সিলেটের লেবুজাতীয় ফল সাতকরা দিয়ে রান্না গরুর মাংস অঞ্চলটির ঐতিহ্যবাহী রান্নার অন্যতম পরিচিত পদ। ২০২৬ সালের ৩ মে জাগো নিউজের লাইফস্টাইল বিভাগে এই পদের একটি রেসিপি প্রকাশিত হয়। টক স্বাদ ও সুগন্ধের জন্য সাতকরা সিলেট অঞ্চলের খাদ্যসংস্কৃতিতে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে জায়গা করে আছে। সাতকরা দিয়ে মাছ, মাংসসহ নানা পদ রান্না হয়, তবে গরুর মাংসের সঙ্গে এর মিলনই সবচেয়ে জনপ্রিয়। মাংসের সঙ্গে সাতকরার টক স্বাদ মিশে যে স্বাদ ও ঘ্রাণ তৈরি হয়, তা অন্য রান্নায় সহজে মেলে না।
সাতকরা কী এবং কোথায় জন্মায়
সাতকরার বৈজ্ঞানিক নাম Citrus macroptera, এটি লেবুজাতীয় উদ্ভিদের পরিবার রুটেসির সদস্য। ২০১৭ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণা পর্যালোচনা অনুযায়ী এটি একটি আধা-বুনো লেবুজাতীয় প্রজাতি, যার আদি নিবাস মালয় দ্বীপপুঞ্জ ও মেলানেশিয়া অঞ্চল। বাংলাদেশের সিলেট বিভাগে অধিকাংশ বাড়ির আঙিনায় ও পাহাড়ি এলাকায় গাছটি জন্মে। ভারতের আসামের বরাক উপত্যকায়ও এর ব্যাপক চাষ হয়। কাঁটাওয়ালা গাছটি প্রায় ৫ মিটার উঁচু হয়; ফলের ব্যাস প্রায় ৬ থেকে ৭ সেন্টিমিটার, খোসা মোটামুটি মসৃণ ও পুরু, পাকলে হলুদ হয়। ভেতরের শাঁস বেশ শুকনো, রস কম, স্বাদ তেতো ও টক।
সিলেটে সাতকরার পুরু খোসাই মূলত সবজির মতো খাওয়া হয়, তেতো-টক স্বাদের কারণে শাঁস সাধারণত ফেলে দেওয়া হয়। কাঁচা বা পাকা সাতকরার খোসা টুকরো করে গরু, খাসি ও মাছের তরকারি এবং ডালে রান্না করা হয়; পরে রান্নার জন্য রোদে শুকিয়েও রাখা হয়, আচারও বানানো হয়। দ্য ডেইলি স্টারের ২০১৫ সালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, সাতকরা বিশেষভাবে মাংসের পদের উপযোগী এবং আচারেও ভালো মানায়। একই প্রতিবেদন অনুযায়ী সিলেটের জৈন্তাপুরে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বারি) সাইট্রাস গবেষণা কেন্দ্র ১৯৬১ সালে ১১৯ একর জমিতে প্রতিষ্ঠিত হয়, সেখানে জুলাই থেকে সাতকরাসহ নানা লেবুজাতীয় গাছের চারা বিক্রি শুরু হয়।

সিলেট থেকে দেশজুড়ে একটি পদ
সাতকরা-গরুর মাংসের উৎপত্তি সিলেট বিভাগে, তবে পদটি এখন সারা দেশে এবং যুক্তরাজ্যে বসবাসরত ব্রিটিশ বাংলাদেশিদের মধ্যেও জনপ্রিয়। ঈদুল আজহার সময় পদটির কদর বিশেষভাবে বাড়ে। মূল উপকরণ গরুর মাংস, সাতকরা, পেঁয়াজ, রসুন ও তেজপাতা। সাধারণত সাদা ভাত বা বিন্নি চালের ভাতের সঙ্গে পরিবেশন করা হয়, পাশে থাকে শসা, টমেটো ও পেঁয়াজের সালাদ। কেউ কেউ গরুর মাংসের বদলে মাছ বা অন্য মাংস দিয়েও একইভাবে রান্না করেন।

উপকরণ
- গরুর মাংস ১ কেজি
- সাতকরা ১টি
- পেঁয়াজ কুচি ১ কাপ
- পেঁয়াজ বাটা ১ কাপ
- রসুন বাটা দেড় টেবিল চামচ
- আদা বাটা ১ টেবিল চামচ
- মরিচের গুঁড়া ১ টেবিল চামচ
- হলুদের গুঁড়া আধা টেবিল চামচ
- ধনিয়া গুঁড়া ১ টেবিল চামচ
- জিরার গুঁড়া আধা টেবিল চামচ
- গরম মসলার গুঁড়া আধা চা চামচ
- তেজপাতা, দারুচিনি ও লবঙ্গ কয়েক টুকরো
- তেল ১ কাপ
- পানি প্রয়োজনমতো
- লবণ স্বাদমতো
রান্নার প্রণালি
- গরুর মাংস ভালোভাবে ধুয়ে পানি ঝরিয়ে নিন। একটি সাতকরা পরিষ্কার করে ধুয়ে ছোট ছোট টুকরো করে কেটে রাখুন।
- কড়াইয়ে মাংস নিয়ে একে একে পেঁয়াজ কুচি, পেঁয়াজ বাটা, রসুন ও আদা বাটা, সব গুঁড়া মসলা, তেজপাতা, দারুচিনি, লবঙ্গ, তেল ও লবণ দিন। সব একসঙ্গে মিশিয়ে মাঝারি আঁচে ধীরে ধীরে কষান, যাতে মসলা মাংসের সঙ্গে ভালোভাবে মিশে যায়।
- কিছুক্ষণ কষানোর পর ঢাকনা খুলে পাঁচ-ছয় মিনিট পরপর নেড়ে দিন এবং আরও কিছুক্ষণ কষান।
- মাংস আধা সেদ্ধ হয়ে এলে কেটে রাখা সাতকরার টুকরো দিন। প্রয়োজনমতো পানি দিয়ে ঢেকে অল্প আঁচে সেদ্ধ হতে দিন, যাতে সাতকরার টক স্বাদ মাংসে মিশে যায়।
- মাংস নরম হয়ে এলে গরম মসলার গুঁড়া ছিটিয়ে আরও কয়েক মিনিট রান্না করুন। চুলা থেকে নামিয়ে ভাতের সঙ্গে পরিবেশন করুন।

ছবি: Akhtar Owais Ahmed / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY 2.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, দ্য ডেইলি স্টার, এভিডেন্স-বেসড কমপ্লিমেন্টারি অ্যান্ড অল্টারনেটিভ মেডিসিন (২০১৭), উইকিপিডিয়া





মন্তব্য
(০)