২০২৬ সালের জুলাইয়ের শেষ দিকে বঙ্গোপসাগরে ইঞ্জিন বিকল একটি মাছ ধরার নৌকা থেকে দুই শ্রীলঙ্কান জেলেকে জীবিত উদ্ধার করেন কক্সবাজারের মহেশখালী উপজেলার কুতুবজোম ইউনিয়নের জিয়াউর রহমান ও তার ট্রলারের জেলেরা। উদ্ধার হওয়া দুজন বাবা ও ছেলে, এস এইচ চামিন্দা ও সাউন্ডা হান্নাদিগিপিয়াওয়াটিং। বিবিসি বাংলার ২৮ জুলাইয়ের প্রতিবেদন অনুযায়ী, নৌকাটি টানা ৩৬ দিন সাগরে ভেসে থাকার পর বাংলাদেশের সমুদ্রসীমায় জিয়াউর রহমানের ট্রলারের নজরে আসে। ওই ট্রলারে তিনিসহ মোট আটজন জেলে ছিলেন।
১৯ জুন থেকে সাগরে ভেসে থাকা
মহেশখালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আবদুস সুলতান দোভাষীর মাধ্যমে দুই জেলের সঙ্গে কথা বলে বিবিসি বাংলাকে জানান, ১৯ জুন চারজন শ্রীলঙ্কান জেলে ট্রলার নিয়ে মাছ ধরতে বের হয়েছিলেন। গভীর সমুদ্রে নৌকার ইঞ্জিন বিকল হয়ে যায়, আর মেরামত করতে না পারায় সেটি ভাসতে ভাসতে বাংলাদেশের দিকে চলে আসে। চারজনের মধ্যে দুজন অন্য একটি ট্রলারে ফিরে গেলেও নৌকাটি রক্ষা করতে বাবা ও ছেলে সেটি ছেড়ে যাননি।
জিয়াউর রহমান উদ্ধার হওয়া দুজনের বরাত দিয়ে বিবিসি বাংলাকে বলেন, সঙ্গের খাবার ফুরিয়ে যাওয়ার পর তারা সাগরের কাঁচা মাছ খেয়ে বেঁচে ছিলেন। দ্য ডেইলি স্টার ও ঢাকা ট্রিবিউনের প্রতিবেদনে দুই জেলের ভাষ্য উদ্ধৃত করে বলা হয়, ভেসে থাকার সময় সাগরে আরেকটি নৌযানের লোকজন তাদের ওপর হামলা চালিয়ে ইঞ্জিন, ব্যাটারি, ডিজেল ও সরঞ্জাম নিয়ে যায়। ডেইলি স্টারের তথ্যমতে চামিন্দার বয়স ৫১ এবং তার ছেলের ৩০ বছর।
দূরত্বের হিসাবেই ঘটনাটি অস্বাভাবিক। বিবিসি বাংলা জানায়, বাংলাদেশ থেকে সমুদ্রপথে শ্রীলঙ্কার দূরত্ব প্রায় ১৩০০ নটিক্যাল মাইল এবং দক্ষিণ এশিয়ার এই দুই দেশের মধ্যে সরাসরি কোনো জলসীমা নেই। দুই জেলের বাড়ি ডেভিনুওয়ারার রুরাল হসপিটাল রোডে। ডেভিনুওয়ারা বা ডোন্দ্রা শ্রীলঙ্কার দক্ষিণ প্রদেশের মাতারার কাছে দ্বীপদেশটির একেবারে দক্ষিণ প্রান্তের জনপদ, যেখানে রয়েছে ডোন্দ্রা হেড বাতিঘর।

