে ফেলে; জিনটির প্রকাশ কম হলে শীষে দানা বাড়ে।
জাতটির প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো চারা অবস্থায় তিন সপ্তাহ পর্যন্ত ১২ ডিএস/মিটার মাত্রার লবণাক্ততা সহ্য করা। অঙ্গজ বৃদ্ধি থেকে প্রজনন পর্যন্ত লবণাক্ততা-সংবেদনশীল সব ধাপে এটি ৮ ডিএস/মিটার লবণাক্ততায়ও ফলন দেয়। চাল মাঝারি চিকন ও সাদা, ভাত ঝরঝরে; শীষ থেকে ধান সহজে ঝরে পড়ে না। জীবনকাল তুলনামূলক কম হওয়ায় উপকূলীয় লবণাক্ত অঞ্চলে ধান কাটার পর মাঝারি উঁচু থেকে উঁচু জমিতে সূর্যমুখী ও লবণ সহনশীল সরিষা আবাদের সুযোগ তৈরি হবে।
ব্রি ধান১১৩: ব্রি ধান২৯ এর বিকল্প বোরো
বোরো মৌসুমের জনপ্রিয় জাত ব্রি ধান২৯ এর বিকল্প হিসেবে ব্রি ধান১১৩ ছাড়করণ করা হয়। এটি মাঝারি চিকন দানার উচ্চ ফলনশীল জাত। ডিগপাতা খাড়া, প্রশস্ত ও লম্বা এবং ধান পাকলেও পাতা সবুজ থাকে। পূর্ণবয়স্ক গাছের উচ্চতা ১০২ থেকে ১০৫ সেন্টিমিটার; গাছ শক্ত হওয়ায় সহজে হেলে পড়ে না। গড় জীবনকাল ১৪৩ দিন।
এক হাজার পুষ্ট ধানের ওজন গড়ে ১৯ দশমিক ৪ গ্রাম। চাল মাঝারি চিকন ও সাদা, দেখতে অনেকটা নাজিরশাইলের মতো। চালে অ্যামাইলোজ ২৮ শতাংশ ও প্রোটিন ৮ দশমিক ৪ শতাংশ, ভাত ঝরঝরে। ফলন পরীক্ষায় জাতটি ব্রি ধান৮৮ এর চেয়ে ১১ দশমিক ৫ শতাংশ বেশি ফলন দেয়। গড় ফলন হেক্টরে ৮ দশমিক ১৫ টন; উপযুক্ত পরিবেশে সঠিক ব্যবস্থাপনায় হেক্টরে ১০ দশমিক ১ টন পর্যন্ত।

ব্রি ধান১১৪: ব্লাস্ট প্রতিরোধী দীর্ঘ জীবনকালের বোরো
ব্রি ধান১১৪ বোরো মৌসুমের দীর্ঘ জীবনকালের জাত, যার বিশেষ বৈশিষ্ট্য ব্লাস্ট রোগ প্রতিরোধ। ব্লাস্ট ম্যাগনাপোর্থি ওরাইজি (Magnaporthe oryzae) নামের ছত্রাকের কারণে হয়; এটি পাতা, গিঁট ও শীষের গোড়াসহ গাছের মাটির ওপরের সব অংশে দাগ তৈরি করে, আর শীষের গোড়া আক্রান্ত হলে দানা পুষ্ট হয় না। বিশ্বে প্রতি বছর এই রোগে যে পরিমাণ ধান নষ্ট হয়, তা দিয়ে ছয় কোটির বেশি মানুষের খাবার হতে পারত বলে হিসাব রয়েছে।
জাতটির ডিগপাতা খাড়া, প্রশস্ত ও লম্বা, পাতা গাঢ় সবুজ, গাছ মজবুত এবং হেলে পড়ে না। গড় ফলন হেক্টরে ৭ দশমিক ৭৬ টন, ভালো পরিচর্যায় ১০ দশমিক ২৩ টন পর্যন্ত। দানা মাঝারি মোটা ও সোনালি। গড় জীবনকাল ১৪৯ দিন, যা জনপ্রিয় বোরো জাত ব্রি ধান৮৯ এর সমান। এক হাজার পুষ্ট ধানের ওজন গড়ে ১৭ দশমিক ৪ গ্রাম; চালে অ্যামাইলোজ ২৭ শতাংশ ও প্রোটিন ৭ দশমিক ৭ শতাংশ, ভাত ঝরঝরে।
জাতটিতে ব্লাস্ট প্রতিরোধী প্রকট জিন পিআই৯ (Pi9) আছে এবং কৃত্রিমভাবে রোগজীবাণু প্রয়োগের পরীক্ষায় এটি উচ্চমাত্রার প্রতিরোধ (স্কোর ০) দেখিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ওহাইও স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা ২০০৬ সালে জেনেটিকস সাময়িকীতে এই জিনটিকে ব্লাস্টের বিরুদ্ধে বিস্তৃত পরিসরের (ব্রড-স্পেকট্রাম) প্রতিরোধী জিন হিসেবে বর্ণনা করেন।


ছবি: Sajib5467 / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, প্রথম আলো, সায়েন্স (আশিকারি ও অন্যান্য, ২০০৫), জেনেটিকস (কু ও অন্যান্য, ২০০৬), উইকিপিডিয়া




মন্তব্য
(০)