গুলিরধার থেকে ১৪ ঘণ্টার পথ
জিয়াউর রহমান বিবিসি বাংলাকে জানান, এক রাতে বঙ্গোপসাগরের গুলিরধার এলাকায় একটি নৌকাকে ভাসতে দেখে তিনি কাছে যান এবং দেখেন ইঞ্জিন বিকল নৌকায় অসুস্থ অবস্থায় বসে আছেন দুই ভিনদেশি। "কাছে গিয়ে দেখলাম দুইজন মানুষ বসা থেকে উঠতে পর্যন্ত পারতেছে না। তাদের কোন কথাই বুঝতেছিলাম না। তারা হাতের ইশারায় সাহায্য চাচ্ছিল। আর শুধু বলছিলো- শ্রীলঙ্কান, শ্রীলঙ্কান", বলেন তিনি। তার ভাষ্যে, দুজন বারবার "নেভি? কোস্টগার্ড" শব্দ দুটিও বলছিলেন।
শ্রীলঙ্কান দুই জেলে নিজেদের নৌকা হাতছাড়া করতে চাননি। তাই তাদের নিজের ট্রলারে তুলে নেওয়ার পর নৌকাটি ট্রলারের সঙ্গে বেঁধে উপকূলের দিকে রওনা হন জিয়াউর রহমান। প্রায় ১৪ ঘণ্টা চলার পর পরদিন সকালে তারা উপকূলে পৌঁছান। ঢাকা ট্রিবিউন জানায়, নৌকাটি টেনে আনা হয় মহেশখালীর তাজিয়াকাটা ঘাটে। পথে মোবাইল নেটওয়ার্ক পাওয়া গেলে হোয়াটসঅ্যাপে পরিবারের সঙ্গে কথা বলেন বাবা-ছেলে।
এরপর জিয়াউর রহমান থানা ও কোস্টগার্ডকে খবর দেন, দুজনকে নিজের বাড়িতে নিয়ে খাবার দেন এবং স্থানীয় চিকিৎসক ডেকে চিকিৎসা করান। একদিন তার বাড়িতে থাকার পর শনিবার তিনি দুজনকে মহেশখালী থানায় নিয়ে যান। ডেইলি স্টারকে দুই জেলের একজন বলেন, উদ্ধারকারীরা শুধু তাদের প্রাণই বাঁচাননি, খাইয়েছেন, আশ্রয় দিয়েছেন এবং পরিবারের সদস্যের মতো আচরণ করেছেন।

দেশে ফেরানোর প্রক্রিয়া ও নৌকার ভবিষ্যৎ
পুলিশ জানায়, দুই জেলে নিজের ভাষা ছাড়া অন্য কোনো ভাষা বোঝেন না। তাই কক্সবাজারের একটি হোটেলে কর্মরত এক শ্রীলঙ্কান নাগরিককে থানায় এনে দোভাষী হিসেবে পুরো ঘটনা শোনা হয়। পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসন বিষয়টি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে জানায়, মন্ত্রণালয় জানায় শ্রীলঙ্কান দূতাবাসকে। ওসি আবদুস সুলতান বিবিসি বাংলাকে বলেন, শ্রীলঙ্কার রাষ্ট্রদূত তাকে ফোন করে দুই জেলের সঙ্গে কথা বলেন এবং তাদের দেশে ফিরিয়ে নেওয়ার আশ্বাস দেন। দুজনের পাসপোর্ট ছবি দূতাবাসে পাঠানো হয়েছে; ট্রাভেল পাসসহ সব প্রক্রিয়া শেষ হলে তাদের দেশে ফেরানো সম্ভব হবে। সাউন্ডার মেয়ে শ্রীলঙ্কা থেকে বিবিসি বাংলাকে দুজনের পরিচয় নিশ্চিত করে বাংলাদেশের জেলে ও পুলিশকে ধন্যবাদ জানান।
দুজনকে থানা হেফাজত থেকে সমাজসেবা অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধানে রাখতে আদালতে আবেদন করা হয়। দৈনিক ইত্তেফাক ২৭ জুলাই জানায়, আদালতের আদেশে ২৮ জুলাই সকালে তাদের ঢাকার মিরপুর-১ এলাকার সরকারি আশ্রয়কেন্দ্রে স্থানান্তরের প্রক্রিয়া চলছিল।
যে নৌকা ছেড়ে তারা যেতে চাননি, সেটি শ্রীলঙ্কায় পাঠানো সম্ভব হবে না বলে পুলিশ জানায়। তখন বাবা-ছেলে নৌকাটি উদ্ধারকারী জিয়াউর রহমানকে উপহার দিতে চান। ওসি জানান, নৌকাটি জব্দ তালিকায় তুলে আদালতে উপস্থাপন করা হয়েছে এবং আদালতের প্রক্রিয়া শেষ করেই কেবল সেটি উপহার হিসেবে নেওয়া যাবে। জিয়াউর রহমান বিবিসি বাংলাকে বলেন, "তাদের জন্য নিঃস্বার্থ উপকার করেছি। তারা যদি ভালবেসে নৌকাটি দিতে চান আমি সেটি নেবো"।

মহেশখালী বঙ্গোপসাগরের একটি দ্বীপ উপজেলা, আয়তন ৩৬২.১৮ বর্গকিলোমিটার। ২০২২ সালের জনশুমারিতে এর জনসংখ্যা ছিল ৩ লাখ ৮৫ হাজার ৫১০। পৌরসভা ছাড়াও উপজেলায় আটটি ইউনিয়ন রয়েছে, কুতুবজোম তার একটি। মাছ ধরা ও লবণ উৎপাদন এখানকার মানুষের প্রচলিত জীবিকা।
ছবি: Tanvir Rahat / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: বিবিসি বাংলা, দ্য ডেইলি স্টার, ঢাকা ট্রিবিউন, দৈনিক ইত্তেফাক, উইকিপিডিয়া





মন্তব্য
(০)